hadith book logo

মুসলিম নারী এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য

লেখকঃ অধ্যাপক ড. ফালেহ ইবন মুহাম্মাদ আস-সুগাইর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২৩

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: একজন সফল মহিলা দা‘ঈ’র গুণাবলী:

প্রথম: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করা। সুতরাং এই ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা ব্যতীত তার আমল বিক্ষিপ্ত ধূলায় পরিণত হবে। আর তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, একজন মহিলা দা‘ঈ’র জন্য আবশ্যক হলো, সে নিজেকে তার মধ্যে আলোচনা, পর্যালোচনা ও প্রতিকার করবে।

দ্বিতীয়: ধৈর্যধারণ করা ও কষ্টসহিষ্ণু হওয়া। কারণ, দাওয়াতী কাজ একটি ভারী দায়িত্বপূর্ণ কাজ এবং তার প্রতিবন্ধকতাও অনেক। সুতরাং তা উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এই ধৈর্যের। আল-কুরআনুল কারীমের মধ্যে নব্বইয়েরও অধিক স্থানে তার আলোচনার পুনারাবৃত্তি হয়েছে। বরং এর প্রতি নির্দেশগুলো সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল।

তৃতীয়: জ্ঞান অর্জন করা। [এই ব্যাপারে পূর্বে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।]

চতুর্থ: ভালো কাজ, উত্তম চরিত্র এবং চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা; কারণ, দাওয়াতকে ব্যর্থতায় পর্যবেশনকারী এবং দাওয়াত দাতা ইতিবাচক ফলাফল লাভ করতে না পারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কথার সাথে কাজের গরমিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفۡعَلُونَ ٢ كَبُرَ مَقۡتًا عِندَ ٱللَّهِ أَن تَقُولُواْ مَا لَا تَفۡعَلُونَ ٣ ﴾ [ سُورَةُ الصَّفّ : 2-3]

“হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা তোমরা কেন বল? তোমরা যা কর না, তোমাদের তা বলাটা আল্লাহর দৃষ্টিতে মারাত্মক অসন্তোষজনক।” [সূরা আস-সফ, আয়াত: ২-৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿أَتَأۡمُرُونَ ٱلنَّاسَ بِٱلۡبِرِّ وَتَنسَوۡنَ أَنفُسَكُمۡ وَأَنتُمۡ تَتۡلُونَ ٱلۡكِتَٰبَۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ ٤٤﴾ [ سُورَةُ البَقَرَةِ : 44[

“তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের আদেশ দাও, আর তোমাদের নিজেদেরকে ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর। তবে কি তোমরা বুঝ না?” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৪৪] আর এই অধ্যায় বা বিষয়ে আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র আরও অনেক বক্তব্য রয়েছে।

পঞ্চম: ধৈর্য ও সহনশীলতা। কোনো ব্যক্তির জীবনে সবচেয়ে মহৎ যে জিনিস দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলো ধৈর্য, সহনশীলতা ও তাড়াহুড়া না করা। কেননা, পথ অনেক লম্বা, আর প্রত্যেক গৃহ নির্মাণকারীই সে গৃহে বসবাস করতে পারে না। হয়ত তুমি ঘর বানাবে, আর বসবাস করবে তুমি ভিন্ন অন্য কেউ। তুমি জ্ঞান অর্জন করবে এবং তা তুমি ভিন্ন অন্যের নিকট পৌঁছিয়ে দেবে, আর তুমি সম্পদ উপার্জন করবে, আর তার থেকে ভোগ করবে তুমি ভিন্ন অন্য কেউ। সুতরাং দা‘ঈ নারী তার উদ্দেশ্য ও ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যে পৌঁছতে এবং তার (দাওয়াতের) পথে অবিচল থাকতে এই মহৎ গুণটি দ্বারা উপকৃত হতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবদুল কায়েস গোত্রের আশাজ্জকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

«إِنَّ فِيكَ خَصْلَتَيْنِ يُحِبُّهُمَا اللَّهُ : الْحِلْمُ وَالأَنَاةُ » .

“নিশ্চয় তোমার মধ্যে এমন দু’টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলোকে আল্লাহ পছন্দ করেন ধৈর্য ও সহনশীলতা।” ইমাম মুসলিম রহ. হাদীসখানা তাঁর গ্রন্থে বর্ণনা করেন। [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান ( الإيمان ), পরিচ্ছেদ: আল্লাহ, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও দীনের অনুশাসনের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ এবং তার প্রতি মানুষকে আহ্বান করা, দীন সম্পর্কে প্রশ্ন করা ও তা সংরক্ষণ করা, আর যার কাছে দীন পৌঁছায়নি, তার কাছে দীনের দাওয়াত পেশ করা ( باب الأَمْرِ بِالإِيمَانِ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَشَرَائِعِ الدِّينِ وَالدُّعَاءِ إِلَيْهِ , و السوال عنه , و حفظه و تبليغه من لم يبلغه .), বাব নং ৮, হাদীস নং ১২৬।] সুতরাং যার মধ্যে সহিষ্ণুতা নেই, তার ওপর কর্তব্য হলো, সহনশীলতার গুণ অর্জন করা। কারণ, জ্ঞান হয় জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে, আর সহিষ্ণু হয় সহনশীলতার গুণ অর্জন করার মাধ্যমে।

ষষ্ঠ: প্রত্যেক ব্যাপারে সততার পরিচয় দেওয়া: আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে সত্য অবলম্বন করা, মানুষের সাথে সত্য আচরণ করা, নিজের নফসের সাথে সততার পথ অবলম্বন করা এবং কিতাব, কথা ও কাজের ক্ষেত্রে সত্য অবলম্বন করা। সুতরাং সে যেন আল্লাহ অথবা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যাপারে মিথ্যা না বলে। কারণ, এটা জঘন্য ও ভয়াবহ মিথ্যাচার, আর সাধারণ মানুষের সাথেও মিথ্যা বলো না, এমনকি ছোট বাচ্চা ও জীবজন্তুদের সাথেও নয়। সুতরাং তার জন্য আবশ্যক হলো, সে হবে সত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

সপ্তম: সে বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানা, যে অবস্থার মধ্যে মুসলিম নারী জীবনযাপন করে। সুতরাং সে ততটুকুই আলোচনা করবে, যতটুকু কোনো মুসলিম নারী বুঝে ও ধারণ করে। অতএব যখন সে মানুষের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে, বিশেষ করে নারীর অবস্থা সম্পর্কে, তখন সে তাদের হৃদয়ে পৌঁছাতে সক্ষম হবে এবং তাদের সমস্যাসমূহ প্রতিকার করতে পারবে; আর তাদের সাথে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারবে।

অষ্টম: শরী‘আতের আদব-কায়দার মাধ্যমে সে নিজে আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার সম্পন্না হবে, আরও বিশেষ করে আবশ্যকীয় বিষয়গুলো অনুসরণের মাধ্যমে। যেমন, শর‘ঈ পর্দা, পুরুষদের সাথে মেলামেশা না করা, তাদের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে নরম হয়ে কথা না বলা এবং তার আকার-আকৃতি ও বেশভূষা হবে শরী‘আতের বিধান মোতাবেক।

নবম: নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদির ওপর শরী‘আতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দিককে প্রাধান্য দেবে। সুতরাং তার সার্বক্ষনিক চিন্তা থাকবে অন্যদেরকে হিদায়াত করা, তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং তাদের মধ্যে যারা শত্রুদের পাতা ফাঁদে জড়িয়ে গেছে তাদেরকে উদ্ধার করা। আর তার অভিপ্রায় এমন হবে না যে, সে খ্যাতিমান অথবা গণমানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে এবং দুনিয়ার কোনো বস্তু পাওয়ার প্রত্যাশা করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

দশম: দাওয়াতের সফল পদ্ধতিসমূহের প্রতি মনোযোগ দেওয়া [অচিরেই তৃতীয় অনুচ্ছেদে তার বর্ণনা আসছে।]।

আর এক কথায়, শরী‘আত যেসব বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেছে, সেসব বিষয় দ্বারা নিজেকে গুণান্বিত করা এবং শরী‘আত যেসব বিষয় থেকে সতর্ক করেছে, সেসব বিষয় থেকে দূরে থাকা।