১
চার ইমামের আকীদাহ - মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান
লেখকঃ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৫
চতুর্থ অধ্যায় ইমাম শাফে‘ইর আকীদাহ তাওহীদ বিষয়ে তার বাণী
ইমাম বাইহাহী রাবী‘ ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর শপথ করে অথবা তার নামসমূহ হতে কোন নাম দ্বারা শপথ করে তারপর সে কসম ভঙ্গ করল, তার ওপর কাফফারাহ ওয়াজিব। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতিত অন্য কিছুর শপথ করে যেমন কোন লোক বলল, কা‘বার কসম, আমার বাপের কসম ইত্যাদি তারপর সে কসম ভঙ্গ করল, তার ওপর কোন কাফফরাহ নেই। অনুরূপভাবে যদি কোন ব্যক্তি বলে, আমার জীবনের কসম, তার ওপর কোন কাফফরাহ নেই। গাইরুল্লাহর নামে শপথ করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী অনুযায়ী মাকরুহ ও নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার কসম খেকে নিষেধ করেছেন। যে ব্যক্তি শপথ করতে চায় সে যেন আল্লাহর নামে শপথ করে অথবা চুপ থাকে।
ইমাম শাফে‘ঈ এর কারণ বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর নামসমূহ মাখলুক নয়। সুতরাং যে আল্লাহর নামের দ্বারা শপথ করল তারপর ভঙ্গ করল, অবশ্যই তাঁর ওপর কাফফারাহ ওয়াজিব।
ইবনুল কাইয়্যিম ‘ইজতিমাউল জুয়ুশ’ নামক গ্রন্থে শাফে‘ঈ হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি যে সুন্নাতের ওপর আছি এবং আমার আহলে হাদীস ভাইদেরকে যে সুন্নাতের উপর দেখেছি ও যাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি যেমন সুফিয়ান, মালেক ও অন্যান্যগণ, তাওহীদের বিষয়ে তাদের মত হলো এই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর স্বীকার করা যে, আল্লাহ স্বীয় আসমানে তার আরশের উপর আছেন। তিনি যেভাবে চান তার মাখলুকের নিকটবর্তী হন। আর আল্লাহ যেভাবে চান দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন।
আর আয-যাহবী আল-মুযানী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছন: আমি বললাম: তাওহীদের বিষয়ে আমার অন্তরে যা রয়েছে এবং যার সাথে আমার অন্তর সম্পৃক্ত হয়েছে তা দূর করার যদি কেউ থাকে, তাহলে তিনি হলেন (ইমাম) শাফে‘ঈ। ফলে আমি তার নিকট গেলাম তখন তিনি মিসরের মসজিদে ছিলেন। যখন আমি তার সামনে বসলাম, বললাম : তাওহীদ বিষয়ে আমার অন্তরে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, আর আমি জানি যে, আপনার জানার মতো আর কেউ জানে না। অতএব (এ বিষয়ে) আপনার ইলম কি? তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। অতঃপর বললেন, তুমি কি জান তুমি কোথায়? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটিই সেই জায়গা যেখানে আল্লাহ ফিরআউনকে ডুবিয়েছেন। তোমার কাছে কি পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, সাহাবীগণ এ বিষয়ে কথা বলেছেন? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, আসমানে কতটি তারকা আছে তুমি জান? আমি বললাম: না। তিনি বললেন: যত নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়েছে তার কয়টির প্রকৃতি ও উদয়-অস্ত জান? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, সৃষ্টির একটি জিনিস তুমি তোমার চোখে দেখ, অথচ তার সম্পর্কে তুমি জান না, অথচ তুমি তার স্রষ্টার ইলম সম্পর্কে কথা বলছো!?
অতঃপর তিনি আমাকে ওযূ সম্পর্কীয় একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে আমি তাতে ভুল করি। তিনি মাসআলাটি চারটি ভাগ করলেন। আমি তার একটিতেও সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। তখন তিনি বললেন, যার প্রতি তুমি দৈনিক পাঁচবার মুখাপেক্ষি হও, তার ইলম রেখে স্রষ্টার ইলম নিয়ে টানাটানি করছ। যখন তোমার অন্তরে এর উদ্রেক হয়, তখন তুমি আল্লাহর বাণীর দিকে ফিরে যাও:আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি অতি দয়াময়, পরম দয়ালু।নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির মধ্যেসূরা আল বাকারাহ : ১৬৩, ১৬৪ সুতরাং মাখলুক দ্বারা খালেকের অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ দাও। আর যেখান তোমার জ্ঞান পৌঁছেনি সে বিষয়ে নিজেকে কষ্টে ফেল না।
ইবনু আব্দুল বারর ইউনুস ইবন আব্দুল আ‘লা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইমাম শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি, যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে বলতে শুনবে নাম এক জিনিষ আর নাম দ্বারা নামকরণকৃত বস্তু আরেক জিনিষ অথবা বলে এ জিনিষটি এ জিনিষ হয় তাহলে তুমি জেনে রাখো যে, সে যিনদীক।
শাফে‘ঈ স্বীয় কিতাব আর-রিসালায় বলেছেন, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য...যিনি তেমনই যেমন তিনি তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। তার মাখলুক তার বিষয়ে যা বর্ণনা করে তিনি তার উর্ধ্বে।
যাহবী সীয়ার গ্রন্থে শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সিফাতগুলো আমরা সাব্যস্ত করব এবং তুলনাকে তার থেকে অসাব্যস্ত করব। যেমনিভাবে তিনি তা নিজের থেকে অসাব্যস্ত করেছেন।“তার মতো কোন কিছু নেই”।আশ-শূরা : ১১।ইবন আব্দুল বার রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি শাফিঈকে আল্লারহ বাণী সম্পর্কে বলতে শুনেছি।কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।আল-মুতাফফিফীন : ১৫
এ দ্বারা আমাদের জানিয়ে দেন যে, সেখানো কতক সম্প্রদায় এমন থাকবে যাদের আড়াল করা হবে না, তারা তার দিকে দেখবেন। তাকে দেখাতে তাদের কোন অসুবিধা হবে না।
লালাকায়ী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন ইদ্রীস আশ-শাফে‘ঈর দরবারে হাযির হলাম। তখন তার কাছে একটি মাটির টুকরা আনা হলো যাতে ছিল: আপনি আল্লাহর বাণী সম্পর্কে কি বলেন?কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।
শাফে‘ঈ বললেন, নারাজির কারণে যেহেতু তাদের আড়াল করা হয়েছে, এতে প্রমাণিত হয় যে সন্তুষ্টির কারণে তারা তাকে দেখবে। রবী‘ বলেন, আমি বললাম, হে আবূ আব্দুল্লাহ আপনি কি এ মত পোষণ করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ এ দ্বারাই আমি আল্লাহর দীনদারি গ্রহণ করি।
ইবন আব্দুল বার হারুদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবরাহীম ইবন ইসমাঈল ইবন উলাইয়্যাহ সম্পর্কে ইমাম শাফে‘ঈর নিকট আলোচনা করা হলে তিনি বলেন, আমি প্রতিটি বিষয়ে তার বিরোধি এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বিষয়েও। সে যা বলে আমি তা বলি না। আমি বলি আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই যিনি পর্দার আড়াল থেকে মূসার সাথে কথা বলেছেন। আর সে বলে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই যিনি কালাম সৃষ্টি করেছেন যা পর্দার আড়াল থেকে তিনি মূসাকে শুনিয়েছেন।
লালাকা’ঈ রাবী‘ ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে যে, কুরআন মাখলুক সে কাফির।
বাইহাকী আবূ মুহাম্মাদ আয-যুবাইরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক লোক শাফে‘ঈকে বলল, আপনি আমাকে কুরআন সম্পর্কে বলুন তা কি স্রষ্টা? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা, না। সে বলল, তাহলে কি সৃষ্টি? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা, না। তাহলে কি গাইরে মাখলুক (অসৃষ্ট)? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা হ্যাঁ। কুরআন যে গাইরে মাখলুক তার ওপর প্রমাণ কি? এ কথা শোনে শাফে‘ঈ মাথা উঁচা করলেন এবং বললেন, তুমি কি স্বীকার কর কুরআন আল্লাহর কালাম, সে বলল, হ্যাঁ। শাফে‘ঈ বললেন, এ বাক্যের মধ্যে বিষয়টি অতিবাহিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে,আত-তাওবাহ : ৫।আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন।আন-নিসা : ১৬৪।
শাফে‘ই বললেন, তুমি কি স্বীকার করো যে, আল্লাহ ছিল এবং তার কালামও ছিল? বা আল্লাহ ছিল কিন্তু তার কালাম ছিল না? লোকটি বলল, বরং আল্লাহ ছিল এবং তার কালামও ছিল। তিনি বলেন, শাফে‘ই মুচকি হাঁসি দিলেন এবং বললেন, হে কূফীগণ, তোমরা আশ্চর্য ধরনের কথা বলো, কারণ তোমরা স্বীকার করো যে, আল্লাহ সবকিছুর পূর্বে ছিলেন এবং তার কথাও ছিল। তাহলে তোমরা এ জাতীয় কথা কোথায় পেলে : কালামই আল্লাহ, অথবা (কালাম) আল্লাহ নন, অথবা (কালাম) গাইরুল্লাহ অথবা (কালাম) আল্লাহকে বাদ দিয়ে? লোকটি চুপ হয়ে গেল এবং বের হয়ে পড়ল।
জুযউল ই‘তিকাদ গ্রন্থ যা শাফে‘ঈর দিকে নিসবত করা হয়ে থাকে—তাতে আবূ তালেব আল আশারী থেকে বর্ণিত—: যার নস হলো, তিনি বলেন: আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে এবং তার প্রতি ঈমান আনয়ন সম্পর্কে শাফে‘ঈকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ তাবারাকা ও তা‘আলার জন্য রয়েছে নামসমূহ ও সিফাতসমূহ, যা নিয়ে নাযিল হয়েছে তার কিতাব এবং যার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহর মাখলুকের মধ্য থেকে যার নিকট প্রমাণ পৌঁছেছে যে, কুরআন এর (অর্থাৎ সিফতা ও নামসমূহের) বর্ণনাসহ নাযিল হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা তার নিকট সহীহভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, যা ইনসাফগার বর্ণনাকারীগণ তার থেকে পরম্পরায় বর্ণনা করেছেন, তার জন্যে তার বিরোধিতা করার কোন সুযোগ নেই। দলীল প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি কেউ তার বিরোধিতা করে সে আল্লাহকে অস্বীকার করল। আর যদি সংবাদ পৌঁছানোর পূর্বে অস্বীকার করে, তাহলে সে না-জানার কারণে ক্ষমা যোগ্য, কারণ তার ইলম গবেষণা ও চিন্তা দ্বারা অর্জন করা সম্ভবপর নয়।
এ ধরনের আল্লাহর আরো সংবাদ দেওয়া যে, তিনি অবশ্যই সর্বশ্রোতা। আর তাঁর জন্য রয়েছে দুটি হাত। কারণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:বরং তাঁর দুই হাত প্রশস্ত।আল-মায়েদাহ : ৬৪এবং তার জন্য রয়েছে ডান হাত, কারণ আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলেন:এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে।আয-যুমার : ৬৭এবং তাঁর জন্য রয়েছে চেহারা, কারণ আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলেন:প্রতিটি বস্তুই ধ্বংস হবে। তবে তার চেহারা ছাড়া।আল-কাসাস : ৮৮এবং তার বাণীআর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা।আর-রহমান : ২৭এবং তাঁর জন্য রয়েছে পা, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:এমনকি রব তাতে তাঁর পা রাখবেন।অর্থাৎ জাহান্নাম (এর ওপর)। কারণ, যে আল্লাহর রাস্তায় মারা গিয়েছে তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনসে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করেছে যে, তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাঁসছেন।আর তিনি প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে সংবাদ দেন। আর তিনি কানা নন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাজ্জালের আলোচনা করেন তখন বলেন:নিশ্চয় সে কানা আর তোমাদের রব কানা নন।আর মু’মিনগণ কিয়ামতের তাদের রবকে স্বচোক্ষে দেখবেন যেমনটি তারা চাঁদকে চৌদ্দ তারিখের রাত্রিতে দেখতে পাবেন এবং তার জন্য রয়েছে আঙ্গুল। রাসূলের কথা দ্বারা প্রমাণিত:এমন কোনো অন্তর নেই যা রহমানের আঙ্গুলসমূহ থেকে দু’আঙ্গুলের মাঝে নেই।আর এসব অর্থ (তথা সিফাত) যদ্বারা আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লা তার নিজের সত্তাকে গুণান্বিত করেছেন এবং যদ্বারা গুণান্বিত করেছেন তাঁকে তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তা ও গবেষণা দ্বারা যথাযথভাবে তা অনুভব করা যায় না এবং এগুলো না-জানার কারণে কাউকে কাফিরও বলা যায় না। তবে তার কাছে সংবাদ পৌঁছার পর, যদি অস্বীকার করে তবে তাকে কাফির বলা যাবে। আর যদি এ বিষয়ে বর্ণিত সংবাদ এমন হয় যা বুঝার ক্ষেত্রে শোনাটাই প্রত্যক্ষ করার স্থলাভিষিক্ত হয় তখন শ্রোতার ওপর তার যথাযথ অর্থ মেনে নেওয়া ও তার ওপর সাক্ষ্য দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যেমনটি সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনল এবং প্রত্যক্ষ করল। তবে আমরা এসব সিফাত সাব্যস্ত করব এবং সাদৃশ্যকে নাকোচ করবো যেমনটি তিনি তার নিজের সত্তা থেকে নাকোচ করেছেন। তিনি বলেন,তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।আশ-শূরা : ১১সর্বশেষ বিশ্বাস
ইমাম শাফে‘ঈ এর কারণ বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর নামসমূহ মাখলুক নয়। সুতরাং যে আল্লাহর নামের দ্বারা শপথ করল তারপর ভঙ্গ করল, অবশ্যই তাঁর ওপর কাফফারাহ ওয়াজিব।
ইবনুল কাইয়্যিম ‘ইজতিমাউল জুয়ুশ’ নামক গ্রন্থে শাফে‘ঈ হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি যে সুন্নাতের ওপর আছি এবং আমার আহলে হাদীস ভাইদেরকে যে সুন্নাতের উপর দেখেছি ও যাদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি যেমন সুফিয়ান, মালেক ও অন্যান্যগণ, তাওহীদের বিষয়ে তাদের মত হলো এই স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর স্বীকার করা যে, আল্লাহ স্বীয় আসমানে তার আরশের উপর আছেন। তিনি যেভাবে চান তার মাখলুকের নিকটবর্তী হন। আর আল্লাহ যেভাবে চান দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন।
আর আয-যাহবী আল-মুযানী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছন: আমি বললাম: তাওহীদের বিষয়ে আমার অন্তরে যা রয়েছে এবং যার সাথে আমার অন্তর সম্পৃক্ত হয়েছে তা দূর করার যদি কেউ থাকে, তাহলে তিনি হলেন (ইমাম) শাফে‘ঈ। ফলে আমি তার নিকট গেলাম তখন তিনি মিসরের মসজিদে ছিলেন। যখন আমি তার সামনে বসলাম, বললাম : তাওহীদ বিষয়ে আমার অন্তরে একটি প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, আর আমি জানি যে, আপনার জানার মতো আর কেউ জানে না। অতএব (এ বিষয়ে) আপনার ইলম কি? তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। অতঃপর বললেন, তুমি কি জান তুমি কোথায়? আমি বললাম: হ্যাঁ। তিনি বললেন, এটিই সেই জায়গা যেখানে আল্লাহ ফিরআউনকে ডুবিয়েছেন। তোমার কাছে কি পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, সাহাবীগণ এ বিষয়ে কথা বলেছেন? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, আসমানে কতটি তারকা আছে তুমি জান? আমি বললাম: না। তিনি বললেন: যত নক্ষত্র সৃষ্টি করা হয়েছে তার কয়টির প্রকৃতি ও উদয়-অস্ত জান? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, সৃষ্টির একটি জিনিস তুমি তোমার চোখে দেখ, অথচ তার সম্পর্কে তুমি জান না, অথচ তুমি তার স্রষ্টার ইলম সম্পর্কে কথা বলছো!?
অতঃপর তিনি আমাকে ওযূ সম্পর্কীয় একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে আমি তাতে ভুল করি। তিনি মাসআলাটি চারটি ভাগ করলেন। আমি তার একটিতেও সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। তখন তিনি বললেন, যার প্রতি তুমি দৈনিক পাঁচবার মুখাপেক্ষি হও, তার ইলম রেখে স্রষ্টার ইলম নিয়ে টানাটানি করছ। যখন তোমার অন্তরে এর উদ্রেক হয়, তখন তুমি আল্লাহর বাণীর দিকে ফিরে যাও:আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি অতি দয়াময়, পরম দয়ালু।নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির মধ্যেসূরা আল বাকারাহ : ১৬৩, ১৬৪ সুতরাং মাখলুক দ্বারা খালেকের অস্তিত্বের ওপর প্রমাণ দাও। আর যেখান তোমার জ্ঞান পৌঁছেনি সে বিষয়ে নিজেকে কষ্টে ফেল না।
ইবনু আব্দুল বারর ইউনুস ইবন আব্দুল আ‘লা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইমাম শাফে‘ঈকে বলতে শুনেছি, যখন তুমি কোন ব্যক্তিকে বলতে শুনবে নাম এক জিনিষ আর নাম দ্বারা নামকরণকৃত বস্তু আরেক জিনিষ অথবা বলে এ জিনিষটি এ জিনিষ হয় তাহলে তুমি জেনে রাখো যে, সে যিনদীক।
শাফে‘ঈ স্বীয় কিতাব আর-রিসালায় বলেছেন, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য...যিনি তেমনই যেমন তিনি তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। তার মাখলুক তার বিষয়ে যা বর্ণনা করে তিনি তার উর্ধ্বে।
যাহবী সীয়ার গ্রন্থে শাফে‘ঈ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সিফাতগুলো আমরা সাব্যস্ত করব এবং তুলনাকে তার থেকে অসাব্যস্ত করব। যেমনিভাবে তিনি তা নিজের থেকে অসাব্যস্ত করেছেন।“তার মতো কোন কিছু নেই”।আশ-শূরা : ১১।ইবন আব্দুল বার রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি শাফিঈকে আল্লারহ বাণী সম্পর্কে বলতে শুনেছি।কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।আল-মুতাফফিফীন : ১৫
এ দ্বারা আমাদের জানিয়ে দেন যে, সেখানো কতক সম্প্রদায় এমন থাকবে যাদের আড়াল করা হবে না, তারা তার দিকে দেখবেন। তাকে দেখাতে তাদের কোন অসুবিধা হবে না।
লালাকায়ী রাবী ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন ইদ্রীস আশ-শাফে‘ঈর দরবারে হাযির হলাম। তখন তার কাছে একটি মাটির টুকরা আনা হলো যাতে ছিল: আপনি আল্লাহর বাণী সম্পর্কে কি বলেন?কখনো নয়, নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে।
শাফে‘ঈ বললেন, নারাজির কারণে যেহেতু তাদের আড়াল করা হয়েছে, এতে প্রমাণিত হয় যে সন্তুষ্টির কারণে তারা তাকে দেখবে। রবী‘ বলেন, আমি বললাম, হে আবূ আব্দুল্লাহ আপনি কি এ মত পোষণ করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ এ দ্বারাই আমি আল্লাহর দীনদারি গ্রহণ করি।
ইবন আব্দুল বার হারুদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবরাহীম ইবন ইসমাঈল ইবন উলাইয়্যাহ সম্পর্কে ইমাম শাফে‘ঈর নিকট আলোচনা করা হলে তিনি বলেন, আমি প্রতিটি বিষয়ে তার বিরোধি এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বিষয়েও। সে যা বলে আমি তা বলি না। আমি বলি আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই যিনি পর্দার আড়াল থেকে মূসার সাথে কথা বলেছেন। আর সে বলে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই যিনি কালাম সৃষ্টি করেছেন যা পর্দার আড়াল থেকে তিনি মূসাকে শুনিয়েছেন।
লালাকা’ঈ রাবী‘ ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, শাফে‘ঈ বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে যে, কুরআন মাখলুক সে কাফির।
বাইহাকী আবূ মুহাম্মাদ আয-যুবাইরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক লোক শাফে‘ঈকে বলল, আপনি আমাকে কুরআন সম্পর্কে বলুন তা কি স্রষ্টা? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা, না। সে বলল, তাহলে কি সৃষ্টি? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা, না। তাহলে কি গাইরে মাখলুক (অসৃষ্ট)? শাফে‘ঈ বললেন, আল্লাহুম্মা হ্যাঁ। কুরআন যে গাইরে মাখলুক তার ওপর প্রমাণ কি? এ কথা শোনে শাফে‘ঈ মাথা উঁচা করলেন এবং বললেন, তুমি কি স্বীকার কর কুরআন আল্লাহর কালাম, সে বলল, হ্যাঁ। শাফে‘ঈ বললেন, এ বাক্যের মধ্যে বিষয়টি অতিবাহিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:আর যদি মুশরিকদের কেউ তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে,আত-তাওবাহ : ৫।আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন।আন-নিসা : ১৬৪।
শাফে‘ই বললেন, তুমি কি স্বীকার করো যে, আল্লাহ ছিল এবং তার কালামও ছিল? বা আল্লাহ ছিল কিন্তু তার কালাম ছিল না? লোকটি বলল, বরং আল্লাহ ছিল এবং তার কালামও ছিল। তিনি বলেন, শাফে‘ই মুচকি হাঁসি দিলেন এবং বললেন, হে কূফীগণ, তোমরা আশ্চর্য ধরনের কথা বলো, কারণ তোমরা স্বীকার করো যে, আল্লাহ সবকিছুর পূর্বে ছিলেন এবং তার কথাও ছিল। তাহলে তোমরা এ জাতীয় কথা কোথায় পেলে : কালামই আল্লাহ, অথবা (কালাম) আল্লাহ নন, অথবা (কালাম) গাইরুল্লাহ অথবা (কালাম) আল্লাহকে বাদ দিয়ে? লোকটি চুপ হয়ে গেল এবং বের হয়ে পড়ল।
জুযউল ই‘তিকাদ গ্রন্থ যা শাফে‘ঈর দিকে নিসবত করা হয়ে থাকে—তাতে আবূ তালেব আল আশারী থেকে বর্ণিত—: যার নস হলো, তিনি বলেন: আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে এবং তার প্রতি ঈমান আনয়ন সম্পর্কে শাফে‘ঈকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ তাবারাকা ও তা‘আলার জন্য রয়েছে নামসমূহ ও সিফাতসমূহ, যা নিয়ে নাযিল হয়েছে তার কিতাব এবং যার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহর মাখলুকের মধ্য থেকে যার নিকট প্রমাণ পৌঁছেছে যে, কুরআন এর (অর্থাৎ সিফতা ও নামসমূহের) বর্ণনাসহ নাযিল হয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা তার নিকট সহীহভাবে সাব্যস্ত হয়েছে, যা ইনসাফগার বর্ণনাকারীগণ তার থেকে পরম্পরায় বর্ণনা করেছেন, তার জন্যে তার বিরোধিতা করার কোন সুযোগ নেই। দলীল প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি কেউ তার বিরোধিতা করে সে আল্লাহকে অস্বীকার করল। আর যদি সংবাদ পৌঁছানোর পূর্বে অস্বীকার করে, তাহলে সে না-জানার কারণে ক্ষমা যোগ্য, কারণ তার ইলম গবেষণা ও চিন্তা দ্বারা অর্জন করা সম্ভবপর নয়।
এ ধরনের আল্লাহর আরো সংবাদ দেওয়া যে, তিনি অবশ্যই সর্বশ্রোতা। আর তাঁর জন্য রয়েছে দুটি হাত। কারণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:বরং তাঁর দুই হাত প্রশস্ত।আল-মায়েদাহ : ৬৪এবং তার জন্য রয়েছে ডান হাত, কারণ আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলেন:এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে।আয-যুমার : ৬৭এবং তাঁর জন্য রয়েছে চেহারা, কারণ আল্লাহ আয্যা ওয়াজাল্লা বলেন:প্রতিটি বস্তুই ধ্বংস হবে। তবে তার চেহারা ছাড়া।আল-কাসাস : ৮৮এবং তার বাণীআর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা।আর-রহমান : ২৭এবং তাঁর জন্য রয়েছে পা, কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:এমনকি রব তাতে তাঁর পা রাখবেন।অর্থাৎ জাহান্নাম (এর ওপর)। কারণ, যে আল্লাহর রাস্তায় মারা গিয়েছে তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনসে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করেছে যে, তিনি তার দিকে তাকিয়ে হাঁসছেন।আর তিনি প্রতি রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে সংবাদ দেন। আর তিনি কানা নন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাজ্জালের আলোচনা করেন তখন বলেন:নিশ্চয় সে কানা আর তোমাদের রব কানা নন।আর মু’মিনগণ কিয়ামতের তাদের রবকে স্বচোক্ষে দেখবেন যেমনটি তারা চাঁদকে চৌদ্দ তারিখের রাত্রিতে দেখতে পাবেন এবং তার জন্য রয়েছে আঙ্গুল। রাসূলের কথা দ্বারা প্রমাণিত:এমন কোনো অন্তর নেই যা রহমানের আঙ্গুলসমূহ থেকে দু’আঙ্গুলের মাঝে নেই।আর এসব অর্থ (তথা সিফাত) যদ্বারা আল্লাহ আযযা ওয়াজাল্লা তার নিজের সত্তাকে গুণান্বিত করেছেন এবং যদ্বারা গুণান্বিত করেছেন তাঁকে তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তা ও গবেষণা দ্বারা যথাযথভাবে তা অনুভব করা যায় না এবং এগুলো না-জানার কারণে কাউকে কাফিরও বলা যায় না। তবে তার কাছে সংবাদ পৌঁছার পর, যদি অস্বীকার করে তবে তাকে কাফির বলা যাবে। আর যদি এ বিষয়ে বর্ণিত সংবাদ এমন হয় যা বুঝার ক্ষেত্রে শোনাটাই প্রত্যক্ষ করার স্থলাভিষিক্ত হয় তখন শ্রোতার ওপর তার যথাযথ অর্থ মেনে নেওয়া ও তার ওপর সাক্ষ্য দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যেমনটি সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনল এবং প্রত্যক্ষ করল। তবে আমরা এসব সিফাত সাব্যস্ত করব এবং সাদৃশ্যকে নাকোচ করবো যেমনটি তিনি তার নিজের সত্তা থেকে নাকোচ করেছেন। তিনি বলেন,তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।আশ-শূরা : ১১সর্বশেষ বিশ্বাস