hadith book logo

কবরের প্রশ্ন ও প্রাসংগিক আলোচনা

লেখকঃ মুহাম্মাদ মুনিরুজ্জামান বিন আশরাফ আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

কবরের প্রথম তিনটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরদাতাকে চতুর্থ যে প্রশ্ন করা হবে - তুমি কিভাবে জানলে?

পূর্বের অধ্যায়গুলো থেকে কুরআন-হাদীসের মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে কবরে বা আলমে বারযাখের জীবনে প্রথম যে প্রশ্ন করা হবে তা হলো, তোমার রব কে? দ্বিতীয় যে প্রশ্ন করা হবে, তোমার দ্বীন কি ছিল? এবং তৃতীয় যে প্রশ্ন করা হবে, তা হলো তোমাদের মাঝে যাকে পাঠানো হয়েছিল তিনি কে? অর্থাৎ তোমার নাবী কে? হাদীস থেকে একথাও জানতে পেরেছি যে সঠিক উত্তরদাতাকে আরেকটি প্রশ্ন করা হবে, এটা তুমি কিভাবে জানলে? বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরদাতা যখন তিনটি প্রশ্নের উত্তরে, আমার রব আল্লাহ, আমার দ্বীন ছিল ইসলাম এবং আমার নাবী মুহাম্মাদ ﷺ তখনই সত্যায়ন চাওয়া হচ্ছে, তুমি এগুলো কিভাবে জানলে। উত্তরে তাকে বলতে হবে, ‘‘আমি আল্লাহর কিতাব পড়ে জেনেছি, সেটাকে বিশ্বাস করেছিলাম এবং সত্য বলে গ্রহণ করেছিলাম।’’ সুতরাং কবরের সওয়াল জওয়াব সবাই দিতে পারবে বিষয়টি এমন নয়। এই হাদীসগুলো থেকে কুরআন বুঝে বুঝে পড়ার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। তাছাড়া আমাদের রব হলেন আল্লাহ, আমাদের দ্বীন হলো ইসলাম এবং আমাদের নাবী ও রসূল হলেন মুহাম্মাদ ﷺ, এই কথাগুলো সত্যি সত্যিই কুরআন থেকে জানা ছাড়া কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। আমরাও কুরআন থেকে এগুলো জেনেছি। কুরআন হলো আমাদের পথ প্রদর্শক। তাছাড়া এই প্রশ্নের হাকিকত হলো শুধু কুরআন থেকে জেনে নিলেই হবে না বরং যে ব্যক্তি কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী তার জীবন পরিচালনা করবেন তিনিই কেবল প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে পারবেন। আর এজন্য কুরআন সম্পর্কে আমাদের ভালভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।কেননা কুরআন আসার আগে রসূল ﷺ নিজেই কিছু জানতেন না। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ اَنْ يُّكَلِّمَهُ اللهُ اِلَّا وَحْيًا اَوْ مِنْ وَّرَاءِ حِجَابٍ اَوْ يُرْسِلَ رَسُوْلًا فَيُوْحِيَ بِاِذْنِه مَا يَشَآءُ اِنَّهٗ عَلِيٌّ حَكِيْمٌ

আর এভাবেই আমি ওহী পাঠিয়েছি তোমার প্রতি রূহকে আমার নির্দেশে, তুমিতো জানতেই না কিতাব কি ও ঈমান কি? আর পক্ষান্তরে আমি একে করেছি এমন আলো, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করি, আর নিশ্চয় তুমি অবশ্যই সরল পথের দিক নির্দেশনা দাও।

(সূরা ৪২/শুরাঃ ৫১)

এখানে বুঝা যাচ্ছে আল্লাহ তা‘আলা রসূল ﷺ †ক কুরআন দিয়েই হিদায়াতের সরল পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ আরো বলেন,

اِنَّ هٰذَا الْقُرْاٰنَ يَهْدِيْ لِلَّتِيْ هِيَ اَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِيْنَ الَّذِيْنَ يَعْمَلُوْنَ الصَّالِحَاتِ اَنَّ لَهُمْ اَجْرًا كَبِيْرًا

নিশ্চয় এই কুরআন এমন একটা পথ দেখিয়ে দেয় যা সবচাইতে সহজ, আর নেককার মুমিনদেরকে এই মর্মে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য আছে মহা পুরস্কার। (সূরা ১৭/বানী ইসরাইলঃ ৯)

فَاسْتَمْسِكْ بِالَّذِيْۤ اُوْحِيَ اِلَيْكَ اِنَّكَ عَلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ - وَاِنَّهٗ لَذِكْرٌ لَّكَ وَلِقَوْمِكَ وَسَوْفَ تُسْاَلُوْنَ

অতএব তোমার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে তাকে তুমি সুদৃঢ়ভাবে ধারণ কর, নিশ্চয় তুমি সরল পথের উপর আছ। আর নিশ্চয় এই কুরআন তোমার ও তোমার জাতির জন্য উপদেশ স্বরূপ আর অচিরেই এ বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (সূরা ৪৩/যুখরূফঃ ৪৩-৪৪)

রসূল ﷺ দ্বীনের ব্যাপারে নিজে থেকে কোন কথা না বলে তার প্রতি যে ওহী করা হয়েছে তাই পড়ে পড়ে শুনাতেন। আল্লাহ বলেন,

لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اِذْ بَعَثَ فِيْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْ عَلَيْهِمْ اٰيَاتِه وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَۚ وَاِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِيْ ضَلَالٍ مُّبِيْنٍ

অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়, যদিও ইতঃপূর্বে তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত ছিল।

(সূরা ৩/আলি ইমরানঃ ১৬৪)

اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَاِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ اٰيَاتُهٗ زَادَتْهُمْ اِيْمَانًا وَّعَلٰى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ

মুমিন তো তারাই, যাদের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে।

(সূরা ৮/আনফালঃ ২)

আরো কয়েকটি আয়াত ও হাদীস গভীরভাবে বুঝে বুঝে পড়লেই যে কোন বুদ্ধিমান শিক্ষিত ব্যক্তিই কুরআন বুঝার গুরুত্ব ও না বুঝার পরিণতি সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারবেন। আল্লাহ বলেনঃ

كِتَابٌ اَنْزَلْنَاهُ اِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْاۤ اٰيَاتِه وَلِيَتَذَكَّرَ اُولُو الْاَلْبَابِ

(কুরআন) এক কল্যাণময় কিতাব, ইহা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা ইহার আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা ৩৮/সোয়াদঃ ২৯)

اَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَ اَمْ عَلٰى قُلُوْبٍ اَقْفَالُهَا

তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা গবেষনা করে না, তাদের হৃদয় কি তালাবদ্ধ। (সূরা ৪৭/মুহাম্মদঃ ২৪)

وَاَنْزَلْنَاۤ اِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ اِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُوْنَ

আর তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছিল, আর যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।

(সূরা ১৬/নাহলঃ ৪৪)

اِنَّ فِيْ ذٰلِكَ لَذِكْرٰى لِمَنْ كَانَ لَهٗ قَلْبٌ اَوْ اَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيْدٌ

নিশ্চয় এতে (কুরআনে) উপদেশ রয়েছে তার জন্য যার আছে (বোধসম্পন্ন) অন্তর কিংবা যে খুব মন দিয়ে শ্রবণ করে। (সূরা ৫০/ক্বফঃ ৩৭)

আবু মালিক আল আশআরী (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, রসূল ﷺ বলেছেন, পবিত্রতা হলো ঈমানের অর্ধেক। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ নেকীর পাল্লাকে ভরে দেয়, এবং ‘‘সুবহানাল্লাহ ওয়াল-হামদুলিল্লাহ’’ আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানে পরিপূর্ণ করে দেয়। সালাত হলো নূর, দান (সাদকা) হলো প্রমাণ, ধৈর্য হলো জ্যোতি আর ‘‘আল কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলিল হবে’’। বস্তুতঃ সকল মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে মুক্ত করে অথবা সে নিজের ধ্বংস সাধন করে।

(মুসলিমঃ ৪২৫)

‘‘আল কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলিল হবে’’রসূল ﷺ এর বাণীটুকুই কুরআন পড়া, বুঝা ও সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার ব্যাপারে যার বিবেক জাগ্রত আছে তার জন্য যথেষ্ট। এ বিষয়ে www.islamhouse.com-এ একটি প্রবন্ধ সহ অনেক প্রবন্ধ আছে। আগ্রহী ব্যক্তিগণ সেখান থেকে পড়ে কুরআন বুঝার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন।