hadith book logo

ইসলামের কিছু আলোচিত বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য বিভ্রান্তি

লেখকঃ শাইখ সালেহ ইবন আবদুল্লাহ আল-হুমাইদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭

দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই

বিভিন্ন কারণে দীন ও আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি বা বল-প্রয়োগ করা প্রত্যাখ্যাত।

প্রথমত: বল-প্রয়োগের কারণে বাধ্য হয়ে যে ব্যক্তি ঈমান গ্রহণ করে, তার ঈমান তার কোন উপকারে আসবে না এবং আখেরাতে এর কোন প্রভাব পড়বে না। ঈমান অবশ্যই হতে হবে পরিতুষ্ট চিত্তে, সত্যিকার বিশ্বাস ও একান্ত আন্ততৃপ্তির ভিত্তিতে।

আল-কুরআনুল কারীমে ফেরাউন সম্পর্কে আলোচনা এসেছে যে, যখন সে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ডুবে যেতে লাগল, তখন সে আল্লাহ তা‘আলাকে রব ও মা‘বুদ বলে ঈমানের ও বিশ্বাসের ঘোষণা দিল; কিন্তু তা তার কোন উপকারে আসে নি। আল-কুরআনের ভাষায়:

﴿ وَجَٰوَزۡنَا بِبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ ٱلۡبَحۡرَ فَأَتۡبَعَهُمۡ فِرۡعَوۡنُ وَجُنُودُهُۥ بَغۡيٗا وَعَدۡوًاۖ حَتَّىٰٓ إِذَآ أَدۡرَكَهُ ٱلۡغَرَقُ قَالَ ءَامَنتُ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱلَّذِيٓ ءَامَنَتۡ بِهِۦ بَنُوٓاْ إِسۡرَٰٓءِيلَ وَأَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ٩٠ ءَآلۡـَٰٔنَ وَقَدۡ عَصَيۡتَ قَبۡلُ وَكُنتَ مِنَ ٱلۡمُفۡسِدِينَ ٩١ ﴾ [ سورة يونس : 90 - 91]

“আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করালাম এবং ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য সহকারে সীমালঙ্ঘন করে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। পরিশেষে যখন সে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল, তখন সে বলল, ‘আমি বিশ্বাস করলাম বনী ইসরাঈল যাতে বিশ্বাস করে: নিশ্চয় তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ এখন! ইতোপূর্বে তো তুমি অমান্য করেছ এবং তুমি অশান্তি সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে!” — (সূরা ইউনুস: ৯০ - ৯১)

আবার অপর এক জাতির ঘটনা বর্ণনায় এসেছে:

﴿ فَلَمَّا رَأَوۡاْ بَأۡسَنَا قَالُوٓاْ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَحۡدَهُۥ وَكَفَرۡنَا بِمَا كُنَّا بِهِۦ مُشۡرِكِينَ ٨٤ فَلَمۡ يَكُ يَنفَعُهُمۡ إِيمَٰنُهُمۡ لَمَّا رَأَوۡاْ بَأۡسَنَاۖ ... ٨٥ ﴾ [ سورة غافر : 84 - 85]

“অতঃপর তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন বলল: আমরা এক আল্লাহতেই ঈমান আনলাম এবং আমরা তাঁর সাথে যাদেরকে শরীক করতাম তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করলাম। তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল, তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে আসল না।” — (সূরা গাফের: ৮৪ - ৮৫)

এমনকি অন্যায়-অপরাধ-গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে না, যতক্ষণ না তা হবে স্বেচ্ছায় এবং সত্য ও দৃঢ় সংকল্পের সাথে।

দ্বিতীয়ত: রাসূলগণ ও তাদের পরবর্তীতে আল্লাহর দীনের দা‘য়ীগণের দায়িত্ব ও কর্তব্য মানুষের নিকট সত্য প্রচার করা এবং সত্যের বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তারা জনগণের হেদায়াত, দীন গ্রহণ ও সত্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে না। সুতরাং মূল দায়িত্ব হলো সত্য প্রচার করা, সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া, উপদেশ দেয়া, সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অন্যায় ও অপকর্ম থেকে নিষেধ করা। তবে হেদায়াতের অনুসারী বানানো ও ঈমান গ্রহণ করানোর দায়িত্ব রাসূলদের বা আল্লাহর দীনের দা‘য়ীদের উপর বর্তায় না।

আর এটি স্বাধীনতার অন্যতম একটি দিককে সুদৃঢ় করে; আর সে দিকটি হচ্ছে: মানুষ তার ও তার স্রষ্টার মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব খবরদারি থেকে মুক্ত। মানুষ ও তার প্রতিপালকের মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি ও মাধ্যমবিহীন; কোনো ব্যক্তিই তাতে কর্তৃত্ব খাটাতে পারে না— হোক সে ব্যক্তি ফেরেশ্‌তা কিংবা নবী!

আল-কুরআনুল কারীমে এ বিষয়ে জোড় দিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকার প্রসঙ্গে এসেছে:

﴿ فَذَكِّرۡ إِنَّمَآ أَنتَ مُذَكِّرٞ ٢١ لَّسۡتَ عَلَيۡهِم بِمُصَيۡطِرٍ ٢٢ ﴾ [ سورة الغاشية : 21 - 22]

“অতএব তুমি উপদেশ দাও; তুমি তো একজন উপদেশদাতা। তুমি তাদের কর্ম-নিয়ন্ত্রক নও।” — (সূরা গাশিয়া: ২১ - ২২)

তৃতীয়ত: মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অবস্থান:

যিম্মী ও অন্যান্য অমুসলিমগণ তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্মীয় বিষয়ে কারও পক্ষ থেকে কোন প্রকার বাধাবিপত্তি ছাড়াই ইসলামী রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বসবাস করে এসেছে। বরং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমনের শুরুর দিকে পারস্পরিক আচার-ব্যবহারের যে কারিকুলাম ও শাসনপদ্ধতি তথা সংবিধান লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাতে এসেছে: “... আর ইয়াহূদীদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আমাদের অনুসরণ করবে, তার জন্য সকল প্রকার সাহায্য, সহযোগিতা ও সান্ত্বনা থাকবে ... ইয়াহূদীগণ তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করবে এবং মুসলিমগণও তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করবে ... সকল প্রতিবেশী একই প্রাণের মত, কেউ কারও ক্ষতিকারী হবে না, অপরাধীও হবে না...।” [দেখুন: সীরাতু ইবনে হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪৯ এবং তারিখু ইবনে কাছীর, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪৬ - ২৪৭] আর তিনি তাদের ধর্ম ও ধন-সম্পদের নিরাপত্তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। একই অবস্থা ছিল নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথেও।

আর পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণও অমুসলিমদের সাথে আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর নীতির অনুসরণ করেছেন। তাঁর খলিফা আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আরহুর পক্ষ থেকে তাঁর কোন এক সেনাপতির প্রতি কথা ছিল: “... তোমরা এমন সম্প্রদায়ের নিকট দিয়ে আসা-যাওয়া করবে, যারা মঠ বা গির্জাসমূহে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করেছে; সুতরাং তোমরা তাদেরকে এবং তারা যে কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করেছে, সে কাজ করার অবকাশ দাও ...।”

আর দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর অন্যতম অসিয়ত ছিল: “... আমি যিম্মীদের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিচ্ছি, তাদের সাথে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দিচ্ছি এবং আরও নির্দেশ দিচ্ছি তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে লড়াই করার। আর তাদের উপর শক্তি ও সামর্থ্যের বাইরে কোন দায়িত্ব চাপিয়ে না দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছি...।”

আর চতুর্থ খলিফা আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর অন্যতম বক্তব্য ছিল: “... যার জন্য আমাদের যিম্মাদারী রয়েছে, তার রক্ত আমাদের রক্তের মত এবং তার রক্তমূল্য আমাদের রক্তমূল্যের মত...”। [দেখুন: নসবুর রায়াত ( نصب الراية ), ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৮১]

আর ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষী, শরী‘আত ও তার অনুসারীগণ ইসলামের ছায়াতলে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীগণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যাতে তারা তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্মের উপর বহাল থাকতে পারে এবং তাদের কোন একজনকেও ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয় নি।

আর দূরবর্তী ও নিকটবর্তী সবার নিকট জানা কথা যে, তাদের সাথে এ ধরনের রক্ষণশীল আচরণ ইসলামী রাষ্ট্রের দুর্বল অবস্থানের কারণে হয় নি, বরং এটা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতি; এমনকি উম্মত যখন শক্তি-সামর্থ্যের শীর্ষে ছিল, তখনও তা মেনে চলা হতো। যদি তারা ব্যক্তির উপর বল প্রয়োগ করে তাদের আকিদা-বিশ্বাস বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দিত, তবে তারা তাতে সক্ষম ছিল, কিন্তু তারা তা করে নি।

চতুর্থত: মুসলিম ব্যক্তি যখন কোন কিতাবী মহিলাকে [আহলে কিতাব তথা কিতাবের অনুসারী ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মানুবর্তী মহিলা। —অনুবাদক।] বিয়ে করবে, তখন সে তাকে তার ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করবে না, বরং তার জন্য তার দীনের উপর অটল থাকার পূর্ণ অধিকার থাকবে এবং স্ত্রী হিসেবে সকল অধিকার সে পুরোপুরি ভোগ করবে।