hadith book logo

ইসলামী বিধান ও আধুনিক বিজ্ঞান (প্রথম খন্ড)

লেখকঃ মুহাম্মাদ ওসমান গনি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১

হায়েয অবস্থায় স্ত্রী গমণ নিষেধ কেন?

আল্লাহর বিধানে প্রত্যেকটি বস্ত্তর জন্য নির্ধারিত রয়েছে এক আনুপাতিক পরিমাপ। তার সকল বিধান আমাদের জ্ঞাতে অজ্ঞাতে কল্যাণ সাধন করে যাচ্ছে এবং আমাদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনের সকল সমস্যার সমাধান দিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ ﴿البقرة 222﴾

অর্থঃ তারা তোমার কাছে হায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এটা এক প্রকার অসুস্থতা। অতএব তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রী গমণ থেকে বিরত থাক। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। অতঃপর যখন তারা পবিত্রতা লাভ করে তখন তোমরা তাদের কাছে গমণ কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম করেছেন। নিশ্চয়ই যারা তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকে তাদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন। (সূরা বাকারা, ২ঃ ২২২ আয়াত)।

আল্লাহর বিধান অনুযায়ী একজন মুসলিম পুরুষ ও একজন মুসলিম মহিলা বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে পরস্পর হালাল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যখন সেই রমনীর হায়েয (ঋতু) শুরু হয়, এমতাবস্থায় স্বামী ব্যবহার হারাম হয়ে যায়। তবে প্রশ্ন হল হায়েয অবস্থায় কেন আল্লাহ রাববুল আলামীন স্ত্রী সহবাস হারাম করলেন? এতে উপকার বা ক্ষতি কি? তাহলে আসুন এ ব্যাপারে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

এ নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে আমাদের সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে। অতএব এতে যে মানব জাতির কল্যাণ নিহিত রয়েছে তাতে কোনই সন্দেহ নেই।

বান্দা যখন দাম্পত্য জীবনে মধুর মিলনে মশগুল হয়ে যাবে তখন আল্লাহর কথা স্মরণ থাকে কি না সে জন্যই এই নিষেধের ব্যবস্থা। আল্লাহ চান না যে, এক মুহূর্তের জন্যও বান্দা তাঁকে ভুলে থাকুক। রাস্তায় রেড সিগনালের ব্যবস্থা রেখেছেন যাতে চলন্ত গাড়ীর চালক সেগুলো দেখে তার গাড়ী থামিয়ে দেয়।

আল্লাহ তা‘আলা শুধু দাম্পত্য জীবনেই নয়, বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিধি নিষেধের ব্যবস্থা রেখেছেন। যেমন পানাহারের মধ্যে হালাল হারাম রেখেছেন তেমনি রেখেছেন ইবাদতের মধ্যে। একজন বান্দা আল্লাহর দেয়া নিয়ামত পরিতৃপ্তি সহকারে আহার করবে। কিন্তু স্বীয় সৃষ্টিকর্তার কথা যাতে ভুলে না যায়, বরং প্রতি মুহূর্তে সর্বাবস্থায় তাঁকে স্মরণ করে সেজন্য খাদ্যের মধ্যে হালাল হারামের ব্যবস্থা রেখেছেন। আবার হালাল কাজগুলির কিছু কিছু রমযান মাসে দিনের বেলায় হারাম করে দিয়েছেন। নামাজ আদায় করা আল্লাহর হুকুম। আবার এমন কিছু সময় রয়েছে যে সময় নামাজ পড়া হারাম। এ মুহূর্তেও বান্দা বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহকেই স্মরণ করবে।

পূর্ণ বয়স্কা প্রত্যেক সুস্থ রমণী প্রতি চার সপ্তাহে একবার হায়েয অবস্থায় থাকে। কুরআন মেয়েদের হায়েয অবস্থাকে অসুস্থতা বলেছে এবং হায়েয অবস্থায় সহবাস থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কিছুদিন পূর্বেও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটাকে স্বাভাবিক ও সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করা হতো। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বর্ণনা করছে যে, এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

ডাঃ যোয়ান গ্রাহাম লিখেছেনঃ ঋতুর সময় রোগ ছড়াবার ও রোগাক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে। কাজেই একে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও শরীর বিদ্যা সম্মত (Physiological) বলা চলে না। শরীর তত্ববিদগণের পর্যবেক্ষণের দ্বারা জানা যায় যে, মাসিক ঋতুকালে নারীদের মধ্যে নিম্ন লিখিত শারীরিক পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়ঃ

১। শরীরে তাপ সংরক্ষণ শক্তি কমে যায়। ফলে অধিক মাত্রায় শারীরিক তাপ নির্গত হয়ে তাপমাত্রা কমে যায়।

২। নাড়ী ক্ষীণ হয়ে পড়ে, রক্তের চাপ কমে যায়, শ্বাস গ্রহণের পার্থক্য দেখা যায়।

৩। ম্বরণ শক্তি কমে যায় এবং কোন বিষয়ে একাগ্রতা থাকে না।

৪। স্নায়ুমন্ডলী অবসন্ন ও অনুভূতি শক্তি শিথিল হয়।

শরীর বিজ্ঞানের ডাক্তার এমিল নুডিক বলেনঃ ঋতুবতী স্ত্রীলোকের মধ্যে সাধারণতঃ যে পরিবর্তন দেখা যায় তা নিম্নরূপঃ

মাথা ব্যাথা, অবসাদ, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যথা, স্নায়ুবিক দুর্বল, স্বভাবের রুক্ষতা, মুত্রণালিতে যন্ত্রণা, হযমশক্তি হ্রাস পাওয়া, কোন কোন অবস্থায় কোষ্ঠ কাঠিন্য, সময় সময় বমির ভাব এবং কোন কোন নারীর এ সময় কন্ঠস্বর ভারী হয়ে যায়।

আবার কখনো হযম শক্তি নষ্ট হয়ে যায়, শ্বাস গ্রহণে কষ্ট হয়।

ডাঃ মোহাম্মদ গোল্লাম মুয়াযযাম স্বীয় কিতাবে উল্লেখ করেছেন, ঋতুর সময় স্ত্রী মিলন নিষিদ্ধ হওয়া সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য নীতি সম্মত ও যুক্তি ভিত্তিক। ঋতুর সময় জরায়ুর নিম্নমুখ স্বাভাবিক বন্ধ অবস্থায় থাকে না। তখন এর মুখ খোলা থাকে, ফলে রক্ত বের হতে পারে। ঋতুর রক্ত জরায়ুর গা থেকে ঝরে, কাজেই সেখানেও স্বাভাবিক অবরণ বা ঝিলি ( Endometreum) অটুট থাকে না। ফলে এ সময় জরায়ু বা যোনী নালীতে কোন রোগ জীবানু থাকলে তাও সহজেই ভিতরে প্রবেশ করে এবং Endometritis (জরায়ু ঝিলি প্রদাহ) Salpingites (জরায়ুর নালীর প্রদাহ), Peritonitis (অন্ত্র আবরনী প্রদাহ) ও Pelivic Cellulite (তলপেটের প্রদাহ) ইত্যাদি কঠিন রোগ হওয়ার আশংকা থাকে। এ সময় স্ত্রী সহবাস করলে এসব রোগের সম্ভাবনা বেশী। আবার স্ত্রীর গনেরিয়া, সিফিলিস, সিসটাইটিল (মূত্রনালী প্রদাহ), স্বেত প্রদাহ (Leucorrhoea) ইত্যাদি রোগ থাকলে স্বামীর যৌন অঙ্গে রোগ জীবানু প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং স্বাস্থ্যগত কারণেই ঋতুর সময় সহবাস নিষিদ্ধ।

তা ছাড়া যৌন মিলন নেহায়েতই উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা, সে সময় সব রকম স্বাস্থ্য বিধি পালন সম্ভব নয়। সুতরাং যখন জরায়ুর ঝিলি অটুট নয়, তখন পুরুষদের মাধ্যমে রোগ জীবানু প্রবেশের সম্ভাবনা বেশী। যদি কেউ যথেষ্ট সাবধানতা অমলম্বন করে তবুও মেয়েদের রক্তস্রাবের সময় সহবাস করা জঘন্য খুন খারাবীর মত নিকৃষ্ট মানসিক অবস্থার প্রমাণ দিবে। তাই ডাঃ গ্রাহাম বলেন যে, ঋতুর সময় মিলনে নিষেধ করার কারণ মানসিক নয়, বরং স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সম্মত।