hadith book logo

সৎব্যক্তিদের আসরসমূহ থেকে চার আসর

লেখকঃ শাইখ আহমদ আর-রুমী আল-হানাফী রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

কবরপূজায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণসমূহ (কবর কেন্দ্রীক বানোয়াট হাদিস)

কবর পূজারীরা এ কবর পূজার মত ফেতনায় জড়িয়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে,

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে তাওহীদ তথা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা ও শির্কের সকল উপায়-উপকরণ মুলোৎপাটন করার যে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতা। সুতরাং যাদের মধ্যে এ জ্ঞানের স্বল্পতা রয়েছে, তাদেরকে যখন শয়তান এ কবর পূজার মত ফিতনার দিকে আহ্বান করে এবং তাদের নিকট এমন কোনো জ্ঞানগত পুঁজি না থাকে যা দ্বারা তারা শয়তানের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, তখন তারা তাদের নিকট বিদ্যমান মূর্খতা ও অজ্ঞতার অনুসারে তার আহ্বানে সাড়া দেয় এবং তাদের সাথে থাকা জ্ঞান পরিমাণ তার থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

কতগুলো লিখিত হাদিস, যেগুলো কবরের মত মূর্তিপূজারীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যারোপ করে রচনা করেছে; বস্তুত এ হাদিসগুলো তিনি যে দীন নিয়ে এসেছেন, তার সম্পূর্ণ বিরোধী; তেমন একটি (বানোয়াট) হাদিস:

« إذا تحيرتم في الأمور فاستعينوا بأهل القبور » .

“যখন তোমরা কোন কাজের ক্ষেত্রে দিশেহারা হয়ে যাবে, তখন তোমরা কবরবাসীদের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করবে।” [‘আজলূনী, কাশফুল খাফা ( كشف الخفاء ): ১/৮৫] অপর আরেকটি (বানোয়াট) হাদিস:

«إذا أعيتكم الأمور فعليكم بأصحاب القبور» .

“যখন কাজকর্ম তোমাদেরকে ক্লান্ত-শ্রান্ত করে, তখন তোমাদের উপর আবশ্যক হল কবরবাসীদের অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করা।” [শাইখুল ইসলাম বলেন: “এই হাদিসটি হাদিস বিশারদগণ ও আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আরোপিত মিথ্যা অপবাদ এবং নির্ভরযোগ্য হাদিসের গ্রন্থসমূহে এ ধরনের কিছুই পাওয়া যায় না”। দেখুন: আত-তাওয়াসসুল ওয়াল অসিলা ( التوسل والوسيلة ), পৃ. ২৯৭ এবং আর-রাদ্দু ‘আলাল বিকরী ( الرد على البكري ), পৃ. ৩০২ - ৩০৩] অপর আরেকটি (বানোয়াট) হাদিস:

« لو حسن أحدكم ظنَّه بحجر نفعه » .

“যদি পাথরের প্রতি তোমাদের কারও ধারণা ভাল হয়, তবে সেই পাথর তার উপকার করবে।” [‘তামঈযুত তায়্যিব মিনাল খাবীস’ ( تمييز الطيب من الخبيث ) এর ১৩৩ পৃষ্ঠায় এ হাদিসটি বর্ণনার পর বলা হয়েছে: ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা বলেন: নিশ্চয়ই হাদিসটি মিথ্যা ও বানোয়াট; আর ইবনু হাজার ‘আসকালানী র. বলেন: এর কোনো ভিত্তি নেই।] এই হাদিসগুলোর মত আরও বহু (বানোয়াট) হাদিস রয়েছে, যেগুলো দীন ইসলামের বিরোধী ও বিপরীত, যা কবরের মত মূর্তিপূজারীগণ তৈরি করেছে এবং যেগুলো অজ্ঞ ও পথভ্রষ্টদের মাঝে চালু রয়েছে; আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হল, তিনি লড়াই করবেন ঐ ব্যক্তির সাথে, যে পাথর ও বৃক্ষরাজির প্রতি (এ জাতীয়) সুধারণা পোষণ করে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে কবরের দ্বারা ফিতনায় নিপতিত হওয়ার সকল পথ থেকে দূরে রেখেছেন।

কবরবাসী প্রসঙ্গে বর্ণিত কাহিনীসমূহ; যেমন- অমুক ব্যক্তি কঠিন বিপদের সময় অমুক ব্যক্তির কবরের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করেছে, অতঃপর সে তা থেকে মুক্তি পেয়েছে। অমুক ব্যক্তির উপর বিপদ নাযিল হলো, অতঃপর এই কবরবাসীর নিকট আবেদন করল, ফলে তার ক্ষতিকর বিষয়টি দূর হয়ে গেল; অমুক ব্যক্তি কোনো এক প্রয়োজনে তাকে ডেকেছে, অতঃপর তার প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেছে। মূলত এসব কবরের খাদেম ও কবরপূজারীদের নিকট এ ধরণের হাজারও কাহিনী রয়েছে, যার আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে।

বস্তুত আল্লাহর সৃষ্টজীবের মধ্যে এরা জীবিত ও মৃতদের উপর সবচেয়ে বড় মিথ্যারোপকারী। আর প্রাণী মাত্রই যখন তার প্রয়োজন পূরণ ও তার জন্য ক্ষতিকারক বস্তু দূর করার ব্যাপারে আসক্ত ও অনুরক্ত থাকে, বিশেষ করে যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে যায়, তখন সে যে কোনো উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না। যদিও তাতে কোনো ধরনের অপছন্দনীয় বিষয় জড়িয়ে থাকুক। সুতরাং কেউ যখন শুনে যে, অমুকের কবর বিষের পরীক্ষিত প্রতিষেধক ঔষধ, সে তখন ঐ দিকে ধাবিত হয়, অতঃপর সে সেখানে যায় এবং তার নিকট মনের যাতনা, বিনয়-নম্রতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করার মাধ্যমে দো‘আ করে, অতঃপর তার মনে বিনয়-নম্রতা ও অক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তার দো‘আ কবুল করেন। মূলত এটা কবরের কারণে নয়; কারণ সে যদি অনুরূপ দো‘আ ক্লাব-বার, গোসলখানা কিংবা বাজারের মধ্যেও করত, তাহলেও তিনি তা কবুল করতেন। সুতরাং জাহিল তথা অজ্ঞ ব্যক্তি ধারণা করে যে, এই দো‘আ কবুল করার ক্ষেত্রে কবরের প্রভাব রয়েছে; অথচ সে জানে না যে, আল্লাহ তা‘আলা নিরুপায় ব্যক্তির দো‘আ কবুল করে থাকেন, যদিও সে কাফির হয়।

তাছাড়া বিষয়টি এমন নয় যে, প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যার দো‘আ আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেছেন, তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট বা তিনি তাকে ভালবাসেন কিংবা তার কর্মকাণ্ডের প্রতি সন্তুষ্ট; কারণ, তিনি পুণ্যবান ব্যক্তি ও পাপী উভয়ের দো‘আই কবুল করে থাকেন; অনুরূপভাবে দো‘আ কবুল করেন মুমিন ও কাফিরের।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দয়া ও করুনায় আমাদের জন্য এমন দো‘আ ও আমলকে সহজ করে দিন, যা তাঁর সন্তুষ্টি অনুযায়ী হবে।