hadith book logo

সৎব্যক্তিদের আসরসমূহ থেকে চার আসর

লেখকঃ শাইখ আহমদ আর-রুমী আল-হানাফী রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

ইবাদতের মধ্যে কেনো কোনো উত্তম বিদ‘আত নেই?

কেউ হয়ত বলতে পারে যে, “এগুলো অপছন্দনীয় মন্দ বিদ‘আত বা বিদ‘আতে সাইয়্যেয়ার শ্রেণীভুক্ত নয়, বরং তা শরী‘য়তসম্মত ‘উত্তম বিদ‘আত’ বা বিদ‘আতে হাসানার শ্রেণীভুক্ত; সে তার কথার সপক্ষে যুক্তি হিসেবে বলে থাকে যে, সাহাবীদের পরে নবপ্রবর্তিত কিছু কিছু বিষয় উত্তম বলে বিবেচিত হয়েছে; যেমন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অতিথিশালা, সরাইখানা, পান্থশালা ইত্যাদি কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা সাহাবীদের যুগে তৈরি করা হয়নি। সুতরাং তা বিদ‘আতে হাসানাহ হিসেবে বিবেচিত হবে”

এর উত্তর তাকে বলা হবে যে, এ কথা বলার কোনো সুযোগ নেই; কারণ শরী‘য়তের বিশুদ্ধ দলিল দ্বারা যা উত্তম বলে প্রমাণিত হবে, তাতে দু’টি সম্ভাবনা হতে পারে।

এক. এগুলোকে বিদ‘আত হিসেবে ধরা হবে না, ফলে উপরোক্ত দু’টি হাদীসে বর্ণিত (‘প্রত্যেক বিদ‘আতই পথভ্রষ্টতা’) এই عام তথা সাধারণ বা ব্যাপক নির্দেশনা তার মূল অবস্থাতেই থাকবে, তাতে কোনে হের-ফের হবে না।

দুই. সেগুলোকে হাদীসে বর্ণিত (‘প্রত্যেক বিদ‘আতই পথভ্রষ্টতা’) এই عام তথা সাধারণ বা ব্যাপক নির্দেশনা থেকে খাস বা নির্দিষ্ট করে ব্যতিক্রম হুকুম দেওয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। (এখন দেখা যাক এ দু’টি সম্ভাবনার মধ্যে কোনটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।) যে ব্যক্তি নতুন প্রবর্তিত ইবাদতকে উত্তম বলে সাব্যস্ত করার জন্য এ দাবী করবে যে, হাদীসে বর্ণিত (‘প্রত্যেক বিদ‘আতই পথভ্রষ্টতা’) এই عام তথা সাধারণ বা ব্যাপক নির্দেশনা থেকে এগুলো খাস বা নির্দিষ্ট করে আলাদা বিধান দিয়ে বিশেষায়িত করা হয়েছে, তাকে বলা হবে যে, এ ( تخصيص ) বা বিশেষায়িত করার জন্য এমন দলীল প্রয়োজন যা বিশেষায়িত করার উপযুক্ত হবে। শুধুমাত্র দেশের অধিকাংশ মানুষের আচার-আচরণ কিংবা অনেক পীর-ফকীর বা সাধারণ ইবাদতকারীদের কথাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর ব্যাপক নির্দেশের বিপক্ষে বিশেষায়িতকারী হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। বিশেষায়িত করার দলিল তো কেবল কুরআন, সুন্নাহ ও ইজতেহাদের ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদের ইজমা। পীর-ফকীর ও ইবাদতকারীদের মধ্য থেকে যারা ইজতিহাদ করার যোগ্য নয়, তারা তো সাধারণ জনগণের কাতারে, তাদের কথা বিবেচনাযোগ্য হবে না, যদি না তা ইসলামের মৌলিক নীতিমালা ও গ্রহণযোগ্য গ্রন্থসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এটি এমন একটি নিয়ম, যার পক্ষে উম্মতের ইজমা বা ঐক্যবদ্ধ রায় নির্দেশনা প্রদান করে, তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলার কিতাবের মধ্যেও এমন বক্তব্য রয়েছে, যা এই নিয়মের দিকে ইঙ্গিত করছে; যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ ﴾ [ الشورى : ٢١ ]

“নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দ্বীন থেকে শরী‘আত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ২১] সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলা শরী‘য়ত হিসেবে প্রবর্তন করেননি এমন কোনো কথা বা কাজ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নতুনভাবে প্রবর্তন করে, সে তো দীনের মধ্যে এমন বিধানের প্রবর্তন করল, যার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা’র অনুমতি নেই; ফলে যে ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করবে, সে ব্যক্তি তাকে শরীক ও মা‘বুদ হিসেবে গ্রহণ করল; যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাবদের প্রসঙ্গে বলেছেন:

﴿ ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِ ﴾ [ التوبة : ٣١ ]

“তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগিদেরকে তাদের রবরূপে গ্রহণ করেছে ...।” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩২] আয়াত শোনার পর ‘আদী ইবন হাতেম রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা তো তাদের ইবাদত বা উপাসনা করে নি, জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«أطاعوهم» (তারা তাদের আনুগত্য করেছে) [ইমাম তিরমিযী অনুরূপ শব্দে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, অধ্যায়: আল-কুরআনের তাফসীর ( كتاب تفسير القرآن ), পরিচ্ছেদ: সূরা তাওবা থেকে ( باب و من سورة التوبة ): ৫/২৭২, হাদিস নং- ৩০৯৫, হাদিসটি মাস‘আব ইবন সা‘দের সূত্রে ‘আদী ইবন হাতেম রা. থেকে বর্ণিত; ইমাম তিরমিযী র. বলেন: এটি গরীব হাদিস।]; যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার অনুমতি বা অনুমোদনের বাইরে দীনের ব্যাপারে কাউকে অনুসরণ করে, সে ব্যক্তি তার উপাসনা করে এবং তাকে রব হিসেবে গ্রহণ করে। সুতরাং এ থেকে জানা গেল যে, নির্ভেজাল শারীরিক ইবাদতের মধ্যে প্রবর্তিত প্রত্যেকটি বিদ‘আত (নবপ্রবর্তিত বিধান) মন্দ বিদ‘আত ( البدعة السيئة ) বলে গণ্য হবে।

প্রায়শ অধিকাংশ মানুষ উত্তম ( حسنة ) ও মন্দ ( سيئة ) এ দুয়ের মাঝে কোনো পার্থক্য করতে সক্ষম হয় না; তারা ধারণা করে যে, এমন প্রত্যেক জিনিস, যাকে তাদের মন ভাল মনে করে এবং যার দিকে তাদের স্বভাব ঝুঁকে পড়ে, তা-ই উত্তম বলে বিবেচিত হবে; এভাবে তারা মন্দকেও উত্তম মনে করে বসে। এভাবে প্রকৃতপক্ষে তারা অন্ধের ন্যায় আন্দাজে পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে, তারা ধ্বংসাত্মক গর্তের পথ এবং মুক্তির মহাসড়কের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারে না।