hadith book logo

ইসলামি আকিদা ও মানবপ্রকৃতি

লেখকঃ সানাউল্লাহ নজির আহমাদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

পার্থিব জগতের স্বার্থ ও প্রয়োজনে আল্লাহর ইচ্ছা এবং আল্লাহর শরী‘আতের স্বার্থ ও প্রয়োজনে আল্লাহর ইচ্ছার পার্থক্য:

এক: শর‘ঈ ইচ্ছার সাথে আল্লার মহব্বত ও সন্তুষ্টি সম্পৃক্ত। পার্থিব ইচ্ছা শুধু আল্লাহর একটি ইচ্ছাই, এর সাথে আল্লাহর মহব্বত ও সন্তুষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন পার্থিব স্বার্থে আল্লাহ কাফেরের কুফুরী, অবাধ্যের নাফরমানির অস্তিত্ব চেয়েছেন, ফলে এগুলো সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ গুলো আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের বিচারে পছন্দনীয় নয়, প্রিয়ও নয়। তবে কি জন্য সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ পাক-পবিত্র, তিনিই ভালো জানেন এর সৃষ্টি রহস্য।

দুই: শর‘ঈ ইচ্ছা কখনো বাস্তবায়ন হয়, যেমন কোনো কাফের ঈমান নিয়ে আসল অথবা কোনো মুমিন আল্লাহর আদেশ পালন করল বা কোনো নিষেধ থেকে বিরত থাকল। আবার কখনো বাস্তবায়ন হয় না, যেমন কোনো মুমিন আল্লাহর আদেশ অমান্য করল বা কোনো কাফের ঈমান প্রত্যাখ্যান করল।

পক্ষান্তরে আল্লাহর পার্থিব ইচ্ছার বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবি। যেমন কোনো জিনিস সৃষ্টি করা বা ধ্বংস করা। বৃষ্টি বর্ষণ, কুফুরী, হত্যা ইত্যাদির সম্পাদন।

তিন: আল্লাহর শর‘ঈ ইচ্ছা শুধু ভালো কাজ ও আনুগত্যের জন্য হয়। যা আল্লাহ পছন্দ করেন, যে জন্য তিনি নির্দেশ দেন এবং যেগুলো পরিত্যাগ করতে নিষেধ করেন। পার্থিব ইচ্ছা ভালো-মন্দ, আনুগত্য-অনানুগত্য উভয়ের শামিল। কারণ, অনেক জিনিস আছে, যেগুলো আল্লাহ তা‘আলা কোনো হিকমতের জন্য সৃষ্টি করেন ঠিক, কিন্তু তা তিনি পছন্দ করেন না, বরং নিয়মানুসারে অপছন্দ করেন। যেমন, কাফেরের কুফরি, যে কারণে শাস্তির উপযুক্তও হবে সে। তদ্রূপ কাফের-মুমিন পরস্পরের মাঝে সংগঠিত পরীক্ষামূলক দ্বন্দ্ব-বিবাদ। যার ভেতর সুপ্ত রয়েছে আল্লাহর বিবিধ হেকমত, অজানা হাজারো রহস্য। পার্থিব ইচ্ছা এবং শর‘ঈ ইচ্ছার সমন্বিত ব্যক্তি-ই ভাগ্যবান, চিরসুখী, অন্যথায় সে হতভাগা, চিরদুখী।

আল্লাহর ইচ্ছাকে দুভাগে বিভক্তি করার কারণ: যেহেতু কুরআন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আল্লাহ তা‘আলা কুফর, ব্যভিচার, অবাধ্যতা, হত্যা ও এ ধরনের যাবতীয় অঘটন, দুর্ঘটনার প্রতি সন্তুষ্ট নন, পছন্দও করেন না, বরং এ থেকে নিষেধ করেন, দূরে থাকতে বলেন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, এতদসত্বেও দুনিয়াতে সবকিছুই সংঘটিত হচ্ছে, মানুষ এগুলো করে যাচ্ছে। আবার এও লক্ষ্য করি, আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে ঈমান গ্রহণ, সালাত কায়েম, যাকাত প্রদানসহ ইত্যাদি নির্দেশ দিচ্ছেন। তারপরও লক্ষ্য করি অনেক মানুষ এর বিরোধিতা করছে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধের পরোয়া করছে না। অতএব আমরা যদি বলি, আল্লাহর আদেশ প্রত্যাখ্যান, তার নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদনও আল্লাহর শর‘ঈ ইচ্ছানুযায়ী হয়, তাহলে তা হবে শরয়িতের দলিল প্রমাণাদির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের সুস্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান। এর বিপরীতে আমরা যদি বলি, তাদের কর্ম আল্লাহর পার্থিব ইচ্ছার বাইরে সম্পাদিত হচ্ছে। যার অর্থ, আল্লাহর ইচ্ছার উপর তাদের ইচ্ছা প্রধান্য লাভ করেছে, জয়ী হয়েছে। আল্লাহর অনিচ্ছা সত্তেও তারা এগুলো সম্পাদনে সক্ষম হচ্ছে। এ আকিদাও সুস্পষ্ট গোমরাহি। সুতরাং আমরা নিশ্চিত যে, গুনাহ ও নাফরমানি আল্লাহর শর‘ঈ ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে সম্পাদন হয় না, বরং এগুলো আল্লাহর পার্থিব স্বার্থজনিত ইচ্ছার প্রতিফলন, যা রোধ করার ক্ষমতা কারো নেই, যার থেকে পলায়ন করারও সুযোগ নেই। আমরা আরেকটি জিনিসও লক্ষ্য করি যে, কুরআন-হাদীসে যা কিছু গোমরাহি ও ভ্রষ্ট বলা হয়েছে, যেমন কুফুরী ও অবাধ্যতা আল্লাহর পার্থিব ইচ্ছার ভিত্তিতেই সংঘটিত হচ্ছে, কোনো না-কোনো হিকমতের কারণে। যে কারণে তিনি প্রশংসার যোগ্য, স্তুতির পাত্র। তাই আমরা পার্থক্য করতে বাধ্য হয়েছি যে, শর‘ঈ ইচ্ছার ভিত্তিতে আল্লাহর পছন্দনীয় বস্তু, যার বাস্তবায়ন তিনি হতে দেন না, যেমন কাফেরের ঈমান, অবাধ্যের আনুগত্য। তদ্রূপ শর‘ঈ ইচছার ভিত্তিতে আল্লাহর অপছন্দনীয় বস্তু, যার বাস্তবায়ন তিনি পার্থিব স্বার্থে করেন, যেমন কাফেরের কুফুরী, অবাধ্যের অবাধ্যতা।

তকদীরের ব্যাপারে সমস্ত প্রশ্ন দূর করার জন্য পার্থিব স্বার্থের ইচ্ছা ও শর‘ঈ স্বার্থের ইচ্ছার ভেতর বিভক্তিকরণ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। তারপরও আল্লাহর তাওফীক প্রাপ্তদের ছাড়া কেউ তকদীর বোঝার ক্ষমতা রাখে না।