hadith book logo

একজন ঈমানদার দা‘ঈর গুণাবলী

লেখকঃ মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩৫

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা

৩৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা: আত্মীয়তার সম্পর্ক ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে বিষয়ে সতর্ক-সাবধান থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কেননা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী জান্নাতে যাবে এবং সম্পর্ক ছিন্নকারী জাহান্নামী হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন। পক্ষান্তরে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করলে তাদের প্রাপ্য হক বিনষ্ট হয়। আল্লাহ এ হক রক্ষা করতে বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَءَاتِ ذَا ٱلۡقُرۡبَىٰ حَقَّهُۥ وَٱلۡمِسۡكِينَ وَٱبۡنَ ٱلسَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِيرًا ٢٦﴾ [ الاسراء : ٢٦ ]

‘আত্মীয়-স্বজনের প্রাপ্য হক তাদের দিয়ে দাও এবং অভাবগ্রস্ত মুসাফিরকেও’। [. সূরা বানী ইসরাঈল ২৬]

আল্লাহ তা‘আলা অত্র আয়াতে আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও মিসকীনদের হক আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর এ সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। হাদীসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘সেই ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে, বিনিময়ের স্বার্থে তা রক্ষা করে। বরং সে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী যার সাথে তা ছিন্ন করার পর পুনঃস্থাপন করে’। [. বুখারী, হাদীস নং-৫৫৩২]

উক্ত হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, কোন কিছু পাওয়ার স্বার্থে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রকৃতপক্ষে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী নয়। বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। অনেক এলাকায় দেখা যায়, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ যদি বোনেরা না নেয়, তাহলে ভাইদের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালই থাকে। কিন্তু যদি বোনেরা ঐ সম্পদ গ্রহণ করে, তাহলে ভাইদের সাথে বোনদের আর কোন সুসম্পর্ক থাকে না। এসব জাহেলী চিন্তাধারা। এগুলো থেকে বিরত থাকাই প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। আল্লাহ আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে ক্বিয়মাতের দিন জিজ্ঞেস করবেন। তিনি বলেন:

﴿وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ ٱلَّذِي تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلۡأَرۡحَامَۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيۡكُمۡ رَقِيبٗا ١ ﴾ [ النساء : ١ ]

‘আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা পরস্পরের নিকট জিজ্ঞেস করে থাক এবং অত্মীয়তার ব্যাপারে সতর্ক থাক’। [. সূরা আন নিসা ১]

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

﴿۞وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا وَبِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ وَٱلصَّاحِبِ بِٱلۡجَنۢبِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخۡتَالٗا فَخُورًا ٣٦﴾ [ النساء : ٣٦ ]

‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কাউকে শরীক কর না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী, নিকট প্রতিবেশী এবং সফরসঙ্গী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীদের প্রতিও।নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না’। [. আন সূরা নিসা: ৩৬]

এ আয়াতে নিজের হকের সাথে পিতা-মাতার হকের কথা উল্লেখ করেছেন। অতঃপর নিকটাত্মীয়দের হকের কথা উল্লেখ করেছেন। তাই ইসলামে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবীদার। (১) পিতা-মাতা (২) নিকটাত্মীয় (৩) ইয়াতীম (৪) মিসকীন (৫) প্রতিবেশী (৬) নিকট প্রতিবেশী,(৭) অসহায় মুসাফির (৮) সফরসাথী (৯) দাস-দাসীর সাথে সদয় আচরণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে এসব বিষয়ের প্রতি মানুষ কোন ভ্রুক্ষেপ করে না। বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবার প্রতি মানুষ কোন লক্ষ্য করে না। পক্ষান্তরে শ্বশুর-শাশুড়ীর জন্য সবাই নিজেকে উজাড় করে দেয়। নিজের ভাই-বোনের প্রতি খেয়াল করে না অথচ শ্যালক-শ্যালিকার জন্য হাত খুলে খরচ করে। নিকটাত্মীয়দের প্রতি কর্তব্য পালনে থাকে উদাসীন, তাদের প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা প্রকাশ করে, অথচ বন্ধু-বান্ধবের জন্য উদার হস্তে খরচ করে। এসব উল্টা কাজ থেকে বিরত হয়ে প্রত্যেকের হক যথাযথভাবে আদায় করা উচিত।

এ হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যকারী নিযুক্তি ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে অসদাচরণকারীর পরিণতি সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা পেশ করা হয়েছে। তাই আমাদের সকলের এ ব্যাপারে সতর্ক-সাবধান হওয়া জরূরী।

হাদীসে এসেছে, আবু বাকরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘বিদ্রোহকারী ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার মত কোন পাপই এত জঘন্য নয় যে, পাপীকে আল্লাহ তা‘আলা খুব শীঘ্রই এই পৃথিবীতে তার শাস্তি দেন এবং আখিরাতেও তার জন্য শাস্তি জমা করে রাখেন’। [. আবুদাউদ, হাদীস নং-৪২৫৬]

এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর দুনিয়াতেও শাস্তি হবে এবং পরকালেও তার জন্য শাস্তি নির্ধারিত থাকবে।হাদীসে এসেছে, আবু আইউব আনছারী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে এমন একটি আমল শিক্ষা দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। উপস্থিত লোকজন বলল: তার কি হয়েছে? তার কি হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। এরপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, সালাত আদায় করবে, যাকাত আদায় করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে’। [. বুখারী, হাদীস নং-৫৯৮৩]

ইবনু শিহাব হতে বর্ণিত মুহাম্মাদ ইবনু জুবাইর ইবনু মতঈম বলেন যে, জুবায়র ইবনু মুতঈম খবর দিয়েছেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। [. বুখারী, হাদীস নং-৫৯৮৪]

উল্লেখিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, যা পালন করলে সে জান্নাতে যেতে পারবে। বিষয়গুলি হচ্ছে- (১) আল্লাহর ইবাদত করা (২)তাঁর সাথে শির্ক না করা (৩) ছালাত আদায় করা (৪) যাকাত আদায় করা (৫) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ইবাদতের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কথা বলেছেন: যা পালন করলে মানুষ সহজেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। উপরোল্লেখিত হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় পুরুষের দায়িত্বই বেশী। কেননা তারা অর্থ উপার্জন করে এবং সম্পদের রক্ষক হয়। প্রত্যেককে তার যথাযথ প্রাপ্য প্রদান করলে এবং সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চললে এ সম্পর্ক আজীবন অটুট থাকে। আর এ কাজ মূলতঃ পুরুষের। তাই এক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।