hadith book logo

ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা

লেখকঃ ড. আবদুল করিম জায়দান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪৭

ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা

অবশ্য একথা মনে রাখতে হবে যে, ব্যক্তির মত পোষণও প্রকাশের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ ও উৎশৃঙ্খল হতে পারে না। বরং সে জন্যে কিছু শর্ত কিছু কিছু নিয়ম-নীতি অবশ্যই রয়েছে। তার আসল শর্ত হলো তার মূলে সদিচ্ছা নিহিত থাকতে হবে। কল্যাণের উদ্দেশ্যই এ অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। আর আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাই হতে হবে তার চরম লক্ষ্য। মত প্রকাশের এ স্বাধীনতা থেকে সামগ্রিক কল্যাণ লাভ করাই উদ্দেশ্য হতে হবে। আর এ শর্ত ইসলাম প্রদত্ত অপরাপর অধিকার ভোগের মতোই অত্যন্ত যুক্তিসংগত। দ্বিতীয় শর্ত এইযে, ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করে নিজের বীরত্ব ও বাহাদুরি জাহির করা চলবে না। চলবে না তা করে অন্যকে হীন প্রমাণ করার চেষ্টা করা। কিংবা অপর কোনো বৈষয়িক স্বার্থ লাভ করার চেষ্টা করা।

তৃতীয় শর্ত এইযে, এ অধিকার ভোগ করার সময় ইসলামের মৌলিক আকীদা ও ইসলামের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা বৈধতার বিরোধীতা করা চলবে না। ইসলামী আকীদা –বিশ্বাস ও জীবনাদর্শের সমালোচনা করা চলবে না এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ইসলামী আদর্শের কোনো দোষ প্রচার করার অধিকার কাউকে দেয়া যেতে পারে না। কেন না এ কাজ মুসলমানকে মুরতাদ বানিয়ে দেয়, সে জন্যে তার শাস্তি হওয়াই বিধেয়। আর চতুর্থ শর্ত এই যে ইসলামের নৈতিক নিয়ম-নীতিকে পূর্ণ মাত্রায় বহাল রাখতে হবে তাকে লঙ্ঘন করা চলবে না। কেউ কাউ গালাগাল করতে পারবে না, মিথ্যা দোষারোপ করতে পারবে না কেউ কারো ওপর। কেননা, সেরূপ করার স্বাধীনতা দেয়ার মানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়। এ পর্যায়ে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র, সরকার ও সরকারী দায়িত্বশীল কর্মচারীদের কাজকর্ম ও চরিত্রে কোনোরূপ অন্যায় দেখতে পেলে তার বিরুদ্ধে কথা বলার ও পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে প্রত্যেকটি নাগরিকের। কিন্তু তাই বলে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রহাত্মাক কথা বলার অধিকার কাউকে দেয়া যেতে পারে না। বিপরীত মতাদর্শের সাথে মতবিরোধ করার অধিকার রয়েছে তার সমালোচনা ও দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা ও যেতে পারে। কিন্তু কারোর সভা-সম্মেলনে গোলযোগ করার অধিকার কারোর থাকতে পারে না। আর যতক্ষণ কেউ বিপরীত মতপোষন করা সত্ত্বে ও কোনোরূপ অশান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি না করবে। ততক্ষণ সরকার ও তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করবে না। ব্যক্তিগত মত পোষণ ও প্রকাশের এই হলো সীমা নির্দেশ। এ সীমা রক্ষা করাই সকল শ্রেণীর নাগরিকদের কর্তব্য। এ পর্যায়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো, হযরত আলী রা: এর খেলাফত আমলে বিরোধী মতাবলম্বী খাওয়ারিজদের প্রতি তাঁর গৃহীত নীতি। তাদের লক্ষ করে খলীফা বলেছিলেনঃ

(আরবী)

“ তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত কোনোরূপ অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি না করবে ততক্ষণ তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই শুরু করবো না। ” নাইলুল আওতার, ৭ম খন্ড ১৫৭ পৃষ্ঠা

বস্তুত বিরোধী মতাবলম্বীরা যতক্ষণ জনগনকে তাদের মত গ্রহনে বলপূর্বক বাদ্য করেত না চাইবে, ততক্ষণ ইসলামী রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর দমন নীতি গ্রহন করবে না ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের কর্তব্য হলো তাদের বুঝানো, ভালো শিক্ষাদানে উপদেশ –নসিহতের মাধ্যমে তাদের মনের পরিবর্তন করতে চেষ্টা করা। খাওয়ারিজদের সম্পর্কে এ নীতিই গৃহীত হয়েছিল। বলা হয়েছে, তারা ইনসাফ পূর্ণ সমাজে বসবাস করা সত্বেও যদি তাদের মতাদর্শ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে রাষ্ট্রর কর্তব্য হলো তাদের মতাদর্শের দোষ-ত্রুটি ও মারাত্মকতা লোকদের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা। তাহলে তারা সে ভুল মত ত্যাগ করে সত্য ও নির্ভুল মতাদর্শ গ্রহন করে সমাজের সাথে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। ইমতাউল আসমা, ১১০ পৃষ্ঠা