hadith book logo

কোরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান সামঞ্জস্যপূর্ণ না অসামঞ্জস্যপূর্ণ

লেখকঃ ডঃ জাকির আবদুল করিম নায়েক • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৮

ভ্রূণের পর্যায়সমূহ

আল্লাহ বলেনঃ

وَ لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ سُلٰلَۃٍ مِّنۡ طِیۡنٍ . ثُمَّ جَعَلۡنٰہُ نُطۡفَۃً فِیۡ قَرَارٍ مَّکِیۡنٍ . ثُمَّ خَلَقۡنَا النُّطۡفَۃَ عَلَقَۃً فَخَلَقۡنَا الۡعَلَقَۃَ مُضۡغَۃً فَخَلَقۡنَا الۡمُضۡغَۃَ عِظٰمًا فَکَسَوۡنَا الۡعِظٰمَ لَحۡمًا ٭ ثُمَّ اَنۡشَاۡنٰہُ خَلۡقًا اٰخَرَ ؕ فَتَبٰرَکَ اللّٰہُ اَحۡسَنُ الۡخٰلِقِیۡنَ

“আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি, এরপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে হাড় সৃষ্টি করেছি, অতঃপর হাড়কে গোশত দ্বারা আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুণতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়?” -সূরা-আল মোমিনূন-১২-১৪

এ আয়াতদ্বয়ে মহান স্রষ্টা বলেন তিনি মানুষকে ক্ষুদ্র পরিমাণ তরল পদার্থ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং একে এক সুরক্ষিত বিশ্রামের স্থানে সংরক্ষিত করেছেন। এ অর্থ বুঝানোর লক্ষ্যে তিনি আরবী শব্দ قرارمکين ব্যবহার করেছেন। জরায়ু সর্বদাই পেছন দিক থেকে মেরুদণ্ড দ্বারা সংরক্ষিত। মেরুদণ্ড আবার পেছনের মাংসপেশী দ্বারা সমর্থিত। তাছাড়া ও ভ্রূণ গর্ভফুলের রস সম্পন্ন গর্ভথলি দ্বারা সংরক্ষিত। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ভ্রূণ একটি সুরক্ষিত স্থানে অবস্থান করে।

এই স্বল্প পরিমাণ তরল পদার্থ পরে علقة বা মাংশপেশীতে পরিণত হয়। ‘আলাকা’ শব্দের অর্থ হল, যা আটকে থাকে। ভিন্ন কথায় বলা যায়, এটা যেন ‘জোঁক সদৃশ নির্যাস।’ এই উভয় অর্থই বৈজ্ঞানিকভাবে গৃহীত। প্রাথমিক পর্যায়ে, ভ্রূণ দেয়ালে আটকে থাকে এবং দেখতে জোঁকের আকৃতি মনে হয়। আর এটা রক্তচোষা জোঁকের মত আচরণ করে। মূলত তা মায়ের গর্ভফুলের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ লাভ করে। علقة শব্দের ৩য় আরেকটি অর্থ হল, রক্তপিণ্ড। গর্ভ রক্তপিণ্ডের স্তরে থাকা অবস্থায় অর্থাৎ গর্ভের ৩য় ও ৪র্থ সপ্তাহে রক্তপিণ্ড বদ্ধ থলিতে অবস্থান করে। ফলে, ভ্রূণ রক্তপিণ্ডের আকার গ্রহণ করে এবং একই সময়ে তা জোঁকের আকৃতিও ধারণা করে। কোরআনের জ্ঞানের সাথে বিজ্ঞানের সত্য লাভের জন্য মানুষের চেষ্টাকে তুলনা করা যায়।

১৬৭৭ সালে, সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী হাম এবং লিউয়েন হোয়েক মাইক্রোস্কোপ দ্বারা মানবীয় শুক্র কোষ পর্যবেক্ষণ করেন। তারা ভেবেছিলেন যে, শুক্রকোষ যা ক্ষুদ্রাকৃতির মানুষ হিসেবে বিবেচ্য- তা নতুন শিশু জন্মের জন্য জরায়ুতে বিকাশ লাভ করে। এটা Perforation তত্ব হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন আবিষ্কার করলেন যে, শুক্রের চাইতে ডিম বড়, তখন বিজ্ঞানী ডি গ্রাফ সহ অন্যরা ভাবলেন যে, ডিমের মধ্যে ভ্রূণ ক্ষুদ্রাকৃতিতে অবস্থান করে। পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৮০০ শতাব্দীতে, বিজ্ঞানী মাওপেরটুইস মাতা-পিতার দ্বৈত উত্তরাধিকার তত্ব (theory of biparental inheritence) প্রচার করেন।

علقة পরে مضغة -য় রূপান্তরিত হয়। মুদগাহ’র অর্থ হল, ১। যা দাঁত দিয়ে চিবানো হয় এবং ২। যা আঠাল ও ছোট এবং যা মুখে দেয়া হয়। যেমন গাম। এ দু’টো ব্যাখ্যাই বৈজ্ঞানিকভাবে বিশুদ্ধ। অধ্যাপক কেইথ মুর একটা প্লাষ্টার সীল নিয়ে একে ভ্রূণের প্রাথমিক পর্যায়ের আকৃতির মত বানিয়ে দাঁতে চিবান এবং একে মুদগায় পরিণত করার চেষ্টা করেন। তিনি এর মাধ্যমে এর সাথে প্রাথমিক পর্যায়ের ভ্রূণের ছবিকে তুলনা করেন। তার চিবানো ঐ প্লাষ্টার সীল Somites -এর মত দেখা গেল যা মেরুদণ্ডের প্রাথমিক গঠন স্তর।

এই مضغة পরবর্তীতে عظام বা হাড়ে পরিণত হয়। বাস্তবেই হাড়কে গোশত বা মাংসপেশী পরানো হয়েছে। আল্লাহ পরে একে অন্য সৃষ্টিতে পরিণত করেন।

অধ্যাপক মার্শাল জনসন যুক্তরাষ্ট্রের একজন খাতনামা বিজ্ঞানী Anatomy dept-এর প্রধান এবং ফিলাডেলফিয়ার থমাস জেফারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দানিয়েল ইনিষ্টিটিউটের পরিচালক। তাকে ভ্রূণতত্ব সম্পর্কে কোরআনের এই আয়াতের উপর মন্তব্য করার অনুরোধ করা হলে, তিনি প্রথমে বলেনঃ ভ্রূণের পর্যায়গুলো সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনা শুধুমাত্র সমকালে সংঘটিত কোন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবেনা। সম্ভবত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট খুবই শক্তিশালী কোন মাইক্রোস্কোপ ছিল। যখন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হল যে, কোরআন ১৪০০ বছর আগে অবতীর্ণ হয়েছে, আর মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কার হয়েছে নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বহু শতাব্দী পর। তখন তিনি হেসে দেন এবং স্বীকার করেন যে, প্রথমদিকে আবিষ্কৃত মাইক্রোস্কোপ ১০ বারের বেশী সময়েও ক্ষুদ্র জিনিসকে বড় করে দেখাতে পারেনি এবং যাও দেখিয়েছে, তাও আবার পরিষ্কার ছবি দেখাতে পারেনি। তারপর তিনি বলেন, মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোরআন পাঠ করেন, তখন তার উপর ঐশী বাণী নাযিল হওয়ার বিষয়ে কোন বিরোধ নেই।

ডঃ কেইথ মুর বলেন বিশ্বে গৃহীত আধুনিক কালের ভ্রূণ বিষয়ক উন্নয়ন স্তর সহজে বোধগম্য নয়। কেননা এতে স্তর গুলোকে সংখ্যাতাত্ত্বিক ভাবে পেশ করা হয়েছে। যেমন, ১ম স্তর, ২য় স্তর ইত্যাদি। কিন্তু কোরআনে বর্ণিত স্তরগুলো পার্থক্য বোধক এবং সহজে এর আকার-আকৃতি চিহ্নিত করা যায়। এগুলো জন্মপূর্ব বিকাশের বিভিন্ন স্তরের উপর ভিত্তিশীল ও বোধগম্য এবং বাস্তব, বৈজ্ঞানিক ও মার্জিত বর্ণনার অধিকারী।

নীচের উল্লেখিত আয়াতেও মানুষের ভ্রূণ বিকাশের স্তরগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ

اَلَمۡ یَکُ نُطۡفَۃً مِّنۡ مَّنِیٍّ یُّمۡنٰی . ثُمَّ کَانَ عَلَقَۃً فَخَلَقَ فَسَوّٰی . فَجَعَلَ مِنۡہُ الزَّوۡجَیۡنِ الذَّکَرَ وَ الۡاُنۡثٰی

“সে কি স্খলিত বীর্য ছিল না? অতঃপর সে ছিল রক্তপিণ্ড, অতঃপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যাস্ত করেছেন। অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল নর ও নারী।” -সূরা কিয়ামাহ -৩৭-৩৯

আল্লাহ আরো বলেনঃ

الَّذِیۡ خَلَقَکَ فَسَوّٰىکَ فَعَدَلَکَ . فِیۡۤ اَیِّ صُوۡرَۃٍ مَّا شَآءَ رَکَّبَکَ

“যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন। তিনি তোমাকে তার ইচ্ছামত আকৃতিতে গঠন করেছেন। -সূরা আল ইনফিতার-৭-৮