hadith book logo

নবী মুহাম্মদ সা. এর আগমনের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, দা‘ওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল

লেখকঃ ড. মো: আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের উদ্দেশ্য

মানুষ আশরাফুল মাখলূকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব। ফেরেশ্‌তাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তিনি মানুষকে খলীফা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। [ ﴿ وَإِذۡ قَالَ رَبُّكَ لِلۡمَلَٰٓئِكَةِ إِنِّي جَاعِلٞ فِي ٱلۡأَرۡضِ خَلِيفَةٗۖ قَالُوٓاْ أَتَجۡعَلُ فِيهَا مَن يُفۡسِدُ فِيهَا وَيَسۡفِكُ ٱلدِّمَآءَ وَنَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَۖ قَالَ إِنِّيٓ أَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُونَ ٣٠ ﴾ [ البقرة : ٣٠ ] -কুরআন, সূরাআল-বাকারা : ৩০।] যাতে মানবজাতি তাঁর প্রশংসা, গুণগান, নি‘আমতরাজির কৃতজ্ঞতা ও ইবাদত-বন্দেগীতে রত থেকে জীবন অতিবাহিত করে। আর এ সকল কার্যাবলী কোন পন্থায় ও কি পদ্ধতিতে পালন করবে সে মর্মে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ হয়েছে। মানব জাতির আদি পূরুষ আদম আলাইহিস সালাম-কে সৃষ্টির মাধ্যমেই এ পৃথিবীতে মানুষের পদচারণা শুরু হয়। তিনি শুধুমাত্র একজন মানবই ছিলেন না বরং তাঁকে নবী হিসেবে এ দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। [নবী হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে কুরআনুল কারীমে আদম আলাইহিস সালাম-এর উল্লেখ না থাকলেও পরোক্ষভাবে উল্লেখ আছে। যেমন : ﴿۞إِنَّ ٱللَّهَ ٱصۡطَفَىٰٓ ءَادَمَ وَنُوحٗا وَءَالَ إِبۡرَٰهِيمَ وَءَالَ عِمۡرَٰنَ عَلَى ٱلۡعَٰلَمِينَ ٣٣ ﴾ [ ال عمران : ٣٣ ] আল-কুরআন, সূরা আন নিসা : ৩৩ ; সূরা ত্বা-হা: ১২০-১২১। তবে রাসূলের হাদীসে তাঁকে স্পষ্ট ভাষায় নবী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, أَنَبِيٌّ كَانَ آدَمُ؟ قَالَ : «نَعَمْ، مُكَلَّمٌ» আদম কি নবী ছিলেন? জবাবে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, তাঁর সাথে (আল্লাহর) কথাও হয়েছে।” [সহীহ ইবন হিব্বান, হাদীস নং ৬১৯০ (সম্পাদক)] নবী শব্দটি একবচন, বহুবচনে الأنبياء । যা আরবী نبا ধাতু হতে নির্গত। যার অর্থ হলো সংবাদ। নবীগণ যেহেতু আল্লাহর পক্ষ হতে সংবাদ বাহকের দায়িত্ব পালন করেন এ জন্য তাদেরকে নবী বলা হয়। মানুষের মধ্য হতে যাদের মর্যাদাকে সুউচ্চ ও সম্মানিত করার নিমিত্তে আল্লাহ ওহী দ্বারা বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান প্রদানের জন্যে নির্বাচিত করেছেন তাঁরাই নবী। (আবু বকর যাবের, আকীদাতুল মু’মিন, (জিদ্দা : দারুশ শূরুক, ৫ম সংস্করণ-১৯৮৭), পৃ. ২৬৯। কারো কারো মতে, নবী শব্দটি ‘নাবয়াতুন’ হতে নির্গত। অর্থ উন্নত ও উচ্চ মর্যাদাবান বস্তু। নবী সাধারণ মানুষের তুলনায় উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এ হিসেবে তাকে নবী বলা হয়। আন-নাবীয়্যুন শব্দের অর্থ সরল ও স্পষ্ট পথও হতে পারে। নবীগণ নিজেরা সরল ও স্পষ্ট পথে চলেন এবং মানুষকে সে পথে আহবান করেন, তাই তাদের নবী বলা হয়। (ইবন মানযূর, লিসানুল আরব, ১ম খন্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৪)] পৃথিবীর যাবতীয় বস্তুর বাহ্যিক পরিচয় ও লক্ষণ এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্যাবলী মহান আল্লাহ তাঁকে ব্যাপকভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, [কুরআনের বাণী : ﴿ وَعَلَّمَ ءَادَمَ ٱلۡأَسۡمَآءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمۡ عَلَى ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ فَقَالَ أَنۢبِ‍ُٔونِي بِأَسۡمَآءِ هَٰٓؤُلَآءِ إِن كُنتُمۡ صَٰدِقِينَ ٣١ ﴾ [ البقرة : ٣١ ]‘‘আর তিনি আদম আলাইহিস সালাম-কে যাবতীয় বস্ত্তর নাম শিক্ষা দিলেন। অতঃপর সে সমুদয় ফেরেশ্‌তাদের সামনে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এ সকল নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’’ আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা : ৩১।] যেন তিনি এ সমুদয় বস্তুর পরিচিতি লাভের মাধ্যমে আল্লাহর নির্ধারিত পথে নিজকে পরিচালিত করতে পারেন এবং তাঁর সন্তানাদিও সে পথের অনুগামী হতে পারে। অতএব, জীবন চলার সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য পৃথিবীতে নবী-রাসূলগণের আগমন হয়েছে। সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত পৃথিবীর এমন কোন সম্প্রদায় নেই যাদের নিকট সতর্ককারী প্রেরণ করা হয় নি। [ ﴿ إِنَّآ أَرۡسَلۡنَٰكَ بِٱلۡحَقِّ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗاۚ وَإِن مِّنۡ أُمَّةٍ إِلَّا خَلَا فِيهَا نَذِيرٞ ٢٤ ﴾ [ فاطر : ٢٤ ] ‘‘এমন কোন সম্প্রদায় নেই, যার নিকট সতর্ককারী প্রেরণ করা হয়নি।’’ আল-কুরআন, সূরা ফাতির : ২৪।] আর এ সতর্ককারী হলেন নবী বা নবুয়তের আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ। [জালালূদ্দীন সূয়ূতী ও মাহাল্লী, তাফসীরে জালালাইন, (চীন: পিকিং প্রেস, ১৯৮২খৃ. ১৪০২ হি.), পৃ. ৫৭৭।] মানব জাতিকে স্রষ্টার পক্ষ থেকে সতর্ককারী ও পথপ্রদর্শকরূপে আগমনকারী মহামানবগণকে কুরআনুল কারীমে নবী ও রাসূল রূপে অভিহিত করা হয়েছে। মানুষ ও ফেরেশ্‌তা এ দু’শ্রেণীর মধ্য হতেই আল্লাহ তাদের মনোনীত করেন। [এ মর্মে পবিত্র কুরআনে এসেছে, ﴿ ٱللَّهُ يَصۡطَفِي مِنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ رُسُلٗا وَمِنَ ٱلنَّاسِۚ إِنَّ ٱللَّهَ سَمِيعُۢ بَصِيرٞ ٧٥ ﴾ [ الحج : ٧٥ ] ‘আল্লাহ ফেরেশ্‌তাদের মধ্য হতে মনোনীত করে বাণী বাহক এবং মানুষর মধ্য হতেও ; আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সম্যকদ্রষ্টা।’’ আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ৭৪।]

আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র সৃষ্টিকে তাঁর ইবাদত-বন্দেগী ও গুণাগুণ বর্ণনা করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। [এ মর্মে তিনি বলেন, ﴿ وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ ﴾ [ الذاريات : ٥٦ ] ‘‘আমি মানুষ এবং জ্বিন জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’’ আল-কুরআন, সূরা আয্ যারিয়াত : ৫৬।] কিন্তু এ ইবাদত কোন পদ্ধতিতে কি রূপে করতে হবে তা সম্পর্কে মানুষ জ্ঞাত নয়। ফলে তিনি নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন, যাতে মানুষ যথাযথভাবে তা সম্পন্ন করতে পারে। আর এটি হল সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

মানুষের দু’টি জীবন রয়েছে। একটি ইহলৌকিক অপরটি পরলৌকিক। এ উভয় জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা কিসের উপর নির্ভরশীল তা নির্ণয় করার জন্য এবং মানব জাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে নবী-রাসূলগণের আগমন একান্ত অপরিহার্য ছিল।