১
সাহাবাদের ব্যাপারে আহলে সুন্নত ওয়াল-জামাতের আকিদা
লেখকঃ মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-অহাইবি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৭
সাহাবীদের ইতিহাস গবেষণার মূলনীতি সমূহ
প্রথমতঃ সাহাবীদের মাঝে ঘটে যাওয়া ঝগড়া বিবাদ ঘাঁটা ঘাটি করা ও কাদা ছোঁড়া ছুঁড়ি করা ইসলামের মূলনীতি নয়। বরং ইসলামের মূলনীতি হল এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করা যা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের কিতাব সমূহে সবিস্তারে বর্ণিত আছে। যেমন সুনানে আব্দুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বল, সুনানে ইবনে আবি আছেম, আল্লামা ছাবুনি লিখিত আকীদাতু আসহাবিল হাদীস, ইবনে বত্তা লিখিত আল ইবানাহ, ইমাম তাহাবি লিখিত আকীদাতুত ত্বাহাবিয়াহ ইত্যাদি। এবং এ নীরবতা ঐ ব্যক্তির জন্য বেশি জরুরি যার উপর ভাল মন্দ সংমিশ্রণ, গোলমাল ও ফেতনার আশঙ্কা হয়। আর এ সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার কারণ হল-
সাহাবীদের মান ও মর্যাদা সম্বন্ধে অজ্ঞতা, বয়সে স্বল্পতা, ইসলামে নব দীক্ষা ইত্যাদি। যার কারণে তারা সাহাবীদের মাঝে মত বিরোধের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে ব্যর্থ। তাই অজান্তে সাহাবীদের মর্যাদা হানিরকরে থাকে অথচ সে অনুধাবনও করতে পারে না।
পূর্ববর্তী আলেমদের সর্বজন স্বীকৃত একটি মূলনীতি হল—মানুষের নিকট শুধু শরীয়তের সে সব হুকুমই বর্ণনা করবে যা বুঝতে তারা সক্ষম। ইমাম বুখারি রহ. এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করেছে। তিনি লিখেছেন—
باب من خص بالعلم قوما دون قوم كراهية ألا يفهمون ( فتح الباري : ১/১৯৯ صحيح البخاري، ১/৪১ كتاب العلم باب رقم (৪৯) ط تركيا )
অর্থাৎ—‘কোন বিষয়কে নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায়ের নিকট প্রকাশ করা আর না বুঝার আশঙ্কায় অন্যদের কাছে গোপন রাখা প্রসঙ্গে’। সাহাবী আলী রা. বলেন, শ্রোতার জ্ঞান অনুপাতে কথা বল, তুমি কি চাও সে আল্লাহ ও তদীয় রাসূল কে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করুক? হাফেজ ইবনে হাজর আসকালানী রহ. সাহাবী আলীর রা. কথা সম্পর্কে বলেন এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, متشابهة তথা অস্পষ্ট বিষয়সমূহ সাধারণ মানুষের সামনে আলোচনা করা অনুচিত। এমনি ভাবে সাহাবী ইবনে মাসউদ রা. বলেন যদি তুমি কোন সম্প্রদায়কে এমন সূক্ষ্ম কথা বল যা বুঝতে তারা অক্ষম, তাহলে মনে রাখবে এটা তাদের অনেকের জন্য ফিতনার কারণ হবে। [মুসলিম ১/১১ জামেউল উসুল ৮/১৭] এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ রহ. রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অধ্যায়, আর ইমাম মালেক রহ. আল্লাহর গুণাবলির অধ্যায় এবং ইমাম আবু ইউসুফ রহ. غرائب তথা অসহজসাধ্য অধ্যায় খুব গুরুত্ব সহকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এবং এ প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র মূল নীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তাহল যে হাদীসের বাহ্যিক অর্থ বেদআতকে সমর্থন করে অথচ হাদীসের বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়, তাহলে এমতাবস্থায় সে হাদীসটি এমন ব্যক্তির নিকট না বলা যে হাদীসের বাহ্যিক অর্থকেই মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করবে।
দ্বিতীয়তঃ - যদি বিশেষ প্রয়োজনে সাহাবীদের মাঝে সংঘটিত ঝগড়া বিবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করতে হয় তাহলে প্রথমে তাদের মাঝে সংঘটিত ব্যাপারটি সূক্ষ্মভাবে নিশ্চিত তদন্ত করতে হবে। কেননা মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ . سورة الحجرات ﴿6﴾
‘‘হে মু’মিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতা বশত : তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত না হতে হয়।’’ (সূরা আল-হুজরাত : ৬)
বর্ণিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন পাপাচারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংবাদের যেন উপযুক্ত তদন্ত করা হয় যাতে সে বর্ণনার উপর ভিত্তি করে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে পরক্ষণে তার জন্য লজ্জিত না হতে হয়। আর সাহাবীগণ যেহেতু উম্মতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি তাহলে তাদের ব্যাপারে প্রাপ্ত সংবাদের সুষ্ঠু তদন্ত অতিশয় জরুরি।
আর এ কথাও আমাদের অজানা নয় যে, এ প্রসঙ্গে যত বর্ণনা রয়েছে অধিকাংশগুলোতে মিথ্যা ও বিকৃতি অনুপ্রবেশ করেছে, হয় মূল সূত্রে না হয় বাড়ানো কমানোর মাধ্যমে। যার কারণে এ সব বর্ণনা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এবং প্রসঙ্গে যত বর্ণনাকারী রয়েছে সবগুলো মিথ্যাবাদী বলে প্রসিদ্ধ। যেমন আবু মুখান্নাফ লুতবিন ইয়াহইয়া এবং হিশাম বিন মুহাম্মদ বিন আসসায়েব আলকালাবী প্রমুখ। [মানহাজুস সুন্নাহ ৫/৭২]
তাই সাহাবীদের মানমর্যাদা সম্পর্কে যে সব বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে সে গুলোকে কোন অবস্থাতেই এ সব দুর্বল বর্ণনা দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না যে এগুলোর বর্ণনার ধারাবাহিকতা রাসূল থেকে বিচ্ছিন্ন বা এগুলো সম্পূর্ণ বিকৃত অথবা এগুলোর ভিত এত নড় বড়ে যে ঐগুলি দ্বারা বিশুদ্ধ হাদীসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোটেই সম্ভব নয়। সাহাবীদের মর্যাদার ব্যাপারে এত অধিক হাদীস পাওয়া যায় যা দ্বারা তাদের মর্যাদা আমাদের অন্তরে يقين তথা নিশ্চিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যাকে কোন সন্দেহযুক্ত বা দুর্বল বর্ণনায় ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। কেননা এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিশেষ মূলনীতি রয়েছে। أليقين لا يزول بالشك অর্থাৎ নিশ্চিত বিষয় কখনো অনিশ্চিত বিষয় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। সুতরাং যে স্থানে সন্দেহের এ অবস্থা সেখানে যদি বাতিল প্রমাণিত কথা হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। [মানহাজুস সুন্নাহ ৬/৩০৫]
তৃতীয়ত :- সাহাবীদের সমালোচনা সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীস যদি সত্য অসত্যের মানদন্ডে শুদ্ধ প্রমাণিত হয় ও হাদীসের বাহ্যিক অর্থে তাঁরা অপরাধী প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের নিরপরাধী ও নির্দোষী হওয়ার উত্তম পথ খুঁজে বের করবে।
ইবনে আবি সাইদ রহ. বলেন সাহাবীগণ একথার বেশি হকদার যে তাদের মাঝে ঘটিত ঝগড়া বিবাদ সম্পর্কে নীরবতা পালন করবে এবং তাদের ভুল ত্রুটি গুলোকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে এবং তাদের ব্যাপারে ভাল ধারণা রাখবে। [ইবনে আবি যাইদ লিখিত মুকাদ্দাতু বিসালাহ ৮]
আল্লামা দাকিকুল ঈদ রহ. বলেন সাহাবীদের মত বিরোধ ও ঝগড়া বিবাদ সম্পর্কে মিথ্যা ও ভ্রান্ত যে বর্ণনাবলি রয়েছে সে গুলোর দিকে ভ্রূক্ষেপ করারও প্রয়োজন নেই। আর এ ব্যাপারে যে বিশুদ্ধ বর্ণনাবলি রয়েছে সে গুলোর অতি সুন্দর মার্জনীয় ব্যাখ্যা করবে, কেননা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রশংসা, সমালোচনীয় বিষয়াদির বহু পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়াও সমালোচনীয় বর্ণনাগুলোর একাধিক অর্থ ও একাধিক ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রয়েছে যা কোন নিশ্চিত সাব্যস্ত বিষয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। [আব্দুল আজিজ আল আজলানী লিখিত আসহাব রাসূল সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়া সালস্নাম ওয়া মাযহাবুননাস।]
সাহাবীদের সমালোচনীয় বিষয়ে যত বর্ণনা রয়েছে সব কয়টির ক্ষেত্রে এ মূলনীতি প্রযোজ্য হবে।
চতুর্থতঃ সর্বজন স্বীকৃত ইতিহাসের পাতায় সাহাবীদের যে বিশেষ মত বিরোধ রয়েছে সে গুলোর ব্যাপারে তারা মুজতাহিদ তথা সত্য উদ্ঘাটনে সাধনাকারী। ব্যাপারটি ছিল তাদের কাছে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট তাই তারা এ ক্ষেত্রে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
প্রথম শ্রেণি: যাদের এ কথা বোধগম্য হয়েছে যে খলীফা ন্যায়ের পথে আছেন আর অপরপক্ষ বিদ্রোহী তাই তাদের ইজতিহাদ মতে বিদ্রোহীকে দমন করে খলীফাকে সাহায্য করা ওয়াজিব। সুতরাং তারা তাই করেছে।
দ্বিতীয় শ্রেণি: যারা বর্ণিত শ্রেণির সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ তাদের ধারণা মতে খলীফা বিরোধীগণ ন্যায়ের উপর আর খলীফা অন্যায়ের উপর। সুতরাং খলীফা বিরোধীগণকে সাহায্য করা তাদের উপর কর্তব্য সেজন্য তারা তাই করেছেন।
তৃতীয় শ্রেণি: যাদের নিকট ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ঘোলাটে ছিল। উভয় পক্ষের কাউকে ভুল আর কাউকে শুদ্ধ বলে মন্তব্য করতে একেবারেই অক্ষম ছিল। তাই তারা একাকিত্ব গ্রহণ করেছেন। যেহেতু নিশ্চিত উপযুক্ত কারণ ব্যতীত কোন মুসলমানকে হত্যা করা হারাম, তাই তারা তাদের জন্য একাকিত্বকে ওয়াজিব মনে করেছেন। [মসলিম বি শরহে নববী- ১৫/১৪৯ ১৮/১১ আল ইসাবা ২/৫০১,৫০২ ফাতহুল বারী ১৩/৩৪ ইয়াহয়ায়ে উলূমিদ্দিন ১/১০২] যেহেতু এ যুদ্ধ বিগ্রহ ও মতপার্থক্যের বিশেষ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে এবং তারা সবাই নিজেকে সঠিক পথে বলে ধারণা করেছেন তাই তাদের কাউকে অপরাধী বলা ঠিক হবে না। বরং তাদের সবাইকে ইলমে ফেকহায় মুজতাহিদ এর ন্যায় পুণ্যবান বলতে হবে অর্থাৎ যাদের ইজতিহাদ শুদ্ধ হয়েছে তারা দু’ পুণ্যের অধিকারী আর যারা ভুল করেছে তারা এক পুণ্যের অধিকারী। এখানে আর একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তাদের এসব যুদ্ধ বিগ্রহ আর মতপার্থক্য ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে ছিল না বরং তা ছিল নিছক খলীফা উসমানের প্রতিশোধ গ্রহণের পদ্ধতি। নিরূপণে, অন্যথায় উষ্ট্রীর যুদ্ধের মহা নায়ক তালহা ও যুবায়ের রা. কখনো খেলাফতের দাবিদার ছিলেন না। এমনি ভাবে সিফফিন যুদ্ধের মহানায়ক মুয়াবিয়া রা. আলীর রা. বিপক্ষে খেলাফতের দাবিদার ছিলেন না। তাদের ধারণা মতে এ লড়াই ছিল ইনসাফের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমন। বাস্তবেই যদি ব্যাপারটি এমন হয় তাহলে তা একটি গ্রহণযোগ্য কথা, যেহেতু তারা প্রকৃত সত্যকে না মেনে অন্যায়ের আনুগত্য করে চলছে, তাই তাদের ফিরিয়ে আনা জরুরি। এতে বুঝা যাচ্ছে তাদের এ মতপার্থক্য আর কলহ বিবাদ ইসলামী কোন মৌলিক বিষয় নিয়ে ছিল না। [মানহাজুজ সুন্নাহ ৬/৩২৭] আমর বিন শাবাহ রহ. বলেন এ কথার কোন প্রমাণ নেই যে মু’মিন জননী আয়েশা রা. ও তার সমমনা যারা ছিলেন তাদের কেউ ক্ষমতা নিয়ে আলীর রা. সাথে বিবাদ করেছেন বা তাদের কেউ খেলাফতের দাবি করেছেন বরং আলীর রা. উপর তাদের ক্ষোভ ছিল এই যে, তিনি কেন মজলুম উসমানের হত্যাকারীদেরকে ক্ষমা করছেন, কেন তাদের থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছেন না? [আমর বিন শাবাহ লিখিত আখবারুল সবসা ১৩/৫৬]
আল্লামা যাহাবি রহ. এর অভিমত থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। যার বিবরণ এই যে, আবু মুসলিম আল খাওলানী রহ. ও তার সাথে কিছু লোক সাহাবী মুআবিয়ার রা. নিকট গেলেন, অতঃপর বললেন আপনি কি আলী রা. এর সম পর্যায়ের? না তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ যার কারণে খেলাফতের দাবি করেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি কখনো শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করিনি। তিনি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তিনিই আমার চেয়ে খেলাফতের বেশি উপযোগী কিন্তু তোমরা জান যে খলীফা উসমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর আমি তার ফুফাত ভাই তাই আমি তার রক্তের প্রতিশোধ চাই। সুতরাং তোমরা আলীর নিকট গিয়ে ওসমানের হত্যাকারীদেরকে আমার কাছে সোপর্দ করতে বল, তাহলে আমি তার আনুগত্য স্বীকার করব। তারপর তারা আলীর নিকট এসে এ প্রসঙ্গে কথা বললেন কিন্তু এতে আলী রা. অস্বীকৃতি জানালেন। [আল্লামা জাহাবী লিখিত সিয়ারুল আ’লামুন নাবলা ৩/১৪০] ইবনে কাসিমের এক বর্ণনায় আছে এতদ শ্রবণে সিরিয়াবাসীগণ সাহাবী মুআবিয়ার রা. সপক্ষে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। [আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৩২] আর আমাদের একথাও জেনে রাখা উচিত যে, খলীফা আলী রা. ও মুআবিয়া রা. এর মাঝে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে তাতে বিশিষ্ট সাহাবীসহ অধিকাংশ সাহাবীগণ অংশ গ্রহণ করেন নাই। যেমন ইমাম আহমদ রহ. এর পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, মুহাম্মদ বিন শিরিন থেকে আইয়ুব সখতিয়ানী তার থেকে ইসমাইল বিন আইলাহ তার থেকে আমার পিতা আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, ফিতনা যখন প্রজ্বলিত হল তখন প্রায় দশ হাজার সাহাবী বিদ্যমান ছিলেন কিন্তু তাদের একশত ব্যক্তিও তাতে অংশ গ্রহণ করেন নেই বরং ত্রিশ জন ও নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন উল্লিখিত বর্ণনাটি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শুদ্ধ বর্ণনা আর মুহাম্মদ বিন শিরিন সর্ব শ্রেষ্ঠ সত্যবাদী তার মারাসিলগুলো সবচেয়ে শুদ্ধ মারাসিল। [মানহুজুজ সুন্নাহ ৬/২৩৬, ২৩৭] গবেষকদের উচিত তারা যেন এ সমস্ত বিশুদ্ধ বর্ণনাগুলো ভাল ভাবে অবলোকন করেন যাতে তারা ঐতিহাসিকদের প্রতারণা দ্বারা প্রতারিত হয়ে নিজেদের মস্তিষ্ককে কলুষিত না করে ও তাদের হীনম্মন্যতা দ্বারা বিশুদ্ধ বর্ণনার অপব্যাখ্যা না করে।
পঞ্চমত: মু’মিনদের এ কথা জানা থাকা আবশ্যক যে সাহাবীদের মাঝে যে যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে তা ইজতিহাদ ও বিশেষ ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হলেও সাহাবীগণ এতে দারুণভাবে লজ্জিত ও ব্যথিত হয়েছেন। তাদের ধারণায়ও আসে নেই যে, ব্যাপারটা এত দূর গড়াবে। এবং তারা যখন সাথি সাহাবী ভাইদের মৃত্যুর সংবাদ ফেলেন তখন তারা অবর্ণনীয় মর্মাহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই কল্পনাও করতে পারেন নাই যে, বিষয়টি এ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে।
সাহাবীদের মান ও মর্যাদা সম্বন্ধে অজ্ঞতা, বয়সে স্বল্পতা, ইসলামে নব দীক্ষা ইত্যাদি। যার কারণে তারা সাহাবীদের মাঝে মত বিরোধের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে ব্যর্থ। তাই অজান্তে সাহাবীদের মর্যাদা হানিরকরে থাকে অথচ সে অনুধাবনও করতে পারে না।
পূর্ববর্তী আলেমদের সর্বজন স্বীকৃত একটি মূলনীতি হল—মানুষের নিকট শুধু শরীয়তের সে সব হুকুমই বর্ণনা করবে যা বুঝতে তারা সক্ষম। ইমাম বুখারি রহ. এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করেছে। তিনি লিখেছেন—
باب من خص بالعلم قوما دون قوم كراهية ألا يفهمون ( فتح الباري : ১/১৯৯ صحيح البخاري، ১/৪১ كتاب العلم باب رقم (৪৯) ط تركيا )
অর্থাৎ—‘কোন বিষয়কে নির্দিষ্ট কোন সম্প্রদায়ের নিকট প্রকাশ করা আর না বুঝার আশঙ্কায় অন্যদের কাছে গোপন রাখা প্রসঙ্গে’। সাহাবী আলী রা. বলেন, শ্রোতার জ্ঞান অনুপাতে কথা বল, তুমি কি চাও সে আল্লাহ ও তদীয় রাসূল কে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করুক? হাফেজ ইবনে হাজর আসকালানী রহ. সাহাবী আলীর রা. কথা সম্পর্কে বলেন এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, متشابهة তথা অস্পষ্ট বিষয়সমূহ সাধারণ মানুষের সামনে আলোচনা করা অনুচিত। এমনি ভাবে সাহাবী ইবনে মাসউদ রা. বলেন যদি তুমি কোন সম্প্রদায়কে এমন সূক্ষ্ম কথা বল যা বুঝতে তারা অক্ষম, তাহলে মনে রাখবে এটা তাদের অনেকের জন্য ফিতনার কারণ হবে। [মুসলিম ১/১১ জামেউল উসুল ৮/১৭] এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ রহ. রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অধ্যায়, আর ইমাম মালেক রহ. আল্লাহর গুণাবলির অধ্যায় এবং ইমাম আবু ইউসুফ রহ. غرائب তথা অসহজসাধ্য অধ্যায় খুব গুরুত্ব সহকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এবং এ প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র মূল নীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তাহল যে হাদীসের বাহ্যিক অর্থ বেদআতকে সমর্থন করে অথচ হাদীসের বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়, তাহলে এমতাবস্থায় সে হাদীসটি এমন ব্যক্তির নিকট না বলা যে হাদীসের বাহ্যিক অর্থকেই মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করবে।
দ্বিতীয়তঃ - যদি বিশেষ প্রয়োজনে সাহাবীদের মাঝে সংঘটিত ঝগড়া বিবাদ সম্বন্ধে আলোচনা করতে হয় তাহলে প্রথমে তাদের মাঝে সংঘটিত ব্যাপারটি সূক্ষ্মভাবে নিশ্চিত তদন্ত করতে হবে। কেননা মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ . سورة الحجرات ﴿6﴾
‘‘হে মু’মিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতা বশত : তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত না হতে হয়।’’ (সূরা আল-হুজরাত : ৬)
বর্ণিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন পাপাচারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত সংবাদের যেন উপযুক্ত তদন্ত করা হয় যাতে সে বর্ণনার উপর ভিত্তি করে কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে পরক্ষণে তার জন্য লজ্জিত না হতে হয়। আর সাহাবীগণ যেহেতু উম্মতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি তাহলে তাদের ব্যাপারে প্রাপ্ত সংবাদের সুষ্ঠু তদন্ত অতিশয় জরুরি।
আর এ কথাও আমাদের অজানা নয় যে, এ প্রসঙ্গে যত বর্ণনা রয়েছে অধিকাংশগুলোতে মিথ্যা ও বিকৃতি অনুপ্রবেশ করেছে, হয় মূল সূত্রে না হয় বাড়ানো কমানোর মাধ্যমে। যার কারণে এ সব বর্ণনা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এবং প্রসঙ্গে যত বর্ণনাকারী রয়েছে সবগুলো মিথ্যাবাদী বলে প্রসিদ্ধ। যেমন আবু মুখান্নাফ লুতবিন ইয়াহইয়া এবং হিশাম বিন মুহাম্মদ বিন আসসায়েব আলকালাবী প্রমুখ। [মানহাজুস সুন্নাহ ৫/৭২]
তাই সাহাবীদের মানমর্যাদা সম্পর্কে যে সব বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে সে গুলোকে কোন অবস্থাতেই এ সব দুর্বল বর্ণনা দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না যে এগুলোর বর্ণনার ধারাবাহিকতা রাসূল থেকে বিচ্ছিন্ন বা এগুলো সম্পূর্ণ বিকৃত অথবা এগুলোর ভিত এত নড় বড়ে যে ঐগুলি দ্বারা বিশুদ্ধ হাদীসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোটেই সম্ভব নয়। সাহাবীদের মর্যাদার ব্যাপারে এত অধিক হাদীস পাওয়া যায় যা দ্বারা তাদের মর্যাদা আমাদের অন্তরে يقين তথা নিশ্চিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যাকে কোন সন্দেহযুক্ত বা দুর্বল বর্ণনায় ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। কেননা এ ক্ষেত্রে শরীয়তের বিশেষ মূলনীতি রয়েছে। أليقين لا يزول بالشك অর্থাৎ নিশ্চিত বিষয় কখনো অনিশ্চিত বিষয় দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। সুতরাং যে স্থানে সন্দেহের এ অবস্থা সেখানে যদি বাতিল প্রমাণিত কথা হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। [মানহাজুস সুন্নাহ ৬/৩০৫]
তৃতীয়ত :- সাহাবীদের সমালোচনা সংক্রান্ত বর্ণিত হাদীস যদি সত্য অসত্যের মানদন্ডে শুদ্ধ প্রমাণিত হয় ও হাদীসের বাহ্যিক অর্থে তাঁরা অপরাধী প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদের নিরপরাধী ও নির্দোষী হওয়ার উত্তম পথ খুঁজে বের করবে।
ইবনে আবি সাইদ রহ. বলেন সাহাবীগণ একথার বেশি হকদার যে তাদের মাঝে ঘটিত ঝগড়া বিবাদ সম্পর্কে নীরবতা পালন করবে এবং তাদের ভুল ত্রুটি গুলোকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে এবং তাদের ব্যাপারে ভাল ধারণা রাখবে। [ইবনে আবি যাইদ লিখিত মুকাদ্দাতু বিসালাহ ৮]
আল্লামা দাকিকুল ঈদ রহ. বলেন সাহাবীদের মত বিরোধ ও ঝগড়া বিবাদ সম্পর্কে মিথ্যা ও ভ্রান্ত যে বর্ণনাবলি রয়েছে সে গুলোর দিকে ভ্রূক্ষেপ করারও প্রয়োজন নেই। আর এ ব্যাপারে যে বিশুদ্ধ বর্ণনাবলি রয়েছে সে গুলোর অতি সুন্দর মার্জনীয় ব্যাখ্যা করবে, কেননা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রশংসা, সমালোচনীয় বিষয়াদির বহু পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়াও সমালোচনীয় বর্ণনাগুলোর একাধিক অর্থ ও একাধিক ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রয়েছে যা কোন নিশ্চিত সাব্যস্ত বিষয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। [আব্দুল আজিজ আল আজলানী লিখিত আসহাব রাসূল সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়া সালস্নাম ওয়া মাযহাবুননাস।]
সাহাবীদের সমালোচনীয় বিষয়ে যত বর্ণনা রয়েছে সব কয়টির ক্ষেত্রে এ মূলনীতি প্রযোজ্য হবে।
চতুর্থতঃ সর্বজন স্বীকৃত ইতিহাসের পাতায় সাহাবীদের যে বিশেষ মত বিরোধ রয়েছে সে গুলোর ব্যাপারে তারা মুজতাহিদ তথা সত্য উদ্ঘাটনে সাধনাকারী। ব্যাপারটি ছিল তাদের কাছে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট তাই তারা এ ক্ষেত্রে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
প্রথম শ্রেণি: যাদের এ কথা বোধগম্য হয়েছে যে খলীফা ন্যায়ের পথে আছেন আর অপরপক্ষ বিদ্রোহী তাই তাদের ইজতিহাদ মতে বিদ্রোহীকে দমন করে খলীফাকে সাহায্য করা ওয়াজিব। সুতরাং তারা তাই করেছে।
দ্বিতীয় শ্রেণি: যারা বর্ণিত শ্রেণির সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ তাদের ধারণা মতে খলীফা বিরোধীগণ ন্যায়ের উপর আর খলীফা অন্যায়ের উপর। সুতরাং খলীফা বিরোধীগণকে সাহায্য করা তাদের উপর কর্তব্য সেজন্য তারা তাই করেছেন।
তৃতীয় শ্রেণি: যাদের নিকট ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ঘোলাটে ছিল। উভয় পক্ষের কাউকে ভুল আর কাউকে শুদ্ধ বলে মন্তব্য করতে একেবারেই অক্ষম ছিল। তাই তারা একাকিত্ব গ্রহণ করেছেন। যেহেতু নিশ্চিত উপযুক্ত কারণ ব্যতীত কোন মুসলমানকে হত্যা করা হারাম, তাই তারা তাদের জন্য একাকিত্বকে ওয়াজিব মনে করেছেন। [মসলিম বি শরহে নববী- ১৫/১৪৯ ১৮/১১ আল ইসাবা ২/৫০১,৫০২ ফাতহুল বারী ১৩/৩৪ ইয়াহয়ায়ে উলূমিদ্দিন ১/১০২] যেহেতু এ যুদ্ধ বিগ্রহ ও মতপার্থক্যের বিশেষ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ রয়েছে এবং তারা সবাই নিজেকে সঠিক পথে বলে ধারণা করেছেন তাই তাদের কাউকে অপরাধী বলা ঠিক হবে না। বরং তাদের সবাইকে ইলমে ফেকহায় মুজতাহিদ এর ন্যায় পুণ্যবান বলতে হবে অর্থাৎ যাদের ইজতিহাদ শুদ্ধ হয়েছে তারা দু’ পুণ্যের অধিকারী আর যারা ভুল করেছে তারা এক পুণ্যের অধিকারী। এখানে আর একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, তাদের এসব যুদ্ধ বিগ্রহ আর মতপার্থক্য ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে ছিল না বরং তা ছিল নিছক খলীফা উসমানের প্রতিশোধ গ্রহণের পদ্ধতি। নিরূপণে, অন্যথায় উষ্ট্রীর যুদ্ধের মহা নায়ক তালহা ও যুবায়ের রা. কখনো খেলাফতের দাবিদার ছিলেন না। এমনি ভাবে সিফফিন যুদ্ধের মহানায়ক মুয়াবিয়া রা. আলীর রা. বিপক্ষে খেলাফতের দাবিদার ছিলেন না। তাদের ধারণা মতে এ লড়াই ছিল ইনসাফের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দমন। বাস্তবেই যদি ব্যাপারটি এমন হয় তাহলে তা একটি গ্রহণযোগ্য কথা, যেহেতু তারা প্রকৃত সত্যকে না মেনে অন্যায়ের আনুগত্য করে চলছে, তাই তাদের ফিরিয়ে আনা জরুরি। এতে বুঝা যাচ্ছে তাদের এ মতপার্থক্য আর কলহ বিবাদ ইসলামী কোন মৌলিক বিষয় নিয়ে ছিল না। [মানহাজুজ সুন্নাহ ৬/৩২৭] আমর বিন শাবাহ রহ. বলেন এ কথার কোন প্রমাণ নেই যে মু’মিন জননী আয়েশা রা. ও তার সমমনা যারা ছিলেন তাদের কেউ ক্ষমতা নিয়ে আলীর রা. সাথে বিবাদ করেছেন বা তাদের কেউ খেলাফতের দাবি করেছেন বরং আলীর রা. উপর তাদের ক্ষোভ ছিল এই যে, তিনি কেন মজলুম উসমানের হত্যাকারীদেরকে ক্ষমা করছেন, কেন তাদের থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছেন না? [আমর বিন শাবাহ লিখিত আখবারুল সবসা ১৩/৫৬]
আল্লামা যাহাবি রহ. এর অভিমত থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। যার বিবরণ এই যে, আবু মুসলিম আল খাওলানী রহ. ও তার সাথে কিছু লোক সাহাবী মুআবিয়ার রা. নিকট গেলেন, অতঃপর বললেন আপনি কি আলী রা. এর সম পর্যায়ের? না তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ যার কারণে খেলাফতের দাবি করেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি কখনো শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করিনি। তিনি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং তিনিই আমার চেয়ে খেলাফতের বেশি উপযোগী কিন্তু তোমরা জান যে খলীফা উসমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর আমি তার ফুফাত ভাই তাই আমি তার রক্তের প্রতিশোধ চাই। সুতরাং তোমরা আলীর নিকট গিয়ে ওসমানের হত্যাকারীদেরকে আমার কাছে সোপর্দ করতে বল, তাহলে আমি তার আনুগত্য স্বীকার করব। তারপর তারা আলীর নিকট এসে এ প্রসঙ্গে কথা বললেন কিন্তু এতে আলী রা. অস্বীকৃতি জানালেন। [আল্লামা জাহাবী লিখিত সিয়ারুল আ’লামুন নাবলা ৩/১৪০] ইবনে কাসিমের এক বর্ণনায় আছে এতদ শ্রবণে সিরিয়াবাসীগণ সাহাবী মুআবিয়ার রা. সপক্ষে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। [আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৩২] আর আমাদের একথাও জেনে রাখা উচিত যে, খলীফা আলী রা. ও মুআবিয়া রা. এর মাঝে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে তাতে বিশিষ্ট সাহাবীসহ অধিকাংশ সাহাবীগণ অংশ গ্রহণ করেন নাই। যেমন ইমাম আহমদ রহ. এর পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, মুহাম্মদ বিন শিরিন থেকে আইয়ুব সখতিয়ানী তার থেকে ইসমাইল বিন আইলাহ তার থেকে আমার পিতা আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, ফিতনা যখন প্রজ্বলিত হল তখন প্রায় দশ হাজার সাহাবী বিদ্যমান ছিলেন কিন্তু তাদের একশত ব্যক্তিও তাতে অংশ গ্রহণ করেন নেই বরং ত্রিশ জন ও নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন উল্লিখিত বর্ণনাটি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শুদ্ধ বর্ণনা আর মুহাম্মদ বিন শিরিন সর্ব শ্রেষ্ঠ সত্যবাদী তার মারাসিলগুলো সবচেয়ে শুদ্ধ মারাসিল। [মানহুজুজ সুন্নাহ ৬/২৩৬, ২৩৭] গবেষকদের উচিত তারা যেন এ সমস্ত বিশুদ্ধ বর্ণনাগুলো ভাল ভাবে অবলোকন করেন যাতে তারা ঐতিহাসিকদের প্রতারণা দ্বারা প্রতারিত হয়ে নিজেদের মস্তিষ্ককে কলুষিত না করে ও তাদের হীনম্মন্যতা দ্বারা বিশুদ্ধ বর্ণনার অপব্যাখ্যা না করে।
পঞ্চমত: মু’মিনদের এ কথা জানা থাকা আবশ্যক যে সাহাবীদের মাঝে যে যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে তা ইজতিহাদ ও বিশেষ ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হলেও সাহাবীগণ এতে দারুণভাবে লজ্জিত ও ব্যথিত হয়েছেন। তাদের ধারণায়ও আসে নেই যে, ব্যাপারটা এত দূর গড়াবে। এবং তারা যখন সাথি সাহাবী ভাইদের মৃত্যুর সংবাদ ফেলেন তখন তারা অবর্ণনীয় মর্মাহত হয়েছেন। তাদের অনেকেই কল্পনাও করতে পারেন নাই যে, বিষয়টি এ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে।