hadith book logo

দ্বাদশ-ইমামী শী‘আ ধর্মের মূলনীতিসমূহের সুস্পষ্ট রূপরেখা

লেখকঃ মুহিব্বুদ্দীন আল-খতিব • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

ইমামদের জন্য গায়েবের জ্ঞান সাব্যস্তকরণ

শী‘আরা তাদের বারো জন ইমামের জন্য গায়েবী জ্ঞানের অধিকারী হওয়া এবং তারা মানবীয় গুণাবলীর উর্ধ্বে হওয়া [বরং তারা আলী রা. থেকে বর্ণনা করে যে, তিনি বলেন: “আমি মর্যাদাবান ও ক্ষমতাবান; আমি এমন ব্যক্তি, যে জীবন ও মৃত্যু দান করি। আর আমি প্রথম ও শেষ; প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য।” যেমন শাইখ আল-মুফীদের ‘আল-ইখতিসাস’ ( الاختصاص ) নামক কিতাবে এই বর্ণনাটি এসেছে। অথচ এই গুণাবলী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ব্যতীত অন্য কারও জন্য হতে পারে না। তাদের অনুরূপ আরও একটি বক্তব্য হল: “আমাদের ইমামদের অবস্থান এত উপরে যে, সে পর্যন্ত আল্লাহর নিকটতম ফেরেশতা ও নবী-রাসূলগণও পৌঁছাতে পারে না।” — আল-খুমাইনী, ‘আল-হুকুমাতুল-ইসলামীয়া’ ( الحكومة الإسلامية ), পৃ. ৫২] ইত্যাদি যা যা দাবি করে, ঐসব ইমামগণ তাদের নিজেদের জন্য কখনও তা দাবি করেন নি; কারণ, তারা অর্থাৎ শী‘আরা আল্লাহ তা‘আলা গায়েব সম্পর্কিত বিষয়ে যেমন আকাশ ও যমিন সৃষ্টি এবং জান্নাত ও জাহান্নামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা সম্পর্কিত যেসব ওহী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রেরণ করেছেন, তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। আর এগুলো ‘রিসালাতুল ইসলাম’ ( رسالة الإسلام ) নামক ম্যাগাজিনে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যা কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত সম্বয়কারী সংস্থার অফিস থেকে প্রকাশিত হয়ে থাকে; উক্ত ম্যাগাজিনের চতুর্থ বর্ষের চতুর্থ সংখ্যার ৩৬৮ পৃষ্ঠায় লেবাননের শী‘আ আইনের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান, -যাকে শী‘আরা বর্তমান কালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আলেম হিসেবে গণ্য করে থাকে- তার কলমে তা প্রকাশ পায়। তিনি সেই ম্যাগাজিনে মিন ইজতিহাদাতিশ-শী‘আতিল-ইমামীয়া” ( من اجتهادات الشيعة الإمامية ) শিরোনামে, তাদের মুজতাহিদ শাইখ মুহাম্মদ হাসান আল-আশতিয়ানী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তার ‘বাহারুল-ফাওয়ায়েদ’ ( بحر الفوائد ) নামক কিতাবের ১ম খণ্ডের ২৬৭ পৃষ্ঠায় বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কিত কোন বক্তব্য দেন, যেমন অযু ভঙ্গের কারণ, হায়েয ও নিফাসের বিধান; তখন তিনি যা বলেছেন, তা বিশ্বাস করা এবং আমল করা ওয়াজিব। আর যখন তিনি গায়েবী বিষয় তথা আকাশ ও জমিন সৃষ্টি এবং জান্নাতের হূর ও অট্রালিকার ব্যাপারে কোন তথ্য পেশ করেন, তখন দ্বীন হিসেবে মেনে নেয়া ওয়াজিব নয়; যদিও এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান ( العلم ) মাধ্যমে তা প্রমাণিত হোক না কেন। (অর্থাৎ এই তথ্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে বিশুদ্ধভাবে এসেছে তা জানার পরও তা দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করা ওয়াজিব নয়) আর যদি বিষয়টি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লোম থেকে) প্রাধান্যপ্রাপ্ত জ্ঞান ( الظن ) মাধ্যমে আসে তবে সেটা গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না। !?

হে আল্লাহ, কি আশ্চর্য! তারা ইমামদের উপর মিথ্যারোপ করে; অতঃপর তাদের দিকে গায়েব জানার সম্পর্ক জুড়ে দেয় এবং তারা তা বিশ্বাসও করে। অথচ ইমামদের প্রতি এই ধরনের গায়েবের সম্পৃকততার কোন গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। অথচ যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং যা অকাট্য দলীল হিসেবে প্রমাণিত; তারা তাদের নিজেদের জন্য সেই সব গায়েবী সংবাদকে দীন হিসেবে গ্রহণ করা অনাবশ্যক বলা বৈধ মনে করে। উদাহরণস্বরূপ আকাশ ও যমিন সৃষ্টি এবং জান্নাত ও জাহান্নামের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে আল-কুরআনের আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদিসসমূহ। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে আল-কুরআনের বক্তব্য হল:

﴿ وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤ ﴾ [ سورة النجم : 3-4]

“এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। এ তো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।” —(সূরা আন-নাজম: ৩-৪)

আর যে সব গায়েবী জ্ঞানের বিষয়ের সংবাদ তারা তাদের ইমামদের জন্য নির্ধারণ করে, তার মধ্যে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যে সব গায়েবী বিষয়ের সংবাদ বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত, তার মধ্যে যদি তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে, এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, শী‘আগণ (পৃথিবীতে আল্লাহ প্রদত্ত ওহী আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও) যে সমস্ত গায়েবী সংবাদ তাদের বারো জন ইমামের জন্য আন্দাজ-অনুমান করে সাব্যস্ত করে থাকে তার তুলনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে গায়েবী সংবাদের ব্যাপারে যা আল-কুরআন, মুতাওয়াতির ও বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, তা অতি নগন্য !!।

শী‘আদের নিকট বারো ইমামের গায়েব জানার বিষয়ে যে সব বর্ণনা রয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসারী হাদিসের শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা যাছাইকারী অভিজ্ঞ আলেমদের নিকট সে সকল বর্ণনার বর্ণনাকারীরা মিথ্যাবাদী বলে পরিচিত; কিন্তু তাদের অনুসারী শী‘আগণ ঐ দিকে ভ্রূক্ষেপ করে না এবং উল্টো তারা ইমামদের গায়েব জানার ব্যাপারে তাদের ইমামদের থেকে তারা যা বর্ণনা করেছে সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। অথচ সে একই সময়ে ঐক্যসংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত ‘রিসালাতুল-ইসলাম’ ( رسالة الإسلام ) ম্যাগাজিনটিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে গায়েবী বিষয়ে যা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত, তা বিশ্বাস করা ওয়াজিব না হওয়ার দাবিতে লেবাননে শী‘আদের শরীয়া আইনের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও তাদের গবেষক শাইখ মুহাম্মদ হাসান আল-আশতিয়ানী হাত তালি দিতে লাগল এবং রীতিমত কিতাব লেখা শুরু করে দিল। আর তারা চাচ্ছিল রিসালাতে মুহাম্মদীয়া মিশনকে অযু ভঙ্গের কারণ, হায়েয ও নিফাসের বিধানের মত ফিকহ শাস্ত্রের শাখা-প্রশাখার মাসআলার মধ্যে বন্দী করে রাখতে।