hadith book logo

আমরা কাদের সাথে বন্ধুত্ব করব

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৬

ইসলামের দুশমনদের সাথে বন্ধুত্ব রাখার পরিণাম

যারা বন্ধুত্ব রাখে তারা যালিম :

﴿وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ اَهْوَآءَهُمْ مِّنْ ۢبَعْدِ مَا جَآءَكَ مِنَ الْعِلْمِ اِنَّكَ اِذًا لَّمِنَ الظَّالِمِيْنَ﴾

জ্ঞান (কুরআন) আসার পরও আপনি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন তাহলে আপনি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। [সূরা বাকারা- ১৪৫।]

সুতরাং রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি তাদের ভয়ে অন্তরে কোন বিশ্বাস না রেখে তাদের দ্বীনের অনুসরণ করতেন বাহ্যিকভাবে তাহলেও তিনি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হতেন।

তাদের আমল বরবাদ হয়ে যাবে :

﴿وَلَا يَزَالُوْنَ يُقَاتِلُوْنَكُمْ حَتّٰى يَرُدُّوْكُمْ عَنْ دِيْنِكُمْ وَمَنْ يَّرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِيْنِهٖ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَاُولٰٓئِكَ حَبِطَتْ اَعْمَالُهُمْ فِى الدُّنْيَا وَالْاٰخِرَةِۚ وَاُولٰٓئِكَ اَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيْهَا خَالِدُوْنَ﴾

তারা সর্বদা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে যে পর্যন্ত না তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ত্যাগ করবে, অতঃপর কাফির অবস্থায় মারা যাবে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে। আর তারা হবে জাহান্নামের অধিবাসী; সেখানে তারা চিরকাল (বসবাস) করবে। [সূরা বাক্বারা- ২১৭।]

আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না :

﴿لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُوْنَ الْكَافِرِيْنَ اَوْلِيَآءَ مِنْ دُوْنِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَمَنْ يَّفْعَلْ ذٰلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللهِ فِيْ شَيْءٍ اِلَّاۤ اَنْ تَتَّقُوْا مِنْهُمْ تُقَاةً ﴾

মুমিনরা যেন মুমিনদের ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট থেকে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর। [সূরা আলে ইমরান- ২৮।]

তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে :

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنْ تُطِيْعُوا الَّذِيْنَ كَفَرُوْا يَرُدُّوْكُمْ عَلٰۤى اَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوْا خَاسِرِيْنَ﴾

হে মুমিনগণ! যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাদেরকে পশ্চাদপদে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং তাতে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রত্যাবর্তিত হবে। [সূরা আলে ইমরান- ১৪৯।]

তারা হেদায়াত পাবে না :

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُوْدَ وَالنَّصَارٰۤى اَوْلِيَآءَۘ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍؕ وَمَنْ يَّتَوَلَّهُمْ مِّنْكُمْ فَاِنَّهٗ مِنْهُمْؕ اِنَّ اللهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الظَّالِمِيْنَ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। কেননা, তারা নিজেরাই একে অপরের বন্ধু। (এরপরও) তোমাদের মধ্য থেকে যারা তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে। নিশ্চয় আল্লাহ যালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। [সূরা মায়েদা- ৫১।]

দুনিয়ার স্বার্থে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না

আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদেরকে কেবল ঈমানদারদের সাথে বন্ধুত্ব করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি এভাবেও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যারা এরূপ করবে তাদের সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না। কেননা কাফিররা ইসলামের দুশমন। তারা সর্বদা ইসলাম এবং মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করার জন্য তৎপর থাকে। এখন যদি কোন মুমিন তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে তারা আরো বেশি ইসলামের ক্ষতি করার সুযোগ পাবে। এমনকি যদি কোন নামধারি মুসলিম কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে মুসলিমদের মধ্যে কুফরী কাজকর্ম বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে তবে এটা পুরো মুসলিম সমাজের জন্য ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে এরই বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়। নামধারি অনেক মুসলিম নিজেদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দেয়; অথচ তারা কাফির-মুশরিকদের মিশন বাস্তবায়ন করার জন্য রাত-দিন কাজ করছে। তাই তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়। কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রাখলে কাফিরদের আদর্শকেই মানুষ উত্তম বলে মনে করতে থাকবে। আর কাফিররাও এটাই চায় যে, মুসলিমরা নামে মুসলিম থাকলেও আদর্শগত দিক দিয়ে আমাদের অনুসারী হয়ে যাক। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম জাতিকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنْ تُطِيْعُوا الَّذِيْنَ كَفَرُوْا يَرُدُّوْكُمْ عَلٰۤى اَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوْا خَاسِرِيْنَ﴾

হে মুমিনগণ! যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাদেরকে পশ্চাদপদে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং তাতে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রত্যাবর্তিত হবে। [সূরা আলে ইমরান- ১৪৯।]

আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কাফিরদের আনুগত্য করলে নিঃসন্দেহে তারা কুফরীতে ফিরিয়ে নেবে। কারণ তারা কুফরী ব্যতীত অন্য কোন কিছুতে সন্তুষ্ট নয়। তারা সর্বদা মুমিনদের কাছ থেকে কুফরীকেই কামনা করে। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে আরো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।

ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের বাহ্যিক পরাজয় ঘটলে মুনাফিকরা ভাবল ইয়াহুদিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা দরকার। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আশ্রয় মিলবে। অতঃপর ইয়াহুদিরা যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাদের পক্ষ অবলম্বন করল এবং বলল, আমি ভয় করি; কেননা অভাব অনটনের সময় তাদের ছাড়া আমাদের কোন গতি নেই। তখন আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে বন্ধুত্ব বা কোন সম্পর্ক রাখাকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে দেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

﴿لَا تَجِدُ قَوْمًا يُّؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْاٰخِرِ يُوَآدُّوْنَ مَنْ حَآدَّ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ وَلَوْ كَانُوْاۤ اٰبَآءَهُمْ اَوْ اَبْنَآءَهُمْ اَوْ اِخْوَانَهُمْ اَوْ عَشِيْرَتَهُمْ﴾

যারা আল্লাহর প্রতি ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, তাদেরকে আপনি এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে, যদিও তারা তাদের পিতা অথবা পুত্র অথবা ভাই কিংবা তাদের জাতি-গোষ্ঠীর কেউ হয়। [সূরা মুজাদালা- ২২।]

অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা প্রকৃত মুমিনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। আর তা হলো, যারা ঈমান আনে তাদের মধ্যে এমন একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে বিরুদ্ধাচরনকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করবে; সে পিতামাতা, ভাই, স্ত্রী-সন্তান, গোত্র-গোষ্ঠী যে-ই হোক না কেন।

বাধ্য হয়ে কুফরী সমাজে থাকলেও অন্তরে ঈমান অটুট রাখতে হবে :

﴿مَنْ كَفَرَ بِاللهِ مِنْ ۢبَعْدِ اِيْمَانِهٖۤ اِلَّا مَنْ اُكْرِهَ وَقَلْبُهٗ مُطْمَئِنٌّ ۢبِالْاِيْمَانِ وَلٰكِنْ مَّنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِّنَ اللهِۚ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ ‐ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيَاةَ الدُّنْيَا عَلَى الْاٰخِرَةِ وَاَنَّ اللهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الْكَافِرِيْنَ﴾

যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করল এবং তার হৃদয়কে কুফরীর জন্য উন্মুক্ত রাখল, তাঁর উপর আল্লাহর রাগ পতিত হবে; আর তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি। তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরীর জন্য বাধ্য করা হয়, কিন্তু তার চিত্ত ঈমানের উপর অবিচল। এটা এজন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয়; নিশ্চয় আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না। [সূরা নাহল- ১০৬।]

যদি কোন মুমিন ইসলামের কোন শত্রুদলের ফাঁদে আটকা পড়ে যায় এবং সে তাদের পক্ষ থেকে চরম যুলুম-নির্যাতন, ভয়-ভীতি এমনকি প্রাণনাশের আশঙ্কা করে, তাহলে সে নিজের ঈমান গোপন রেখে কাফিরদের সাথে অবস্থান করতে পারবে। এমনকি চরম অবস্থায় কুফরী বাক্য পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করতে পারবে। তবে শর্ত হলো, তার অন্তর ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। মানুষের ভয় যেন তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে না ফেলে, যার ফলে আল্লাহর ভয় মন থেকে ওঠে যায়। মানুষ বড়জোর তার পার্থিব ও বৈষয়িক স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে, যার পরিসর দুনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু আল্লাহ তাকে চিরন্তন আযাবের মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারেন। কাজেই নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য যদি কখনো বাধ্য হয়ে কাফিরদের সাথে আত্মরক্ষামূলক বন্ধুত্বনীতি অবলম্বন করতে হয়, তাহলে তার পরিসর কেবলমাত্র ইসলামের স্বার্থ ও জান-মালের হেফাজত করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তবে লক্ষণীয় যে, ঐ কুফরী কথা বা কাজ যেন অন্য কোন মুসলিম ভাইয়ের প্রাণনাশের কারণ না হয়।

তবে এর অর্থ এ নয় যে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য কুফরী কথা বলা বাঞ্ছনীয়। বরং এটি একটি ‘রুখসাত’ তথা সুবিধা দান ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি অন্তরে ঈমান অক্ষুণ্ণ রেখে মানুষ বাধ্য হয়ে এ ধরণের কথা বলে, তাহলে তাকে কোন জবাবদিহি করতে হবে না। অন্যথায় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ঈমানের পরিচয় হচ্ছে, মানুষের এ রক্ত-মাংসের শরীরটাকে কেটে টুকরো টুকরো করা হলেও সে যেন সত্যের বাণীরই ঘোষণা দিয়ে যেতে থাকে। নবী ﷺ এর যুগে এ উভয় ধরণের ঘটনার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। একদিকে আছেন খাববাব ইবনে আরাত (রাঃ)। তাঁকে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর শোয়ানো হয়। এমনকি তাঁর শরীরের চর্বি গলে পড়ার ফলে আগুন নিভে যায়। কিন্তু এরপরও তিনি দৃঢ়ভাবে ঈমানের উপর অটল থাকেন। আরো আছেন বিলাল (রাঃ)। তাঁকে লোহার বর্ম পরিয়ে উত্তপ্ত রোদে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। তারপর উত্তপ্ত বালুর প্রান্তরে শোইয়ে তার উপর দিয়ে তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এরপরও তিনি ‘আহাদ, আহাদ’ (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক) শব্দ উচ্চারণ করে নিজের ঈমানের উপর দৃঢ় অবস্থানের কথা জানাতে থাকেন। [ইবনে মাজাহ, হা/১৫০।]

অন্যদিকে আছেন আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ)। তাঁকে এমন কঠিন শাস্তি দেয়া হয় যে, শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি কাফিরদের চাহিদামতো সবকিছু বলে দিলেন। এরপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে নবী ﷺ এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে মন্দ এবং তাদের উপাস্যদেরকে ভালো না বলা পর্যন্ত তারা আমাকে ছাড়েনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মনের অবস্থা কী? তিনি জবাব দিলেন, مُطْمَئِنًّا بِالْاِيْمَانِ তথা ঈমানের উপর পরিপূর্ণ নিশ্চিন্ত। এ কথায় নবী ﷺ বললেন, যদি তারা আবারো এ ধরণের যুলুম করে, তাহলে তুমি তাদেরকে আবারো এসব কথা বলে দিয়ো। [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৭৩৫০।]