১
তাক্বওয়া অর্জনের উপায়
লেখকঃ মোহাম্মদ ইমাম হোসাইন কামরুল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১২
তাক্বওয়ার পার্থিব ফলাফল
তাক্বওয়ার পার্থিব ফলাফলগুলো হচ্ছে নগদ পুরস্কার। এগুলো কখনো কখনো অতি দ্রুত প্রতিফলিত হয়, আবার কখনো কখনো কিছুটা দেরীতে প্রতিফলিত হয়। বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কেননা তিনি কখনো কখনো এর মাধ্যমেও বান্দাকে পরীক্ষা করে থাকেন যে, বান্দা এত দ্রুত প্রতিফল পাওয়ার কারণে তাঁর শুকরিয়া আদায় করে কি না অথবা দেরী হওয়ার কারণে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে কি না। অতএব তাক্বওয়ার পার্থিব ফলাফল পাওয়ার জন্য অনুরূপ মানসিক প্র্রস্তুতি থাকা খুবই জরুরি। নিম্নে পার্থিব ফলাফলের কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হলো :
১. অকল্পনীয় উৎস থেকে জীবিকা লাভ হয় :
তাক্বওয়াবান বান্দাগণ তাক্বওয়ার ফলস্বরূপ আল্লাহর পক্ষ হতে এমন উৎস হতে রিযিক লাভ করে থাকে, যে সম্পর্কে সে কল্পনাও করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مَخْرَجًا ‐ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার উপায় বের করে দেন এবং তিনি ঐ ব্যক্তিকে এমন দিক হতে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। (সূরা তালাক্ব- ২, ৩)
অপর আয়াতে তিনি বলেন,
﴿وَأَلَّوِ اسْتَقَامُوْا عَلَى الطَّرِيْقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَّآءً غَدَقًا﴾
তারা যদি সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাদেরকে আমি প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম। (সূরা জিন- ১৬)
২. সকল কাজকর্ম সহজসাধ্য হয়ে যায় :
যে ব্যক্তি পাপাচার পরিত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় আনুগত্যপূর্ণ কাজ ঐ বান্দার জন্য সহজ করে দেন। তিনি বলেন,
﴿وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مِنْ اَمْرِهٖ يُسْرًا﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার কাজকর্ম সহজ করে দেন। (সূরা তালাক্ব- ৪)
৩. উপকারী জ্ঞান লাভ করা যায় :
যখন কোন বান্দা আল্লাহকে ভয় করে এবং এর ভিত্তিতে সৎকর্ম করার প্রতি মনোযোগী হয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আর তাকে অনেক উপকারী জ্ঞান দান করেন। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاتَّقُوا اللهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللهُ وَاللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمٌ﴾
তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত। (সূরা বাক্বারা- ২৮২)
৪. সূক্ষ্ম ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া যায় :
এটি আল্লাহ তা‘আলার একটি বিশেষ অনুগ্রহ। আর তাক্বওয়াবান বান্দাদের জন্য এ গুণটি অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় তার পক্ষে দ্বীনের উপর টিকে থাকা খুবই কঠিন। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা তাক্বওয়াবান বান্দাদেরকে এগুণটি দান করেন। যেমন- তিনি বলেন,
﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَّكُمْ فُرْقَانًا﴾
হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার শক্তি দেবেন। (সূরা আনফাল- ২৯)
৫. উত্তম ব্যক্তিত্ব লাভ করা যায় :
তাক্বওয়াবান বান্দাগণ পার্থিব জীবনে মানুষের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ভালোবাসেন; ফলে ফেরেশতারাও তাদেরকে ভালোবাসে এবং তাদের জন্য দু‘আ করে; ফলে সে দুনিয়াতে অবস্থিত সৎ বান্দাদের কাছেও প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়। কুরআন মাজীদে এসেছে,
﴿بَلٰى مَنْ أَوْفٰى بِعَهْدِه وَاتَّقٰى فَإِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِيْنَ﴾
হ্যাঁ- কেউ তার অঙ্গীকার পূর্ণ করলে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে চললে আল্লাহ মুত্তাক্বীদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান- ৭৬)
﴿اِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمٰنُ وُدًّا﴾
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় অবশ্যই তাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। (সূরা মারইয়াম- ৯৬)
হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللّٰهِ إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالٰى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادٰى جِبْرِيلَ إِنَّ اللهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبَّهٗ فَيُحِبُّهٗ جِبْرِيلُ ثُمَّ يُنَادِي جِبْرِيلُ فِي السَّمَاءِ إِنَّ اللهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ فَيُحِبُّهٗ أَهْلُ السَّمَاءِ وَيُوْضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي أَهْلِ الْأَرْضِ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি; সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন তিনি তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরীল (আঃ) আসমানবাসীকে ডেকে বলেন, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন; সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আসমানবাসী তাকে ভালোবাসেন। আর তার জন্য যমীনে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। [সহীহ বুখারী, হা/৭৪৮৫; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬৪; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৭১০।]
অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أن رَسُولُ اللّٰهِ قَالَ إِذَا أَحَبَّ اللّٰهُ عَبْدًا نَادٰى جِبْرِيْلَ إِنِّىْ أَحْبَبْتُ فُلَانًا فَأَحِبَّهٗ فَيُنَادِىْ فِىْ السَّمَاءِ ثُمَّ تَنْزِلُ لَهُ الْمَحَبَّةُ فْىْ أَهْلِ الْأَرْضِ فَذٰلِكَ قَوْلُ اللهِ ﴿إِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمٰنُ وُدًّا﴾ وَإِذَا أَبْغَضَ اللهُ عَبْدًا نَادٰى جِبْرِيْلَ إِنِّىْ قَدْ أَبْغَضْتُ فُلَانًا فَيُنَادِىْ فِىْ السَّمَاءِ ثُمَّ تَنْزِلُ لَهُ الْبَغْضَاءُ فِى الْأَرْضِ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। (রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন) তখন জিবরীল (আঃ) আসমানে ঘোষণা করেন। অতঃপর আসমানবাসীর মাঝে তার জন্য ভালোবাসা নাযিল করা হয়। আর এ সম্পর্কেই আল্লাহর বাণী- ‘‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে দয়াময় তাদের জন্য সৃষ্টি করবেন ভালোবাসা’’- (সূরা মারিয়াম- ৯৬)। আর যখন আল্লাহ তা‘আলা কোন বান্দার উপর রাগান্বিত হন, তখন জিবরাঈল (আঃ)-কে ডেকে বলেন, আমি অমুকের উপর রাগান্বিত হয়েছি। অতঃপর তিনি আসমানবাসীদের কাছে এটি ঘোষণা করে দেন। তারপর জমিনেও তার উপর ক্রোধ বর্ষিত হয়। [তিরমিযী, হা/৩১৬১; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬৪।]
৬. আল্লাহর সাহায্য লাভ করা যায় :
তাক্বওয়াবান লোকেরা সরাসরি আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা লাভ করে থাকেন। ফলে শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর কখনো কখনো তারা সাময়িকভাবে তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হলেও চূড়ান্তভাবে মুত্তাক্বীরাই বিজয়ী হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَّاعْلَمُوْاۤ اَنَّ اللّٰهَ مَعَ الْمُتَّقِيْنَ﴾
জেনে রেখো! নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাক্বীদের সাথেই রয়েছেন। (সূরা তাওবা- ১২৩)
অপর আয়াতে বলেন,
﴿قَالَ لَا تَخَافَاۤ اِنَّنِيْ مَعَكُمَاۤ اَسْمَعُ وَاَرٰى﴾
তিনি বললেন, তোমরা ভয় করো না, আমি তো তোমাদের সঙ্গে আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি। (সূরা ত্বা-হা- ৪৬)
অর্থাৎ আমি তোমাদের সঙ্গে আছি তোমাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতার দ্বারা। আর আল্লাহর সাহায্য যে কোনভাবে এবং যে কোন সময়ই আসতে পারে। বদরের যুদ্ধে আল্লাহর প্রকাশ্য সাহায্য এর উত্তম উদাহরণ। সুতরাং আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে, মুত্তাক্বীদেরকে অবশ্যই ধৈর্যধারণ করতে হবে।
৭. শত্রুর চক্রান্ত থেকে মুক্তি লাভ করা যায় :
﴿وَاِنْ تَصْبِرُوْا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًاؕ اِنَّ اللهَ بِمَا يَعْمَلُوْنَ مُحِيْطٌ﴾
যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং তাক্বওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু বেষ্টন করে আছেন। (সূরা আলে ইমরান- ১২০)
৮. পার্থিব বিপদাপদ ও সংকট থেকে রক্ষা পাওয়া যায় :
﴿وَاَنْجَيْنَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ﴾
অতঃপর যারা মুমিন ও মুত্তাক্বী ছিল, তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি। (সূরা নামল- ৫৩)
৯. তাদের যে কোন সংকট দূর করে দেন :
﴿وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مَخْرَجًا﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার (সংকট থেকে বের হওয়ার) পথ বের করে দেন। (সূরা তালাক্ব- ২)
১০. যাবতীয় কল্যাণ লাভ করা যায় :
তাক্বওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য আকাশ ও জমিনের সকল ধরনের কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তিনি বলেন,
﴿وَلَوْ اَنَّ اَهْلَ الْقُرٰۤى اٰمَنُوْا وَاتَّقُوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَالْاَرْضِ﴾
যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম।
(সূরা আ‘রাফ- ৯৬)
১১. সুসংবাদ লাভ করা যায় :
মুত্তাক্বীগণ আল্লাহর পক্ষ হতে আগত সুসংবাদ পেয়ে ধন্য হয়ে থাকেন। আল্লাহ বলেন,
﴿أَلَاۤ إِنَّ أَوْلِيَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ‐ اَلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ ‐ لَهُمُ الْبُشْرٰى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْاٰخِرَةِ﴾
জেনে রাখো! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। যারা বিশ্বাস করে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে; তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে। (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৪)
অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় হাদীসে এসেছে,
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللّٰهِ عَنْ قَوْلِه تَبَارَكَ وَتَعَالٰى ﴿لَهُمُ الْبُشْرٰى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْاٰخِرَةِ﴾ فَقَالَ هِيَ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ يَرَاهَا الْمُسْلِمُ أَوْ تُرٰى لَهٗ
উবাদাহ ইবনে সামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহর বাণী ‘তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে’- (সূরা ইউনুস- ৬৪) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা হচ্ছে উত্তম স্বপ্ন, যা মুসলিম ব্যক্তি দেখে থাকে অথবা তাকে দেখানো হয়। [ইবনে মাজাহ হা/৪০৩১; তিরমিযী, হা/২২৭৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৭৫৬৬।]
অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ أُمِّ كُرْزٍ الْكَعْبِيَّةِ قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللّٰهِ يَقُولُ ذَهَبَتِ النُّبُوَّةُ وَبَقِيَتِ الْمُبَشِّرَاتُ
উম্মে কুরয আল-কা‘বিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, নবুওয়াত চলে গেছে; তবে সুসংবাদ অবশিষ্ট রয়েছে। [ইবনে মাজাহ হা/৩৮৯৬।]
অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ و إنَّ الرِّسالَةَ والنُّبُوَّةَ قَدِ انْقَطَعَتْ فَلَا رَسُوْلَ بَعْدِيْ ولَا نَبِيَّ ولٰكِنِ المُبَشِّرَاتِ رُؤْيَا الرَّجُلِ الْمُسْلِمِ وَهِيَ جُزْءٌ مِنْ أَجْزَاءِ النُّبُوَّةِ
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রিসালাত ও নবুওয়াত বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং আমার পরে কোন রাসূল নেই, কোন নবীও নেই। অতঃপর তিনি বলেন, সুসংবাদ বাকী আছে। আর তা হলো, মুসলিমদের স্বপ্ন। এটা নবুওয়াতের অংশগুলোর একটি অংশ। [তিরমিযী, হা/২২৭২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮১৭৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৮৫১।]
১২. সন্তান-সন্ততিও অনিষ্টের হাত থেকে রক্ষা পায় :
তাক্বওয়াবান লোকের সন্তান-সন্ততি সকল প্রকার অনিষ্ট হতে আল্লাহর আশ্রয় লাভ করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيْمَيْنِ فِى الْمَدِيْنَةِ وَكَانَ تَحْتَهٗ كَنْزٌ لَّهُمَا وَكَانَ اَبُوْهُمَا صَالِحًا﴾
আর ঐ প্রাচীরটি ছিল নগরবাসীর মধ্যে দু’জন ইয়াতীম কিশোরের, যার নিচে আছে তাদের গুপ্তধন এবং যাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। (সূরা কাহফ- ৮২)
সুতরাং ঐ দুই বালককে ও তাদের সম্পদকে রক্ষা করেছে তাদের পিতার সৎকর্ম।
১৩. পার্থিব জীবনের আযাব থেকে পরিত্রাণ লাভ করা যায় :
আল্লাহ তা‘আলা কিছু কিছু পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করে থাকেন। তবে মুত্তাক্বী বান্দাগণ ঐ শাস্তি থেকে সহজেই পরিত্রাণ লাভ করতে সক্ষম হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনাতেই এর উত্তম উদাহরণ বিদ্যমান। যেমন- সামুদ জাতির ঘটনা বর্ণনায় কুরআন মাজীদে এসেছে,
﴿وَأَمَّا ثَمُوْدُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمٰى عَلَى الْهُدٰى فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُوْنِ بِمَا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ ‐ وَنَجَّيْنَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ﴾
আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে ভ্রান্তপথ অবলম্বন করেছিল। অতঃপর তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানল তাদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ। আমরা উদ্ধার করলাম তাদেরকে যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করত। (সূরা হামীম আস-সাজদা- ১৭, ১৮)
১. অকল্পনীয় উৎস থেকে জীবিকা লাভ হয় :
তাক্বওয়াবান বান্দাগণ তাক্বওয়ার ফলস্বরূপ আল্লাহর পক্ষ হতে এমন উৎস হতে রিযিক লাভ করে থাকে, যে সম্পর্কে সে কল্পনাও করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مَخْرَجًا ‐ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার উপায় বের করে দেন এবং তিনি ঐ ব্যক্তিকে এমন দিক হতে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। (সূরা তালাক্ব- ২, ৩)
অপর আয়াতে তিনি বলেন,
﴿وَأَلَّوِ اسْتَقَامُوْا عَلَى الطَّرِيْقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُمْ مَّآءً غَدَقًا﴾
তারা যদি সত্য পথে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তাদেরকে আমি প্রচুর বারি বর্ষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করতাম। (সূরা জিন- ১৬)
২. সকল কাজকর্ম সহজসাধ্য হয়ে যায় :
যে ব্যক্তি পাপাচার পরিত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় আনুগত্যপূর্ণ কাজ ঐ বান্দার জন্য সহজ করে দেন। তিনি বলেন,
﴿وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مِنْ اَمْرِهٖ يُسْرًا﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার কাজকর্ম সহজ করে দেন। (সূরা তালাক্ব- ৪)
৩. উপকারী জ্ঞান লাভ করা যায় :
যখন কোন বান্দা আল্লাহকে ভয় করে এবং এর ভিত্তিতে সৎকর্ম করার প্রতি মনোযোগী হয়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আর তাকে অনেক উপকারী জ্ঞান দান করেন। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاتَّقُوا اللهَ وَيُعَلِّمُكُمُ اللهُ وَاللهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيْمٌ﴾
তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সবিশেষ অবহিত। (সূরা বাক্বারা- ২৮২)
৪. সূক্ষ্ম ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হওয়া যায় :
এটি আল্লাহ তা‘আলার একটি বিশেষ অনুগ্রহ। আর তাক্বওয়াবান বান্দাদের জন্য এ গুণটি অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় তার পক্ষে দ্বীনের উপর টিকে থাকা খুবই কঠিন। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা তাক্বওয়াবান বান্দাদেরকে এগুণটি দান করেন। যেমন- তিনি বলেন,
﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْاۤ اِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَّكُمْ فُرْقَانًا﴾
হে মুমিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার শক্তি দেবেন। (সূরা আনফাল- ২৯)
৫. উত্তম ব্যক্তিত্ব লাভ করা যায় :
তাক্বওয়াবান বান্দাগণ পার্থিব জীবনে মানুষের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ভালোবাসেন; ফলে ফেরেশতারাও তাদেরকে ভালোবাসে এবং তাদের জন্য দু‘আ করে; ফলে সে দুনিয়াতে অবস্থিত সৎ বান্দাদের কাছেও প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়। কুরআন মাজীদে এসেছে,
﴿بَلٰى مَنْ أَوْفٰى بِعَهْدِه وَاتَّقٰى فَإِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِيْنَ﴾
হ্যাঁ- কেউ তার অঙ্গীকার পূর্ণ করলে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে চললে আল্লাহ মুত্তাক্বীদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান- ৭৬)
﴿اِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمٰنُ وُدًّا﴾
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় অবশ্যই তাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন। (সূরা মারইয়াম- ৯৬)
হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللّٰهِ إِنَّ اللهَ تَبَارَكَ وَتَعَالٰى إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادٰى جِبْرِيلَ إِنَّ اللهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبَّهٗ فَيُحِبُّهٗ جِبْرِيلُ ثُمَّ يُنَادِي جِبْرِيلُ فِي السَّمَاءِ إِنَّ اللهَ قَدْ أَحَبَّ فُلَانًا فَأَحِبُّوهُ فَيُحِبُّهٗ أَهْلُ السَّمَاءِ وَيُوْضَعُ لَهُ الْقَبُولُ فِي أَهْلِ الْأَرْضِ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি; সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। তখন তিনি তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর জিবরীল (আঃ) আসমানবাসীকে ডেকে বলেন, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালোবাসেন; সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আসমানবাসী তাকে ভালোবাসেন। আর তার জন্য যমীনে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। [সহীহ বুখারী, হা/৭৪৮৫; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬৪; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৭১০।]
অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أن رَسُولُ اللّٰهِ قَالَ إِذَا أَحَبَّ اللّٰهُ عَبْدًا نَادٰى جِبْرِيْلَ إِنِّىْ أَحْبَبْتُ فُلَانًا فَأَحِبَّهٗ فَيُنَادِىْ فِىْ السَّمَاءِ ثُمَّ تَنْزِلُ لَهُ الْمَحَبَّةُ فْىْ أَهْلِ الْأَرْضِ فَذٰلِكَ قَوْلُ اللهِ ﴿إِنَّ الَّذِيْنَ اٰمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَيَجْعَلُ لَهُمُ الرَّحْمٰنُ وُدًّا﴾ وَإِذَا أَبْغَضَ اللهُ عَبْدًا نَادٰى جِبْرِيْلَ إِنِّىْ قَدْ أَبْغَضْتُ فُلَانًا فَيُنَادِىْ فِىْ السَّمَاءِ ثُمَّ تَنْزِلُ لَهُ الْبَغْضَاءُ فِى الْأَرْضِ
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন বান্দাকে ভালোবাসেন তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাসো। (রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন) তখন জিবরীল (আঃ) আসমানে ঘোষণা করেন। অতঃপর আসমানবাসীর মাঝে তার জন্য ভালোবাসা নাযিল করা হয়। আর এ সম্পর্কেই আল্লাহর বাণী- ‘‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে দয়াময় তাদের জন্য সৃষ্টি করবেন ভালোবাসা’’- (সূরা মারিয়াম- ৯৬)। আর যখন আল্লাহ তা‘আলা কোন বান্দার উপর রাগান্বিত হন, তখন জিবরাঈল (আঃ)-কে ডেকে বলেন, আমি অমুকের উপর রাগান্বিত হয়েছি। অতঃপর তিনি আসমানবাসীদের কাছে এটি ঘোষণা করে দেন। তারপর জমিনেও তার উপর ক্রোধ বর্ষিত হয়। [তিরমিযী, হা/৩১৬১; সহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৬৪।]
৬. আল্লাহর সাহায্য লাভ করা যায় :
তাক্বওয়াবান লোকেরা সরাসরি আল্লাহর সাহায্য ও সহায়তা লাভ করে থাকেন। ফলে শত্রুরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর কখনো কখনো তারা সাময়িকভাবে তাদের কোন ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হলেও চূড়ান্তভাবে মুত্তাক্বীরাই বিজয়ী হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَّاعْلَمُوْاۤ اَنَّ اللّٰهَ مَعَ الْمُتَّقِيْنَ﴾
জেনে রেখো! নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাক্বীদের সাথেই রয়েছেন। (সূরা তাওবা- ১২৩)
অপর আয়াতে বলেন,
﴿قَالَ لَا تَخَافَاۤ اِنَّنِيْ مَعَكُمَاۤ اَسْمَعُ وَاَرٰى﴾
তিনি বললেন, তোমরা ভয় করো না, আমি তো তোমাদের সঙ্গে আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি। (সূরা ত্বা-হা- ৪৬)
অর্থাৎ আমি তোমাদের সঙ্গে আছি তোমাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতার দ্বারা। আর আল্লাহর সাহায্য যে কোনভাবে এবং যে কোন সময়ই আসতে পারে। বদরের যুদ্ধে আল্লাহর প্রকাশ্য সাহায্য এর উত্তম উদাহরণ। সুতরাং আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে, মুত্তাক্বীদেরকে অবশ্যই ধৈর্যধারণ করতে হবে।
৭. শত্রুর চক্রান্ত থেকে মুক্তি লাভ করা যায় :
﴿وَاِنْ تَصْبِرُوْا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًاؕ اِنَّ اللهَ بِمَا يَعْمَلُوْنَ مُحِيْطٌ﴾
যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং তাক্বওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের চক্রান্ত তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর তোমরা যা কর নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু বেষ্টন করে আছেন। (সূরা আলে ইমরান- ১২০)
৮. পার্থিব বিপদাপদ ও সংকট থেকে রক্ষা পাওয়া যায় :
﴿وَاَنْجَيْنَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ﴾
অতঃপর যারা মুমিন ও মুত্তাক্বী ছিল, তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছি। (সূরা নামল- ৫৩)
৯. তাদের যে কোন সংকট দূর করে দেন :
﴿وَمَنْ يَّتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَّهٗ مَخْرَجًا﴾
যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার (সংকট থেকে বের হওয়ার) পথ বের করে দেন। (সূরা তালাক্ব- ২)
১০. যাবতীয় কল্যাণ লাভ করা যায় :
তাক্বওয়া অবলম্বন করলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য আকাশ ও জমিনের সকল ধরনের কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তিনি বলেন,
﴿وَلَوْ اَنَّ اَهْلَ الْقُرٰۤى اٰمَنُوْا وَاتَّقُوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَالْاَرْضِ﴾
যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করে দিতাম।
(সূরা আ‘রাফ- ৯৬)
১১. সুসংবাদ লাভ করা যায় :
মুত্তাক্বীগণ আল্লাহর পক্ষ হতে আগত সুসংবাদ পেয়ে ধন্য হয়ে থাকেন। আল্লাহ বলেন,
﴿أَلَاۤ إِنَّ أَوْلِيَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ‐ اَلَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ ‐ لَهُمُ الْبُشْرٰى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْاٰخِرَةِ﴾
জেনে রাখো! আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। যারা বিশ্বাস করে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করে; তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে। (সূরা ইউনুস: ৬২-৬৪)
অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় হাদীসে এসেছে,
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ سَأَلْتُ رَسُولَ اللّٰهِ عَنْ قَوْلِه تَبَارَكَ وَتَعَالٰى ﴿لَهُمُ الْبُشْرٰى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْاٰخِرَةِ﴾ فَقَالَ هِيَ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ يَرَاهَا الْمُسْلِمُ أَوْ تُرٰى لَهٗ
উবাদাহ ইবনে সামেত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহর বাণী ‘তাদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পারলৌকিক জীবনে’- (সূরা ইউনুস- ৬৪) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা হচ্ছে উত্তম স্বপ্ন, যা মুসলিম ব্যক্তি দেখে থাকে অথবা তাকে দেখানো হয়। [ইবনে মাজাহ হা/৪০৩১; তিরমিযী, হা/২২৭৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৭৫৬৬।]
অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ أُمِّ كُرْزٍ الْكَعْبِيَّةِ قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللّٰهِ يَقُولُ ذَهَبَتِ النُّبُوَّةُ وَبَقِيَتِ الْمُبَشِّرَاتُ
উম্মে কুরয আল-কা‘বিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, নবুওয়াত চলে গেছে; তবে সুসংবাদ অবশিষ্ট রয়েছে। [ইবনে মাজাহ হা/৩৮৯৬।]
অপর হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ و إنَّ الرِّسالَةَ والنُّبُوَّةَ قَدِ انْقَطَعَتْ فَلَا رَسُوْلَ بَعْدِيْ ولَا نَبِيَّ ولٰكِنِ المُبَشِّرَاتِ رُؤْيَا الرَّجُلِ الْمُسْلِمِ وَهِيَ جُزْءٌ مِنْ أَجْزَاءِ النُّبُوَّةِ
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রিসালাত ও নবুওয়াত বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং আমার পরে কোন রাসূল নেই, কোন নবীও নেই। অতঃপর তিনি বলেন, সুসংবাদ বাকী আছে। আর তা হলো, মুসলিমদের স্বপ্ন। এটা নবুওয়াতের অংশগুলোর একটি অংশ। [তিরমিযী, হা/২২৭২; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮১৭৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৮৫১।]
১২. সন্তান-সন্ততিও অনিষ্টের হাত থেকে রক্ষা পায় :
তাক্বওয়াবান লোকের সন্তান-সন্ততি সকল প্রকার অনিষ্ট হতে আল্লাহর আশ্রয় লাভ করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَاَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَامَيْنِ يَتِيْمَيْنِ فِى الْمَدِيْنَةِ وَكَانَ تَحْتَهٗ كَنْزٌ لَّهُمَا وَكَانَ اَبُوْهُمَا صَالِحًا﴾
আর ঐ প্রাচীরটি ছিল নগরবাসীর মধ্যে দু’জন ইয়াতীম কিশোরের, যার নিচে আছে তাদের গুপ্তধন এবং যাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। (সূরা কাহফ- ৮২)
সুতরাং ঐ দুই বালককে ও তাদের সম্পদকে রক্ষা করেছে তাদের পিতার সৎকর্ম।
১৩. পার্থিব জীবনের আযাব থেকে পরিত্রাণ লাভ করা যায় :
আল্লাহ তা‘আলা কিছু কিছু পাপের শাস্তি দুনিয়াতেই প্রদান করে থাকেন। তবে মুত্তাক্বী বান্দাগণ ঐ শাস্তি থেকে সহজেই পরিত্রাণ লাভ করতে সক্ষম হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ঘটনাতেই এর উত্তম উদাহরণ বিদ্যমান। যেমন- সামুদ জাতির ঘটনা বর্ণনায় কুরআন মাজীদে এসেছে,
﴿وَأَمَّا ثَمُوْدُ فَهَدَيْنَاهُمْ فَاسْتَحَبُّوا الْعَمٰى عَلَى الْهُدٰى فَأَخَذَتْهُمْ صَاعِقَةُ الْعَذَابِ الْهُوْنِ بِمَا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ ‐ وَنَجَّيْنَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا وَكَانُوْا يَتَّقُوْنَ﴾
আর সামূদ সম্প্রদায়ের ব্যাপার তো এই যে, আমি তাদেরকে পথ-নির্দেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা সৎপথের পরিবর্তে ভ্রান্তপথ অবলম্বন করেছিল। অতঃপর তাদেরকে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আঘাত হানল তাদের কৃতকর্মের পরিণামস্বরূপ। আমরা উদ্ধার করলাম তাদেরকে যারা ঈমান এনেছিল এবং যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করত। (সূরা হামীম আস-সাজদা- ১৭, ১৮)