hadith book logo

ইসলামে দাস বিধি

লেখকঃ আবদুল্লাহ নাসেহ ‘উলওয়ান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

কাফ্ফারা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান:

আর দাস-দাসী মুক্ত করার ক্ষেত্রে শরীয়ত সম্মত উপায়সমূহের মধ্য থেকে এটা একটা অন্যতম মহান উপায়; আল-কুরআনুল কারীম কাফ্ফারা স্বরূপ দাস-দাসী মুক্ত করার জন্য অনেক বিষয়ে বক্তব্য পেশ করেছে, শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড ও প্রকাশ্য এসব গুনাহের মধ্য থেকে কোনো একটিতে মুসলিম ব্যক্তি জড়িয়ে গেলে (তার উপর এই ধরনের কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে)।

আর অধিকাংশ অপরাধ ও শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড এমন, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন ও বাস্তব জীবনকে পরিবেষ্টন করে আছে!! ...

সুতরাং যখন দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়া হবে এসব অপরাধ ক্ষমার অন্যতম উপায়, তখন এর অর্থ হবে- ইসলামী সমাজে দাস-দাসীদের একটা বিরাট সংখ্যার মুক্তির ব্যাপারে ইসলাম দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে !! ...

আপনাদের সামনে আল-কুরআনুল কারীমের বক্তব্যের আলোকে কাফ্ফারার মাধ্যমে দাস-দাসী আযাদ করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় তুলে ধরা হল:

- ভুলবশত হত্যার কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَمَن قَتَلَ مُؤۡمِنًا خَطَ‍ٔٗا فَتَحۡرِيرُ رَقَبَةٖ مُّؤۡمِنَةٖ وَدِيَةٞ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰٓ أَهۡلِهِۦٓ ﴾ [ النساء : ٩٢ ]

“আর কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে এক মুমিন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা কর্তব্য ।” [সূরা আন-নিসা: ৯২]

- যদি এমন সম্প্রদায়ের কাউকে হত্যা করা হয়, যাদের সাথে আমরা পরস্পর অংগীকারাবদ্ধ, তবে সে ক্ষেত্রে হত্যার কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَإِن كَانَ مِن قَوۡمِۢ بَيۡنَكُمۡ وَبَيۡنَهُم مِّيثَٰقٞ فَدِيَةٞ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰٓ أَهۡلِهِۦ وَتَحۡرِيرُ رَقَبَةٖ مُّؤۡمِنَةٖۖ ﴾ [ النساء : ٩٢ ]

“আর যদি সে এমন সম্প্রদায়ভুক্ত হয় যাদের সাথে তোমরা অংগীকারাবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা এবং সাথে মুমিন দাস মুক্ত করা কর্তব্য।” [সূরা আন-নিসা: ৯২]

- ইচ্ছাকৃত শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা; আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:

﴿ ... وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ ٱلۡأَيۡمَٰنَۖ فَكَفَّٰرَتُهُۥٓ إِطۡعَامُ عَشَرَةِ مَسَٰكِينَ مِنۡ أَوۡسَطِ مَا تُطۡعِمُونَ أَهۡلِيكُمۡ أَوۡ كِسۡوَتُهُمۡ أَوۡ تَحۡرِيرُ رَقَبَةٖۖ ...﴾ [ المائ‍دة : ٨٩ ]

“... কিন্তু যেসব শপথ তোমরা ইচ্ছে করে কর, সেগুলোর জন্য তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। তারপর এর কাফ্ফারা দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান, যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, বা তাদেরকে বস্ত্রদান, কিংবা একজন দাস মুক্তি ...।” [সূরা আল-মায়িদা: ৮৯]

- যিহারের [যিহার ( الظهار ) হল: স্বামী কর্তৃক তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলা: “তুমি আমার উপর আমার মায়ের পিঠের মত হারাম”। সুতরাং এই শব্দের কারণে তার উপর তার স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, যেমনিভাবে তার উপর তার মা হারাম।] কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা, যখন সে তার শব্দগুলো উচ্চারণ করবে, অতঃপর সেই কথা থেকে ফিরে আসবে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَٱلَّذِينَ يُظَٰهِرُونَ مِن نِّسَآئِهِمۡ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُواْ فَتَحۡرِيرُ رَقَبَةٖ مِّن قَبۡلِ أَن يَتَمَآسَّاۚ ... ﴾ [ المجادلة : ٣ ]

“আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তবে একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, ...।” [সূরা আল-মুজাদালা: ৩]

- রমযান মাসে ইচ্ছাকৃত সাওম ভঙ্গের কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে দাস মুক্ত করা, আর এটা সাব্যস্ত হয়েছে সহীহ সুন্নাহর মধ্যে।

এ ছাড়াও আল-কুরআনুল কারীম নির্দেশিত আবশ্যকীয় কাফ্ফারাসমূহ ভিন্ন অন্যান্য ব্যাপারে মুসলিম ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদন করা যে কোনো গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য মুস্তাহাব হিসেবে দাস-দাসী মুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে, এই কাজের জন্য একটি বিরাট সংখ্যক দাস-দাসীকে মুক্ত করা সম্ভব: [আরও সুন্দর হয় ভুলজনিত হত্যার কাফ্ফারার প্রতি আমাদের বিশেষ ইঙ্গিত করলে; কারণ, আমরা আলোচনা করেছি যে, তার (ভুলজনিত হত্যার) কাফ্ফারা হলো নিহত ব্যক্তির পরিবারকে রক্তপণ আদায় করা এবং সাথে একজন দাস মুক্ত করা; আর যে নিহত ব্যক্তি ভুলজনিত কারণে নিহত হয়েছে, সে হলো মানব আত্মা, যাকে কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই তার পরিবার-পরিজন হারিয়েছে, যেমনিভাবে হারিয়েছে তার সমাজ।

এই জন্য ইসলাম দুই দিক থেকে তার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছে: তার পরিবারকে রক্তপণ আদায় করার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া; আর একজন মুমিন দাস মুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজকে ক্ষতিপূরণ দান!? কারণ, দাস মুক্ত করে দেওয়ার মানে যেন ভুলজনিত হত্যার মাধ্যমে যে প্রাণটি চলে গেছে, তার বিনিময় স্বরূপ একটি প্রাণকে বাঁচিয়ে দেওয়া।

আর এর উপর ভিত্তি করে ইসলামের দৃষ্টিতে দাসত্ব হলো মৃত্যু অথবা মৃত্যুর সাথে তুলনীয় একটি বিষয়; তা সত্ত্বেও দাস-দাসীকে বেষ্টন করে আছে প্রতিটি নিরাপত্তা বিষয়ক দায়-দায়িত্ব; আর এই জন্যই ইসলাম দাস-দাসীদেরকে (সত্যিকারের) জীবন দানের জন্য তাদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ] [শহীদ সায়্যিদ কুতুব, ‘আনিল ‘আদালত আল-‘ইজতিমা‘য়ীয়্যাহ ফিল ইসলাম ( عن العدالة الاجتماعية في الإسلام ) [ইসলামে সামাজিক ন্যায়নীতি]।]।