১
সূরা আত-তাওবার তাফসীর
লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১১
জিযিয়া না দেওয়া পর্যন্ত আহলে কিতাবিদেরকে হত্যা করার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান:
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ قَٰتِلُواْ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ ٱلۡحَقِّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ حَتَّىٰ يُعۡطُواْ ٱلۡجِزۡيَةَ عَن يَدٖ وَهُمۡ صَٰغِرُونَ ٢٩﴾ [ التوبة : ٢٩ ]
“২৯. যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, আর শেষ দিনের প্রতিও না, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা সহকারে স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দেয়।” [সূরা আত-তাওবাহ: ২৯]
তারা যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনে না তখন রাসূলগণের কারও প্রতি আর তারা যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি তাদের বিশুদ্ধ ঈমান টিকে না; বরং তারা তো নিছক তাদের খেয়ালখুশি, তাদের প্রবৃত্তির এবং তাদের বাপ-দাদারা যাতে লিপ্ত ছিল তার অনুসরণ করে; তারা সেগুলোর অনুসরণ এজন্য করে না যে, এগুলো আল্লাহ তা‘আলার আইন এবং তাঁর দীন। কেননা তাদের হাতে যে কিতাব রয়েছে তার প্রতি যদি তারা বিশুদ্ধ রূপে ঈমান আনত তবে তো সেটা তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনার প্রতি দিক নির্দেশনা দিত। কেননা সমস্ত নবীই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন আর তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগমন করেন তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করে অথচ তিনি হচ্ছেন সবচেয়ে সম্মানিত রাসূল। কাজেই বুঝা যাচ্ছে যে, তারা পূর্ববর্তী নবীগণের শরীয়তকে এ হিসেবে আঁকড়ে ধরেনি যে, সেটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এসেছে; বরং তারা তাদের খেয়ালখুশি এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল। ফলে অবশিষ্ট নবীদের প্রতি তাদের ঈমান আনয়ন তাদের কোনো উপকারে আসে নি, তারা তো নবীদের সর্দার, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম, সর্বশেষ ও সবচেয়ে কামেল নবীকে অস্বীকার করেছে। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: قَاتِلُوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلا بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَلا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ “যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, আর শেষ দিনের প্রতিও না, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না”। মুশরিকরা পরাজিত হওয়ার পরে আহলে কিতাবীদের সাথে যুদ্ধের সূচনা করার নির্দেশ প্রদান করে এই সম্মানিত আয়াত অবতীর্ণ হয়, যখন লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করে। আরব উপদ্বীপে যখন স্থিরতা আসে তখন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ইয়াহূদী ও নাসারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেন। এটা ছিল নবম হিজরির ঘটনা। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন আর লোকদেরকেও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। আর তিনি তাদেরকে তাঁর লক্ষ্য ও গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি মদিনার আশে পাশে বিভিন্ন আরব এলাকাসমূহে সৈন্য সংগ্রহের জন্য তাঁর লোক প্রেরণ করেন, তিনি ত্রিশ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করেন, মদীনাবাসী এবং তার আশে পাশের মুনাফিক এবং অন্যান্যরা জিহাদ থেকে পেছনে পড়ে যায়। এটা ছিল দুর্ভিক্ষ এবং প্রচণ্ড গরমের সময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য শামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এমনকি তিনি তাবুক পৌঁছেন, তিনি সেখানে অবতরণ করে পানির উৎসে তাঁবু খাটিয়ে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনায় ফিরে আসার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট ইস্তিখারা (সিদ্ধান্ত পাওয়ার উদ্দেশ্যে সালাত আদায়) করেন। এরপর তিনি ফিরে আসেন। কেননা অবস্থা খুব সংগিন ছিল এবং লোকেরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ সংক্রান্ত বর্ণনা আল্লাহ চাহে তো অচিরেই আসছে।
জিযিয়া হচ্ছে অপমান-অপদস্থ এবং কুফরির নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ “যে পর্যন্ত না তারা স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দেয়” অর্থাৎ যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে عَنْ يَدٍ “স্বেচ্ছায়” অর্থাৎ পরাজিত করে এবং বাধ্য করে وَهُمْ صَاغِرُونَ (বশ্যতা সহকারে) অর্থাৎ তারা অপমানিত-অপদস্থ। এ কারণে জিম্মিদেরকে সম্মান প্রদর্শন করা এবং মুসলিমদের উপরে তুলে ধরার বৈধতা নেই; বরং তারা হীন, সম্মানহীন ও হতভাগা। যেমন, সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে: আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা ইয়াহূদী-খৃষ্টানদেরকে (তাদের পূর্বেই) আগে বেড়ে সালাম দিও না। তাদের কারও সাথে পথে যখন তোমাদের সাক্ষাত হয় তখন তাদেরকে সংকীর্ণ সরু পথে (চলতে) বাধ্য কর।” এ কারণে আমীরুল মু’মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের উপরে তাদের অপমান-অপদস্থের এই প্রসিদ্ধ শর্ত আরোপ করেন। এ বিষয়টি হাদিসের ইমামগণ আব্দুর রহমান ইবনু গানাম আল-আশআরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি ওমর ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে শামের খৃষ্টানদের সাথে কৃত শান্তিচুক্তির শর্তগুলো লিপিবদ্ধ করেছি,
“পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ তা‘আলার নামে শুরু করছি, এটা হচ্ছে অমুক অমুক শহরের খৃষ্টানদের পক্ষ থেকে আল্লাহর বান্দা ওমর ইবনুল খাত্তাবের প্রতি (লিখিত) দলীল: আপনারা (হে মুসলিম) যখন আমাদের নিকট আগমন করেন তখন আমরা আমাদের নিজেদের, আমাদের সন্তানাদির, আমাদের ধনসম্পদের এবং আমাদের ধর্মের অনুসারীদের জন্য নিরাপত্তার আবেদন জানিয়েছিলাম আর তোমাদের জন্য আমরা আমাদের উপরে এ শর্ত করে নিয়েছিলাম যে, আমরা আমাদের এলাকায় এবং আশে পাশের এলাকায় সন্ন্যাসীদের জন্য না কোনো মাঠ, গির্জা ও পুণ্যস্থান নির্মাণ করব আর না ধ্বংস হয়ে যাওয়া এগুলোর কোনোটি সংস্কার করব, আর না এগুলোর কোনোটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করব। আর না দিনে-রাতে কোনো মুসলিমকে আমাদের গীর্জাসমূহে অবতরণ করতে বাধা দিব। আর আমাদের ইবাদতখানার দরজাগুলোকে পথিক ও মুসাফিরদের জন্য উন্মুক্ত করে দিব, মুসলিমবৃন্দের যারা আমাদের নিকট অতিথি হিসেবে আসবে তাদেরকে আমরা তিনদিন থাকার এবং খাবারের ব্যবস্থা করব। আর না আমরা আমাদের গির্জা এবং ঘরবাড়ীগুলোতে মুসলিমবৃন্দের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাদের আশ্রয় দিব, অনুরূপভাবে মুসলিমদের সাথে প্রতারণার কোনো কাজ হতে দেখলে তা গোপনও করব না। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দিব না, জনগণের নিকট শির্ক প্রচার করবো না, আর না সেদিকে কাউকে আহ্বান করব, আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজনকে ইসলামে প্রবেশে বাধা দিব না যদি সে তা চায়, আমরা মুসলিমবৃন্দকে সম্মান করব, আমরা আমাদের সে সব আসন ছেড়ে দিব যেসব আসনে তারা বসতে চায়, আমরা তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করব না তাদের পোষাকের, টুপি, পাগড়ী, চপ্পল, চুলের স্টাইলের, আমরা তাদের মত কথাবার্তা বলব না, তাদের মত উপনাম রাখব না, অশ্ব-পৃষ্ঠে চড়ব না, আমাদের কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে রাখব না, আমরা কোনো অস্ত্র ধারণ করব না, আর তা আমাদের সাথে বহনও করবো না, আমরা আরবি ভাষায় আমাদের সীলহোমার খোদাই করব না, মদ বিক্রয় করব না, আমাদের মাথার সামনের দিকে চুল কাটা থাকবে। আমরা যেখানে যাব সেখানে আমাদের রেওয়াজ মাফিক পোষাক পরিধান করব। আমরা কোমরে বেল্ট পরিধান করব। আমাদের গীর্জসমূহে ক্রুশ টাঙ্গাব না, মুসলিমবৃন্দের পথে-ঘাটে এবং হাট-বাজারে ক্রুশ প্রকাশ করব না এবং কোনো কিছু লিখব না, আমাদের গীর্জাগুলোতে মৃদুভাবে ঘন্টা বাজাব, মুসলিমবৃন্দের উপস্থিতিতে আমাদের গীর্জাগুলোতে উচ্চস্বরে আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করব না, আমাদের মৃতদের দাফন-কাফনের প্রার্থনায় আমাদের আওয়াজকে উঁচু করব না, মুসলিমবৃন্দের রাস্তাঘাটে এবং হাট-বাজারে শব-শোভাযাত্রায় বাতি জ্বালাব না, মুসলিমবৃন্দের কবরের পার্শ্বে আমাদের মৃতদেরকে কবরস্থ করব না, মুসলিমবৃন্দের পাকড়াও করা বন্দীকে গোলাম হিসেবে ক্রয় করব না, আমরা মুসলিমবৃন্দকে পথের সন্ধান দিব, তাদের বাড়ি-ঘরে উঁকি মারব না।”
তিনি বলেন: যখন আমি এই দলীলটি নিয়ে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট আসি তখন তিনি তাতে সংযোজন করেন: কোনো মুসলিমকে প্রহার করব না। আমরা আপনাদের জন্য আমাদের, আমাদের ধর্মের অনুসারিদের বিরুদ্ধে এ সমস্ত শর্তারোপ করলাম, আর এ শর্তে আমরা নিরাপত্তা গ্রহণ করলাম, আর আপনাদেরকে দেওয়া এ সমস্ত শর্তের কোনো একটি যদি আমরা ভঙ্গ করি তবে আমাদের কোনো যিম্মাহ (নিরাপত্তার অঙ্গিকার) নেই। আর আপনারা আমাদের সাথে তাই করতে পারবেন যা আপনারা আপনাদের বিরুদ্ধাচরণকারী ও বিদ্রোহীদের সাথে করে থাকেন।”
﴿وَقَالَتِ ٱلۡيَهُودُ عُزَيۡرٌ ٱبۡنُ ٱللَّهِ وَقَالَتِ ٱلنَّصَٰرَى ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ ٱللَّهِۖ ذَٰلِكَ قَوۡلُهُم بِأَفۡوَٰهِهِمۡۖ يُضَٰهُِٔونَ قَوۡلَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِن قَبۡلُۚ قَٰتَلَهُمُ ٱللَّهُۖ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٣٠ ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلۡمَسِيحَ ٱبۡنَ مَرۡيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُوٓاْ إِلَٰهٗا وَٰحِدٗاۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ سُبۡحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٣١ ﴾ [ التوبة : ٣٠، ٣١ ]
“৩০. ইয়াহূদীরা বলে, ‘উযায়র আল্লাহর পুত্র। আর নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এসব তাদের মুখের কথা। এতে তারা তাদের পূর্বেকার কাফিরদের কথারই অনুকরণ করে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! কেমনভাবে তারা সত্য পথ থেকে দূরে ছিটকে পড়েছে। ৩১. আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের ‘আলিম আর দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে; আর মারইয়াম-পুত্র মাসীহকেও। অথচ তাদেরকে এক ইলাহ ব্যতীত (অন্যের) ‘ইবাদাত করার আদেশ দেওয়া হয় নি। তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, প্রশংসা আর মহিমা তাঁরই, (বহু ঊর্ধ্বে তিনি) তারা যাদেরকে (তাঁর)) অংশীদার গণ্য করে তা থেকে।” [সূরা আত-তাওবাহ্: ৩০-৩১]
﴿ قَٰتِلُواْ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَلَا بِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ ٱلۡحَقِّ مِنَ ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ حَتَّىٰ يُعۡطُواْ ٱلۡجِزۡيَةَ عَن يَدٖ وَهُمۡ صَٰغِرُونَ ٢٩﴾ [ التوبة : ٢٩ ]
“২৯. যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, আর শেষ দিনের প্রতিও না, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যে পর্যন্ত না তারা বশ্যতা সহকারে স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দেয়।” [সূরা আত-তাওবাহ: ২৯]
তারা যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনে না তখন রাসূলগণের কারও প্রতি আর তারা যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি তাদের বিশুদ্ধ ঈমান টিকে না; বরং তারা তো নিছক তাদের খেয়ালখুশি, তাদের প্রবৃত্তির এবং তাদের বাপ-দাদারা যাতে লিপ্ত ছিল তার অনুসরণ করে; তারা সেগুলোর অনুসরণ এজন্য করে না যে, এগুলো আল্লাহ তা‘আলার আইন এবং তাঁর দীন। কেননা তাদের হাতে যে কিতাব রয়েছে তার প্রতি যদি তারা বিশুদ্ধ রূপে ঈমান আনত তবে তো সেটা তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনার প্রতি দিক নির্দেশনা দিত। কেননা সমস্ত নবীই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের সুসংবাদ দিয়ে গেছেন আর তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগমন করেন তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করে অথচ তিনি হচ্ছেন সবচেয়ে সম্মানিত রাসূল। কাজেই বুঝা যাচ্ছে যে, তারা পূর্ববর্তী নবীগণের শরীয়তকে এ হিসেবে আঁকড়ে ধরেনি যে, সেটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এসেছে; বরং তারা তাদের খেয়ালখুশি এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছিল। ফলে অবশিষ্ট নবীদের প্রতি তাদের ঈমান আনয়ন তাদের কোনো উপকারে আসে নি, তারা তো নবীদের সর্দার, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম, সর্বশেষ ও সবচেয়ে কামেল নবীকে অস্বীকার করেছে। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: قَاتِلُوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلا بِالْيَوْمِ الآخِرِ وَلا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ “যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না, আর শেষ দিনের প্রতিও না, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তাকে হারাম গণ্য করে না, আর সত্য দ্বীনকে নিজেদের দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে না”। মুশরিকরা পরাজিত হওয়ার পরে আহলে কিতাবীদের সাথে যুদ্ধের সূচনা করার নির্দেশ প্রদান করে এই সম্মানিত আয়াত অবতীর্ণ হয়, যখন লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করে। আরব উপদ্বীপে যখন স্থিরতা আসে তখন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ইয়াহূদী ও নাসারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেন। এটা ছিল নবম হিজরির ঘটনা। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন আর লোকদেরকেও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। আর তিনি তাদেরকে তাঁর লক্ষ্য ও গন্তব্য সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি মদিনার আশে পাশে বিভিন্ন আরব এলাকাসমূহে সৈন্য সংগ্রহের জন্য তাঁর লোক প্রেরণ করেন, তিনি ত্রিশ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করেন, মদীনাবাসী এবং তার আশে পাশের মুনাফিক এবং অন্যান্যরা জিহাদ থেকে পেছনে পড়ে যায়। এটা ছিল দুর্ভিক্ষ এবং প্রচণ্ড গরমের সময়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য শামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এমনকি তিনি তাবুক পৌঁছেন, তিনি সেখানে অবতরণ করে পানির উৎসে তাঁবু খাটিয়ে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনায় ফিরে আসার জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট ইস্তিখারা (সিদ্ধান্ত পাওয়ার উদ্দেশ্যে সালাত আদায়) করেন। এরপর তিনি ফিরে আসেন। কেননা অবস্থা খুব সংগিন ছিল এবং লোকেরা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ সংক্রান্ত বর্ণনা আল্লাহ চাহে তো অচিরেই আসছে।
জিযিয়া হচ্ছে অপমান-অপদস্থ এবং কুফরির নিদর্শন:
আল্লাহ তা‘আলার বাণী: حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ “যে পর্যন্ত না তারা স্বেচ্ছায় ট্যাক্স দেয়” অর্থাৎ যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে عَنْ يَدٍ “স্বেচ্ছায়” অর্থাৎ পরাজিত করে এবং বাধ্য করে وَهُمْ صَاغِرُونَ (বশ্যতা সহকারে) অর্থাৎ তারা অপমানিত-অপদস্থ। এ কারণে জিম্মিদেরকে সম্মান প্রদর্শন করা এবং মুসলিমদের উপরে তুলে ধরার বৈধতা নেই; বরং তারা হীন, সম্মানহীন ও হতভাগা। যেমন, সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে: আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা ইয়াহূদী-খৃষ্টানদেরকে (তাদের পূর্বেই) আগে বেড়ে সালাম দিও না। তাদের কারও সাথে পথে যখন তোমাদের সাক্ষাত হয় তখন তাদেরকে সংকীর্ণ সরু পথে (চলতে) বাধ্য কর।” এ কারণে আমীরুল মু’মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের উপরে তাদের অপমান-অপদস্থের এই প্রসিদ্ধ শর্ত আরোপ করেন। এ বিষয়টি হাদিসের ইমামগণ আব্দুর রহমান ইবনু গানাম আল-আশআরী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি ওমর ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে শামের খৃষ্টানদের সাথে কৃত শান্তিচুক্তির শর্তগুলো লিপিবদ্ধ করেছি,
“পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ তা‘আলার নামে শুরু করছি, এটা হচ্ছে অমুক অমুক শহরের খৃষ্টানদের পক্ষ থেকে আল্লাহর বান্দা ওমর ইবনুল খাত্তাবের প্রতি (লিখিত) দলীল: আপনারা (হে মুসলিম) যখন আমাদের নিকট আগমন করেন তখন আমরা আমাদের নিজেদের, আমাদের সন্তানাদির, আমাদের ধনসম্পদের এবং আমাদের ধর্মের অনুসারীদের জন্য নিরাপত্তার আবেদন জানিয়েছিলাম আর তোমাদের জন্য আমরা আমাদের উপরে এ শর্ত করে নিয়েছিলাম যে, আমরা আমাদের এলাকায় এবং আশে পাশের এলাকায় সন্ন্যাসীদের জন্য না কোনো মাঠ, গির্জা ও পুণ্যস্থান নির্মাণ করব আর না ধ্বংস হয়ে যাওয়া এগুলোর কোনোটি সংস্কার করব, আর না এগুলোর কোনোটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করব। আর না দিনে-রাতে কোনো মুসলিমকে আমাদের গীর্জাসমূহে অবতরণ করতে বাধা দিব। আর আমাদের ইবাদতখানার দরজাগুলোকে পথিক ও মুসাফিরদের জন্য উন্মুক্ত করে দিব, মুসলিমবৃন্দের যারা আমাদের নিকট অতিথি হিসেবে আসবে তাদেরকে আমরা তিনদিন থাকার এবং খাবারের ব্যবস্থা করব। আর না আমরা আমাদের গির্জা এবং ঘরবাড়ীগুলোতে মুসলিমবৃন্দের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাদের আশ্রয় দিব, অনুরূপভাবে মুসলিমদের সাথে প্রতারণার কোনো কাজ হতে দেখলে তা গোপনও করব না। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে কুরআন শিক্ষা দিব না, জনগণের নিকট শির্ক প্রচার করবো না, আর না সেদিকে কাউকে আহ্বান করব, আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজনকে ইসলামে প্রবেশে বাধা দিব না যদি সে তা চায়, আমরা মুসলিমবৃন্দকে সম্মান করব, আমরা আমাদের সে সব আসন ছেড়ে দিব যেসব আসনে তারা বসতে চায়, আমরা তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করব না তাদের পোষাকের, টুপি, পাগড়ী, চপ্পল, চুলের স্টাইলের, আমরা তাদের মত কথাবার্তা বলব না, তাদের মত উপনাম রাখব না, অশ্ব-পৃষ্ঠে চড়ব না, আমাদের কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে রাখব না, আমরা কোনো অস্ত্র ধারণ করব না, আর তা আমাদের সাথে বহনও করবো না, আমরা আরবি ভাষায় আমাদের সীলহোমার খোদাই করব না, মদ বিক্রয় করব না, আমাদের মাথার সামনের দিকে চুল কাটা থাকবে। আমরা যেখানে যাব সেখানে আমাদের রেওয়াজ মাফিক পোষাক পরিধান করব। আমরা কোমরে বেল্ট পরিধান করব। আমাদের গীর্জসমূহে ক্রুশ টাঙ্গাব না, মুসলিমবৃন্দের পথে-ঘাটে এবং হাট-বাজারে ক্রুশ প্রকাশ করব না এবং কোনো কিছু লিখব না, আমাদের গীর্জাগুলোতে মৃদুভাবে ঘন্টা বাজাব, মুসলিমবৃন্দের উপস্থিতিতে আমাদের গীর্জাগুলোতে উচ্চস্বরে আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করব না, আমাদের মৃতদের দাফন-কাফনের প্রার্থনায় আমাদের আওয়াজকে উঁচু করব না, মুসলিমবৃন্দের রাস্তাঘাটে এবং হাট-বাজারে শব-শোভাযাত্রায় বাতি জ্বালাব না, মুসলিমবৃন্দের কবরের পার্শ্বে আমাদের মৃতদেরকে কবরস্থ করব না, মুসলিমবৃন্দের পাকড়াও করা বন্দীকে গোলাম হিসেবে ক্রয় করব না, আমরা মুসলিমবৃন্দকে পথের সন্ধান দিব, তাদের বাড়ি-ঘরে উঁকি মারব না।”
তিনি বলেন: যখন আমি এই দলীলটি নিয়ে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট আসি তখন তিনি তাতে সংযোজন করেন: কোনো মুসলিমকে প্রহার করব না। আমরা আপনাদের জন্য আমাদের, আমাদের ধর্মের অনুসারিদের বিরুদ্ধে এ সমস্ত শর্তারোপ করলাম, আর এ শর্তে আমরা নিরাপত্তা গ্রহণ করলাম, আর আপনাদেরকে দেওয়া এ সমস্ত শর্তের কোনো একটি যদি আমরা ভঙ্গ করি তবে আমাদের কোনো যিম্মাহ (নিরাপত্তার অঙ্গিকার) নেই। আর আপনারা আমাদের সাথে তাই করতে পারবেন যা আপনারা আপনাদের বিরুদ্ধাচরণকারী ও বিদ্রোহীদের সাথে করে থাকেন।”
﴿وَقَالَتِ ٱلۡيَهُودُ عُزَيۡرٌ ٱبۡنُ ٱللَّهِ وَقَالَتِ ٱلنَّصَٰرَى ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ ٱللَّهِۖ ذَٰلِكَ قَوۡلُهُم بِأَفۡوَٰهِهِمۡۖ يُضَٰهُِٔونَ قَوۡلَ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِن قَبۡلُۚ قَٰتَلَهُمُ ٱللَّهُۖ أَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٣٠ ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلۡمَسِيحَ ٱبۡنَ مَرۡيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُوٓاْ إِلَٰهٗا وَٰحِدٗاۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ سُبۡحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٣١ ﴾ [ التوبة : ٣٠، ٣١ ]
“৩০. ইয়াহূদীরা বলে, ‘উযায়র আল্লাহর পুত্র। আর নাসারারা বলে, মাসীহ আল্লাহর পুত্র। এসব তাদের মুখের কথা। এতে তারা তাদের পূর্বেকার কাফিরদের কথারই অনুকরণ করে। আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন! কেমনভাবে তারা সত্য পথ থেকে দূরে ছিটকে পড়েছে। ৩১. আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা তাদের ‘আলিম আর দরবেশদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছে; আর মারইয়াম-পুত্র মাসীহকেও। অথচ তাদেরকে এক ইলাহ ব্যতীত (অন্যের) ‘ইবাদাত করার আদেশ দেওয়া হয় নি। তিনি ব্যতীত সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, প্রশংসা আর মহিমা তাঁরই, (বহু ঊর্ধ্বে তিনি) তারা যাদেরকে (তাঁর)) অংশীদার গণ্য করে তা থেকে।” [সূরা আত-তাওবাহ্: ৩০-৩১]