hadith book logo

নবী মুহাম্মদ সা. এর আগমনের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, দা‘ওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল

লেখকঃ ড. মো: আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

১. শির্কের প্রচলন

শির্ক-এর শাব্দিক অর্থ অংশীদার স্থাপন করা, ঈমান কিংবা ইবাদতে অংশীদার করা। [ড. মুহাম্মদ ফজলূর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩১।] যারা আল্লাহর সাথে শির্ক স্থাপন করত তাদের মুশরিক বলা হয়। এটা তাওহীদের বিপরীত। তারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করত না; তাদের বেশিরভাগ লোক আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করত; কিন্তু তাঁর সাথে ইবাদতে অন্যকে অংশীদার সাব্যস্ত করত। এমর্মে পবিত্র কুরআনে এসেছেঃ

﴿ وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۖ فَأَنَّىٰ يُؤۡفَكُونَ ٦١ ﴾ [ العنكبوت : ٦١ ]

‘‘যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সূষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে কর্মে নিয়োজিত করেছে? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ, তাহলে তাদেরকে কোথায় ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে।’’ [আল-কুরআন, সূরা আনকাবুত : ৬১।]

এছাড়াও তারা বিশ্বাস করত যে, আল্লাহ তা‘আলাই আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যমীনকে জীবিত করেন, এবং মৃতকে জীবিত করেন, তদুপরি তারা শরিক স্থাপন হতে বিরত থাকত না। [পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে ﴿ وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّن نَّزَّلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَحۡيَا بِهِ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِ مَوۡتِهَا لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُۚ قُلِ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡقِلُونَ ٦٣ ﴾ [ العنكبوت : ٦٣ ] কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে ﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ ٦٥ ﴾ [ العنكبوت : ٦٥ ] অন্যত্র আরও বলা হয়েছে ﴿ قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ ٣١ ﴾ [ يونس : ٣١ ] আল-কুরআন, সূরা আনকাবুত : ৬৩ ও ৬৫; সূরা ইউনুস : ৩১।]

মোটকথা: তারা আল্লাহর রুবুবিয়তে বিশ্বাস পোষণ করত কিন্তু সেক্ষেত্রে বিভিন্ন শক্তির উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন উপাস্যের ধারণা করত, যেগুলোকে তাদের উপকারী, ক্ষতিসাধনকারী, অস্তিত্বদানকারী ও ধ্বংসকারী বলে মনে করত। [আবুল হাসান আলী আন্ নদভী, সিরাতুন নববীয়্যাহ, (লখনৌ: মাজ’মা ইসলামী ‘ইলমী, তা.বি), পৃ. ৩০।] এগুলোর ইবাদতে তাঁরা নিয়োজিত হত এ প্রত্যাশায় যে, এগুলো আল্লাহর নৈকট্য লাভে তাদের জন্য সুপারিশকারী হবে। পবিত্র কুরআনে তাদের আকীদা বিশ্বাস সম্পর্কে এসেছে,

﴿وَٱلَّذِينَ ٱتَّخَذُواْ مِن دُونِهِۦٓ أَوۡلِيَآءَ مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ٣ ﴾ [ الزمر : ٣ ]

‘‘যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদত এজন্যই করি, যে তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে।’’ [আল-কুরআন, সূরা আয্-যূমার : ৩।]

তাছাড়া তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর রুবুবিয়াত তথা আল্লাহর সত্ত্বা, তার কর্মকাণ্ড ও গুণাগুণেও শির্ক করত। তাই তো দেখা যায়, আরবের মুশরিকরা ফেরেশ্‌তাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যায়িত করত। ‘‘জ্যোতিষির’’ [জ্যেতিষী সেসব লোককে বলা হতো, যারা নক্ষত্রের গতি সম্পর্কে গবেষণা করতো এবং হিসাব-নিকাশ করে বিশ্বের ভবিষ্যত ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করতো। (মোল্লা আলী ক্বারী, মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ, ২য় খন্ড, (লক্ষ্ণৌ : তা.বি), পৃ. ৩)।] কথার উপর ছিল তাদের পূর্ণ আস্থা। [তাহের সূরাটী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১৩।] জ্যোতিষিরা কিছু জিন হাসিল করে তাদের মাধ্যমে বহু কল্পিত, মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী করে জনসাধারণ হতে বহু অর্থ উপার্জন করত। মূলতঃ এটা ছিল তাদের উপার্জনের মাধ্যম। মানুষকে ধোঁকা দিয়ে টাকা পয়সা লুট করাই ছিল তাদের পেশা। [আমর ইবন লূয়াই বনু খোজা‘আ গোত্রের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। ছোটবেলা থেকে এ লোকটি ধর্মীয় পূণ্যময় পরিবেশে প্রতিপালিত হয়েছিল। ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল অসামান্য। সাধারণ মানুষ তাকে ভালবাসার চোখে দেখতো এবং নেতৃস্থানীয় ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে মনে করে তার অনুসরণ করতো। এক পর্যায়ে এ লোকটি সিরিয়া সফর করে। সেখানে যে মূর্তিপূজা করা হচ্ছে সে মনে করলো এটাও বুঝি আসলেই ভাল কাজ। যেহেতু সিরিয়ায় অনেক নবী আবির্ভূত হয়েছেন এবং আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছে। কাজেই সিরিয়ার জনগণ যা করছে সেটা নিশ্চয় ভালো কাজ এবং পূণ্যের কাজ। এরূপ চিন্তা করে সিরিয়া থেকে ফেরার পথে সে ‘হুবাল’ নামের এক মূর্তি নিয়ে এসে সেই মূর্তি কা‘বাঘরের ভেতর স্থাপন করলো। এরপর সে মক্কাবাসীদের মূর্তিপূজার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে শির্ক করার আহবান জানালো। মক্কার লোকেরা ব্যাপকভাবে তার ডাকে সাড়া দেয়। মক্কার জনগণকে মূর্তিপূজা করতে দেখে আরবের বিভিন্ন এলাকার লোকজন তাদের অনুসরণ করলো। কেননা, কা‘বাঘরের রক্ষাণাবেক্ষনকারীদের বৃহত্তর আরবের লোকেরা ধর্মগুরু মনে করতো । (শায়খ মু?হাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদী, মুখতাছারুস সীরাত, প্রাগুক্ত, পৃ. ২)।]