hadith book logo

তাক্বওয়া অর্জনের উপায়

লেখকঃ মোহাম্মদ ইমাম হোসাইন কামরুল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

তাক্বওয়ার উদ্দেশ্য

১. আল্লাহর ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করা :

তাক্বওয়া শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে সচেতন হওয়া বা সতর্ক হওয়া। কথাবার্তা ও কর্মক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত যাবতীয় বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহকে মহাবিশ্বের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, শাস্তিদাতা, পুরস্কারদাতা, আইনদাতা, জীবন-মৃত্যুদাতা হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আর এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, এসব কর্মে তার সাথে অন্য কোন অংশীদার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوْا بِهٖ شَيْئًا﴾

তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে, কোনকিছুকে তাঁর সাথে শরীক করবে না।

(সূরা নিসা- ৩৬)

২. আল্লাহর ক্রোধকে ভয় করা :

তাক্বওয়া বলতে কুরআন মাজীদে কখনো কখনো আল্লাহর ক্রোধ বা রাগের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়সমূহকেও বুঝানো হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে- আল্লাহর ক্রোধকে ভয় করা এবং যেসব কর্মের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা রাগান্বিত হন, সেসব কর্ম সম্পাদন করা থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍۚ وَاتَّقُوا اللهَؕ اِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ ۢبِمَا تَعْمَلُوْنَ﴾

হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। প্রত্যেক মানুষেরই ভেবে দেখা উচিত যে, সে আগামীকালের (কিয়ামতের) জন্য কী পাঠিয়েছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সর্বাধিক অবহিত। (সূরা হাশর- ১৮)

৩. আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করা :

তাক্বওয়া বলতে কুরআন মাজীদে কখনো কখনো আল্লাহর শাস্তির সাথে সম্পর্কিত বিষয়সমূহকেও বুঝানো হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে- দুনিয়াতে আল্লাহর কোন আযাব অথবা পরকালীন জীবনে জাহান্নামের শাস্তিকে ভয় করা। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِيْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ اُعِدَّتْ لِلْكَافِرِيْنَ﴾

তোমরা সেই জাহান্নামকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। এটা তৈরি করা হয়েছে কাফিরদের জন্য। (সূরা বাক্বারা- ২৪)

৪. কিয়ামত দিবসের কঠিন মুহূর্তকে ভয় করা :

তাক্বওয়া শব্দটি কুরআন মাজীদে কখনো কখনো কিয়ামত দিবসকে ভয় করার নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- কিয়ামত দিবসের কঠিন মুহূর্তকে ভয় করা। যেমন- আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَاتَّقُوْا يَوْمًا لَّا تَجْزِيْ نَفْسٌ عَنْ نَّفْسٍ شَيْئًا وَّلَا يُقْبَلُ مِنْهَا عَدْلٌ وَّلَا تَنْفَعُهَا شَفَاعَةٌ وَّلَا هُمْ يُنْصَرُوْنَ﴾

আর তোমরা এমন এক দিনকে ভয় করো, যেদিন কেউ কারো হতে বিন্দুমাত্র উপকৃত হতে পারবে না, কারো নিকট হতে কোন প্রকার বিনিময়ও গ্রহণ করা হবে না, কারো শাফা‘আত (সুপারিশ) কাজে লাগবে না এবং তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। (সূরা বাক্বারা- ১২৩)

﴿قُلْ اِنِّۤيْ اَخَافُ اِنْ عَصَيْتُ رَبِّيْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيْمٍ﴾

বলো, আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্যতা করি, তবে আমি ভয় করি এক মহাদিনের শাস্তির। (সূরা আন‘আম- ১৫)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, অন্যের ইবাদাত করতে আমি ভয় করি এজন্য যে, তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন। [তাফসীরে কুরতুবী ৬/৩৯৭।]

৫. আল্লাহর আনুগত্য করা :

তাক্বওয়া বলতে যেমনিভাবে একদিকে আল্লাহভীতিকে বুঝানো হয়ে থাকে, অনুরূপভাবে আল্লাহভীতি অর্জনের জন্য যা করা প্রয়োজন তথা আল্লাহর আনুগত্য করার প্রতিও তাগিদ প্রদান করে থাকে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে- আল্লাহর আদেশ-নিষেধসমূহ বিনা প্রতিবাদে ও বিনা শর্তে সন্তুষ্টচিত্তে স্বীকার করে নিয়ে তা পালন করা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। যেমন- কুরআন মাজীদে এসেছে,

﴿يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ حَقَّ تُقَاتِه وَلَا تَمُوْتُنَّ اِلَّا وَاَنْتُمْ مُّسْلِمُوْنَ﴾

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আলে ইমরান- ১০২)

অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন,

﴿ يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ ﴾ أَطِيْعُوْا اللهَ ﴿حَقَّ تُقَاتِهٖ﴾ وَحَق َّتُقَاتِهٖ أَنْ يُّطَاعَ فَلَا يَعْصِىْ وَأَنْ يَّشْكُرَ فَلَا يَكْفُرُ وَأَنْ يَّذْكُرَ فَلَا يَنْسٰى وَيُقَالُ أَطِيْعُوْا الله كمَا يَنْبَغِيْ

অর্থাৎ ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো’’ তথা আল্লাহর আনুগত্য করো। আর যথাযথ ভয় বলতে বুঝানো হয়েছে যে, আনুগত্য করা, অতঃপর অবাধ্য না হওয়া; শুকরিয়া আদায় করা, অতঃপর অস্বীকার না করা; (আল্লাহকে) স্মরণ করা, অতঃপর ভুলে না যাওয়া। সুতরাং বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যেরকমভাবে ভয় করা উচিত। [আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ), তানভীরুল মুকাববাস মিন তাফসীরি ইবনি আববাস (রাঃ)।]

৬. অন্তরকে পাপাচার থেকে পবিত্র করা :

তাক্বওয়া শব্দ দ্বারা যেসব কর্মের উদ্দেশ্য নেয়া হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে উপযুক্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে, অন্তরকে পাপাচার থেকে পবিত্র করা। কেননা অন্তর যখন সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হবে, তখন তাতে আল্লাহভীতি প্রবেশ করবে; ফলে সে উত্তম কর্ম সম্পাদনের প্রতি ধাবিত হবে। অবশেষে সে মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হবে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَنْ يُّطِعِ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ وَيَخْشَ اللهَ وَيَتَّقْهِ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الْفَآئِزُوْنَ﴾

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা হতে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম। (সূরা নূর- ৫২)