hadith book logo

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মাদকাসক্তির প্রভাব ও তার সমাধান

লেখকঃ ড. মো. মুস্তাফিজুর রহমান, মো. মোশাররফ হোসাইন • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

বাংলাদেশে মাদকাসক্তি:

বাংলাদেশের মানুষ মাদকদ্রব্যের সাথে কম বেশী পরিচিত থাকলেও এদেশে মাদকাসক্তির ব্যাপক প্রসার লক্ষ্য করা যায় স্বাধীনতা উত্তর সময়ে। অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান তিনটি আফিম ও আফিমজাত পণ্য উৎপাদনকারী অঞ্চলের কাছাকাছি একটি দেশ হওয়ায় এবং প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে বিপজ্জনক মাদকদ্রব্যের প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে গত প্রায় তিন দশক ধরে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। [আলী হাসান, ‘শতাব্দীর অভিশাপ ড্রাগাসক্তি: বিপন্ন তারুণ্য; মাসিক রোকসানা, আগষ্ট ১৯৮৮ খৃ. পৃ. ২২।] সারা বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত পপির সিংহভাগই উৎপাদিত হয় এশিয়ার ৩টি প্রধান অঞ্চলে যথা: (১) থাইল্যান্ড, লাওস ও বার্মা-এই তিনটি দেশের সীমান্ত সংযোগ স্থলে যাকে গোল্ডের ট্রায়াঙ্গল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়; (২) পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ককে নিয়ে গোল্ডেন ক্রিসেন্ট অঞ্চল এবং (৩) এ দুটি অঞ্চলের মর্ধবতী অঞ্চলে ভারত-নেপাল সীমান্ত জুড়ে গোল্ডেন ওয়েজ এলাকা। [অধ্যাপিকা বশিরা মান্নান, বাংলাদেশে মাদকাসক্তি নিরাময়ে পরিবার ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা একটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন’, (ঢাকা: বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য বিরোধী ফেডারেশন, ১৯৯৪ খৃ.) পৃ. ২।]

মূলত: পঞ্চাশের দশক থেকে অদ্যাবধি আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বাংলাদেশকে মাদকাসক্তি চোরাচালানের করিডোর হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। [মুহাম্মদ সামাদ, মাদকাসক্তি এবং মাদকদ্রব্য চোরাচালানের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক’’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, সংখ্যা ৪২, ফেব্রুয়ারী, ১৯৯২, পৃ. ১৫০।] বাংলাদেশকে মাদক পাচারের করিডোর হিসাবে বেছে নেবার পিছনে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথমটি বিশ্বের প্রধান মাদকদ্রব্য উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো যেমন গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজ বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী। তাছাড়া বাংলাদেশের সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে। দ্বিতীয় কারণটি হলো, বাংলাদেশ মাদকদ্রব্য উৎপাদনে ও ব্যাপক ব্যবহারে দীর্ঘদিন যাবত মুক্ত ছিল ফলে আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য প্রতিরোধ সংস্থার কার্যাবলী ও তাদের সন্দেহের বাইরে থাকে। মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারীরা ও সুযোগকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ হেরোইনের ব্যাপক চালান আসত বার্মা ও থাইল্যান্ড থেকে। কিন্তু ১৯৯০ এর পর থেকে পাকিস্তান ও ভারত থেকে সীমান্ত পথে প্রচুর পরিমাণ হেরোইন ও মরফিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এ চোরাচালান ঘটছে জল, স্থল ও আকাশ পথে। [অধ্যাপিকা বশিরা মান্নান, প্রাগুক্ত, পৃ. ২-৩।]

১৯৮০ সাল পর্যন্ত হেরোইন নামক মাদকদ্রব্যটি বাংলাদেশে অপরিচিত ছিল। [এ.বি.এম. রবিউল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮।] অর্থাৎ ১৯৮২ সাল পর্যন্ত হেরোইনের নেশা বাংলাদেশে শুরু হয়েছে বলে জানা যায় নি। এমনকি বলা হয়েছে ১৯৮৩-৮৪ সালের আগে আমাদের দেশের কেউ হেরোইন চিনতো না। অথচ ব্যাপকভাবে হেরোইন চোরাচালান বৃদ্ধি ও বাংলাদেশে তার বাজারজাত করণের ফলে ৮৫-৮৬ সাল থেকে বাংলাদেশে নিয়মিত হেরোইনসেবীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ৮৭-৯১ সাল পর্যন্ত বিশেষত তরুণ ছাত্র সমাজের মধ্যে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা সৃষ্টি হয়। [অধ্যাপিকা বশিরা মান্নান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩।]

১৯১৭ সালে সমবায় ভিত্তিতে নওগাঁ জেলায় সর্বপ্রথম গাঁজার চাষ শুরু হয়। স্বাধীনতাপূর্ব কাল হতে বাংলাদেশে ছিল সীমিত সংখ্যক লাইসেন্সধারী আফিমসেবী। কিন্তু স্বাধীনতার পর গাঁজা ও মদের প্রচলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। আশির দশকের গোড়ার দিকে হেরোইন বাংলাদেশে প্রসার লাভ করে। পেথিডিনের ব্যবহারও বর্তমান দশকে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। [মোঃ আব্দুর রব মোল্লা ও মুহাম্মদ সাইফুল আলম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিমালা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪।]