hadith book logo

কবরের প্রশ্ন ও প্রাসংগিক আলোচনা

লেখকঃ মুহাম্মাদ মুনিরুজ্জামান বিন আশরাফ আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ ও রসূল ﷺ এর নির্দেশ

মুসলিমদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের মাধ্যমে বার বার নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং দলে দলে বিভক্ত হতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ

وَاعْتَصِمُوْا بِحَبْلِ اللهِ جَمِيْعًا وَّلَا تَفَرَّقُوْا وَاذْكُرُوْا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ اِذْ كُنْتُمْ اَعْدَآءً فَاَلَّفَ بَيْنَ قُلُوْبِكُمْ فَاَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِه ۤ اِخْوَانًاۚ وَّكُنْتُمْ عَلٰى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنْقَذَكُمْ مِّنْهَاؕ كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمْ اٰيَاتِه لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ

আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়োনা। আর তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালবাসার সঞ্চার করেছেন। অতঃপর তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের কিনারায়, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনাকরেন, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।

(সূরা ৩/আলি ইমরানঃ ১০৩)

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর রজ্জু বলতে ওহী তথা কুরআন-সুন্নাহকে আর দৃঢ়ভাবে ধারণ বলতে কুরআন-হাদীস থেকে জ্ঞান অর্জন করে সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং দলে দলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহর নিয়ামত বলতে ওহীর দ্বারা পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা (দ্বীন ইসলাম) ও রসূল ﷺ †ক পাঠিয়ে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও আমলের পদ্ধতি দেখিয়ে দেয়াকে বুঝিয়েছেন এবং আয়াতের শেষ অংশে বলেছেন যে, তিনি আমাদের জন্য সবকিছু বিস্তারিতভাবে (কুরআন-হাদীসে) বর্ণনা করেছেন যাতে আমরা দিক-বিদিক ছুটোছুটি না করে কুরআন-হাদীস থেকে জ্ঞান অর্জন করি এবং কুরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করে সঠিক পথে চলতে পারি। আল্লাহ আরো বলেন,

وَلَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوْا وَاخْتَلَفُوْا مِنْ ۢبَعْدِ مَا جَآءَهُمُ الْبَيِّنَاتُؕ وَاُولٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيْمٌ

আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পরেও আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠিন আযাব। (সূরা ৩/আলি ইমরানঃ ১০৫)

وَاَنَّ هٰذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيْمًا فَاتَّبِعُوْهُۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيْلِه ؕ ذٰلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِه لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ

আর নিশ্চয় এটাই সরল পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। (সূরা ৬/আনআমঃ ১৫৩)

اِنَّ الَّذِيْنَ فَرَّقُوْا دِيْنَهُمْ وَكَانُوْا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِيْ شَيْءٍؕ اِنَّمَاۤ اَمْرُهُمْ اِلَى اللهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوْا يَفْعَلُوْنَ

নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার কোন দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন। (সূরা ৬/আনআমঃ ১৬০)

وَلَا تَكُوْنُوْا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ (৩১) مِنَ الَّذِيْنَ فَرَّقُوْا دِيْنَهُمْ وَكَانُوْا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ ۢبِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُوْنَ

আর তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো নাযারা নিজেদের দীনকে বিভক্ত করেছে ও যারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ দিয়ে আনন্দিত। (সূরা ৩০/রুমঃ ৩২)

এই আয়াত আল্লাহ তা‘আলা যারা এক অখন্ড আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলামকে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং বিভিন্ন দলে দলে বিভক্ত হয়ে গেছে এবং কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী আকীদা আমল থাকারা পরেও, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত বা রসূল ﷺ ও তার সাহাবীদের মতাদর্শের বিরোধী থাকার পরেও দলের, ব্যক্তির মতাদর্শ নিয়ে সন্তুষ্ট আছে তাদেরকে তিরস্কার করে প্রকৃত দ্বীন ইসলামের অনুসারী তথা সত্যিকারের মুসলিমদেরকে বিভিন্ন দল, মত, পথ, ইজম, মাযহাবে বিভক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত হতে নিষেধ করেছেন। বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য তাফসীরে আহসানুল বায়ান ও তাফসীরে ইবনে কাসীর দেখুন।

يَاۤ اَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا تُوْبُوْاۤ اِلَى اللهِ تَوْبَةً نَّصُوْحًا عَسٰى رَبُّكُمْ اَنْ يُّكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهَارُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللهُ النَّبِيَّ وَالَّذِيْنَ اٰمَنُوْا مَعَهٗ نُوْرُهُمْ يَسْعٰى بَيْنَ اَيْدِيْهِمْ وَبِاَيْمَانِهِمْ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَاۤ اَتْمِمْ لَنَا نُوْرَنَا وَاغْفِرْ لَنَاۤ اِنَّكَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর, খাঁটি তওবা; আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, নাবী ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের নূর তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে সর্বক্ষমতাবান। (সূরা ৬৬/তাহরিমঃ ৮)

রসূল ﷺ ও উম্মতের জন্য এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন যা সহীহ হাদীসে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। এখানে তার কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ উল্লেখ্য করা হলোঃ

 আনাস (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, নাবী ﷺ বলেছেন, তিনটি গুন যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাধ আস্বাদন করতে পারে- (১) আল্লাহ ও তাঁর রসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া, (২) কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসা, এবং (৩) কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপছন্দ করা। (বুখারীঃ ১৫, ২১, ৬০৪১, ৬৯৪১; মুসলিমঃ ৪৩)

 আবু হুরাইরা (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, নাবী ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশ (ইবাদতের মাধ্যমে) সাহায্য চাও।

(বুখারীঃ ৩৯, ৫৬৭৩, ৬৪৬৩, ৭২৩৫)

 নুমান ইবনু বশীর (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি আল্লাহর রসূল ﷺ †ক বলতে শুনেছি, ‘‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু’য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয় হতে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহর সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল ক্বলব (অন্তর)।

(বুখারীঃ ৫২, ২০৫১, মুসলিমঃ ১৫৯৯)

 আবু হুরায়রা (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, রসূল ﷺ বলেছেন, আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে কিন্তু যে অস্বীকার করে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করে। তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে।

(বুখারীঃ ৭২৮০)

যারা আল্লাহর রসূলের সহীহ হাদীসকে জেনে বুঝে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে পরিত্যাগ করে বিভিন্ন দল, মত ও পথের অনুসরন করে তারা আল্লাহর রসূলের অবাধ্য।

 আনাস (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, নাবী ﷺ বলেছেন, তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন কর, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না, মানুষকে সুসংবাদ দাও, বিরক্তি সৃষ্টি করো না। (বুখারীঃ ৬৯, ৬১২৫, মুসলিমঃ ১৭৩৪)

 আলী (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, নাবী ﷺ বলেছেন, তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে যাবে। (বুখারীঃ ১০৬, মুসলিম মুকাদ্দামাঃ হাঃ ২)।

 আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়র (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতা যুবায়র (রদিঃ)কে বললাম, আমি তো আপনাকে অমুক অমুকের মত আল্লাহর রসূল ﷺ এর হাদীস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেন, জেনে রাখ, আমি তাঁর থেকে দূরে থাকিনি, কিন্তু আমি তাকে বলতে শুনেছি, যে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন জাহান্নামে তাঁর ঠিকানা বানিয়ে নিল।

(বুখারীঃ ১০৭, মুসলিম মুকাদ্দামা, হাঃ ৩)

 আনাস (রদিঃ) বর্ণনা করেছেন, এ কথাটি তোমাদের নিকট বহু হাদীস বর্ণনা করতে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় যে, নাবী ﷺ বলেছেন, যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।

(বুখারী ১০৮)।

সুতরাং জাল/জয়ীফ হাদীস ও ইসলামের নামে মুরববী, বুযুর্গ, পীর-মুর্শিদ, ওলী-আওলীয়াদের নামে বানানো কিস্সা, স্বপ্নের কাহিনী ও কারগুজারী বর্ণনা থেকে সাবধান! কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে জ্ঞান অর্জন করুন। সেই অনুযায়ী আমল করুন ও দাওয়াত দিন।

 উমর (রদিঃ) বলেন, তোমরা নেতা হবার পূর্বেই জ্ঞানার্জন করে নাও। আবূ আবদুল্লাহ (বুখারী) বলেন, আর নেতা বানিয়ে দেয়ার পরও, কেননা নাবী ﷺ এর সাহাবীগণ বৃদ্ধ বয়সেও ইলম অর্জন করেছেন। (সহীহুল বুখারী, ৩/১৫ অধ্যায়ঃ ইলম ও হিকমাহ এর ক্ষেত্রে সমতুল্য হবার উৎসাহ)