মাদকদ্রব্যের ভয়ংকর ও বিধ্বংসী আক্রমণ থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করে অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে দেশের জনগণ, সরকার ও বেসরকারী সংস্থাসমূহের করণীয় হচ্ছে:
শিশুকাল থেকেই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে; যাতে ইসলামের বিধি-বিধানসমূহ পালনে আগ্রহী হয়। মহান আল্লাহ তা‘আলার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসা তৈরী করতে হবে; যাতে আল্লাহর প্রতিটি কথা পালন করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা মদ ও এর পানকারী এবং যে পান করায়, এর বিক্রেতা ও ক্রেতা, এর রস গ্রহণকারী ও রস যোগানদানকারী, সরবরাহকারী ও যার নিকট সরবরাহ করা হয় সবার উপরই লা’নত করেছেন। [সুলাইমান ইবনু আল-আশ‘আস, সুনানু আবি দাউদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১৭।] মাদকদ্রব্যের ব্যবসা হারাম। ইত্যাদি বিষয়সহ মাদকের ইহকালীন ক্ষতি ও পরকালীন শাস্তির কথা স্মরণ করিয়ে নৈতিক ও চারিত্রিক শক্তি বৃদ্ধি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে
পিতা-মাতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ,
মসজিদের ইমাম সাহেব, সামাজিক নেতৃবৃন্দ ও সমাজ কর্মীরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেন।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচীতে মাদকাসক্তির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে প্রবন্ধ, ফিচার, গল্প ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমানে পাঠ্যসূচীতে যতটুকু বিদ্যমান আছে তা খুবই সামান্য। মাদক সংক্রান্ত বিষয়সমূহ আরো বিস্তারিত আকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মাদকাসক্তি সম্পর্কে মাঠ পর্যায়ে ডাটা সংগ্রহ করা ও গবেষণা করার সুযোগ দিতে হবে।
মাদকাসক্তি প্রতিরোধ সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডে সরকারকে উদার হস্তে সহযোগিতা করতে হবে। যেমন, এ সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা, গণসচেতনতা সৃষ্টি, প্রদর্শনী প্রোগ্রাম, সেমিনার, আলোচনা সভা, ওয়ার্কশপ, মাদক বিরোধী অভিযান ইত্যাদিতে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করা।
মাদকদ্রব্যের ভয়াবহ ক্ষতি যেমন, শারীরিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে থাকতেই মাদকাসক্তির শারীরিক ক্ষতির দিকটি বুঝাতে হবে। কেননা প্রথম মাদক গ্রহণ কালে অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন থাকে না। তাহলে সমাজের প্রতিটি মানুষ মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ বেচা-কেনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হবে।
প্রচলিত আইনে মাদক সংক্রান্ত মামলাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। দোষী সাব্যস্ত হলে এ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে পরবর্তীতে আর কেউ এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে, সহযোগিতা বা মদদ যোগাতে সাহস না করে। এ শাস্তির বিষয়টি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে হবে এবং মাদকদ্রব্যের প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।
সরকারী উদ্যোগে মাদকদ্রব্যের চোরাচালান ও সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ মাদক চোরাচালানের আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং চোরাচালানকারী রাষ্ট্রসমূহ সবগুলোই প্রায় সার্ক সদস্যভূক্ত, সেহেতু এ ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের সাথে আলোচনা করে চোরাচালান রোধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
মাদকদ্রব্যের চোরাচালান, বিক্রয়, বিপনন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ও সরকারী সংস্থা যেমন পুলিশ, বি.ডি.আর, আইন বিভাগকে আরো বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নিতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে মাদক চোরাচালান ও সরবরাহে পুলিশ বিভাগের সংশ্লিষ্টতার কথা শোনা যায়। সে ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হলে তাৎক্ষনিক চাকুরী থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে হবে, যাতে ছেলেমেয়েরা পাড়ার বা মহল্লার বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে আড্ডা না দেয়। কেননা বখাটে বন্ধুদের খপ্পরে পড়েই প্রথম মাদক গ্রহণ করে থাকে।
প্রচার মাধ্যমে মাদকাসক্তির কুফল আরো ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। এইডস, ডাইরিয়া প্রতিরোধে ইত্যাদির মত এর বিরুদ্ধেও বিজ্ঞাপন ও গণসচেতনতা বৃদ্ধিকারক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে এ ব্যাপারেও একটি ব্যাপক সচেতনতা ও গণপ্রতিরোধের পরিবেশ গড়ে উঠে।
দেশে চোরাচালানের সম্ভাব্য পয়েন্টগুলোতে চোরাচালান রোধের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সমাবেশ ঘটানোসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার ও বেসরকারী সংস্থাসমূহ মাদকাসক্তি নিবারণে বার বার বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। কিন্তু বরাবরের মতই তা কোনো কাজে আসেনি। এক নাগাড়ে মাদক তার কালো হিংস্র থাবা বিস্তার করেই যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মাদকের মায়াজালে আটকে ধ্বংস হচ্ছে জাতি ও সমাজ। অর্থনৈতিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি; মাদকাসক্তির এহেন বিধ্বংসী দাবানল থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা আপাত একটিই, সেটি হচ্ছে আল-কুরআনের আইন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকাসক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ। সরকারী ও বেসরকারী সকল উদ্যোগকে সমন্বিত করে একটি পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী আন্তরিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা সময়ের শ্রেষ্ঠ দাবী।