hadith book logo

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মাদকাসক্তির প্রভাব ও তার সমাধান

লেখকঃ ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান, মো. মোশাররফ হোসাইন • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

বর্তমান বাংলাদেশ:

স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাধারণ জনগোষ্ঠীর মাঝেও এর দানবীয় বিস্তার দেশের বিবেকবান ও সচেতনদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। অবৈধ মাদকদ্রব্যের বিষাক্ত অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের জনসংখ্যার বিরাট একটা অংশ। শুধু অন্ধকারেই হারিয়ে যাচ্ছে না, বিষাক্ত মাদকদ্রব্য সেবন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসংখ্য মানুষ। গত ১লা বৈশাখ (এপ্রিল ৯৮) গাইবান্ধা জেলায় স্পিরিট পানে ৯৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তা ছাড়া স্পিরিট পানে অসুস্থতার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫১ জন এবং পরবর্তীতে আরও ৪৫০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয় বলে জানা গেছে। ২০০০ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারী ফেনীতে বিষাক্ত রেক্টিফাইড স্পিরিট পান করে প্রায় ৫০ জন লোক মারা যায়। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে এখানেই মারা গিয়েছিল ৯ জন। পরবর্তীতে ঢাকার তেজগাঁও এর বেগুনবাড়ীতে ১২ জন মারা গিয়েছিল। এপর ১৯৯৯ সালেও নরসিংদী জেলায় যে রেক্টিফাইড স্পিরিট ট্রাজেডী ঘটেছিল তাতে শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায়েছে ১২৬।

মাদারীপুর জেলার জেলখানা থেকে পতিতালয় সব জায়গায়ই জমজমাট মাদক ব্যবসা। অনুসন্ধানে জানা গেছে সদর উপজেলায় মাদকদ্রব্য বিক্রির ৫০টি স্পট রয়েছে। বরগুনা শহরের কমপক্ষে ৩০টি স্পটে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার হেরোইন ফেনসিডিল মদ, গাঁজা নেশাজাতীয় ইনজেকশন সবই বিক্রিয় হচ্ছে প্রকাশ্যে। শেরপুর শহরের বিভিন্ন জায়গায় চলে মাদকের ব্যবসা। বগুড়ার শিবগঞ্জে ও পাবনার ঈশ্বরদীতেও ফেনসিডিল ভয়াবহ আঘাত হেনেছে। সীমান্তবর্তী জেলা নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় চোরাইপথে ফেনসিডিল নিয়ে আসার পর তা ঈশ্বরদীতে পাঠানো হয় এখানে থেকে ট্রেন, বাস, মাইক্রো ও প্রাইভেট গাড়িতে করে এগুলো যায়, ঢাকা, সাভার, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর প্রভৃতি এলাকায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, ঢাকা শহরের প্রায় ২৫০টি ফেনসিডিল বিতরণ কেন্দ্র আছে।

যশোরের চৌগাছা ও বেনাপোল সীমান্তের বিভিন্ন চোরাপথ দিয়ে ফেনসিডিল পাচার হয়ে আসে। গত ১৮ ও ১৯ অক্টোবর ২০০৪ ফেনসিডিলের দু’টি চালান আটক হয়েছে। এ নিয়ে ২ মাসে সেখানে অন্তত ৫০ হাজার বোতল ফেনসিডিল আটক হয়। পুলিশ বিডিআরের চোখ এড়িয়ে কি পরিমাণ ফেনসিডিল নেশাখোরদের হাতে চলে যাচ্ছে এ থেকে সহজে অনুমান করা যায়।

শুধু রাজধানী শহর ঢাকার মাদকের প্রধান স্পট আছে ১০০০ টির মতো। খুচরা স্পটের সংখ্যা এ হাজারেরও বেশী। ঢাকায় মাদকের প্রধান স্পট ডেমরা থানাধীন ধলপুর বস্তি। বিশেষ করে বস্তায় বস্তায় ভারতীয় ফেনসিডিল এখানে আসে এবং অর্ডার অনুযায়ী এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। ঢাকার ৩ সহস্রাধিক বস্তিই মাদক বেচা-কেনার আখড়া। রাজধানীর মেট্রো পলিটন থানাগুলোর মধ্যে কাফরুল ও ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাড়া বাকী সবগুলোই মাদকের রমরমা বাজারে পরিণত হয়েছে। চোরাই পথে বানের পানির মত মাদক আসছে এখানে। এর খুব সামান্য অংশই ধরা পড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে । গত ২০০০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আটককৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে, প্রায় ৬ লাখ ফেনসিডিল বোতল, ১৪৩ কেজি হেরোইন, ৪৩০ মন মন গাঁজা, ৭০,৬৫৩ লিটার তাড়ি, ২০,০৩৮ লিটার পেথিডিন এবং ৩৮,৪২৩ লিটার রেক্টিফাইড স্পিরিট (দেখুন সারণী-১)। এ থেকে কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়, কি পরিমাণ মাদক বাংলাদেশে আসছে।