hadith book logo

আমরা কাদের সাথে বন্ধুত্ব করব

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭

৩. মুমিনের বন্ধু সৎ মুমিনগণ

আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদারদের প্রতি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন সত্যপন্থীদের সাথে বন্ধুত্ব করে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَكُوْنُوْا مَعَ الصَّادِقِيْنَ﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। [সূরা তাওবা- ১১৯।]

মুমিনরা একে অপরের বন্ধু :

﴿وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ﴾

মুমিন নর ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। [সূরা তাওবা- ৭১।]

দুনিয়ার জীবনপথে মুমিনদের সাথি হবে মুমিনরাই। সাহচর্যের প্রভাব সুদূর প্রসারী হয়ে থাকে বিধায় কুরআন মুমিনদের সমাজবদ্ধ জীবন যাপনেরই নির্দেশিকা দিয়েছে। আল্লাহদ্রোহীদের সাহচর্য মুমিনদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সমাজ জীবনে মুমিনদের সম্পর্ক ঈমানদারদের সঙ্গে কেমন হবে এবং আল্লাহদ্রোহী কাফিরদের সঙ্গে কেমন হবে, সে সম্পর্কে কুরআন সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে,

﴿مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللّٰهِ وَالَّذِيْنَ مَعَهٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُمْ﴾

মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর তাঁর (মুহাম্মাদের) সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর, তবে নিজেদের ব্যাপারে একান্ত সহানুভূতিশীল। [সূরা ফাতহ- ২৯।]

আলোচ্য আয়াতাংশে আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সাথিদের সময়কার সমাজের সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতে গড়া ঈমানদারদের সত্যপন্থী দল সমাজের একটি অংশ। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর আদর্শবিরোধী কাফিরদের নিয়ে সমাজের বাতিলপন্থীদের আরেকটি দল। এই উভয় দলের লোকদের নিয়ে তখনকার সমাজ। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন যেন বিশ্বের সকল মানুষ সেই দ্বীন বা জীবনবিধান অনুসরণ করে চলে এবং এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠা করে দুনিয়ার জীবনে সুখ-শান্তি এবং আখিরাতের জীবনে মুক্তি পেতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথিগণ ছিলেন এ পথের অনুসারী। কিন্তু সমাজের দ্বিতীয় অংশটি প্রকৃত সত্যকে না মানার কারণে রাসূল ও মুমিনদের ঘোর বিরোধী হয়ে প্রকৃত সত্যের উল্টো পথে যেমন নিজেরা চলত, তেমনি সমাজকেও সে পথে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করত। তাই স্বাভাবিকভাবেই হক ও বাতিলপন্থীদের মধ্যে দেখা দেয় চরম বিরোধ, যা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে।

বাতিলপন্থীদের জন্য মুমিনগণ ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। অর্থাৎ কাফিরদের জন্য মুমিনগণ ছিলেন আপোসহীন। অথচ মুমিনগণ নিজেদের মধ্যে ছিলেন একে অন্যের হিতাকাঙ্ক্ষী, আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল। মুমিনগণের এ ধরণের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার ফলে তারা যেমন দুনিয়ার জীবনে সামাজিক শান্তি-শৃংখলার সাথে জীবন যাপন করতে পারতেন, তেমনি পরকালীন জীবনে মুক্তির পথ অনুসন্ধানও তাদের জন্য সহজ হয়ে যেত।

দুনিয়ার জীবনে মুমিনগণ যেন একই দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। দেহের একটি অঙ্গে অসুবিধা দেখা দিলে সম্পূর্ণ দেহটাই অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। বস্তুত প্রকৃত ঈমানদারদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ত সম্পর্ক থেকেও অধিকতর ঘনিষ্ঠ। এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী। এ বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্বের প্রভাব কেবল দুনিয়ার জীবনেই ফলপ্রসূ নয়, বরং পরকালের অসীম ও অনন্ত জীবনেও তা সুদূরপ্রসারী। কারণ মুমিনগণ পরস্পরকে দুনিয়ার জীবনে স্বচ্ছ ও সুন্দরভাবে চলার এবং আখিরাতের জীবনে মুক্তির জন্য সহযোগিতা করে থাকে।

মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই :

﴿اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ اِخْوَةٌ فَاَصْلِحُوْا بَيْنَ اَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ﴾

নিশ্চয় মুমিনরা একে অপরের ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে সুসম্পর্ক বহাল রাখো এবং আল্লাহকে ভয় করো। আশা করা যায়, তোমাদের উপর দয়া করা হবে। [সূরা হুজুরাত- ১০।]

মুমিনদের বন্ধুত্ব আল্লাহর বিরাট অনুগ্রহ :

﴿وَاذْكُرُوْا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ اِذْ كُنْتُمْ اَعْدَآءً فَاَلَّفَ بَيْنَ قُلُوْبِكُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهٖۤ اِخْوَانًا﴾

তোমাদের উপর আল্লাহর দেয়া নিয়ামতকে স্মরণ করো। যখন তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে; এমতাবস্থায় তিনি তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ফলে তোমরা তার অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেলে। [সূরা আলে ইমরান- ১০৩।]

আল্লাহর পথে লড়াইকারী মুমিন বন্ধুদেরকে আল্লাহ ভালোবাসেন :

﴿اِنَّ اللهَ يُحِبُّ الَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَ فِيْ سَبِيْلِهٖ صَفًّا كَاَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَّرْصُوْصٌ﴾

নিশ্চয় যারা সারিবদ্ধভাবে সীসাঢালা সুদৃঢ় প্রাচীরের মতো হয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। [সূরা সাফ- ৪।]

আল্লাহর জন্য যারা বন্ধুত্ব করবে তারা আরশের ছায়ায় স্থান পাবে :

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, সাত প্রকারের লোক যাদেরকে আল্লাহ তাঁর ছায়ার নিচে আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না। তাদের মধ্যে দুজন হলেন তারা, যারা আল্লাহর জন্য একে অন্যকে ভালোবাসত ও আল্লাহর জন্য মিলিত হতো এবং আল্লাহর জন্যই বিচ্ছিন্ন হতো। [মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/৩৫০৫; সহীহ বুখারী, হা/৬৬০; সহীহ মুসলিম, হা/২৪২৭; তিরমিযী, হা/২৩৯১; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৪৪৮৬; ইবনে খুযাইমা, হা/৩৫৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৬৬৫।]