১
ইসলামের মৌলিক নীতিমালা
লেখকঃ ড. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস-সুহাইম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৩
ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য; আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের আত্মার যাবতীয় অনিষ্টতা থেকে এবং আমাদের সমস্ত কাজ-কর্মের গুনাহ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি। আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ হিদায়াত করতে পারে না। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তাঁর ওপর রহমত ও অসংখ্য শান্তির ধারা বর্ষণ করুন।
অতঃপর...
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণকে বিশ্ববাসীর নিকট এজন্য প্রেরণ করেছেন, যেন তারা রাসূল আগমনের পরে আল্লাহর দরবারে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে না পারে। আর তিনি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা হিদায়াত, রহমত, আলো এবং রোগমুক্তি। আর ইতোপূর্বে রাসূলগণকে বিশেষভাবে তাদের স্বজাতির নিকট প্রেরণ করা হতো এবং তারাই তাদের কিতাবসমূহকে হিফাযত করতেন। ফলে (তাদের মৃত্যুর পর) তাদের লেখাসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং তাদের শরী‘আতও বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। কারণ তা নির্দিষ্ট একটি জাতির নিকট এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন। তাঁকে তিনি সমস্ত নবী ও রাসূলগণের পরিসমাপ্তকারী ও শেষ নবী বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّۧنَۗ﴾ [ الاحزاب : ٤٠ ]
“মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪০] আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি সর্বোত্তম কিতাব ‘মহান আল কুরআন’ অবতীর্ণ করে তাঁকে সম্মানিত করেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলা নিজেই তার হিফাযতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি এর হিফাযতের দায়িত্ব তাঁর কোনো সৃষ্টিজীবের ওপর ছেড়ে দেননি। যেমন, তিনি বলেন,
﴿إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩﴾ [ الحجر : ٩ ]
“নিশ্চয় আমরা কুরআন [. الذكر দ্বারা উদ্দেশ্য আল-কুরআন।] নাযিল করেছি, আর আমরাই তার হিফাযতকারী।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯] আল্লাহ তা‘আলা তাঁর শরী‘আতকে কিয়ামত অবধি স্থায়ী করেছেন এবং তিনি বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর শরী‘আত অবশিষ্ট থাকার আবশ্যকীয় বিষয়সমূহের মধ্যে হলো- তাঁর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর দিকে আহ্বান করা, তাঁর ওপর ধৈর্যধারণ করা ইত্যাদি। তাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ ও পদ্ধতি এবং তাঁর পরে তাঁর অনুসারীগণের পথ ও পদ্ধতি হলো, জেনে-বুঝে সজ্ঞানে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা। এই পদ্ধতির কথা আল্লাহ তা‘আলা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে বলেন,
﴿قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٠٨﴾ [ يوسف : ١٠٧ ]
“বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০৮]
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর পথে কষ্টের জন্য ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দেন। যেমন, তিনি বলেন,
﴿فَٱصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ أُوْلُواْ ٱلۡعَزۡمِ مِنَ ٱلرُّسُلِ٣٥﴾ [ الاحقاف : ٣٥ ]
“সুতরাং আপনি ধৈর্যধারণ করুন যেমন ধৈর্যধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ।” [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ৩৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱصۡبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٢٠٠﴾ [ ال عمران : ٢٠٠ ]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্যধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক, আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২০০]
মহান আল্লাহ প্রদত্ত এই চিরন্তন পদ্ধতির অনুসরণ করে, আমি তাঁর কিতাব এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে এ গ্রন্থটি আল্লাহর পথে আহ্বানের উদ্দেশ্যে রচনা করি। এতে আমি মহাবিশ্ব সৃষ্টি, মানুষ সৃষ্টি ও তার মর্যাদা, তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ, সাবেক ধর্মগুলোর অবস্থা ইত্যাদি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি। অতঃপর ইসলামের অর্থ এবং রোকনসমূহের পরিচয় তুলে ধরেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি হিদায়াত চায়, তার সামনে এগুলোই তার প্রমাণপঞ্জি। আর যে ব্যক্তি নাজাত বা মুক্তি চায়, তার জন্য আমি সে পথের বিশ্লেষণ করেছি। যারা নবী, রাসূল ও সৎ ব্যক্তিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়, তাদের জন্য পথ এটিই। আর যে ব্যক্তি তা পরিহার করে, সে একান্তই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় এবং সে পথভ্রষ্ট রাস্তার অনুসরণ করে।
প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীগণ, তারা তাদের ধর্মের দিকে মানুষকে আহ্বান করে এবং তারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, অন্যদের তুলনায় হক বা সত্য তাদের সাথেই রয়েছে (অর্থাৎ তারাই একমাত্র সত্যের ওপর রয়েছে)। প্রত্যেক আকীদা-বিশ্বাসী মানুষ অন্য মানুষকে তাদের আকীদা-বিশ্বাসের ধারক-বাহকের আকীদার অনুসরণ এবং তাদের মতাবলম্বী দল নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার দিকে আহ্বান করে।
পক্ষান্তরে কোনো মুসলিম কাউকে তার পথ অনুসরণ করার আহ্বান করে না। কারণ, তার নির্দিষ্ট বা আলাদা কোনো পথ বা আদর্শ নেই। বরং তার দীন তো আল্লাহরই দীন, যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ وَمَا ١٩﴾ [ ال عمران : ١٩ ]
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯] সে কোনো মানুষকে সর্বমহান গণ্য দিকেও আহ্বান করে না। কারণ, আল্লাহর দীনের সামনে সকল মানুষের মর্যাদা সমান। একমাত্র তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ছাড়া তাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বরং একজন মুসলিম মানুষকে তাদের রবের পথে অবলম্বন করতে, তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনতে, আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে শরী‘আত অবতীর্ণ করেছেন এবং সকল মানুষের নিকট তা পৌঁছে দেয়ার আদেশ করেছেন, তা অনুসরণ করার প্রতি আহ্বান করেন।
বস্তুত এ কারণেই আল্লাহর মনোনীত দীন; যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যা দিয়ে তিনি সর্বশেষ রাসূল প্রেরণ করেছেন, তার দিকে মানুষকে আহ্বানের লক্ষ্যে, যে হিদায়াত চায় তাকে পথপ্রদর্শন করা এবং যে মঙ্গল কামনা করে তার জন্য নির্দেশিকাস্বরূপ আমি এই কিতাব রচনা করেছি। আল্লাহর শপথ! একমাত্র এই দীন ব্যতীত কোনো সৃষ্টিকুলই প্রকৃত কল্যাণ বা সুখ পাবে না। আর যে ব্যক্তি রব হিসেবে আল্লাহর ওপর, রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এবং দীন হিসেবে ইসলামের ওপর ঈমান-দৃঢ়বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সে ব্যতীত আর কেউ সত্যিকারের প্রশান্তি পাবে না। অতীত ও বর্তমান যুগে হাজার হাজার ইসলামের সুপথ প্রাপ্তগণ এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করার পরই প্রকৃত জীবন সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করা ছাড়া তারা প্রকৃত সুখ ও কল্যাণের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি।
প্রত্যেক মানুষই কল্যাণের দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রশান্তি অনুসন্ধান করে এবং এবং বাস্তবতা খুঁজে বেড়ায়। তাই আমি এই গ্রন্থ রচনা করেছি, আর আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এই আমলকে নির্ভেজালভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য গ্রহণ করেন এবং তাঁর পথের একজন দা‘ঈ (আহ্বানকারী) হিসেবে গণ্য করেন। তিনি যেন এই কাজটিকে ঐসব সৎ আমলের অন্তর্ভুক্ত করেন, যা তার সম্পাদনকারীকে দুনিয়া ও আখেরাতে উপকার পৌঁছায়।
আর যে বা যারা বইটি ছাপাতে অথবা যেকোনো ভাষাতে অনুবাদ করতে চায়, আমি তাদেরকে এর অনুমতি দিলাম। তবে শর্ত হলো, যে ভাষায় অনুবাদ করা হবে, অনুবাদের ক্ষেত্রে যেন আমানতদারিতা রক্ষা করে। আর আমাকে অনুবাদের এক কপি দিয়ে তিনি যেন আমার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন, যাতে করে তা হতে উপকার লাভ করতে পারি এবং একই পরিশ্রম যেন বারবার না করা হয়।
অনুরূপভাবে আমি আশা করি, যদি কারো কোনো প্রকার মন্তব্য অথবা সংশোধনী থাকে, চাই তা মূল আরবী কিতাব সম্পর্কে হোক অথবা এর যে কোনো ভাষায় অনুবাদিত কিতাব সম্পর্কে হোক, তিনি যেন আমাকে আমার নিম্ন ঠিকানায় পৌঁছে দেন।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ, সর্বোপরে ও সর্বনিকটে। প্রকাশ্যে ও গোপনে, শুরু ও শেষে একমাত্র তাঁরই প্রশংসা। তাঁর জন্য ঐ পরিমাণ প্রশংসা যা আসমানসমূহ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয় এবং আমাদের রব অন্য যা কিছু চান, তা পূর্ণ করে দেন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তাঁর সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তাঁর পথ ও পন্থার ওপর চলে, তাদের সকলের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত অগণিত অসংখ্য সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
লেখক
ড. মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস সুহাইম
রিয়াদ: ১৩/১০/১৪২০ হিজরী
পোষ্ট বক্স ১০৩২ রিয়াদ: ১৩৪২
পোষ্ট বক্স ৬২৪৯, রিয়াদ: ১১৪৪২
অতঃপর...
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণকে বিশ্ববাসীর নিকট এজন্য প্রেরণ করেছেন, যেন তারা রাসূল আগমনের পরে আল্লাহর দরবারে কোনো অজুহাত দাঁড় করাতে না পারে। আর তিনি এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা হিদায়াত, রহমত, আলো এবং রোগমুক্তি। আর ইতোপূর্বে রাসূলগণকে বিশেষভাবে তাদের স্বজাতির নিকট প্রেরণ করা হতো এবং তারাই তাদের কিতাবসমূহকে হিফাযত করতেন। ফলে (তাদের মৃত্যুর পর) তাদের লেখাসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং তাদের শরী‘আতও বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। কারণ তা নির্দিষ্ট একটি জাতির নিকট এবং নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য অবতীর্ণ হয়েছিল।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষভাবে নির্বাচন করেছেন। তাঁকে তিনি সমস্ত নবী ও রাসূলগণের পরিসমাপ্তকারী ও শেষ নবী বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّۧنَۗ﴾ [ الاحزاب : ٤٠ ]
“মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪০] আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রতি সর্বোত্তম কিতাব ‘মহান আল কুরআন’ অবতীর্ণ করে তাঁকে সম্মানিত করেছেন এবং আল্লাহ তা‘আলা নিজেই তার হিফাযতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি এর হিফাযতের দায়িত্ব তাঁর কোনো সৃষ্টিজীবের ওপর ছেড়ে দেননি। যেমন, তিনি বলেন,
﴿إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩﴾ [ الحجر : ٩ ]
“নিশ্চয় আমরা কুরআন [. الذكر দ্বারা উদ্দেশ্য আল-কুরআন।] নাযিল করেছি, আর আমরাই তার হিফাযতকারী।” [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯] আল্লাহ তা‘আলা তাঁর শরী‘আতকে কিয়ামত অবধি স্থায়ী করেছেন এবং তিনি বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর শরী‘আত অবশিষ্ট থাকার আবশ্যকীয় বিষয়সমূহের মধ্যে হলো- তাঁর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর দিকে আহ্বান করা, তাঁর ওপর ধৈর্যধারণ করা ইত্যাদি। তাই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথ ও পদ্ধতি এবং তাঁর পরে তাঁর অনুসারীগণের পথ ও পদ্ধতি হলো, জেনে-বুঝে সজ্ঞানে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করা। এই পদ্ধতির কথা আল্লাহ তা‘আলা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করে বলেন,
﴿قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٠٨﴾ [ يوسف : ١٠٧ ]
“বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০৮]
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর পথে কষ্টের জন্য ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দেন। যেমন, তিনি বলেন,
﴿فَٱصۡبِرۡ كَمَا صَبَرَ أُوْلُواْ ٱلۡعَزۡمِ مِنَ ٱلرُّسُلِ٣٥﴾ [ الاحقاف : ٣٥ ]
“সুতরাং আপনি ধৈর্যধারণ করুন যেমন ধৈর্যধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ।” [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ৩৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱصۡبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٢٠٠﴾ [ ال عمران : ٢٠٠ ]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্যধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাক, আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ২০০]
মহান আল্লাহ প্রদত্ত এই চিরন্তন পদ্ধতির অনুসরণ করে, আমি তাঁর কিতাব এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে এ গ্রন্থটি আল্লাহর পথে আহ্বানের উদ্দেশ্যে রচনা করি। এতে আমি মহাবিশ্ব সৃষ্টি, মানুষ সৃষ্টি ও তার মর্যাদা, তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ, সাবেক ধর্মগুলোর অবস্থা ইত্যাদি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছি। অতঃপর ইসলামের অর্থ এবং রোকনসমূহের পরিচয় তুলে ধরেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি হিদায়াত চায়, তার সামনে এগুলোই তার প্রমাণপঞ্জি। আর যে ব্যক্তি নাজাত বা মুক্তি চায়, তার জন্য আমি সে পথের বিশ্লেষণ করেছি। যারা নবী, রাসূল ও সৎ ব্যক্তিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়, তাদের জন্য পথ এটিই। আর যে ব্যক্তি তা পরিহার করে, সে একান্তই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় এবং সে পথভ্রষ্ট রাস্তার অনুসরণ করে।
প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীগণ, তারা তাদের ধর্মের দিকে মানুষকে আহ্বান করে এবং তারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, অন্যদের তুলনায় হক বা সত্য তাদের সাথেই রয়েছে (অর্থাৎ তারাই একমাত্র সত্যের ওপর রয়েছে)। প্রত্যেক আকীদা-বিশ্বাসী মানুষ অন্য মানুষকে তাদের আকীদা-বিশ্বাসের ধারক-বাহকের আকীদার অনুসরণ এবং তাদের মতাবলম্বী দল নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার দিকে আহ্বান করে।
পক্ষান্তরে কোনো মুসলিম কাউকে তার পথ অনুসরণ করার আহ্বান করে না। কারণ, তার নির্দিষ্ট বা আলাদা কোনো পথ বা আদর্শ নেই। বরং তার দীন তো আল্লাহরই দীন, যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلدِّينَ عِندَ ٱللَّهِ ٱلۡإِسۡلَٰمُۗ وَمَا ١٩﴾ [ ال عمران : ١٩ ]
“নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯] সে কোনো মানুষকে সর্বমহান গণ্য দিকেও আহ্বান করে না। কারণ, আল্লাহর দীনের সামনে সকল মানুষের মর্যাদা সমান। একমাত্র তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ছাড়া তাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। বরং একজন মুসলিম মানুষকে তাদের রবের পথে অবলম্বন করতে, তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনতে, আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে শরী‘আত অবতীর্ণ করেছেন এবং সকল মানুষের নিকট তা পৌঁছে দেয়ার আদেশ করেছেন, তা অনুসরণ করার প্রতি আহ্বান করেন।
বস্তুত এ কারণেই আল্লাহর মনোনীত দীন; যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যা দিয়ে তিনি সর্বশেষ রাসূল প্রেরণ করেছেন, তার দিকে মানুষকে আহ্বানের লক্ষ্যে, যে হিদায়াত চায় তাকে পথপ্রদর্শন করা এবং যে মঙ্গল কামনা করে তার জন্য নির্দেশিকাস্বরূপ আমি এই কিতাব রচনা করেছি। আল্লাহর শপথ! একমাত্র এই দীন ব্যতীত কোনো সৃষ্টিকুলই প্রকৃত কল্যাণ বা সুখ পাবে না। আর যে ব্যক্তি রব হিসেবে আল্লাহর ওপর, রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এবং দীন হিসেবে ইসলামের ওপর ঈমান-দৃঢ়বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সে ব্যতীত আর কেউ সত্যিকারের প্রশান্তি পাবে না। অতীত ও বর্তমান যুগে হাজার হাজার ইসলামের সুপথ প্রাপ্তগণ এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করার পরই প্রকৃত জীবন সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করা ছাড়া তারা প্রকৃত সুখ ও কল্যাণের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি।
প্রত্যেক মানুষই কল্যাণের দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রশান্তি অনুসন্ধান করে এবং এবং বাস্তবতা খুঁজে বেড়ায়। তাই আমি এই গ্রন্থ রচনা করেছি, আর আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনা করছি, তিনি যেন এই আমলকে নির্ভেজালভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য গ্রহণ করেন এবং তাঁর পথের একজন দা‘ঈ (আহ্বানকারী) হিসেবে গণ্য করেন। তিনি যেন এই কাজটিকে ঐসব সৎ আমলের অন্তর্ভুক্ত করেন, যা তার সম্পাদনকারীকে দুনিয়া ও আখেরাতে উপকার পৌঁছায়।
আর যে বা যারা বইটি ছাপাতে অথবা যেকোনো ভাষাতে অনুবাদ করতে চায়, আমি তাদেরকে এর অনুমতি দিলাম। তবে শর্ত হলো, যে ভাষায় অনুবাদ করা হবে, অনুবাদের ক্ষেত্রে যেন আমানতদারিতা রক্ষা করে। আর আমাকে অনুবাদের এক কপি দিয়ে তিনি যেন আমার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন, যাতে করে তা হতে উপকার লাভ করতে পারি এবং একই পরিশ্রম যেন বারবার না করা হয়।
অনুরূপভাবে আমি আশা করি, যদি কারো কোনো প্রকার মন্তব্য অথবা সংশোধনী থাকে, চাই তা মূল আরবী কিতাব সম্পর্কে হোক অথবা এর যে কোনো ভাষায় অনুবাদিত কিতাব সম্পর্কে হোক, তিনি যেন আমাকে আমার নিম্ন ঠিকানায় পৌঁছে দেন।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ, সর্বোপরে ও সর্বনিকটে। প্রকাশ্যে ও গোপনে, শুরু ও শেষে একমাত্র তাঁরই প্রশংসা। তাঁর জন্য ঐ পরিমাণ প্রশংসা যা আসমানসমূহ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয় এবং আমাদের রব অন্য যা কিছু চান, তা পূর্ণ করে দেন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তাঁর সাহাবীগণের ওপর এবং যারা তাঁর পথ ও পন্থার ওপর চলে, তাদের সকলের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত অগণিত অসংখ্য সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
লেখক
ড. মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন সালেহ আস সুহাইম
রিয়াদ: ১৩/১০/১৪২০ হিজরী
পোষ্ট বক্স ১০৩২ রিয়াদ: ১৩৪২
পোষ্ট বক্স ৬২৪৯, রিয়াদ: ১১৪৪২