hadith book logo

অন্তর বিধ্বংসী বিষয় আসক্তি

লেখকঃ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জেদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

শয়তানের কু-মন্ত্রণা থেকে বাচার জন্য সহায়ক ভালো ভাবনা-চিন্তাসমূহ:

১. আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আজমত ও বড়ত্ব, আসমান ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা।

২. ইসলামী শরীয়তের জ্ঞান অর্জন করা। একজন মানুষের জন্য ইলম অর্জন ও জ্ঞানের চর্চা নিয়ে লিপ্ত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অনেক আলেমগণের অবস্থা এমন যে তারা হারাম বা অন্যায় কাজ করার মত কোন সময়ই তাদের থাকে না। কারণ, তারা সবসময় শরীয়তের ইলম ও মুসলিম মিল্লাতের সমস্যা সমাধানের কাজে ব্যস্ত থাকে।

৩. আখিরাত ও তার ভয়াবহতা নিয়ে চিন্তা করা। যেমন, মৃত্যু, কবরের আযাব, হাউজে কাউসার, শাফা‘আত, মীযান, পুলসিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তা করা।

৪. হালাল রুজি উপার্জনের জন্য চিন্তা করা। যেমন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকুরী ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তা ফিকির করতে হবে। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে অবসর সময়গুলোকে ব্যয় করা ও কাজে লাগানোর জন্য ফিকির করা।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, উল্লেখিত সবকিছুকে যদি তুমি লাভ করতে চাও, তবে যে সব জিনিষ তোমার জানা জরুরি সে সব বিষয়গুলো জানতে এবং তা হাসিল করতে তোমার চিন্তাকে ব্যয় করতে হবে। যেমন, তাওহীদ সম্পর্কে তোমার জানতে হবে এবং তার দায়িত্ব কি তা তোমাকে জানতে হবে। মৃত্যুর পর জান্নাতে প্রবেশ নাকি জাহান্নামে প্রবেশ এ বিষয়ে চিন্তা করার মাধ্যমে তোমাকে অবশ্যই সময় ব্যয় করতে হবে। আর খারাপ ও বদ আমলের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করতে হবে এবং তার থেকে বাচার উপায় কি তা নিয়ে তোমাকে ভেবে বের করতে হবে। ইচ্ছা ও দৃঢ়তার বিষয়ে তোমাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যে সব কর্মের ইরাদা করলে তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে তারই ইরাদা করতে হবে। আর যে সব কর্মের ইরাদা তোমার ক্ষতির কারণ হয় তা পরিহার করতে হবে।

আল্লাহ্‌র নেককার বান্দাদের মতে, মানবাত্মার জন্য খেয়ানতের আকাঙ্ক্ষা করা, চিন্তা-ফিকিরকে খিয়ানত বিষয়ে ব্যয় করা, স্বয়ং খিয়ানত হতে অধিক ক্ষতিকর।’ [ইবনুল কাইয়্যেম, আল-ফাওয়ায়েদ: ১৭৬।]

সুতরাং যেহেতু মানুষের অন্তরে সব সময় বিভিন্ন কর্মের উদ্রেক ও চিন্তা জাগ্রত হতেই থাকে, আর তা ধীরে ধীরে ইরাদায় রূপ নেয়। তারপর তা প্রত্যয় ও দৃঢ়তায় রূপ নেয়, তাই প্রতিটি স্তরে তাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, শুধু ভাবনা-চিন্তার পর্যায়ের চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়। আমাদেরকে অবশ্যই ভাবনা-চিন্তার পর্যায় ও পরবর্তী প্রতিটি পর্যায়ের চিকিৎসায় মনোনিবেশ করতে হবে।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, ‘তুমি ভাবনাকে প্রতিহত কর। যদি তা করতে সক্ষম না হও তবে তা চিন্তায় রূপ নেবে। তখন তোমাকে অবশ্যই চিন্তা দূর করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। আর তাও যদি করতে সক্ষম না হও তাহলে তা আসক্তিতে পরিণত হবে। তখন তোমাকে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। আর যদি যুদ্ধ করে তা প্রতিহত করতে না পার তখন তা প্রতিজ্ঞায় রূপ নেবে, তখন তোমাকে তা দূর করার জন্য মরণপণ চেষ্টা করতে হবে। তাতে যদি তুমি ফেল কর, তবে তা বাস্তবে রূপ নেবে এবং কর্মে পরিণত হবে। তারপর যদি তাকে তা বিপরীত কোন ভালো কাজ দ্বারা প্রতিহত না কর, তখন তা তোমার অভ্যাসে পরিণত হবে। তখন তার থেকে ফিরে আসা তোমার জন্য পাহাড়কে জায়গা থেকে সরানোর চেয়েও কঠিন কাজ হবে।’ [আল-ফাওয়ায়েদ: ৩১।]

একটি কথা মনে রাখতে হবে, অন্তরের কু-বাসনাকে সংশোধন করা চিন্তার সংশোধনের চেয়ে অধিক সহজ। আর চিন্তাকে সংশোধন করা ইচ্ছার সংশোধনের চেয়ে অধিক সহজ। আর ইচ্ছার সংশোধন করা খারাপ কর্ম সংশোধন করা হতে সহজ। আর খারাপ কর্ম ঠিক করা অভ্যাস পরিত্যাগ করা হতে সহজ।

যদি তুমি বল কোন জিনিস তোমাকে এ ধরনের কু-মন্ত্রণা ও খারাপ ভাবনা চিন্তাতে গা ভাসিয়ে দেয়া প্রতিহত করতে সাহায্য করবে?

আমরা বলব, এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় সহযোগিতা করবে। যেগুলো একটি অপরটির উপর নির্ভরশীল।

১. এটা ঈমান রাখা ও দৃঢ়ভাবে জানা যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে যে সমস্ত ভাবনা উদিত হয় তা সবই জানেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿يَعۡلَمُ خَآئِنَةَ ٱلۡأَعۡيُنِ وَمَا تُخۡفِي ٱلصُّدُورُ ١٩ ﴾ [ سورة غافر : 19[.

চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন। [সূরা গাফের, আয়াত: ১৯]

﴿وَإِن تَجۡهَرۡ بِٱلۡقَوۡلِ فَإِنَّهُۥ يَعۡلَمُ ٱلسِّرَّ وَأَخۡفَى ٧ ﴾ [ سورة طه : 7[.

“আর যদি তুমি উচ্চস্বরে কথা বল তবে তিনি গোপন ও অতি গোপন বিষয় জানেন।” [সূরা তাহা, আয়াত: ৭]

বান্দা যখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার অন্তরের বিষয়সমূহ জানার কারণে লজ্জা অনুভব করবে, তখন সে তার অন্তরে যে সব কু ভাবনা-চিন্তা জাগ্রত হয়, তা থেকে সে দূরে থাকবে। এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

২. চিন্তা ফিকির করা:

তোমার অন্তরে যখন কু-মন্ত্রণা ও খারাপ চিন্তার উদ্রেক হয়, তখন তুমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বড়ত্ব সম্পর্কে চিন্তা করবে, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নাম ও গুণসমূহকে তোমার অন্তরে হাজির করবে। অন্তরে এ কথা চিন্তা করবে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কঠিন আযাব দাতা, শাস্তি দানকারী ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, শক্তিশালী ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী।

৩. লজ্জাবোধ করা:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুদরত ও তিনি যে আমাদের অন্তরের গোপন বিষয়গুলো জানেন তা বিশ্বাস করার পর তোমাকে অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের থেকে লজ্জা করতে হবে। তুমি খারাপ চিন্তা ও শয়তানী চিন্তা হতে নিজেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করবে। যখন তুমি কোন অপকর্ম করছ, ঠিক তখন যদি তোমার পরিচিত কেউ অথবা তোমার কোন বন্ধু তোমার নিকট প্রবেশ করে তখন তোমার কি অবস্থা হবে তা চিন্তা করে দেখ এবং তুমি কি করবে? মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যিনি তোমাকে দেখছেন তার থেকে লজ্জা করা আরও অধিকতর শ্রেয়।

৪. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বড়ত্ব ও কুদরত সম্পর্কে চিন্তা করা।

৫. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের রহমত হতে বঞ্চিত হওয়া এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে তুমি একেবারে মূল্যহীন ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হওয়ার ভয় করা।

৬. আপন অন্তরের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করা। ফলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহব্বত ছাড়া আর কোন কিছুর মহব্বতকে অন্তরে স্থান না দেয়া বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া।

৭. অন্তরে শয়তানের কু-মন্ত্রণা বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তা অবশিষ্ট ঈমানকে খেয়ে না ফেলে।

৮. মানুষের অন্তরের কু-মন্ত্রণা পাখিকে শিকার করার জন্য নিক্ষিপ্ত দানা-পানির মত। শয়তান তা মানুষের সামনে দানার মত ছিটিয়ে দেয়, যাতে মানুষ তা গ্রহণ করে। শয়তানের প্রতিটি কু-মন্ত্রণাই হল মানুষের জন্য তার ঈমানকে শিকার করার জন্য পেতে রাখা ফাঁদ ও জাল।

৯. মনে রাখতে হবে, শয়তানের কু-মন্ত্রণা কখনোই ঈমানের সাথে একত্র হতে পারে না।

১০. একটি কথা জানতে হবে মানুষের অন্তরে শয়তানের কু-মন্ত্রণা কুল কিনারা হীন সমুদ্রের মত যার কোন শেষ নেই। যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে তার ডুবে মরাটা অনিবার্য।