hadith book logo

সর্বযুগের বিশ্বস্ত নবী

লেখকঃ কামাল উদ্দিন মোল্লা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

৭। মানব প্রকৃতির অনুকূল:

যখন আমরা বলি এই রিসালত মানব প্রকৃতির বা ফিতরাতের অনুকূল তার অর্থ এই নয় যে পূর্বেকার রিসালত মানব প্রকৃতি বিরোধী অথবা নির্দয়। প্রত্যেক রিসালতেই মূলত আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত (যদিও পরবর্তিতে বিকৃতি করা হয়েছে) তবে পূর্বেকার রিসালতে যেমনটি আগেও আলোচনা হয়েছে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে নির্দিষ্ট কাওম ও নির্দিষ্ট সময়ের প্রতি। এজন্য পূর্বেকার সকল রিসালত আঞ্চলিক ও আংশিক বিষয় প্রতিকার করতো। আর রিসালতে মুহাম্মদী হচ্ছে বিশ্বজনীন রিসালত, সকল কাল সকল যুগ বিস্তৃত। এর আগমন হয়েছে সকল মানুষের সংশোধনের জন্য। কোন শ্রেণী, বর্ণ, ভাষা, কাল ও স্থান নেই। এ জন্য ইহা সর্বাবস্থায় মানব প্রকৃতির সঙ্গে কাজ করে। এই রিসালত যখন আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয় তখনই এ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি রাখা হয়েছিল।

আল্লাহ মানব প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তা, তিনি সবকিছু জানেন কোনটি এর জন্য উপযোগী আর কোনটি অনুপযোগী। এই দ্বীন তিনি অবতীর্ণ করেছেন তার প্রজ্ঞা মত এবং ব্যাখ্যা দিয়েছেন মানুষের শক্তি সামর্থ্যের প্রতি দৃষ্টি রেখে।

فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ( الروم : ৩০(

এটাই আল্লাহর প্রকৃতি যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম।

যতই সময় অতিবাহিত হলো ও মানুষ জাহিলি প্রথা পদ্ধতির দিকে অগ্রসর হলো আল্লাহর পদ্ধতি ছেড়ে, ততই তারা অস্থিরতা ও বিপথে পতিত হলো এবং হচ্ছে। এতে করে এই দ্বীন যে মানব প্রকৃতি উপযোগী দ্বীন, সে রহস্য আরো বেশি স্পষ্ট হলো।

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়মে মানব প্রকৃতিতে কতিপয় ঝোঁক রয়েছে যা গচ্ছিত রাখা হয়েছে মানব প্রকৃতিতে। যাতে মানুষ যথার্থভাবে নির্ধারণ করতে পারে তার উপর অর্পিত ভূ-খন্ডের প্রতিনিধিত্ব বিষয়ে। সে ঝোঁক হলোঃ আহার করা, পান করা, পোষাক পরিধান, বাসস্থান, মালিক হওয়া, নিজেকে প্রতিষ্ঠিতা করণ ইত্যাদি। এই ঝোঁক বা চালিকা শক্তি ভূ-খন্ড আবাদের জন্য প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মানব অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যদি তাহা চলতে থাকে কোন নিয়ম নীতি ছাড়া। তখন প্রকৃতি পরিবর্তিত হবে অবাধ্য প্রবৃত্তির দিকে, মানুষও তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবেনা। অতএব অনুকরণীয় সহনশীল একটি নিয়ম নীতি এই ঝোঁককে যুক্তিকভাবে বৈধতা দিতে পারে একেবারে বাতিলও নয় আবার মূলনীতি ধ্বংস করেও নয়। একই মূহুর্তে তার অবাধ বিচরণও নিয়ন্ত্রণ হবে। তখন স্বভাব প্রকৃতি প্রবৃত্তিতে রূপান্তর হবেনা। অতএব মানুষ ভোগ করতে থাকবে তার জন্য উপকারি বস্তু একই মুহুর্তে তার আচরণ কে একটি সীমা রেখার মধ্যে পরিচালনা করবে যাতে ধ্বংস ও নষ্টের দিকে ধাবিত না হয়।এই কাজটিই করেছে ইসলাম।

ঝোঁক বা চাহিদা কে ইসলাম বৈধ মনে করে। একই সাথে এটাকে পরিমার্জিত করার ও মানব অস্তিত্বের সীমা রেখার মধ্যে থেকে উন্নত করার জন্যও কাজ করে, যেন অবাধ্য প্রবৃত্তির আকার ধারণ না করে। বরং প্রজ্ঞাময় আল্লাহর অংকিত নিয়ম-নীতিতে পরিচালিত কতিপয় উৎসাহ ও আগ্রহ হিসাবে গণ্যহয়।

আল্লাহ বলেন-

تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا ( البقرة : ১৮৭(

এটা হলো আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমা। অতএব, এর কাছেও যেওনা।

تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَعْتَدُوهَا ( البقرة : ২২৯(

এটা হলো আল্লাহ কর্তৃক বেঁধে দেয়া সীমা,কাজেই একে অতিক্রম করোনা।

এ কারণে ইসলাম বৈরাগ্যতাকে সমর্থন করেনা। কারণ এটা স্বভাব প্রবণতাকে নষ্ট ও দমন করে দেয়।

তিন ব্যাক্তির একটি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরে গেলেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইল। যখন তাদেরকে জানানো হলো। তারা নিজেদের ইবাদতকে খুব অল্প মনে করল। অতঃপর একজন বলল আমি সারাবছর রোজ রাখব, রোজা ভঙ্গকরবনা। অপর জন বলল আমি রাত্রি জাগ্রত থেকে ইবাদত করব, ঘুমাবো না, তৃতীয় জন বলল আমি নারীকে বিবাহ করব না। তাদের বিষয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেরে তাদের বললেনঃ আল্লাহর শপথ নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে বেশি ভয়কারী। তবে আমি রোজা পালনকরি, সময়ে খাবারও গ্রহন করি, নামায আদায় করি, ঘুমাই, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। অতএব যে আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করে সে আমার অন্তর্ভূক্ত নয়।

অনুরূপভাবে ইসলাম অবাধ্য প্রবৃতিতে ডুবে যাওয়াকেও সমর্থন করেনা। যা বিশেষ করে প্রচলিত জাহিলিয়াত সৃষ্টি করেছে, যাতে স্বভাব প্রকৃতি ধ্বংস হয়, চরিত্র ধ্বংস হয়, মানুষ পর্যভূষিত হয় পশুত্বে।

আমরা দেখতে পেয়েছি পূর্বের হাদিসে সর্বোত্তম আকৃতিতে ভারসাম্যের প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। বস্তুত জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম এ উদাহরণ পেশ করে।

ভারসাম্যহীনতার একটা উদাহরণ: পশ্চিমা পুঁজিবাদ অনুমোদিত ব্যক্তি মালিকানা, এ মালিকানার কোন সীমা ও নিয়ম নীতি নেই। ফলে তাতে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, অত্যাচার জন্ম হয়। যা পশ্চিমা জগতে বিরাজমান। কমিউনিজম ব্যক্তি মালিকানাকে অস্বীকার করে। এতে ব্যক্তি মালিকানার কোন সুযোগ নেই। ফলে ব্যক্তির প্রেরণা ধ্বংস হয় উৎপাদন সংকুচিত হয়। পরিণতিতে এক সময়কার পৃথিবীর সেরা গম উৎপাদন খামারের মালিক রাশিয়া উৎপাদন অপর্যাপ্ত হওয়ায় আমেরিকা হতে গম আমদানি করতে হয়েছিল এবং এভাবে কমিউনিজম ধ্বংস হলো।

ইসলাম মাঝা মাঝি অবস্থান করে

ইসলাম প্রকৃতির সাথে মিলে অগ্রসর হয়। তাই শুরু থেকেই ব্যক্তি মালিকানা অনুমতি দেয়। যাতে ব্যক্তি আপন প্রেরণায় কাজ করার সুযোগ হয়। এবং কমিউনিজমের মত ব্যক্তি মালিকানাকে দমনও করেনা। বরং একটি আদর্শ নিয়ম নীতি প্রণয়ন করে যা জুলুম ও ফাসাদ থেকে দূরে রাখে। সুদ হারাম করে, মজুত করণ, লুন্ঠন, চুরি, ধোকাবাজি ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে এবং এ অবৈধ পথে সম্পদের মালিক অথবা সম্পদ বৃদ্ধি হারাম ঘোষণা করে। অতঃপর যাকাত ফরজ করে যা সম্পদ বৃদ্ধির সীমা বেঁধে দেয় ও সম্পদে দরিদ্র শ্রেণীকে অংশিদার বানায়। এ হলো এমন কতক নিয়মাবলী যা পশ্চিমা ব্যবস্থার সৃষ্ট চরিত্র ধ্বংস ও সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জুলুম থেকে হেফাজত করে। এভাবে আমরা যদি খুঁজতে থাকি দেখতে পাব মানব জীবনের সকল পর্যায় ধর্ম ও মানব প্রকৃতির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সামঞ্জস্য বিরাজ করছে ইসলামে। এমনিভাবে পথ ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষার দিকনির্দেশনা অথবা ধ্বংসে পতিত মুহুর্তে নিজেকে রক্ষার প্রদ্ধতি রয়েছে এই ইসলামেই। এতে করে স্বভাব প্রকৃতিতে শান্তি ও জীবনে স্থিতি ফিরে পায়।