hadith book logo

ইসলামী বিধান ও আধুনিক বিজ্ঞান (প্রথম খন্ড)

লেখকঃ মুহাম্মাদ ওসমান গনি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৩

অতিরিক্ত আহার করা নিষেধ কেন?

ইসলামে মানব জীবনের সকল দিকের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে যা মানব জাতির সার্বিক কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসে। শরীরের জন্য খাদ্য প্রয়োজন। তাই আমরা সকলেই খাদ্য গ্রহণ করি। উত্তম সুস্বাদু খাদ্য পরিমাণ মত আহার করার ব্যাপারে ইসলামে কোন নিষেধ নেই। নিষেধ শুধু অতিরিক্ত আহার ও অপচয়ের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

كُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ ﴿الأعراف 31﴾

অর্থঃ পানাহার কর, কিন্তু অপচয় কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সূরা আরাফ, ৭ঃ ৩১ আয়াত)।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

مَا مَلأَ ادَمِىٌّ وعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنِهِ بِحَسَبِ ابن آدمَ لُقَيمَتٌ يقمْنَ صُلْبَه فانْ لَمْ يَفْعَلْ فَثُلُثٌ للطَّعامِ وَثُلُثٌ للشَّرابِ وَثُلُثٌ للتَنَفُّسِ ( رواه ابن ماجه )

অর্থঃ মানুষ তার পেটের ন্যায় খারাপ অন্য কোন পাত্রপূর্ণ করেনি। অথচ আদম সন্তানের কোমর সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাদ্যই যথেষ্ট। আর যদি তা না করতে পারে তাহলে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানির জন্য, আর বাকী এক তৃতীয়াংশ শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখবে। (ইবনে মাজাহ)।

তিনি আরও বলেছেনঃ কাফির সাত আঁতে আহার করে অর্থাৎ বেশী পরিমাণ খায়, আর মু’মিন এক আঁতে আহার করে অর্থাৎ কম খায়। (মিশকাত)।

আরও বর্ণিত আছেঃ

نحن قَوْمٌ لا نأكُلُ حَتّى نَجُوْعَ وإذا أكَلْنا لا نَشْبَعُ

অর্থঃ আমরা এমন এক জাতি; ক্ষুধা না লাগা পর্যন্ত খাই না, আর যখন খাই তখন পরিতৃপ্ত ভাবে নয় অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাই না।

কেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রয়োজনের অতিরিক্ত খেতে নিষেধ করলেন এবং অতিরিক্ত আহারে ক্ষতিই বা কি? খাদ্য বিশেষজ্ঞগণ এ ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌঁছেছেন যে, ৮০% রোগ ব্যাধি খাবারের কারণেই হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করে সেই খাদ্য যেমন হজম করতে বড় ধরণের শক্তি অপচয় হয় অর্থাৎ অতিরিক্ত আহার হজম শক্তিকে ক্লান্ত করে ফেলে এবং ক্লান্ত হয়ে যায় সেগুলো বের করতেও। এমন কি পায়খানা ও প্রস্রাবের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। [ الاسلام أو الضياع للشيخ عبد المجيد الزنداني (ص ৬৭)]

ডাঃ এ এইচ এম আজহারুল ইসলাম উল্লেখ করেছেনঃ অধিক ভোজনের প্রাথমিক ফল হল ডায়াবেটিস। কেননা বেশী খাওয়ার কারণে লালগ্রন্থিকে বেশী কাজ করতে হয়। এ কারণে আভ্যন্তরিণ আদ্রতা রস (insulin) কমে যায় এবং রক্তে চিনির (suger) পরিমাণ বেড়ে যায়। অধিক ভোজন রক্তের চাপ বৃদ্ধির আর একটি অত্যাবশ্যকীয় কারণ। কেননা ডায়াবেটিস এবং ব্লাড প্রেসার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। অধিক ভোজনের কারণে প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। এতে রক্তবাহী শিরাগুলি সংকীর্ণ হয়ে যায়। ফলে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ ভাবে যখন শিরাগুলি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে তখন সংশিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুভূতিহীন হয়ে যায়। আর এ অবস্থাটি মস্তিস্কের কোন অংশে হঠাৎ প্রকাশ পেলে মানুষ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়।

শিরার সংকীর্ণতা হৃদরোগের অন্যতম কারণ। কেননা শিরার চুড়ান্ত সংকীর্ণতা হৃদপিন্ডের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। এমতাবস্থায় হৃদপিন্ডের বিবর্তন হওয়া অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। অধিক ভোজনের ফলেই অসময়ে বার্ধক্যে পতিত হয়ে থাকে। কেননা বেশী খেলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই দুর্বল বা শক্তিহীন হয়ে যায় এবং তাকে অতি অল্প বয়সেই বৃদ্ধ বলে মনে হয়।

অধিক ভোজনের কারণে শরীর মোটা বা স্থুল হয়ে থাকে। এই অবস্থায় বহুবিধ রোগ ব্যাধি হয়ে থাকে। Bone Marrow pain বা অস্থি মজ্জার ব্যাথা, joint pain ইত্যাদি হয়ে থাকে। [মাসিক মদীনা, অক্টেবর ২০০০ইং।]

সাধারণতঃ শহরবাসীদের মধ্যে যারা অধিক ভোজন করে অপচয় করে তাদের শেষ বয়সে এ ধরনের কঠিন ব্যাধি পরিলক্ষিত হয়। অপর দিকে গ্রামবাসীদের মধ্যে যারা অল্প ও স্বাভাবিক আহারে তুষ্ট থাকে এবং এটা অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে তারা এ সমস্ত রোগ ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকে। কেননা তাতে কোলেষ্টরেলের আধিক্য থাকে না এবং ঐ সমস্ত অতিরিক্ত বস্ত্তও থাকে না যা শরীরকে ক্লান্ত করে থাকে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের মতে, মানুষের জন্য কোমর সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাদ্যই যথেষ্ট। আর একান্তই যদি বেশী খাওয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে তাহলে পেটের এক তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক তৃতীয়াংশ পানি দ্বারা পূর্ণ করে বাকী এক ভাগ শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখতে হবে যা একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরই নির্দেশ ছিল। প্রফেসর রিচার্ড বার্ড গবেষণার পর প্রকাশ করেছেন যে, বেশী খাদ্য খেলে নিম্ন লিখিত রোগ ব্যাধির সৃষ্টি হয়ঃ

১। মস্তিস্কের ব্যাধি।

২। চক্ষুরোগ।

৩। জিহবা ও গলার।

৪। বক্ষ ও ফুসফুসের ব্যাধি।

৫। হৃদ রোগ।

৬। যকৃত ও পিত্তের রোগ।

৭। ডায়াবেটিস।

৮। উচ্চ রক্ত চাপ।

৯। মস্তিস্কের শিরা ফেটে যাওয়া।&

১০। দুশ্চিন্তাগ্রস্ততা

১১। অর্ধাঙ্গ রোগ।

১২। মনস্তাত্তিক রোগ।

১৩। দেহের নিম্নাংশ অবশ হয়ে যাওয়া। [সুন্নাতে রাসূল ও আধুনিক বিজ্ঞান- ডাঃ মোঃ তারেক মাহমুদ।]

তাই বর্তমানে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বার বার এ কথার উপর জোর দিচ্ছে যে, কম আহার করুণ, বেশী দিন বাঁচুন।