hadith book logo

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে পবিত্রতা অর্জন করতেন

লেখকঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইবন আব্দুল আযীয আল-মাদানী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২১১

যখন তায়াম্মুম জায়েয:

মুসাফির বা মুক্বীম থাকাবস্থায় যে কোনো কারণে কারোর অযু বা গোসল ভঙ্গ হলে নিম্নোক্ত অবস্থাগুলোতে তায়াম্মুম করা জায়েয:

১. পানি না পেলে:

পানি না পেলে তায়াম্মুম করা জায়েয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَلَمۡ تَجِدُواْ مَآءٗ فَتَيَمَّمُواْ صَعِيدٗا طَيِّبٗا﴾ [ المائ‍دة : ٦ ]

“অতঃপর তোমরা পানি না পেলে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৬]

এ সম্পর্কীয় হাদীস পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।

২. অযু বা গোসলের জন্য যথেষ্ট এতটুকু পানি না পেলে:

অযু বা গোসলের জন্য যথেষ্ট এতটুকু পানি না পেলে তায়াম্মুম করা জায়েয। অতএব, যতটুকু পানি আছে তা দিয়ে অযু বা গোসল করবে এবং বাকী অঙ্গগুলোর জন্য তায়াম্মুম করবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ﴾ [ التغابن : ١٦ ]

“তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর”। [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১৬]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَيْءٍ فَأْتُوْا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ، وَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَدَعُوْهُ» .

“যখন আমি তোমাদেরকে কোনো কাজের আদেশ করব তখন তোমরা তা যথাসাধ্য পালন করবে। আর যখন তোমাদেরকে কোনো কাজ করতে নিষেধ করব তখন তা হতে তোমরা অবশ্যই বিরত থাকবে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭২৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৩৭।]

৩. পানি অত্যন্ত ঠাণ্ডা হলে:

যখন পানি অতিশয় ঠান্ডা যা ব্যবহারে নিশ্চিত ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে এবং গরম করারও কোনো ব্যবস্থা নেই এমতাবস্থায় তায়াম্মুম করা জায়েয।

‘আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«اِحْتَلَمْتُ فِيْ لَيْلَةٍ بَارِدَةٍ غَزْوَةِ ذَاتِ السَّلاَسِلِ، فَأَشْفَقْتُ إِنِ اغْتَسَلْتُ أَنْ أَهْلِكَ ! فَتَيَمَّمْتُ، ثُمَّ صَلَّيْتُ بِأَصْحَابِيْ الصُّبْحَ، فَذَكَرُوْا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ : يَا عَمْرُو ! صَلَّيْتَ بِأَصْحَابِكَ وَأَنْتَ جُنُبٌ ؟ فَأَخْبَرْتُهُ بِالَّذِيْ مَنَعَنِيْ مِنَ الاِغْتِسَالِ وَقُلْتُ : إِنِّيْ سَمِعْتُ اللهَ يَقُوْلُ : ﴿وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَنفُسَكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُمۡ رَحِيمٗا﴾ [ النساء : ٢٩ ] فَضَحِكَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَلَمْ يَقُلْ شَيْئًا» .

“যাতুস সালাসিল” নামক গাযওয়ায় থাকাবস্থায় এক হিমশীতল রাত্রিতে অকস্মাৎ আমার স্বপ্নদোষ হয়ে গেলে মৃত্যুর আশঙ্কায় গোসল না করে আমি তায়াম্মুম করেছি। এমতাবস্থায় আমি সাথীদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেছি। অতঃপর আমার সাথীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ব্যাপারে অবগত করালে তিনি আমাকে ডেকে বললেন: হে ‘আমর! তুমি কি জুনুবী থাকাবস্থায় নিজ সাথীদেরকে নিয়ে সালাত পড়েছ? তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার গোসল না করার কারণটি জানিয়েছি এবং কৈফিয়ত স্বরূপ বলেছি: আমি কুরআন মাজীদে পেয়েছি, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমরা নিজে নিজকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। তাই আমি গোসল করিনি। কৈফিয়তটি শুনা মাত্রই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন এবং আমাকে আর কিছুই বলেন নি”। [আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৩৪; দারাক্বুত্বনী ৬৭০।]

৪. রোগাক্রান্ত বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে:

রোগাক্রান্ত বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে এবং পানি ব্যবহারে রোগ বেড়ে যাওয়া বা আরোগ্য হতে বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তখন তায়াম্মুম করা জায়েয। জাবির ইবন আব্দুল্লাহ ও আব্দুল্লাহ ইবন ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন,

«خَرَجْنَا فِيْ سَفَرٍ فَأَصَابَ رَجُلًا مِّنَّا حَجَرٌ فَشَجَّهُ فِيْ رَأْسِهِ ثُمَّ احْتَلَمَ، فَسَأَلَ أَصْحَابَهُ فَقَالَ : هَلْ تَجِدُوْنَ لِيْ رُخْصَةً فِي التَّيَمُّمِ؟ فَقَالُوْا : مَا نَجِدُ لَكَ رُخْصَةً، وَأَنْتَ تَقْدِرُ عَلَى الْـمَاءِ، فَاغْتَسَلَ فَمَاتَ، فَلَمَّا قَدِمْنَا عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أُخْبِرَ بِذَلِكَ فَقَالَ : قَتَلُوْهُ قَتَلَهُمُ اللهُ ! أَلاَ سَأَلُوْا إِذْ لَمْ يَعْلَمُوْا، فَإِنَّمَا شِفَاءُ الْعِيِّ السُّؤَالُ، إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيْهِ أَنْ يَتَيَمَّمَ وَيَعْصِرَ أَوْ يَعْصِبَ عَلَى جُرْحِهِ خِرْقَةً ثُمَّ يَمْسَحَ عَلَيْهَا وَيَغْسِلَ سَائِرَ جَسَدِهِ» .

“আমরা সফরে বের হলে আমাদের একজনের মাথায় পাথর পড়ে তার মাথা ফেটে যায়। ইতোমধ্যে তার স্বপ্নদোষ হয়। তখন সে তার সাথীদেরকে এ মর্মে জিজ্ঞাসা করে যে, তোমরা শরী‘আতে আমার জন্য তায়াম্মুম করার কোনো সুযোগ খুঁজে পাচ্ছো কি? তারা বললঃ না, তোমার জন্য তায়াম্মুমের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, তুমি পানি ব্যবহারে সক্ষম। অতঃপর সে গোসল করার সাথে সাথেই মারা যায়। এরপর আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছুলে তাঁকে এ সম্পর্কে জানানো হলে তিনি (তিরস্কার স্বরূপ) বললেন: ওরা বেচারাকে মেরে ফেলেছে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ধ্বংস করুক। তারা যখন ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত নয় তখন তারা কাউকে জিজ্ঞাসা করে নি কেন? কারণ, জিজ্ঞাসাই হচ্ছে অজ্ঞানতার উপশম। তায়াম্মুমই তার জন্য যথেষ্ট ছিল। ক্ষতের উপর ব্যান্ডেজবেঁধে তাতে মাসাহ এবং বাকী শরীর ধৌত করে নিলেই চলতো”। [আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৩৬, ৩৩৭; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৫৭৮।]

৪. পানি সংগ্রহে অপারগতা প্রমাণিত হলে:

পানি সংগ্রহে অপারগতা প্রমাণিত হলে তায়াম্মুম করা জায়েয। যেমন, শত্রু, চোর-ডাকাত বা অগ্নিকাণ্ডের হাতে নিজ মান-সম্মান, ধন-সম্পদ বা জীবন হারানোর ভয়। তেমনিভাবে সে খুবই অসুস্থ নড়চড়ে অক্ষম এবং পানি এনে দেওয়ার মতো আশেপাশে কেউ নেই।

৫. মজুদ পানি ব্যবহার করলে কঠিন পিপাসায় মৃত্যুর ভয় হলে:

পানি সামান্য যা ব্যবহার করলে কঠিন পিপাসায় মৃত্যুর ভয় হয় এমতাবস্থায় পানি ব্যবহার না করে প্রয়োজনের জন্য মজুদ রেখে তায়াম্মুম করা জায়েয। এ ব্যাপারে আলিমদের ঐকমত্য রয়েছে। মোট কথা, যে কোনো কারণে পানি সংগ্রহে অক্ষম বা পানি না পেলে কিংবা পানি ব্যবহারে নিশ্চিত অসুবিধে দেখা দিলে তায়াম্মুম করা জায়েয।