hadith book logo

সাহাবীদের পেয়েছি, কিন্তু আহলে-বাইতকে হারাই নি

লেখকঃ আবু খলিফা আলি ইব্‌ন মুহাম্মদ আল-কুদাইবি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

যেভাবে আসুক, যাদু কখনো সফল হয় না

আমাদের ‘কুদাইবিয়াহ’ [কুদাইবিয়াহ বাহরাইনের প্রসিদ্ধ এলাকা, মানামাহ শহরে অবস্থিত। এটাই আমার পূর্বপুরুষের শহর ও তাদের জন্মস্থান। অনেক আগে থেকেই আশপাশের লোকদের তীর্থস্থান হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল এ এলাকা। বিশেষভাবে মুহরিক এলাকার লোকদের জন্য, কারণ তার বায়ূ ও পরিবেশ খুব ভাল। আমার নানা ও বয়স্ক মুরুব্বীদের কাছে এমনি শুনেছি।] এলাকায় জনৈক ব্যক্তি কুরআন-হাদিসের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা ও মানুষের সমস্যার সমাধান করে খুব খ্যাতি অর্জন করে ছিল।

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা গ্রহণ করার পর যখন আমার পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীগণ আমাকে শিয়া ধর্মে ফিরাতে অপারগ হল, তারা আমাকে সংকীর্ণ ও কোণঠাসা করার নিমিত্তে আপত্তিকর অপপ্রচার আরম্ভ করল।

কুদাইবিয়ার এ ভদ্রলোক নিজেই আমার সিদ্ধান্ত থেকে আমাকে ফিরানোর দায়িত্ব নিলো। শিয়াদের নিকট তার জ্ঞান ও নেক আমলের ব্যাপক খ্যাতি। সে আমার কাছে এসে কূটনৈতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বলল: তার পিতা আমার পিতার বন্ধু ছিল, আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।

অতঃপর অন্যান্য আলোচনা আরম্ভ করল। ইতিমধ্যে সে আমার সামনে এলোমেলোভাবে কুরআন খুলল ও অস্পষ্ট উচ্চারণ করল, আমি যা বুঝিনি। অতঃপর বলল: এ আয়াত পড়, আমি পড়লাম। তার ধারণা মোতাবিক সে আয়াত আমাকে আমার অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াতে সতর্ক করছে!!

আমাকে বলল: এ আয়াত রহমত। এ আয়াত তোমার জন্য অতি উত্তম যদি মান। আজ রাতে এ আয়াত তুমি কয়েকবার শ্রবণ করবে। নিশ্চিত এ আয়াত তোমার কল্যাণের বার্তাবাহী!

সত্যিই আমি যখন গাড়িতে ওঠে আমার অডিও ক্যাসেট চালু করি, সে আয়াত শুনতে পাই!

আমি তাকে ডেকে বললাম: আপনি সত্য বলেছেন!

সে মুচকি হেসে বলল: নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেন! যদি তুমি এ আয়াত মান আল্লাহ তোমাকে অধিক তাওফিক দিবেন।

আমি বাড়ি ফিরে যখন আমার টেলিভিশন ওপেন করি, হুবহু সে আয়াত শুনে আঁতকে উঠি!

আমি তার কথা স্মরণ করলাম। দ্রুত ওঠে আমার সংগ্রহে রাখা কুরআন খুললাম, এলোমেলো ভাবেই, এখানেও সে আয়াত দেখে অবাক হলাম!

আমি সে রাতে ঘুমাইনি, তার ভয়ে কিংবা তার কারিশমায় নয়, বরং আমার সামনে বিকশিত সত্য ও আমার ওপর ভর করা ভাবনাতে ডুবে ছিলাম। আমি চিন্তা করে করে ভোর করলাম: “তার কথা কিভাবে সত্য হল?! কিভাবে, কিভাবে আমার সামনে এসব প্রকাশ পেল প্রভৃতি?!”

কয়েক দিন পর অত্র এলাকার আমার এক শিয়া বন্ধুর কথা শুনে আশ্চর্য হলাম, সে বলল: “এ ব্যক্তি তাদেরকে ভবিষ্যৎ বাণী করেছে অতিসত্বর কুদাইবি পূর্বের ন্যায় শিয়া ধর্মে ফিরে আসবে। আমি হাসলাম এবং বললাম: এ লোক গায়েব জানে, না সে যাদুকর?!

এখানে আমার কথায় আমিই ভাবতে শুরু করলাম, নিশ্চয় সে যাদুকর, তার যাদুর ব্যাপারে সন্দেহ কোথায়?!

আমি তার সম্পর্কে আমার বন্ধুর কথা, আমার ও তার আলোচনা এবং বারবার দেখা আয়াতের কারিশমা একসঙ্গে যোগ করলাম।

আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম: সে আমার নিকট কি চায়?

অত্র এলাকার আমার পিতার এক বন্ধুকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন সে নেককার নয় যেমন এলাকার মানুষেরা ধারণা করে, সে জিনের সাথে কাজ করে।

কয়েক দিন যাবৎ সে আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করছে, সে আমার ভাল চায়, তার দৃষ্টিতে আহলে বাইতের অনুসরণে রয়েছে কল্যাণ। আল্লাহ আহলে বাইতকে এসব লোকদের থেকে পবিত্র রাখুন।

আমি তার পরীক্ষা নেয়া ও তার দৌরাত্ম্য দেখার মনস্থ করি। অধিকাংশ মজলিসে আমি তার সাথে তাওহিদ ও শিরকের আলোচনা করি। আমি তাকে যা প্রশ্ন করি ও যে দলিল দেই তার উত্তরে তার অপারগতা প্রকাশ পায়।

একদা সে শিয়া-সুন্নী কতক লোক জমা করল, আমি তাদের সামনে শিরকের আলোচনা আরম্ভ করি। সে রাতে আমার সাথে কৃত তার আমলের বর্ণনা দেই। কোন উত্তর করল না সে, বরং মজলিস থেকে তার ওঠা দেখে সবাই আশ্চর্য হল। এ সুযোগে আমি তার মুখোশ খুলে দিলাম, তার ভণ্ডামী সবার সামনে প্রকাশ হয়ে গেল। তখন আমি আল্লাহর বাণী স্মরণ করলাম:

﴿ وَلَا يُفۡلِحُ ٱلسَّٰحِرُونَ ٧٧ ﴾ [ يونس : ٧٧ ]

“অথচ যাদুকররা সফল হয় না”। [সূরা ইউনুস: (৭৭)] অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে:

﴿ إِنَّ كَيۡدَ ٱلشَّيۡطَٰنِ كَانَ ضَعِيفًا ٧٦ ﴾ [ النساء : ٧٦ ]

“নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল”। [সূরা নিসা: (৭৬)‎]

এতেই ক্ষান্ত হল না, বরং আমার থেকে এলাকার লোকদের দূরে রাখার জন্য তার সব চেষ্টা ব্যয় করল, যেন কেউ আমার কারণে প্রভাবিত না হয়। তার দাবি আমার উদ্দেশ্য অসৎ!

তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হল, মানুষ তার সম্পর্কে জেনে গেল, উল্টো সে লাঞ্ছিত হল। তখন থেকে এলাকায় সে যাদুকর হিসেবে পরিচিতি পেল এবং লজ্জায় বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিল। কারো সাথে সাক্ষাত হলে নিজের কর্মের সাফাই গেয়ে বলে: আমি তার ভালোর জন্য এরূপ করেছি।

আমি বুঝি না তারা কুরআন ও হাদিস থেকে কোথায় বাস করে, অথচ কুরআন-হাদিসে যাদু ও যাদুকর থেকে দূরে থাকার আদেশ করেছে, বরং তার কুফরির ঘোষণা দিয়েছে!! তাদের পক্ষে কিভাবে সম্ভব হল দলিল-প্রমাণের পরিবর্তে যাদু ও কারিশমার আশ্রয় নেয়া?!

আমাদের বর্ণনায় আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বস্তু থেকে হিফাজত থাক”। তারা বলল: কি? তিনি বললেন: “আল্লাহর সাথে শরীক করা ও যাদু...”। [ওসায়েলুশ শিয়াহ: (১৫/৩৩০), বিহারুল আনওয়ার: (৭৮/১১৩)]

ইমাম জাফর সাদেক ‘আলাইহিস সালাম তার দাদা আলি ‘আলাইহিস সালাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: “যে যাদুর কোন শিক্ষা করল, কম কিংবা বেশী, সে কুফরি করল”। [ওসায়েলুশ শিয়াহ: (১৭/১৪৮), বিহারুল আনওয়ার: (৬৭/২১০)]

ইমাম আলি ‘আলাইহিস সালাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোন গণকের নিকট গেল, তাকে জিজ্ঞাসা করল ও তার কথায় বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদের ওপর নাযিলকৃত দীনের সাথে কুফরি করল”। [মুস্তাদরাকুল ওয়াসায়েল: (১৩/১০০)]