hadith book logo

সৎব্যক্তিদের আসরসমূহ থেকে চার আসর

লেখকঃ শাইখ আহমদ আর-রুমী আল-হানাফী রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

তিন যুগের মর্যাদা

তন্মধ্যে প্রথম যুগের লোকজনকে আল্লাহ এমন এক বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিশেষিত করেছেন, সে ক্ষেত্রে তাঁদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ অন্য কারও নেই, তাদের সাথে যুক্ত হওয়ারও কোনো পথ নেই; যেহেতু তাঁরা তাঁর নবীকে এবং তাঁর প্রতি আল-কুরআন নাযিলের দৃশ্যকে অবলোকন করেছেন এবং তা সংরক্ষণ করার জন্য তাঁদেরকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন, যাতে একটি বর্ণও বিনষ্ট না হয়, অতঃপর তাঁরা তা একত্রিত করেছেন এবং তাকে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তাঁরা তাঁদের নবীর হাদিসসমূহকে তাঁদের হৃদয়ে সংরক্ষণ করেছেন এবং তাকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন; আর এই দীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁরা এমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, যা আয়ত্ত করা এবং সে অবস্থানে পৌঁছা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁদেরকে তাদের নবীর উম্মতের পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দান করুন।

তারপর তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হলেন তাবে‘য়ীগণ; তাঁরা যেসব হাদিস ও দীনের মাসআলা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, সেগুলো সংকলন করেছেন এবং সাহাবীদের নিকট থেকে শরী‘য়তের হুকুম-আহকাম ও তাফসীর বর্ণনা করেছেন, এমনকি তাঁদের কেউ কেউ একটি হাদিস ও একটি মাসআলার সন্ধানে এক মাস অথবা দুই মাসের পথ ভ্রমণ করেছেন। আর তাঁরা শরী‘য়তের বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করেছেন; সুতরাং এই দীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁদেরও অনেক মর্যাদা হাসিল হয়েছে।

অতঃপর তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হলেন তাবে-তাবে‘য়ীগণ (তাবে‘য়ীগণের অনুসারীগণ), যাঁদের মাঝে আত্মপ্রকাশ করেছে নির্ভরযোগ্য ফকীহগণ; অতঃপর তাঁরা আল-কুরআনকে সহজ সংকলন অবস্থায় পেয়েছে, আর হাদিসসমূহকে পেয়েছে গচ্ছিত ও সুবিন্যস্ত অবস্থায়; ফলে তাঁরা শরী‘য়তের নিয়মকানুনের দাবি অনুযায়ী কুরআন ও হাদিস বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন, তার থেকে মূলনীতিমালা অনুযায়ী বিধিবিধান উদ্ভাবন করেছেন এবং দলিল-প্রমাণসমূহের কারণ নির্ণয় করেছেন ও মানুষের জন্য তা সহজ করেছেন; আর তাঁদের কারণে পরিস্থিতি সুশৃঙ্খল হয়েছে এবং উম্মতে মুহাম্মদী’র দীন স্থিতিশীল হয়েছে; ফলে এই দীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁদের জন্যও অনেক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হাসিল হয়েছে।

অতঃপর তাঁরা যখন তাঁদের পথে চলে গেলেন, তখন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের আগমন হল, এ প্রজন্ম বাস্তবায়ন করার মত কোনো দায়িত্বই পেল না, বরং তারা সে বিষয়টিকে পরিপূর্ণ অবস্থায় পেল; পূর্ববর্তীগণ যা উদ্ভাবন ও বর্ণনা করেছেন, তাদের জন্য তা সংরক্ষণ ও আত্মস্থ করা ছাড়া আর কোন দায়িত্বই অবশিষ্ট রইল না। ফলে এটা স্থিরিকৃত হয়ে গেল যে, পূর্ববর্তীদের অনুসরণ, অনুকরণ ও তাঁদের মানদণ্ডে টিকে থাকা ব্যতীত তারা তাদের জন্য ভাল কিছু অর্জন করবে না। সুতরাং পূর্ববর্তীদের ফিকহের বাইরে যদি তারা কোনো ফিকহের উদ্ভাবন ঘটায় তা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে, যদি না তা এমন বিষয় হয়, যার বর্ণনা তাঁদের (পূর্ববর্তীদের) সময়কার কর্ম ও কথায় সংঘটিত হয়নি এবং এমন বিষয় হয়, যার বিধি-বিধান জানার ক্ষেত্রে তাঁদের নিয়ম-কানুন ও তাঁদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত প্রমাণের আলোকে তা সংঘটিত হয়। সুতরাং যখন তা তাঁদের মূলনীতিমালার আলোকে হবে, তখন তার পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করা হবে, নচেৎ গ্রহণ করা হবে না; কারণ, তাঁদের পরে যাদের আগমন ঘটেছে, তাদের প্রত্যেকেই বিদ‘আতের ব্যাপারে বলে যে, তা মুস্তাহাব, অতঃপর সে (বিদ‘আতকে মুস্তাহাব সাব্যস্ত করার জন্য) এ বিষয়ে তাঁদের মূলনীতিমালার বাইরে দলিল নিয়ে আসে; সুতরাং এটা তার পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, শুধু ভাল ধারণার কারণে কেবল ঐ ব্যক্তিরই অনুসরণ ও অনুকরণ অন্যের জন্য জায়েয হবে, যিনি ন্যায়পরায়ণ মুজতাহিদ (গবেষক) হবেন। কোনো মুকাল্লিদ তথা অনুসরণকারীর অনুসরণ বৈধ হবে না।

কিন্তু যখন দীর্ঘসময় ধরে ইজতিহাদ বন্ধ হয়ে আছে, তখন কোনো মুজতাহিদের মাযহাব বা মত জানার জন্য কেবল আলেমদের মাঝে প্রচলিত গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ সংকলনের সাহায্য নেওয়াতেই সীমাবদ্ধ। তাও ঐ ব্যক্তির জন্য যিনি উক্ত গ্রন্থ থেকে মুজতাহিদের মত বের করতে সক্ষম। কিন্তু যিনি গ্রন্থ থেকে মাযহাবের মত বের করতে সক্ষম নন, তার জন্য সে মুজতাহিদের মত জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে জ্ঞান ও আমলের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ বিশ্বস্ত ব্যক্তির সংবাদ। সুতরাং গ্রন্থ পেলেই তার উপর আমল শুরু করে দেওয়া বৈধ হবে না; কারণ, এ যুগে এমন বহু গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে, যা দুর্বল ব্যক্তিগণ প্রকৃত অবস্থা না জেনেই সংকলন করেছে, তেমনিভাবে প্রত্যেক আলেমের কথায়ও আমল করা বৈধ হবে না, যেহেতু তিন যুগের পরে মানুষের মধ্যে পাপাচার বৃদ্ধি পেয়েছে, আর অপরিচিত বা অজ্ঞাত ব্যক্তি ফাসিকের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত [আর এটা স্বীকৃত শর‘য়ী নিয়েমের পরিপন্থী; কারণ, মুসলিমের ক্ষেত্রে মূলনীতি বা মূলকথা হল সত্যবাদিতা, তবে যখন তারা মিথ্যাবাদিতা প্রকাশ পেয়ে যাবে, তখন তার ন্যায়পরায়ণতার দিকটির পতন হয়ে যাবে।]। সুতরাং দ্বীনের (মুজতাহিদের) সত্যিকার মত জানার ক্ষেত্রে অনিবার্যভাবেই প্রাধান্যপ্রাপ্ত ন্যায়পরায়ণতার দিকটি থাকতে হবে।

তারপর এখানে একটি স্বীকৃত নিয়ম রয়েছে, যা জানা খুবই জরুরি; আর তা হল, ফিকহ সংক্রান্ত মাসআলা যখন বর্ণনা করা হবে, তখন উচিত হবে তার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া;

অতঃপর যদি দেখা যায় যে, তার উৎস কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা’র মত সুপরিচিত ও প্রসিদ্ধ, তাহলে সেটা মানার ব্যাপারে কারও পক্ষ থেকে কোনো বিতর্ক নেই।

কিন্তু যদি তার উৎসস্থল সুবিদিত না হয়, বরং তা ইজতিহাদী (গবেষণাগত) বিষয় হয়,

তাহলে বর্ণনাকারী মুজতাহিদ (গবেষক) হলে, মুকাল্লিদ (অনুসরণকারী) ব্যক্তির উপর তাকে অনুসরণ করা অপরিহার্য হবে এবং তার নিকট দলিল চাওয়াটা তার উপর আবশ্যক হবে না; কারণ, মুজতাহিদের কথাই তার জন্য দলিল;

আর বর্ণনাকারী যদি মুজতাহিদ না হয় বরং মুকাল্লিদ হয়,

১- তাহলে সে যদি মুজতাহিদ থেকে বর্ণনা করে এবং তার থেকে তার বর্ণনা করাটা যদি প্রমাণিত হয়, তবে এই ক্ষেত্রেও অনুসরণ করাটা অপরিহার্য হবে;

২- কিন্তু সে যদি মুজতাহিদ থেকে বর্ণনা না করে বরং তার নিজের পক্ষ থেকে বর্ণনা করে অথবা অপর কোন মুকাল্লিদের পক্ষ থেকে বর্ণনা করে অথবা সে সাধারণভাবে বর্ণনা করে,

ক. তখন সে যদি এই ক্ষেত্রে শরী‘য়ত সম্মত দলিল বর্ণনা করে, তাহলে তখন তার ব্যাপারে কোন কথা থাকবে না;

খ. আর যদি তা বর্ণনা করা না হয়, তবে সে বিষয়টি লক্ষ্য করতে হবে,

‍এক. যদি তার কথা মূলনীতি ও গ্রহণযোগ্য গ্রন্থসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তাতে কোনো প্রকার বিরোধ না থাকে, তাহলে তার উপর আমল করা জায়েয (বৈধ) হবে; কিন্তু তার উপর আমলকারী ব্যক্তির জন্য উচিত হবে, অন্ধ অনুসরণ করার জায়গায় অবস্থান না করে বরং তার নিকট বর্ণনার পক্ষে দলিল দাবি করা।

দুই. আর যদি তার কথা মূলনীতি ও গ্রহণযোগ্য গ্রন্থসমূহের সাথে বিরোধপূর্ণ হয়, তাহলে সে দিকে মোটেই দৃষ্টি দেওয়া যাবে না; কেননা, আলেমগণ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, “যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয়ের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে জানা যাবে না ততক্ষণ পর্যন্ত তার অনুসরণ করা শুদ্ধ হবে না, যদিও তার কাছে বিষয়টি বাতিল হওয়া জানা না যায়”। তাহলে যেটার বাতিল হওয়ার বিষয়টি জানা যাবে সেটার অনুসরণ করা তো কোনোক্রমেই বিশুদ্ধ হবে না।