hadith book logo

নবী মুহাম্মদ সা. এর আগমনের প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, দা‘ওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল

লেখকঃ ড. মো: আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

তিন. আখেরাতের জীবনকে অগ্রাধিকার দান

দুনিয়ার এ জীবন অত্যন্ত ক্ষনস্থায়ী। এখানে মানুষ যদি ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে যায়, তাহলে পরকালীন জীবনে এর চরম মূল্য দিতে হবে। দুনিয়ার প্রতি আসক্তি মানুষকে অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন ও যাবতীয় অবৈধ পথে পা বাড়াতে সহায়তা করে। অপরদিকে আখেরাতের চিন্তা মানুষের মাঝে আল্লাহ প্রেম, আল্লাহ্‌ভীতি, সৎকর্ম ইত্যাদি কাজে উৎসাহ যোগায়, পবিত্র কুরআনে পার্থিব জীবনকে খেল-তামাসার বস্তু হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তদুপরি মানুষ এর পিছনে পাগলপারা হয়ে ছুটছে; লাগামহীন জীবন যাপন করছে এবং সীমাহীন ভোগে বিভোর হয়ে পড়ছে। মুমিনের জন্য এ পার্থিব জীবন শুধুমাত্র পরীক্ষার বস্তু বৈ কিছুই নয়। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে আখেরাতের জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে দুনিয়ার জীবনে প্রস্তুতিমূলক নেক আমল সম্পন্ন করার প্রতি আহবান জানান। কেননা, আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস মানুষকে দৃঢ়ভাবে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে। অন্যথায় যে কোন সময় তাগুতের প্ররোচণায় প্রতারিত হতে পারে। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,

﴿ وَلَا تَمُدَّنَّ عَيۡنَيۡكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعۡنَا بِهِۦٓ أَزۡوَٰجٗا مِّنۡهُمۡ زَهۡرَةَ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا لِنَفۡتِنَهُمۡ فِيهِۚ وَرِزۡقُ رَبِّكَ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰ ٢ ﴾ [ طه : ١٣١ ]

‘‘আমি তাদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেসব বস্ত্তর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেয়া রিযক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।’’ [আল-কুরআন, সূরা ত্বা-হা : ১৩১।]

অতএব, মানুষের ভোগের সামগ্রী নগন্য ও ক্ষণস্থায়ী, আর আল্লাহর নিকট যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী। এ মর্মে সূরা আল-কাসাসে এসেছে,

﴿ وَمَآ أُوتِيتُم مِّن شَيۡءٖ فَمَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَزِينَتُهَاۚ وَمَا عِندَ ٱللَّهِ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ٦٠ ﴾ [ القصص : ٦٠ ]

‘‘তোমাদের যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও শোভা এবং আল্লাহর নিকট যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না ?’’ [আল-কুরআন, সূরা আল-কাসাস : ৬০।]

দুনিয়ার প্রতি অত্যাধিক আসক্তি, মহববত ও ঝোঁকপ্রবণতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এ কারণে অতীতে অনেক জাতিকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এসেছে,

﴿وَكَمۡ أَهۡلَكۡنَا مِن قَرۡيَةِۢ بَطِرَتۡ مَعِيشَتَهَاۖ فَتِلۡكَ مَسَٰكِنُهُمۡ لَمۡ تُسۡكَن مِّنۢ بَعۡدِهِمۡ إِلَّا قَلِيلٗاۖ وَكُنَّا نَحۡنُ ٱلۡوَٰرِثِينَ ٥٨ ﴾ [ القصص : ٥٨ ]

‘‘আমি কত জনপদকে ধ্বংস করেছি যার অধিবাসীরা ভোগ সম্পদের দম্ভ করত। ধ্বংসের পর খুব কম লোকই এ গুলোতে বাস করত। আর আমি চুড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।’’ [আল-কুরআন, সূরা আল-কাসাস : ৫৮।]

তৎকালীন আরবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা‘ওয়াতের এ মহান মিশন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য পার্থিব বিভিন্ন প্রকার ভোগ-বিলাস সামগ্রীর প্রলোভন দেখায়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা ও আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখের প্রত্যাশায় তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ মর্মে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

«والله لو وضعوا الشمس عن يميني و القمر عن يساري على أن أترك هذا الأمر حتى يظهره الله أو أهلك فيه، ما تركته» .

‘‘আল্লাহর শপথ ! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদ এনে দিয়ে চাইত যে, আমি এ কাজ পরিত্যাগ করি, তথাপি আমি তা পাত্যিাগ করতাম না, যতক্ষন না আল্লাহ এ কাজকে সফল ও জয়যুক্ত করেন অথবা আমি এ কাজ করতে করতে শহীদ হয়ে যাই।’’ [সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত, ১ম খন্ড, পৃ. ১৬৬।]

অতএব, আখেরাতের চিন্তাই মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিতে সক্ষম হয়, যা মূলতঃ একজন মানুষের চুড়ান্ত সফলতার মনজিল। পরকালীন জীবনকে অগ্রাধিকার না দেয়ার জন্যে আল্লাহ তা‘আলা অসংখ্য জনপদকে ধ্বংস করেছেন, তারা আল্লাহ প্রদত্ত নি‘আমত লাভের পরও তার প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিল। দা‘ওয়াতের প্রাথমিক যুগে এ মর্মে মক্কাবাসীকে সাবধান কল্পে মহান আল্লাহ বলেন- ‘‘হে মক্কাবাসীগণ! তোমরা যে ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে অবাধ্য হয়েছ এবং তার (রাসূলের) সাথে বিরোধ করছো তোমাদের ন্যায় বহু জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি, যারা স্বীয় ভোগ-বিলাসের বস্তুতে গর্বিত ছিল এবং তারা আমার (আল্লাহ) প্রদত্ত্ব নি’আমতের প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিল।’’ [ইবন কাছীর, তাফসীরে ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩য় খন্ড, পৃ. ৪০৭।]