১
নবী মুহাম্মদ সা. এর আগমনের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, দা‘ওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল
লেখকঃ ড. মো: আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১১
শৈশব কাল
দুগ্ধপান : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের পর সাতদিন মাতৃদুগ্ধ পান করেন। তারপর আটদিন ছুয়াইবার [ছুয়াইবা ছিল আবু লাহাবের দাসী। আব্দুল্লাহর পুত্র সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার সংবাদ সে স্বীয় মালিককে জানালে আনন্দের আতিশায্যে আবু লাহাব তৎক্ষনাৎ তাকে আযাদ করে দেয়। সে সময় তার কোলের শিশুর নাম ছিল মাছরুহ। তাঁর আগে হামজা ইবন আব্দুল মোত্তালিব এবং তাঁর পরে আবু সালমা ইবন আব্দুল আহাদ মাখজুমিকেও ছুয়াইবা দুধ পান করিয়েছিলেন। (দ্র. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩)।] দুগ্ধ পান করেন। ছুয়াইবার পর খাওলা বিনতে মুনযেরসহ আরও তিনজন মহিলা তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন। [তাহের সূরাটী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২৮।] কিছুদিন পর হালিম সা’দিয়া এ সৌভাগ্যের অধিকারী হন। সে সময় আরবের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় গোত্রসমূহের মধ্যে এ প্রথা প্রচলিত ছিল যে, তারা স্ব স্ব সন্তানকে শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রতিপালন করা পছন্দ করত। এতে শিশুদের দৈহিক স্বাস্থ্য সুন্দররূপে বিকাশ লাভ করত এবং তারা বিশুদ্ধ ও শ্রুতিমধুর আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে পারত। চিরন্তন প্রথানুসারে গ্রামাঞ্চলের ধাত্রীরা সম্ভ্রান্ত ও শরীফ পরিবারে সন্তান পাবার আশায় মক্কা শহরে আগমন করত; এর মাধ্যমে তারা পারিতোষক ও সম্মানী লাভ করত। পিতৃহীন বালক প্রতিপালনে যথাযথ সম্মানী ও পারিশ্রমিক না পাবার আশংকায় বনু সা‘দ [এটি একটি গোত্রের নাম। বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় তারা খুবই পারদর্শী ছিল। মক্কা নগর হতে ৭০ মাইল দূরবর্তী শহর তায়েফের পার্শ্বস্থিত গ্রামে তাদের আবাস ছিল। (দ্র: মাহবুবুর রহমান, মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮৫), পৃ. ৩৯)।] গোত্রের অন্যান্য ধাত্রীরা তাঁকে গ্রহণ করে নি; এমনকি হালিমাও প্রথমে তাঁকে গ্রহণ না করে অগত্যা খালি হাতে ফিরে যাবার সময় শিশু মুহাম্মদের লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ফলে হালিমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ মাতা হলেন, বনু সা’দ ইবন বকরের জনৈকা মহিলা হালিমা বিনত্ আবু যুবায়র। হালিমা সা’দিয়া বলেন : আমি দুদ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধানে বনু সা’দ গোত্রের অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে তায়েফ হতে সাদা গাঁধার পিঠে সওয়ার হয়ে মক্কায় রওয়ানা হই। সে বছর দেশে দূর্ভিক্ষ বিরাজ করছিল। আমার কোলেও একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিল কিন্তু আমার স্তনে এই পরিমাণ দুগ্ধ ছিল না যা তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সারারাত সে ক্ষুধায় কাতরাত আর আমরা বিনিদ্র রজনী যাপন করতাম। আমাদের একটি উটনীও ছিল, কিন্তু তার স্তনে তখন দুগ্ধ ছিল না। আমার আরোহিত উষ্ট্রীটি এত দূর্বল ছিল যে, মক্কায় পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এতিম ভেবে আমাদের মধ্যে কেউই গ্রহণ করল না। এদিকে বিলম্ব হওয়ায় আমি ও অন্য কোন শিশু পোষ্য পাইনি। আমি আমার স্বামীকে বললাম, অগত্যা শুন্য হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে এ এতিম শিশুটিকে নিয়ে যাওয়াই ভাল। আমার স্বামী এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। ফলে তিনি এতিম শিশুকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তাঁবুতে এসে দুগ্ধ পান করাতে বসার সঙ্গে সঙ্গে বরকত ও কল্যাণের অজস্রধারা প্রকাশ পেতে লাগল। হালিমা বলেন, আমার স্বামী উটনীর দুধ দোহন করে আসলেন এবং আমরা সকলেই তৃপ্তি সহকারে পান করলাম। বহুদিন পর সারারাত আরামে কাটালাম। আমাদের দুর্বল উষ্ট্রী অত্যন্ত সবল হয়ে গেল এবং সবাইকে পিছনে রেখে গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। (ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৭-১৬৯)।] তাঁর অভাব অনটন দুরীভূত হয়ে প্রাচুর্যতা ও সচ্ছলতা ফিরে এলো এবং বান্ধবীরা তাঁর ঈর্ষায় মেতে উঠতে লাগল। এরূপে তাঁর গৃহে অতি আদর-যত্নে সুদীর্ঘ দু’বছর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লালিত পালিত হন।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৈহিক ক্রম বিকাশ অন্যান্য শিশুদের তুলনায় হৃষ্টপুষ্ট ও মোটা ছিল। এমনকি দু’বছর বয়সে তাঁকে খুব বড় দেখাত। প্রথানুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে আসা হল, কিন্তু হালিমা শিশুটিকে আরও কিছুদিন প্রতিপালনের আকাংখা ব্যক্ত করেন। বিবি আমেনা হালিমার আকুতি দেখে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পুণরায় তার নিকট ফিরিয়ে দেন। [ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬২-১৬৪।]
হালিমার গৃহে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্বীয় দুধ ভাইদের সাথে খেলাধুলার উদ্দেশ্যে মাঠে যেতেন। এ সময় একদা জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আগমন করলেন এবং দেখলেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলা করছেন। তিনি তাঁকে ধরে শুইয়ে দিলেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৃৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ হতে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন, এ অংশটি হল শয়তানের। এরপর জিব্রাইল আলাইহিস সালাম হৃৎপিণ্ডটি একটি স্বর্নের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। অন্য শিশুরা ছুটে বিবি হালিমার কাছে গিয়ে বললো, মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরিবারের লোকেরা ছুটে এসে দেখলো তিনি বিবর্ণমুখে বসে আছেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষে সেই সিলাই এর চিহ্ন দেখেছি। [ইমাম মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, (কিতাবুল ঈমান, বাবুল ইসরা), পৃ.৯২।] সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল চার বা পাঁচ বছর। [অধিকাংশ সীরাত রচয়িতা এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ( ইবন সা’দ, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ.১১২) কিন্তু ইবন ইসহাকের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিন বছর বয়সে এ ঘটনা ঘটেছিল। ( ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৪-১৬৫)।] এভাবে পরবর্তীতেও তাঁর বক্ষ বিদীর্ণের ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে। [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোটা জীবনে বক্ষবিদারনের ঘটনা মোট চারবার সংগঠিত হয়েছে। প্রথমবার শৈশবে, দ্বিতীয়বার দশ বছর বয়সে, তৃতীয়বার যখন তিনি চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হন এবং চতুর্থবার মে’রাজে যাওয়ার প্রাক্কালে সংগঠিত হয়। (মুহাম্মদ ইদ্রীস কান্দাহলভী, প্রাগুক্ত,১ম খন্ড, পৃ. ৭৭-৭৮) প্রথমবার তাঁর কলব হতে জমাট বাধা কালো অংশ যা পাপের উৎস তা পবিত্র পানি দ্বারা ধৌত করা হয়। দ্বিতীয়বার যেহেতু দশ বছর বয়সে তিনি উপনীত হয়েছেন এবং এ মূহুর্তে তাঁর মন মানসিকতা বালকসূলভ হওয়ায় খেলাধুলার দিকে বেশী ঝুঁকে পড়া স্বাভাবিক ছিল তাই, এ প্রবণতাকে দূর করার জন্য এ পর্যায়ে বক্ষবিদীর্ণ হয়। তৃতীয়বার ওহী লাভের সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ রহস্যাবলী এবং আল্লাহর কালামকে ধারণের যোগ্য করে তোলা হয়েছে। চতুর্থবার তাঁর দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিক হতে আল্লাহর দর্শন লাভে ও মহাসৃষ্টির গুরু রহস্যাবলী পরিদর্শনের উপযুক্ত করে দেয়া। ( মুহাম্মদ ইদ্রীস কান্দাহলভী, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ৮৩-৮৪)।] এদিকে ইঈিত করেই মহান আল্লাহ বলেন,
﴿أَلَمۡ نَشۡرَحۡ لَكَ صَدۡرَكَ ١ ﴾ [ الشرح : ١ ]
‘‘হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আপনার বক্ষকে বিদীর্ণ করে দেইনি?’’ [আল-কুরআন, সূরা আশ্ শরাহ : ১।]
এঘটনার পর তিনি (হালিমা) ভীত হয়ে পড়লেন এবং শিশুকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। [ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৮] মা আপন সন্তানকে সুস্থ সবল দেখে প্রীত হন এবং স্নেহ ভালবাসা ও আদর সোহাগ দিয়ে লালন-পালনে সচেষ্ট হন। তাঁর দেখাশুনা ও তত্বাবধানের জন্য স্বীয় পরিচারিকা উম্মু আয়মানকে নিযুক্ত করেন। [তার আসল নাম বারাত, তিনি আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। ‘উবায়দ ইবনুল হারিছ’ আল-খাযরাজীর সাথে প্রথম তার বিয়ে হয়। এ ঘরে আয়মান নামক একজন পুত্র জন্মে। এ সুত্রেই তার নাম হয় উম্মে আয়মান। উপরন্তু তার মৃত্যুর পর তিনি যায়দ ইবন হারিছের সাথে পরিবার সূত্রে আবদ্ধ হন। (ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খন্ড, পৃ. ৫৭১-৫৭২)।]
তাঁর বয়স যখন ছয় বছর তখন তাঁর মা তাঁকে দাদার মাতৃকুলকে দেখাবার নিমিত্তে তাঁকে ইয়াসরিব নিয়ে যান। তিনি তাঁর প্রিয়তম স্বামী আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মোত্তালিবের কবর যিায়ারতের ইচ্ছুক ছিলেন। [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সফরের কিছু কিছু ঘটনা বর্ণনা করতেন। হিজরতের পর তিনি বনী নাজ্জারের ঘর বাড়ী দেখে বলেন, আমার মা এখানেই অবতরণ করেছিলেন এবং বনী আদী ইবন্ নাজ্জারের বাউলীতে (সিড়ি যুক্ত বড় কুয়া) আমি খুব লাফালাফি করেছিলাম। (দ্র : আয যারকানী, শারহ’ আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়া, ১ম খণ্ড, (মিসর: আল মাতবা‘আতুশ শাফেঈয়্যাহ, তা.বি.), পৃ.১৬৭-১৬৮)।] মক্কা প্রত্যাবর্তনের পথে ‘আল-আবওয়া’ [জায়গাটি মস্তুরার নিকটবর্তী যা এখন মক্কা ও মদিনার মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ স্থান।] নামক স্থানে বিবি আমেনা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং কিছুদিন পর সেখানেই মারা যান। মাতৃবিয়োগের শোকে তিনি তখন বিহ্বল হয়ে উঠেন; উম্মে আয়মান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন এবং দাদা আব্দুল মোত্তালিবের নিকট সোর্পদ করেন।
এরপর তিনি দাদার স্নেহ ছায়ায় অবস্থান করেন, তিনি তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতেন এবং সব সময় নিজের সঙ্গে রাখতেন। কাবা শরীফের ছায়ায় স্বীয় ফরাশের উপর সাথে নিয়ে বসতেন এবং নানাভাবে স্নেহ ও ভালবাসার প্রকাশ ঘটাতেন। [ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৮।] দু’বছর যেতে না যেতেই তাঁর বয়স যখন আট হল তখন তাঁর দাদা এ অস্থায়ী জগত ছেড়ে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি জমান। এভাবে শিশুকালেই যাবতীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষন ও প্রতিপালনের বস্তুগত উপকরণ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়ে এক ও অপরিসীম ক্ষমতাধর বেনিয়াজ আল্লাহর শিক্ষা-প্রশিক্ষন ও প্রতিপালনের জন্য নির্বাচিত হন।
আব্দুল মোত্তালিব মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় পুত্র আবু তালেবকে ওসিয়ত করে গেলেন; তিনি যেন ভাতৃষ্পুত্রের বিশেষভাবে যত্ন নেন। আব্দুল্লাহ ও আবু তালিব উভয়ে ছিলেন সহোদর ভাই। পিতার অন্তিম উপদেশ এবং নিজের স্বাভাবিক স্নেহবশতঃ আবু তালিব এতিম ভাতিজার প্রতিপালন করতে থাকেন। তিনি তাকে সর্বদা চোখে চোখে রাখতেন। শোবার সময় এবং কোথাও বেড়াতে গেলেও তাঁকে ছাড়া যেতেন না। বয়োঃবৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য ও চরিত্র মাধুরী এমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল যে, আবু তালিব তা দেখে এতিম ভাতিজার প্রতি আরও বেশী অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভাতিজার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ মমতা অক্ষুন্ন ছিল।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৈহিক ক্রম বিকাশ অন্যান্য শিশুদের তুলনায় হৃষ্টপুষ্ট ও মোটা ছিল। এমনকি দু’বছর বয়সে তাঁকে খুব বড় দেখাত। প্রথানুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে আসা হল, কিন্তু হালিমা শিশুটিকে আরও কিছুদিন প্রতিপালনের আকাংখা ব্যক্ত করেন। বিবি আমেনা হালিমার আকুতি দেখে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পুণরায় তার নিকট ফিরিয়ে দেন। [ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬২-১৬৪।]
হালিমার গৃহে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্বীয় দুধ ভাইদের সাথে খেলাধুলার উদ্দেশ্যে মাঠে যেতেন। এ সময় একদা জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আগমন করলেন এবং দেখলেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলা করছেন। তিনি তাঁকে ধরে শুইয়ে দিলেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৃৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ হতে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন, এ অংশটি হল শয়তানের। এরপর জিব্রাইল আলাইহিস সালাম হৃৎপিণ্ডটি একটি স্বর্নের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। অন্য শিশুরা ছুটে বিবি হালিমার কাছে গিয়ে বললো, মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরিবারের লোকেরা ছুটে এসে দেখলো তিনি বিবর্ণমুখে বসে আছেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষে সেই সিলাই এর চিহ্ন দেখেছি। [ইমাম মুসলিম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, (কিতাবুল ঈমান, বাবুল ইসরা), পৃ.৯২।] সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল চার বা পাঁচ বছর। [অধিকাংশ সীরাত রচয়িতা এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ( ইবন সা’দ, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ.১১২) কিন্তু ইবন ইসহাকের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিন বছর বয়সে এ ঘটনা ঘটেছিল। ( ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৪-১৬৫)।] এভাবে পরবর্তীতেও তাঁর বক্ষ বিদীর্ণের ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে। [রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোটা জীবনে বক্ষবিদারনের ঘটনা মোট চারবার সংগঠিত হয়েছে। প্রথমবার শৈশবে, দ্বিতীয়বার দশ বছর বয়সে, তৃতীয়বার যখন তিনি চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হন এবং চতুর্থবার মে’রাজে যাওয়ার প্রাক্কালে সংগঠিত হয়। (মুহাম্মদ ইদ্রীস কান্দাহলভী, প্রাগুক্ত,১ম খন্ড, পৃ. ৭৭-৭৮) প্রথমবার তাঁর কলব হতে জমাট বাধা কালো অংশ যা পাপের উৎস তা পবিত্র পানি দ্বারা ধৌত করা হয়। দ্বিতীয়বার যেহেতু দশ বছর বয়সে তিনি উপনীত হয়েছেন এবং এ মূহুর্তে তাঁর মন মানসিকতা বালকসূলভ হওয়ায় খেলাধুলার দিকে বেশী ঝুঁকে পড়া স্বাভাবিক ছিল তাই, এ প্রবণতাকে দূর করার জন্য এ পর্যায়ে বক্ষবিদীর্ণ হয়। তৃতীয়বার ওহী লাভের সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ রহস্যাবলী এবং আল্লাহর কালামকে ধারণের যোগ্য করে তোলা হয়েছে। চতুর্থবার তাঁর দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিক হতে আল্লাহর দর্শন লাভে ও মহাসৃষ্টির গুরু রহস্যাবলী পরিদর্শনের উপযুক্ত করে দেয়া। ( মুহাম্মদ ইদ্রীস কান্দাহলভী, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ৮৩-৮৪)।] এদিকে ইঈিত করেই মহান আল্লাহ বলেন,
﴿أَلَمۡ نَشۡرَحۡ لَكَ صَدۡرَكَ ١ ﴾ [ الشرح : ١ ]
‘‘হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আপনার বক্ষকে বিদীর্ণ করে দেইনি?’’ [আল-কুরআন, সূরা আশ্ শরাহ : ১।]
এঘটনার পর তিনি (হালিমা) ভীত হয়ে পড়লেন এবং শিশুকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। [ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৮] মা আপন সন্তানকে সুস্থ সবল দেখে প্রীত হন এবং স্নেহ ভালবাসা ও আদর সোহাগ দিয়ে লালন-পালনে সচেষ্ট হন। তাঁর দেখাশুনা ও তত্বাবধানের জন্য স্বীয় পরিচারিকা উম্মু আয়মানকে নিযুক্ত করেন। [তার আসল নাম বারাত, তিনি আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন। ‘উবায়দ ইবনুল হারিছ’ আল-খাযরাজীর সাথে প্রথম তার বিয়ে হয়। এ ঘরে আয়মান নামক একজন পুত্র জন্মে। এ সুত্রেই তার নাম হয় উম্মে আয়মান। উপরন্তু তার মৃত্যুর পর তিনি যায়দ ইবন হারিছের সাথে পরিবার সূত্রে আবদ্ধ হন। (ইসলামী বিশ্বকোষ, প্রাগুক্ত, ২০শ খন্ড, পৃ. ৫৭১-৫৭২)।]
তাঁর বয়স যখন ছয় বছর তখন তাঁর মা তাঁকে দাদার মাতৃকুলকে দেখাবার নিমিত্তে তাঁকে ইয়াসরিব নিয়ে যান। তিনি তাঁর প্রিয়তম স্বামী আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মোত্তালিবের কবর যিায়ারতের ইচ্ছুক ছিলেন। [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সফরের কিছু কিছু ঘটনা বর্ণনা করতেন। হিজরতের পর তিনি বনী নাজ্জারের ঘর বাড়ী দেখে বলেন, আমার মা এখানেই অবতরণ করেছিলেন এবং বনী আদী ইবন্ নাজ্জারের বাউলীতে (সিড়ি যুক্ত বড় কুয়া) আমি খুব লাফালাফি করেছিলাম। (দ্র : আয যারকানী, শারহ’ আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়া, ১ম খণ্ড, (মিসর: আল মাতবা‘আতুশ শাফেঈয়্যাহ, তা.বি.), পৃ.১৬৭-১৬৮)।] মক্কা প্রত্যাবর্তনের পথে ‘আল-আবওয়া’ [জায়গাটি মস্তুরার নিকটবর্তী যা এখন মক্কা ও মদিনার মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ স্থান।] নামক স্থানে বিবি আমেনা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং কিছুদিন পর সেখানেই মারা যান। মাতৃবিয়োগের শোকে তিনি তখন বিহ্বল হয়ে উঠেন; উম্মে আয়মান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন এবং দাদা আব্দুল মোত্তালিবের নিকট সোর্পদ করেন।
এরপর তিনি দাদার স্নেহ ছায়ায় অবস্থান করেন, তিনি তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতেন এবং সব সময় নিজের সঙ্গে রাখতেন। কাবা শরীফের ছায়ায় স্বীয় ফরাশের উপর সাথে নিয়ে বসতেন এবং নানাভাবে স্নেহ ও ভালবাসার প্রকাশ ঘটাতেন। [ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৮।] দু’বছর যেতে না যেতেই তাঁর বয়স যখন আট হল তখন তাঁর দাদা এ অস্থায়ী জগত ছেড়ে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি জমান। এভাবে শিশুকালেই যাবতীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষন ও প্রতিপালনের বস্তুগত উপকরণ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়ে এক ও অপরিসীম ক্ষমতাধর বেনিয়াজ আল্লাহর শিক্ষা-প্রশিক্ষন ও প্রতিপালনের জন্য নির্বাচিত হন।
আব্দুল মোত্তালিব মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় পুত্র আবু তালেবকে ওসিয়ত করে গেলেন; তিনি যেন ভাতৃষ্পুত্রের বিশেষভাবে যত্ন নেন। আব্দুল্লাহ ও আবু তালিব উভয়ে ছিলেন সহোদর ভাই। পিতার অন্তিম উপদেশ এবং নিজের স্বাভাবিক স্নেহবশতঃ আবু তালিব এতিম ভাতিজার প্রতিপালন করতে থাকেন। তিনি তাকে সর্বদা চোখে চোখে রাখতেন। শোবার সময় এবং কোথাও বেড়াতে গেলেও তাঁকে ছাড়া যেতেন না। বয়োঃবৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য ও চরিত্র মাধুরী এমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল যে, আবু তালিব তা দেখে এতিম ভাতিজার প্রতি আরও বেশী অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভাতিজার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ মমতা অক্ষুন্ন ছিল।