hadith book logo

ইসলামের কিছু আলোচিত বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য বিভ্রান্তি

লেখকঃ শাইখ সালেহ ইবন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১

আল্লাহর পথে জিহাদ (الجهاد في سبيل الله)

জিহাদ প্রসঙ্গে প্রদত্ত বক্তব্যে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির জন্য শক্তি ও তার আবশ্যকতা সম্পর্কে একটি আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অনুরূপভাবে ইসলামের প্রকৃতরূপ ও অপারাপর ধর্মসমূহ থেকে তার বিশেষ ভিন্নতা সম্পর্কিত বর্ণনা এবং মুসলিম ‘জাতি’ বা উম্মাতের তাৎপর্য ও এর সাথে ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের নিকট প্রচলিত ‘জাতি’র ধারণার পার্থক্য ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে। অতঃপর মনোযোগ আকর্ষণ করা হবে ইসলামে জিহাদের মূলতত্ত্ব এবং এর সাথে শুধু الحرب (যুদ্ধ) অথবা শুধু القتال (মারামারি) শব্দের অর্থের পার্থক্য সম্পর্কে। তারপর আলোচনা করা হবে الجهاد (জিহাদ) শব্দকে তার অর্থ সীমাবদ্ধকারী শব্দ في سبيل الله (আল্লাহর পথে) -এর সাথে সংযুক্ত করার তাৎপর্য সম্পর্কে।

শক্তি:

শক্তি হল একটি প্রশংসনীয় বস্তু ও কাঙ্খিত বিষয়; আর এটা এমন এক বিশেষ গুণের নাম, যার প্রতি মানব আত্মা আকৃষ্ট এবং যাকে মানব আত্মা পছন্দ করে। আর মানুষ যখন দৃঢ়তার সাথে তার কর্মগুলো গ্রহণ করে এবং শক্তিমত্তার সাথে তার কার্যাবলী সমাপ্ত করে ও তার বিষয়সমূহ পরিচালনা করে, তবে সে যা চায় তা যথাযথভাবে করতে সক্ষম হবে; চাই সে শক্তিটা চৈন্তিক শক্তি, জ্ঞানগত শক্তি, অথবা বস্তুগত শক্তি।

সুতরাং শক্তিশালী দেহ, শক্তিশালী মতামত এবং শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব— এ ধরনের সবকিছুই পছন্দনীয় গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত।

আর এটা সর্বজনবিদিত যে, শক্তির ব্যাপারটি তখনই পছন্দনীয় ও উত্তম বলে বিবেচিত হবে, যখন তার ব্যবহার হবে উত্তম পন্থায় এবং সকল মানুষের জন্য উপকারী ক্ষেত্রে।

একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রই পারে তার গাম্ভীর্য ও মর্যাদা রক্ষা করতে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই গুণ তার সাথে সম্পৃক্ত থাকে।

আর এটা আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত একটি অন্যতম প্রচলিত নিয়ম, যার উপর জীবন-যাত্রা প্রতিষ্ঠিত; তাই ঐ সত্যে কোন কল্যাণ নেই, যার বাস্তবায়ন নেই; আর ঐ সত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না, যতক্ষণ না তার সাথে এমন শক্তির সংযোজন হবে, যা তার সংরক্ষণ করবে এবং তাকে পরিবেষ্টন করে রাখবে।

আর দুনিয়ার জাতি ও রাষ্ট্রসমূহ স্থান, কাল ও পাত্রভেদে বিভিন্ন পদ্ধতি ও প্রকারে তার শক্তি প্রস্তুত করে যাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের বর্তমান যুগে শক্তির বিভিন্ন প্রকার আবিষ্কৃত হয়েছে; আর উপায়-উপকরণের প্রস্তুতি সকল কল্পনার বাইরে চলে গেছে। এটা হল শক্তি ও তার গুরুত্বের ব্যাপারে ভূমিকা।

আর অপর ভূমিকাটি ইসলাম ও তার অনুসারীদের প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত। অমুসলিমগণ, বিশেষ করে খ্রিষ্টানগণ এবং তাদের পরবর্তীতে পশ্চিমাগণ ইসলামকে ভুল বুঝে যখন ধারণা পোষণ করে যে, ইসলাম হচ্ছে কতগুলো অদৃশ্য বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিক ইবাদাতের সমষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি ধর্ম; ফলে তাদের ধারণা অনুসারে ইসলাম ব্যক্তিগত ব্যাপার মাত্র; আর একজন মানুষ তার ইচ্ছা অনুযায়ী নিজের জন্য আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্ম পছন্দ করবে এবং সে তার পছন্দসই পদ্ধতিতে তার প্রতিপালকের উপাসনা করবে। তাদের নিকট ব্যাপারটি এতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ইসলামের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য অন্যরকম; কেননা তা হল আন্তরিকভাবে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের নাম; আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ বলে বিশ্বাস করা এবং এই বিশ্বাস লালন করা যে, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়, যিনি পরিপূর্ণ গুণাবলী দ্বারা গুণান্বিত এবং সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ও অপরিপূর্ণতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। একই সাথে ইসলাম একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ শরী‘আত তথা বিধানের নাম, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে; নিরাপদ জীবনে ও যুদ্ধ জীবনে; পরিবার-পরিজন, নিকটতম ব্যক্তি ও দূরতম ব্যক্তি, শত্রু ও বন্ধুর সাথে তার আচার-আচরণ; শরী‘আত, বিধিবিধান, আদব-কায়দা ও শিষ্টাচারসহ যত প্রয়োজন রয়েছে তার সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে; আরও অন্তর্ভুক্ত করে রাজনৈতিক, সামাজিক, চারিত্রিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালাসহ দুনিয়ার সকল বিষয় ও বস্তুকে।

আর ইসলামের অনুসারীগণ সমাজবিজ্ঞানীদের মাঝে প্রচলিত ধারণার কোন ‘জাতি’ নয়; কারণ, তাদের মতে ‘জাতি’ অর্থ ‘একটা মানবগোষ্ঠী, যারা তাদের মধ্যকার নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যে পরস্পর একতাবদ্ধ ও সংঘবদ্ধ। পক্ষান্তরে ইসলামের দৃষ্টিতে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই ‘মুসলিম জাতি’ বা উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত, যে ব্যক্তি ইসলামকে দীন হিসেবে গ্রহণ করেছে; সে যে শ্রেণী, বর্ণ, অথবা পূর্ব ও পশ্চিমের যে দেশেরই হোক না কেন।