hadith book logo

মৃত্যু ও কবর সম্পর্কে করণীয় ও বর্জনীয়

লেখকঃ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৮

কুরআনখানী প্রশ্নঃ মৃত ব্যক্তি কি কুরআনখানীর সওয়াব লাভ করে?

উত্তরঃ এক দ্বীনি ভাই প্রশ্ন করেছেন,মৃত ব্যক্তি কুরআনখানীর সওয়াব লাভ করে কি না। তাই এসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে শরীয়তের সিদ্ধান্ত পেশ করতে চাই। তবে তার আগে কবর যিয়ারত ও ইসালে সওয়াব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করছি।

কবর যিয়ারতের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত:

কবর যিয়ারতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেক যে সকল নির্দেশনা পাওয়া যায় তার মোটামাটি সারাংশ নিম্নরূপঃ

১) মৃতদের জন্য দুয়া করা।

২) মৃতদের প্রতি সালাম প্রদান করা।

৩) কবর দেখে শিক্ষা গ্রহণ করা।

কুরআন পড়া,ফাতিহাখানী করা বা এ জাতীয় কোন কিছু করার কথা কুরআন-হাদীসে নেই। কবর যিয়ারতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একাধিক দুয়া বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি দুয়া হলঃ

السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ أَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمْ الْعَافِيَةَ

““কবর গৃহের হে মুমিন-মুসলিম অধিবাসীগণ,আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ চাইলে আমরাও আপনাদের সাথে মিলিত হব। আমি আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা কামনা করছি। ” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ গোরস্থানে প্রবেশকালে কী বলতে হয়। হাদীস নং ১৬২০]

সুনানে আবূ দাঊদে বর্ণিত হয়েছে,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাফন ক্রিয়া শেষ করে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলতেন,

اسْتَغْفِرُوا لأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ فَإِنَّهُ الآنَ يُسْأَلُ

"তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা চাও। দুয়া কর যেন সে স্থির থাকতে পারে। কারণ,তাকে এখনই প্রশ্ন করা হবে।" [সুনান আবূ দাঊদ, অধ্যায়ঃ কবরের নিকট মাইয়্যেতের জন্য দুয়া-এস্তেগফার করা। হাদীস নং ২৮০৪ ৯ম খণ্ড ২৪ পৃষ্ঠা,সহীহ আবূ দাঊদ, আলবানী।]

সুনান ইবনে মাজাতে বর্ণিত হয়েছে,লাশ কবরে রাখা হলে তিনি এ দুয়া পাঠ করতেনঃ

بِسْمِ اللهِ وَعلى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ

“বিসমিল্লাহি আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ" “আল্লাহর নামে আল্লাহর রাসূলের আদর্শের উপরে এই মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখলাম। ” [সুনান ইবনে মাজাহ,অধ্যায়ঃ মায়্যেতকে কবরে প্রবেশ করানোর ব্যপারে বর্ণনা। হাদীস নং ১৫৩৯,সহীহ, আলবানী) আফসোসের বিষয় হল,এই সুন্নাত ক্রমেই উঠে যাচ্ছে। খুব কম লোকই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ হয়ত জানাযা পড়েই চলে যায়। কেউ মাটি দিয়েই চলে যায়। কম লোক আছে যারা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মৃত ব্যক্তির সাওয়াল-জওয়াবের সময় তার দৃঢ়তার জন্য দুয়া করে।]

এ সম্পর্কে হাদীসের কোথাও উল্লেখ নেই যে,তিনি কবরবাসীদের উদ্দেশ্যে কোন সূরা পাঠ করেছেন। অথচ কবরের পাশে কুরআনের বিভিন্ন সূরা পাঠ করা বর্তমানে আমাদের সমাজের সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে!

সহীহ হাদীসে আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে,

زَارَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ قَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ ، ثُمَّ قَالَ : " اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي ، وَاسْتَأْذَنْتُهُ أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي فَزُورُوا الْقُبُورَ ، فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করতে গিয়ে কাঁদলেন এবং তাঁর সাথে যে সাহাবীগণ ছিলেন তারাও কাঁদলেন। অতঃপর তিনি বললেন,

“আমি আমার মায়ের মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম কিন্তু আমাকে সে অনুমতি প্রদান করা হয়নি। তবে আমি মায়ের কবর যিয়ারতের জন্যে আবেদন জানালে তিনি তা মঞ্জুর করেন। অতএব,তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা কবর যিয়ারত করলে মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। ” [সহীহ মুসলিম, হা/৯৭৬, মুসতাদরাক আলাস সাহীহাইন, অধ্যায়: কিতাবুল জানায়েয, অনুচ্ছেদ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করা। হা/১৪৩০]

এ হাদীস থেকে জানা যায়,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিয়ম ছিল,মৃতদের জন্য শুধু ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। মৃতদের উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করা আদৌ তাঁর রীতি ছিল না। এটাই হাদীস ও কুরআনে বর্ণিত সঠিক পদ্ধতি এবং বিবেক সম্মত পন্থা। কারণ কুরআনে প্রকৃতপক্ষে আলোচনা করা হয়েছে,জীবন পরিচালনার বিভিন্ন রীতি-নীতি,বিধি-বিধান,হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষয়। মানুষ মারা গেলে এসব দিয়ে তার কোন উপকার হয় না এবং কুরআন-হাদীস দ্বারাও এটা প্রমাণিত নয়।