hadith book logo

ইসলামী বিধান ও আধুনিক বিজ্ঞান (প্রথম খন্ড)

লেখকঃ মুহাম্মাদ ওসমান গনি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

ছেলেরা মেয়েদের দ্বিগুন অংশ পায় কেন?

ইসলাম শ্বাশত সত্য ও শান্তির ধর্ম। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ ( سورة آل عمران 19)

অর্থঃ ইসলাম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত ধর্ম। আর বিশ্ব মানবতা ও বিশ্ব নারী সমাজকে একমাত্র ইসলামই পারে শান্তি দিতে এবং তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। আল্লাহর কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতই পারে বিশ্বের নির্যাতিত, লাঞ্ছিত ও অবহেলিত নারী সমাজকে পূনঃ প্রাতিষ্ঠা করতে। ইসলাম যেহেতু শান্তি ও ন্যায় বিচারের ধর্ম সেহেতু ইসলাম নারী পুরুষ কারোরই অমঙ্গল কামনা করতে পারে না। কারও অধিকার হরণ এবং কাউকে অবমাননা করা ইসলাম-বিরোধী।

বর্তমান যুগে কিছু ভ্রান্ত পথভ্রষ্ট ব্যক্তি রয়েছে, তারা বলেঃ ইসলাম মেয়েদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, যেহেতু উত্তরাধিকারের ব্যাপারে ইসলাম ধর্ম মেয়েদেরকে ছেলেদের সমান অধিকার দেয়নি।

আসলে মানুষের মাঝে কিছু চালাক চতুর লোক রয়েছে যারা মেয়েদেরকে নিয়ে সদা সর্বদা তাদের কু-প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য চক্রান্ত করছে এবং তাদেরকে ধোকা দিচ্ছে।

আসুন তাহলে দেখা যাক মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে দুর্বল ও সম্পদের বেশী মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও কেন ইসলাম ছেলেদের জন্য মেয়েদের দ্বিগুন অংশ নির্ধারণ করলো? ইসলাম শ্বাশত সত্য ও শান্তির ধর্ম। আল্লাহ রাববুল ইয্যত ইরশাদ করেনঃ

يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ ( سورة النساء 11)

অর্থঃ আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেনঃ একজন পুরুষের অংশ দুজন নারীর অংশের সমান। (সুরা নিসা, ৪ঃ ১১ আয়াত)।

এই আয়াতের শেষ অংশে আল্লাহ রাববুল আলামীন স্পষ্ট করে আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা উল্লেখ করে বলেনঃ

آَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴿النساء 11﴾

অর্থঃ তোমরা তো জানো না যে, তোমাদের পিতা ও পুত্রের মধ্যে কে তোমাদের জন্য অধিক উপকারী। এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, রহস্যবিদ। (সুরা নিসা, ৪ঃ ১১ আয়াত)।

ইসলামের সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বে তৎকালীন আরব সমাজ ছিল বর্বর জাহিলিয়াতের সমাজ। সেই সময় নারীরা ছিল সবচেয়ে বেশী অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও পদদলিত। নারী সমাজকে সামাজিক ভাবে মূল্যায়ন করা হতো না। কোন পরিবারে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের কারণ মনে করা হতো। দরিদ্র ও অভাবের ভয়ে ভূমিষ্ট শিশুকে মেরে ফেলা হত। জন্মদাতা যালিম পিতা শিশু সন্তানের হৃদয় বিদারক চিৎকার উপেক্ষা করে তাকে মাটিতে পুঁতে রাখত। অনেক পিতা দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে কন্যা সন্তানকে বিক্রি করে দিত। সেই যুগে এমন কি মেয়েদেরকে কিছুই দেয়া হতো না এই বলে যে, তারা যুদ্ধ করত না, তারা তলোয়ার ধারণ করত না এবং শত্রুর মোকাবিলা করত না। এই সূত্র ধরে তারা পিতা মাতার ধন সম্পদেরও মালিক হতো না। আর না হতো তাদের স্বামীর অংশীদার। মেয়েরা এ ভাবেই যুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতো।

আল্লাহ রাববুল আলামীন বিশ্ববাসীর হিদায়েতের লক্ষ্যে চির শ্বাশত ও শান্তিপূর্ণ নির্ভেজাল বিধান দিয়ে বিশ্ব মানবের মুক্তির দূত ও আলোর দিশারী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পৃথিবীতে পাঠালেন। তিনি চৌদ্দ শত বছর পূর্বে আল্লাহর নির্দেশে নারীর হক নির্ধারণ করলেন যাতে তারা ইযযতের সাথে স্বসম্মানে তা গ্রহণ করতে পারে। করুণা কিংবা দানের ভিত্তিতে নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।

وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ ( سورة النساء 7)

অর্থঃ রমণীদের পিতামাতা ও আত্মীয় স্বজন যা রেখে গেছে তার মধ্যে তাদের জন্য অংশ রয়েছে। (সূরা নিসা, ৪ঃ ৭ আয়াত)।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়, যার দ্বারা সমাজে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যার দ্বারা সে তার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে পারে তা হলো অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা। ইসলাম ছাড়া অন্য সকল আইন কানুন নারীকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল করে রেখেছে এবং সমাজে নারীর দাসত্বের কারণই হলো তার এ আর্থিক দুর্গতি। ইউরোপ এ অবস্থার অবসান চাইল এবং তার জন্য নারীকে উপার্জনশীল হিসাবে তৈরী করলো। উত্তরাধিকার সে লাভ করলো। ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকারের বিরাট অধিকার দান করলো। পিতা, স্বামী, সন্তান ও অন্যান্য নিকট-আত্মীয়ের উত্তরাধিকার সে লাভ করলো। উত্তরাধিকার আইনে নারীকে পুরুষের অর্ধেক অংশ দেয়া হয়েছে। নারী তার স্বামীর নিকট হতে মোহর ও ভরণ পোষণ পায়। পুরুষ এ সকল হতে বঞ্চিত। নারীর ভরণ পোষণ শুধু স্বামীর উপর ওয়াজিবই নয়, বরং স্বামীর অবর্তমানে পিতা, ভাই, সন্তান অথবা অন্যান্য আত্মীয় তার ভরণ পোষণ করতে বাধ্য। মেয়েদের সম্পদ লাভ করার মাধ্যমে তার উপর পূর্ণ মালিকানা ও সত্ত্ব কায়েম হয় এবং তা ব্যয় করার পূর্ণ অধিকার তার, পিতা, স্বামী কিংবা অন্য কারও নেই। কোন ব্যবসায়ে মূলধন বিনিয়োগ করলে, অথবা নিজ শ্রম দ্বারা কোন অর্থ উপার্জন করলে তারও সে মালিক হবে। এ ছাড়াও তার ভরণ পোষণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বামীর। স্ত্রী যত ধনশালী হোক না কেন, তার ভরণ পোষণের দায়িত্ব হতে স্বামী মুক্ত হতে পারবে না। এভাবে ইসলাম ধর্মে নারীর আর্থিক অবস্থাকে এত সুদৃঢ় করে দেয়া হয়েছে যে, অনেক সময় নারী পুরুষ অপেক্ষা বেশী ভাল অবস্থায় থাকে।