hadith book logo

মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য

লেখকঃ অধ্যাপক ড. ফালেহ ইবন মুহাম্মাদ আস-সুগাইর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

মুসলিম নারীর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য

১. সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের উপাদানসমূহ:

ক. মুসলিম নারীদের ব্যক্তিত্ব গঠনে চিন্তাধারায়, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ও জ্ঞানগত দিক থেকে স্বভাব-প্রকৃতির ক্রম উন্নতির মধ্য দিয়ে সুস্পষ্ট ও সহজ-সরল শরী‘আতের কারিকুলামের আলোকে একটি প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রের মাধ্যমে একটি পদ্ধতিগত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা।

খ. তরুণ সমাজের জন্য মাদরাসায় ইসলামী সংস্কৃতি চালু করা এবং সিলেবাস ভিত্তিক শিক্ষাকে যথেষ্ট মনে না করা। কারণ, তা সময়ের সাথে শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং পাঠ পদ্ধতির বহির্ভূত উদ্যম বা কার্যক্রম থেকে ফায়দা হাসিল করতে হবে এবং আরও ফায়দা হাসিল করতে হবে ঐ পাঠ্যক্রম থেকে, যা সে অধ্যয়ন করে।

গ. শিশুর জন্য বিশ্বস্ত শিশু পরিচর্যাকারিনী হওয়া, তার শিশুই সেখানে প্রথম প্রাধান্য পাবে এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে তাদের (শিশুদের) সাথে যার সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আর একজন মা সাধারণত: (যা অচিরেই বর্ণিত হবে ইনশাআল্লাহ) যার কাছে চাওয়া হয় তার সন্তানদের তত্ত্বাবধান এবং ফাসাদ বা বিপর্যয় থেকে তাদেরকে রক্ষা করা, তখন সত্যিকার মুসলিম নারী থেকে এটাই দাবি করা হয় যে, সে তার তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে উপযুক্ত গবেষক ও প্রশাসকদেরকে বের করে দেবে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের সাথে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য এবং তাদের সমাজে ও মহল্লায় তাদের সমবয়সীদের সাথে তারা যেন হতে পারে সৎ প্রভাবশালী আদর্শ জাতি।

ঘ. একজন নারী কর্তৃক তার আশপাশে, তার ঘরের মধ্যে এবং তার প্রতিবেশী ও বান্ধবীদের সাথে যারা আছে, তাদের মধ্যে ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টি করা। সে তাদের মধ্যে আল্লাহর যিকিরের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করবে এবং দীন শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করবে; আর সে দীন বিরোধিতার পর্যবেক্ষণ করবে এবং সে সব ব্যাপারে সতর্ক করবে।

ঙ. কাজকর্মে সমন্বয় সাধন এবং তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণের ওপর এই সংস্কৃতির প্রভাবকে ফুটিয়ে তোলা। সুতরাং বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করাটাই তার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং তার জন্য আবশ্যক হলো, সে তার সংস্কৃতিকে প্রকাশ করবে তার কথাবার্তায়, নীরব থাকায়, বের হওয়ার সময়, পোশাক-পরিচ্ছদে, সঞ্চয় ও রান্নাবান্না করাসহ তার সার্বিক তৎপরতার মধ্যে, আর তার স্বামী, পরিবার-পরিজন, তার স্বামীর পরিবার-পরিজন ও তার প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তার সংস্কৃতিকে প্রকাশ করবে। কারণ, অনেক সময় কথাবার্তা সেই পরিমাণ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না, যেই পরিমাণ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে প্রশংসনীয় চরিত্র বা আচার-আচরণ।

চ. তার স্বামীকে সহযোগিতা করা। যখন সে (স্বামী) দা‘ঈ তথা আল্লাহ দীনের পথে আহ্বানকারীর ভূমিকা রাখে, তখন সে হবে তার সর্বোত্তম সাহায্যকারী ও বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষক, সে তার জন্য দো‘আ করবে, তার সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বা আসবাবপত্রসমূহ গুছিয়ে রাখবে, তার কর্মকাণ্ডকে তার জন্য সহজ করে দেবে এবং তার কাঙ্খিত বস্তু দ্বারা যথাসম্ভব তাকে তুষ্ট করবে। সুতরাং সে তাকে (তার স্বামীকে) নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করবে এবং সে প্রতিদান ও কল্যাণের মধ্যে তাকে অংশীদার করবে।

ছ. জ্ঞানসমৃদ্ধ বার্ষিক ম্যাগাজিন বা সাময়িকীতে অংশগ্রহণ করা; উদাহরণস্বরূপ যা বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্র ইত্যাদি থেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মৌসুমে প্রকাশিত হয়।

জ. ঐসব আলাপ-আলোচনা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, যা নারী প্রসঙ্গ নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে, আরও বিশেষ করে জটিল সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করে; উদাহরণস্বরূপ কিছু বিষয় ও সমস্যা হলো: শিক্ষা ও বিবাহ, গৃহ ও কাজ, শিশু ও প্রতিবেশীদের সাথে আচার-আচরণ, সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া, নারী প্রসঙ্গে ধ্যানধারণা ও বিশ্বাসগত প্রভাব; বিনোদন ও পর্যটনের স্পটসমূহ ইত্যাদি। অতএব একজন বিদুষী সংস্কুতিমনা মুসলিম নারীর জন্য উচিৎ কাজ হলো, সে ঐসব বিষয়ে অংশগ্রহণ করা।

২. এই দায়িত্ব ও কর্তব্য বাস্তবায়ন-পদ্ধতি:

আর এই ব্যাপারে যা সহায়তা করবে, তা কার্যকর করবে এবং তা প্রচার-প্রসার ঘটাবে, তা হচ্ছে, মহিলা সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীলা এবং কল্যাণ ও হিদায়াতের পথে আহ্বানকারিনীগণের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা পথ সুগম করা। আর এই পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার বিষয়টি বাস্তবায়িত হবে নম্র ব্যবহার, উন্মুক্ত হৃদয়, ভালোবাসা, ঐক্যমত ও বিভিন্ন শাখার সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালনকারিনীদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর ভিত্তি করে, শুধু বক্তৃতা-বিবৃতির পথে নয়। তাছাড়া আরও যা এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারে তা হচ্ছে, বুদ্ধিমত্তা ও আবেগ-আন্তরিকতাকে কাজে লাগানো। সুতরাং কেবল জ্ঞান হলেই যথেষ্ট নয়; যদিও এই যুগ সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ’, এমন কথার দ্বারা যেন মুসলিম নারী প্রতারিত না হয়, বরং সে আবেগ-আন্তরিকতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে। কারণ, আবেগ-সহানুভূতি হলো একটি বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারকারী পদ্ধতি ও কুরআনিক নিয়মনীতি, যা আল-কুরআন (মানুষকে) আগ্রহীকরণ ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেছে, আর তা স্বভাবজাত পদ্ধতিও বটে। আর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন-পদ্ধতির বাস্তবায়নের অন্যতম দিক হলো: নিজের সমালোচনা করা ও অনবরত নিজের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ণ করা, যাতে সে নিজের উন্নতির চিন্তা ভুলে না যায়; নতুবা সে অলসতা ও শয়তানের ফাঁদে পতিত হবে। (যুনাইদী যা উল্লেখ করেছেন তা থেকে সংক্ষেপিত)