hadith book logo

সাহাবীগণের হক ও ফযীলত সম্পর্কে যথাযথ করণীয়

লেখকঃ আব্দুল্লাহ ইবন সালিহ আল-কুসাইর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি দু’জাহানের রব। মুত্তাকিদের জন্য তিনি শেষ ফল চূড়ান্ত করেছেন, আর অত্যাচারী ব্যতীত কাউকে তিনি শাস্তি দিবেন না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি প্রকাশ্য সত্য, একচ্ছত্র মালিক। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, সত্যবাদী, একান্ত বিশ্বস্ত ও উম্মতের জন্য স্পষ্ট হিতাকাঙ্ক্ষী। কিয়ামতের আগে তাকে সত্যসহ প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি জগতবাসীকে সুসংবাদ দাতা ও সাবধানকারী। মুমিনদের জন্য রহমত এবং জিন ও মানবের জন্য তাওহীদের প্রমাণ। আল্লাহ তার উপর, তার পরিবার ও সকল সাহাবীর ওপর সালাত ও সালাম নাযিল করুন, যারা তার ওপর ঈমান এনে তাকে সাহায্য ও শক্তিশালী করেছে এবং তাঁর সাথে প্রেরিত আলোকবর্তিকার অনুসরণ করেছে, বস্তুত তারাই সফলকাম।

সাহাবীগণ অনেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, তাদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি নাযিল হোক, যেমন আল্লাহ তাদেরকে শেষ নবী, সকল নবীর সরদার মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। অতএব, তারা শ্রেষ্ঠ উম্মত, ইসলামের শিরোমনি, পরবর্তীদের জন্য শরী‘আতের সেতু বন্ধন এবং ইলম ও আমলের পথিকৃৎ ইমাম। তাদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছেন। নিম্নে তাদের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য, ফযীলত ও মর্যাদার দলীল পেশ করছি:

১. আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে সাহাবীগণের প্রশংসা করেছেন। তারা ইসলাম, ঈমান ও ইহসানের ধারক বলে তিনি সাক্ষী দিয়েছেন। তাদের জন্য তিনি নিজের নৈকট্য ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের আরও অনেক নি‘আমতের প্রতিশ্রুতি, যা আল্লাহ ইবাদতকারীদের জন্য তৈরি করেছেন, তার হকদার তারাই সবার আগে।

২. সাহাবীগণ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তারা জান্নাতি, সকল জাতি থেকে সেরা ও শ্রেষ্ঠ। তাদের জন্য এ ছাড়া আরও অনেক সুসংবাদ রয়েছে কুরআনুল কারীম ও সহীহ সুন্নাহতে।

৩. আহলে ইলম সবাই একমত যে, মুসলিম উম্মাহর ভেতর সাহাবীগণ সবচেয়ে বেশি ফযীলত, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।

ইনসাফপন্থী কেউ এতে দ্বিধা করে না যে, সাহাবীগণ সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী, তবে বর্তমান যুগে কতক লোকের জন্ম হয়েছে, যারা সাহাবীগণের সমালোচনা ও তাদের দোষ-ত্রুটি অন্বেষণ করছে, যার পশ্চাতে তাদের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কতক সাহাবীকে কলুষিত করা অথবা সকল সাহাবীর মর্যাদা বিনষ্ট করা। এর গভীরে তাদের ষড়যন্ত্র হচ্ছে, আল্লাহকে মিথ্যারোপ ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতে কালিমা লেপন করা, যিনি নিজের পক্ষ থেকে কোনো কথা বলেন না। তাদের আরেক উদ্দেশ্য হচ্ছে, শরী‘আতের সেতু বন্ধনকে দোষারোপ, ইসলামে স্বীকৃত ও আদর্শ ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি ও মুসলিম উম্মাহর যুবকদের পথভ্রষ্ট করা, বদ-দীন-যিন্দিকদের পক্ষ গ্রহণ ও ইসলামের শত্রুদের খুশি করা। বস্তুত এ জাতীয় কর্ম গণ্ডমূর্খ ও নিফাকে পূর্ণ ব্যক্তি ব্যতীত কারও থেকে প্রকাশ পেতে পারে না। এ শ্রেণির লোকেরা মূলত বাতেনী চিন্তাধারা, ধর্মহীনতা ও নিফাক ছড়ানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত; কিন্তু সেটা গোপন করার জন্য সে এসব নাপাক কর্ম-কাণ্ডের নাম দিয়েছে গবেষণা ও অনুসন্ধান। এ ব্যক্তি যদি তাওবা ছাড়া মারা যায়, নিজ ব্যতীত কারও ক্ষতি করবে না। সে তার খারাপ লিখনি ও বিষাক্ত বাক্য দিয়ে নিজের ভেতর লুকানো বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ ٱلۡمُفۡسِدَ مِنَ ٱلۡمُصۡلِحِۚ ٢٢٠﴾ [ البقرة : 220]

“আল্লাহ জানেন কে ফাসাদকারী, আর কে সংশোধনকারী”। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২২০]

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُصۡلِحُ عَمَلَ ٱلۡمُفۡسِدِينَ ٨١﴾ [ يونس : 81]

“নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের আমল পরিশুদ্ধ করেন না”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৮১]

অপর আয়াতে তিনি বলেন,

﴿إِنَّ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِيٓ ءَايَٰتِنَا لَا يَخۡفَوۡنَ عَلَيۡنَآۗ أَفَمَن يُلۡقَىٰ فِي ٱلنَّارِ خَيۡرٌ أَم مَّن يَأۡتِيٓ ءَامِنٗا يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۚ ٱعۡمَلُواْ مَا شِئۡتُمۡ إِنَّهُۥ بِمَا تَعۡمَلُونَ بَصِيرٌ ٤٠﴾ [ فصلت : 40]

“নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহ বিকৃত করে তারা আমার অগোচরে নয়। যে অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে সে কি উত্তম, না যে কিয়ামত দিবসে নিরাপদভাবে উপস্থিত হবে? তোমাদের যা ইচ্ছা আমল কর, নিশ্চয় তোমরা যা আমল কর তিনি তার সম্যক দ্রষ্টা”। [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪০]

এসব লোকদের জানা উচিৎ যে, সাহাবীগণ হলেন আসমানের তারকা স্বরূপ, যার দ্বারা জ্ঞানীরাই পথ পায়, কুকুরের ঘেউ ঘেউ তাদের কোনোও ক্ষতি করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ يُدَٰفِعُ عَنِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٖ كَفُورٍ ٣٨﴾ [ حج : 38]

“নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন, এবং কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না”। [সূরা হাজ, আয়াত: ৩৮]

অত্র আয়াতে মুমিন দ্বারা প্রথম উদ্দেশ্য সাহাবীগণ। অতএব, আল্লাহ যাদের পক্ষ অবলম্বন করেন তাদের ক্ষতি করার সাধ্য কারও নেই। অন্যত্র তিনি বলেন:

﴿ لِيَغِيظَ بِهِمُ ٱلۡكُفَّارَۗ ٢٩﴾ [ محمد : 29]

“যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদের রাগান্বিত করতে পারেন”। [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯]

এ আয়াতেরও প্রথম উদ্দেশ্য সাহাবীগণ। আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফিরদের রাগিয়েছেন।

সাহাবীগণ এখন কবরে, স্বীয় রবের প্রতিদান ভোগ করছেন। তাদের সম্পর্কে গোস্বা প্রকাশ, হিংসার বীজ বপন ও তাদের সম্মান নষ্ট করে কাফিরদের অনুসারী মুনাফিক বা যিন্দিক ব্যতীত কেউ প্রশান্তি পেতে পারে না। তাদের প্রতিবাদ করার উদ্দেশ্যেই সাহাবীগণের নিয়ে সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা লিখছি, যেন আমার ওপর থাকা তাদের হক কিছুটা হলেও আদায় হয় এবং উম্মত তার সঠিক নির্দেশনা খুঁজে পায়। আরও উদ্দেশ্য সাহাবীগণের ফযীলত বর্ণনা করা এবং তাদের সম্পর্কে যারা সন্দেহে পতিত তাদেরকে সঠিক পথ দেখানো। অতিরিক্ত আরও সংযোজন করেছি সাহাবীর সংজ্ঞা, তাদের মর্যাদা, ফযীলত, উম্মতের ওপর তাদের হক এবং তাদের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকিদা। আমার আরেক উদ্দেশ্য, ভুলে যাওয়া মুসলিমদের সাহাবীগণের মর্যাদা স্মরণ করানো ও তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের রাগিয়ে তোলা। আল্লাহ সঠিক পথের হিদায়াত দানকারী।

আব্দুল্লাহ ইবন সালিহ আল-কুসাইর

১০/০৪/১৪২৪ হি.