hadith book logo

সাহিত্যিক মাওলানা আহমাদ আলী

লেখকঃ হাদীছ ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩০

মৃত্যুর ঘটনা :

মৃত্যুর ১৮ দিন পূর্বে তাঁর ঐকান্তিক আগ্রহে সাতক্ষীরা হ’তে তাঁকে বুলারাটি গ্রামের বাড়ীতে আনা হয়। ইন্তেকালের দু’দিন আগে থেকে তিনি খানাপিনা একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন। অধিকাংশ সময় ঘুমিয়েই কাটাতেন। হঠাৎ ইন্তেকালের দিন সকাল ৯-টার দিকে চোখ মেলে বললেন, ‘আমার আজকে মৃত্যু হবে, সবাইকে খবর দাও’। ভাইপো মৌলবী আব্দুর রশীদ নূরী যিনি ঐসময় সাতক্ষীরা যাওয়ার অনুমতি নেওয়ার জন্য শিয়রে দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে লক্ষ্য করে সহজভাবে বলে দিলেন, ‘খোকা (কনিষ্ঠ পুত্র) বাড়ীতে নেই। তুমি সাতক্ষীরা গেলে আমার জানাযা পড়বে কে?’ বলেই আবার চক্ষু মুদলেন।

বিদ্যুৎবেগে খবর ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। আত্মীয়-স্বজন সবাই চলে এলো। বাড়ী লোকে লোকারণ্য। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র আসাদুল্লাহ আল-গালিব তখনও বাড়ী থেকে ১৯ মাইল দূরে ব্রজবাকসায় একটি ধর্মীয় জালসায়। মাওলানা আহমাদ আলী সারাদিন চোখ বুঁজে পড়ে আছেন। সবাই তাঁর আশু মৃত্যুর আশংকায় প্রহর গুনছে। কেউবা তেলাওয়াত করছে। এমন সময় রাত ৯-টার দিকে কনিষ্ঠ পুত্র এসে পৌঁছে গেলেন।

তিনি কাছে এসে সালাম দিয়ে বসতেই মাওলানা চোখ মেলে তাকালেন। যেন এই মুহূর্তটির অপেক্ষাতেই তিনি সারাদিন চুপচাপ সময় কাটিয়েছেন। তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক কণ্ঠে ছোট ছেলের সঙ্গে তার বিবাহ সংক্রান্ত কিছু আলোচনা শেষে ছেলের ডান হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি আমার রক্তের সন্তান! একরার করো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দ্বীনে মুহাম্মাদীর উপরে কায়েম থাকবে?’ প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র তার প্রাণের চাইতে আপন স্বীয় শিক্ষাগুরু ও দীক্ষাগুরু পরম শ্রদ্ধেয় পিতার পবিত্র হাতে হাত রেখে অশ্রুসজল নেত্রে উপস্থিত শতাধিক মানুষের সম্মুখে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে একরার করলেন।

ঐ একটি বাক্যের মাধ্যমেই তিনি যেন তাঁর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নিজ হাতে গড়া প্রিয় সন্তানের হাতে ন্যস্ত করে নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি এখন ভারমুক্ত। হাসিমুখে তিনি এখন প্রিয়বন্ধুর সান্নিধ্যে বিদায় নেবেন। দীর্ঘ ৯৪ বৎসরের দুনিয়াবী মায়াবন্ধন এখন ছিন্ন করার পালা। কিন্তু সবাই যে চায় তাঁর বিদায়কালীন অছিয়ত শুনতে। তিনি পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতে বললেন। কিন্তু বাষ্পরুদ্ধ শতাধিক ছাত্র-শিক্ষক, আলেম-ওলামা, আত্মীয়-পরিজন কারুপক্ষে তখন সম্ভব ছিল না স্বাভাবিক কণ্ঠে তেলাওয়াত করা। তাই অর্ধশতাধিক বছরের শিক্ষক, সমাজ সংস্কারক আলেমে দ্বীন মাওলানা আহমাদ আলী অবশেষে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার্বজনীন উপদেশমূলক আয়াত বাছাই করে নিজেই তেলাওয়াত শুরু করলেন ও সবাইকে তার সঙ্গে তেলাওয়াত করতে বললেন। সূরায়ে বাক্বারাহর ১৫৩ আয়াত ‘অলা তাকূলু’... হ’তে শুরু করে ১৫৬ আয়াতের শেষে ‘ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজে‘ঊন’ পর্যন্ত পৌঁছে গেলে তাঁর যবান আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেল। অস্ফুটস্বরে উচ্চারিত হ’ল ‘আর-রফীক্বাল আ‘লা’ (সর্বোচ্চ বন্ধু)। এই কথাটি মৃত্যুকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মুখ দিয়ে বের হয়েছিল। কণ্ঠ রুদ্ধ হ’ল। ঠিক রাত ৯.২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজে‘ঊন ।

আজীবন শিক্ষক ও অভিভাবক মাওলানা আহমাদ আলী মৃত্যুর প্রাক্কালেও শিক্ষকের ভাবমূর্তি বজায় রেখে বিদায় নিলেন। আল্লাহুম্মাগফিরলাহু অরহামহু অ‘আ-ফিহি অ‘ফু আনহু... আমীন! তাঁর রোগ ভোগের মেয়াদ ছিল সর্বমোট ৪ মাস ২৩ দিন। রোগ কোন ডাক্তারেই নির্ণয় করতে পারেননি। তবে সূত্রপাত হয়েছিল বাসি দই খেয়ে পেট ফেঁপে যাওয়া থেকে।

পরদিন দুপুর সাড়ে বারোটায় জানাযা হয়। খুলনা-যশোর যেলা জমঈয়তে আহলেহাদীছের সভাপতি মাওলানা মতীউর রহমান, অন্যতম সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুল মান্নান আল-আযহারী, সাতক্ষীরা শহর জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা এরশাদসহ বহু আলেম-ওলামা ও ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও সর্বস্তরের কয়েকশত শোকাহত মানুষ জানাযায় শরীক হন। সকলের দাবীক্রমে কনিষ্ঠপুত্র মাওলানা আসাদুল্লাহ আল-গালিব বেদনাপ্লুত হৃদয়ে ছালাতে জানাযায় ইমামতি করেন। অতঃপর তিনি ও মাওলানা মরহূমের প্রিয় ছাত্র সাতক্ষীরার কামাল নগরের মাওলানা আব্দুছ ছামাদ মিলে মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম জানালা বরাবর অদূরবর্তী পারিবারিক গোরস্থানে চিরস্থায়ী আবাসগৃহের ছোট্ট পরিসরে অতি সযতনে চিরদিনের জন্য শুইয়ে দেন।... আল্লাহুম্মাগফির লাহূ ওয়া আকরিম নুযুলাহু অ অসসে‘ মাদখালাহু -আমীন!