hadith book logo

মৃত্যু ও কবর সম্পর্কে করণীয় ও বর্জনীয়

লেখকঃ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫৫

কুরআনখানী ও ইসালে সওয়াব সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের অভিমত:

১) ইমাম নওয়াবী রহ.:

ইমাম নওয়াবী রহ. وُصُولُ ثَوابِ الصدقةِ عنٌ المَّيتِ তথা মৃতের নিকট সদকা’র সওয়াব পৌঁছা অধ্যায়ে আয়েশা রা.এর নিম্নোক্ত হাদীস উল্লেখ করেছেন: এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন:

إِنَّ أُمِّي اُفْتُلِتَتْ نَفْسهَا ، وَإِنِّي أَظُنّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ ، فَلِي أَجْر أَنْ أَتَصَدَّق عَنْهَا ؟ قَالَ : نَعَمْ

“হে আল্লাহর রাসূল,আমার মা হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন, কিন্তু কোন ওসিয়ত করে যান নি। আমার ধারণা,তিনি যদি কথা বলতে সক্ষম হতেন তবে সদকা করতেন। তাই আমি যদি তার পক্ষ থেকে সাদকাহ করি তাহলে কি তিনি তার সওয়াব পাবেন? তিনি উত্তরে বললেন,“হ্যাঁ। ” [ইমাম নওয়াবী রহ. কর্তৃক সহীহ মুসলিমের ৩০৮২ নং হাদীসের ব্যাখ্যা। অধ্যায়: সদকার সওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছা প্রসঙ্গে।]

ইমাম নওয়াবী রা. বলেনঃ “উক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,মৃতের পক্ষ থেকে সাদকা করা হলে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেয়ে থাকে। এ ব্যাপারে সমস্ত আলেম একমত। আবার এ ব্যাপারেও ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে,মৃতের জন্য জিকির">দু’আ করা হলে তার নিকট পৌঁছে। অনুরূপভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করা যায় এবং তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করাও শরীয়ত সম্মত। এসব ব্যাপারে ছহীহ হাদীস এবং সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ বিদ্যামান রয়েছে।

আর এটাই আমাদের প্রসিদ্ধ অভিমত যে,কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব মৃতের নিকট পৌঁছে না”।

২) ইমাম সানআনী রহ.: তিনি বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘বুলূগুল মারাম’ এর ব্যাখ্যা ‘সুবুলুস্ সালাম’ কিতাবে আব্দুল্লাহ ইব্ন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। তা হল,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় একটি গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কবরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেনঃ

السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالْأَثَرِ

“হে কবরবাসীগণ,তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ তোমাদেরকে এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। তোমরা আমাদের আগে চলে গেছ। আমরা তোমাদের অনুগামী। ” [তিরমিযী। আল্লামা আলবানী রহ. হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন।]

ইমাম সান’আনী বলেন,“এ হাদীস প্রমাণ বহন করে যে, কেউ কারো জন্য দু’আ-ইস্তেগফার করলে যেন প্রথমে নিজের জন্যে করে। কুরআনে যে সমস্ত দু’আ আছে সেগুলোতেও আগে নিজের জন্য দুয়া করার কথাই উল্লেখিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেনঃ

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ

“হে আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে এবং আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা করে দাও যারা ঈমানের সাথে আমাদের আগে (দুনিয়া) থেকে চলে গেছে। ” [সূরা হাশর: ৫৯] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন:

وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ

“ক্ষমা প্রার্থনা কর নিজের জন্য এবং মুমিনদের জন্য। ” [সূরা মুহাম্মাদঃ ৪৭]

এ হাদীস দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে,উপরোক্ত দু’আগুলো এবং এ জাতীয় যত দু’আ আছে মৃত লোকদের উপকারে আসে। এ ব্যাপারে কোন আলেমই দ্বিমত করেন নি। কিন্তু কুরআন পড়ার সওয়াব মৃতের নিকট পৌঁছে না যেমনটি ঈমাম শাফেঈ রাহ. বলেছেন।

৩) ইমাম শাওকানী রহ.: ইমাম শাওকানী রহ. ইমাম ইবনে তাইমিয়া রচিত আল মুন্তাকা এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ নাইলুল আওতার কিতাবে বলেছেন,“ইমাম শাফেঈ এবং তাঁর একদল সহোচর আলেমের প্রসিদ্ধ মাযহাব হল,কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব মৃত মানুষের নিকট পৌঁছে না। আমাদেরও মত হল,কুরআন তেলাওয়াত করা হলে মৃতদের কোন উপকার হয় না এবং কবরের নিকট কুরআন পাঠ করা জায়েযও নয়। এ ব্যাপারে স্পষ্ট দলীল হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

لاَ تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِى تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ

“তোমরা তোমাদের বাড়ীকে গোরস্থানে পরিণত করনা। যে ঘরে সূরা বাকারা পাঠ করা হয় শয়তান সে ঘর থেকে পলায়ন করে। ” [সহীহ মুসলিম। অনুচ্ছেদ: বাড়ীতে নফল নামায পড়া মুস্তাহাব তবে মসজিদেও পড়া জায়েয। হাদীস নং ১৮৬০ (আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত)] তিনি আরও বলেনঃ

صَلُّوا فِي بُيُوتِكُمْ وَلَا تَتَّخِذُوهَا قُبُورًا

“তোমরা তোমাদের ঘরে (নফল) নামায আদায় কর এবং তা কবরস্থানে পরিণত কর না। ” [তিরমিযী, ইব্ন উমর রা. থেকে। অনুচ্ছেদ: বাড়ীতে নফল নামায পড়া মুস্তাহাব। হাদীস নং ৪৫৩। ইমাম তিরমিযী এ হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।] অর্থাৎ কবরে যেমন নামায পড়া হয় না কিংবা কুরআন তেলাওয়াত করা হয় না তদ্রুপ ঘরে নফল নামায এবং কুরআন পড়া বাদ দিয়ে ঘরকে গোরস্থানে পরিণত করনা।

কবরের পাশে কুরআন পড়লে যদি মৃতদের উপকার হত, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নফল নামায এবং কুরআন ঘরে পড়তে বলতেন না এবং নিজেদের ঘরকে গোরস্থানে পরিণত করতে নিষধ করতেন না। যদিও তিনি উম্মতের সব চেয়ে বেশী কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি পরম করুনাময়। তার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, গোরস্থান কুরআন তেলায়াত এবং নামায পড়ার স্থান নয়। আর এ কারণে তিনি কবরের নিকট কুরআন তেলাওয়াত করেছেন বা কুরআনের কোন সূরা পড়েছেন তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। অথচ তিনি অধিকহারে নফল নামায আদায় করতেন এবং কবর যিয়ারত করতেন, সেই সাথে মানুষকে কবর যিয়ারত করার নিয়ম-পদ্ধতিও শিক্ষা দিতেন। এখান থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে,গোরস্থানে কুরআন তেলাওয়াত করা বা কুরআনের বিশেষ কোন সূরা পাঠ করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ নয় বরং বিদ্আতের অন্তর্ভুক্ত যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।