১
মুক্তবাসিনী-২
লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৩
হিজাব থেকে জিন্স : জীবন থেকে মৃত্যু
যখন জিয়া বিমানবন্দর দিয়ে কানাডার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন তখন তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর বাঙালী ও পর্দানশীন নারী। হিজাবে আবৃত হয়ে আনতনয়নে শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি কানাডার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন সেই একই বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করলেন তখন আর তিনি বাঙালী কিংবা পর্দানশীন কোনো নারী নন, পুরোদস্তুর ইউরোপিয়ান-আমেরিকান নারী। আজ তার পরনে টাইট ফিটিং জিন্সের প্যান্ট!
যেদিন বিদেশের উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন সেদিন স্বামীর কাছে পুনঃপুন দু‘আ নিয়েছিলেন, বারবার দাম্পত্য ভাব বিনিময় করেছিলেন। কিন্তু যেদিন দেশে ফিরলেন সেদিন বিশ মিনিট পর কোনো মতে সৌজন্যের খাতিরে বললেন, ওহ্ তুমি? তা বলো কেমন আছো?
আধুনিকতা আমাদেরকে নিরঙ্কুশভাবে সবকিছু উগরে দিয়েছে। দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও দিতে থাকবে। বিজ্ঞানের অবদান কোথায় গিয়ে শেষ হবে সে কথা বলা মুশকিল। তবে হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, মানুষ বিজ্ঞান, উন্নতি আর উৎকর্ষের হাত ধরে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হবে, যখন তারা নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে কথা বলতে পারবে। হাদীসের বাণী-
«وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تُكَلِّمَ السِّبَاعُ الإِنْسَ، وَحَتَّى تُكَلِّمَ الرَّجُلَ عَذَبَةُ سَوْطِهِ وَشِرَاكُ نَعْلِهِ وَتُخْبِرَهُ فَخِذُهُ بِمَا أَحْدَثَ أَهْلُهُ مِنْ بَعْدِهِ»
‘ওই সত্তার শপথ! যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বনের হিংস্র বাঘ কথা বলবে, কোড়া (চাবুক) কথা বলবে, জুতার ফিতা কথা বলবে এবং স্ত্রী স্বামীর অনুপস্থিতিতে যে পাপ করেছে উরু তার সংবাদ দেবে’। [জামে তিরমিযী : ২১৮১, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]
আলোচ্য হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী মানুষ চতুষ্পদ জন্তুসহ জড় পদার্থের ভাষা পর্যন্ত বুঝতে সক্ষম হবে। তো এই বিজ্ঞান আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়েছে। দেয়া শেষ হয়নি এখনও। ডেটিং, চ্যাটিং আর ম্যাসেজিং হলো এই বিজ্ঞানেরই অন্যতম অবদান! বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের সাথে নিমিষেই যোগাযোগ করতে পারছে। ফেসবুকের মাধ্যমে, মোবাইলের মাধ্যমে। মোবাইলে কথা বলতে গেলে আমাদের দেশে সর্বনিম্ন মূল্য হলেও অন্তত ২৯ পয়সা মিনিটে কথা বলতে হয়। কিন্তু ইন্টারনেটের কল্যাণে এরচেয়ে অনেক কম মূল্যে- বলা যায় প্রায় বিনামূল্যে লক্ষ মাইল দূরে বসে দুইজন লোক পরস্পরে কথা বলছে। শুধু কথাই বলছে না, বরং কম্পিউটার ক্যামেরার কল্যাণে পরস্পরকে দেখে দেখে কথা বলছে!
আজকের যুগে দুইজন যুবক-যুবতী চ্যাট করবে আর পরস্পরে পরস্পরকে দেখবে না- তার কল্পনাকেও বিজ্ঞানের অবমাননা বলে জ্ঞান করা হয়। উৎকর্ষের ধাপ একে একে পেরিয়ে পাগলা ঘোড়ার গতিতে এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞান। টু-জি প্রযুক্তি ছাড়িয়ে এখন বাংলাদেশেও থ্রিজি (থার্ড জেনারেশন বা তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি) সুবিধা সম্বলিত মোবাইল সেবা প্রবেশের জন্য মুখ ব্যাদান করে অপেক্ষা করছে। এই প্রযুক্তির আগমনের মধ্য দিয়ে তখন সাধারণ যুবক-যুবতীরাও মোবাইলেই ইন্টারনেটের সেই বাঞ্ছিত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ লাভ করবে। তখন তরুণ-তরুণী আর যুবক-যুবতীদের নৈতিকতার যে পচন ধরবে তা কোন্ ভাগাড়ে নিয়ে ফেলতে হবে আবিষ্কারকদেরকে সে কথাটাও আগাম ভেবে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। কিন্তু তখন কি আমরা পারব বিজ্ঞানের সেই ভার সইতে? এখনই যে বিজ্ঞানের ‘ভারে’ আমরা কেবলই ন্যুব্জ হয়ে পড়ছি! এই ঋণের দাবানলে আমাদের ঘর পুড়ছে, জীবন ধ্বংস হচ্ছে এবং হাজারও অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদেরকে ভয়ানক পরিণতির অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত বিখ্যাত সব মানুষের জীবনপাতার সজীবতাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।
২০১১ইং সালের জুনের ৫ তারিখের কথা অনেকেরই মনে থাকবে হয়ত। সেদিনের সেই ঘটনাটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, আচরণের নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসের অবমূল্যায়নের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিখ্যাত বিশবিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ ও খ্যাতনামা শিক্ষিকা যদি ভিন্ন সম্পর্কের অভিযোগে স্বামী কর্তৃক চরম নির্যাতনের শিকার হন- চাই সেই অভিযোগ যতই প্রশ্নবিদ্ধ হোক না কেন- তবে সেই সমাজের নৈতিকতা নিয়ে আর বড়াই করা যায় না এবং সেই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গৌরব করারও কিছু থাকে না। আসলে দেশের গৌরব এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষিকার ব্যাপারে কিছু লেখা আমাদের মানায়ও না, উচিতও না। তবু কলমের কাছে কখনও কখনও ঠেকে যাই। সত্য প্রকাশের সৌজন্যে, মানুষের বিবেকের দরজায় করাঘাত করার জন্য এসব লিখতে হয়। তাই সাহসে, সংকোচে লিখি এসব।
জুমানা বেগম (ছদ্মনাম) ভার্সিটির আন্তঃযোগাযোগ বিভাগের একজন শিক্ষিকা। কিছুদিন আগে কানাডা থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। সেই ডিগ্রিটাই সম্ভবত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সত্য মিথ্যা যাই হোক তার স্বামীর মনে সন্দেহ ঢুকেছিল। সেই সন্দেহ এবং পূর্বপর নানা ঘটনাই তাকে স্ত্রীর প্রতি ক্ষুদ্ধ, ক্রুদ্ধ ও হিংস্র করে তুলেছিল। তিনি তার প্রতিভাধর স্ত্রীর প্রতি খড়গহস্ত হয়েছিলেন। ঘটনার দিন তিনি স্ত্রীর ওপর সর্বশক্তি নিয়োগ করে উন্মত্ত দানবতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অপ্রত্যাশিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যান স্ত্রী জুমানা। প্রতিহত বা প্রতিরোধ করার আগেই তিনি চরম সর্বনাশের শিকার হন। স্বামী তাকে বিছানায় ফেলে চোখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে চোখের মনি বের করে ফেলে। মুহূর্তের ঘটনা। স্ত্রী জুমানা কয়েক মিনিটের মধ্যেই মূল্যবান অঙ্গ চোখের জ্যোতি হারিয়ে অন্ধ হয়ে যান।
মানুষের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান নেয়ামত হচ্ছে তার চোখ। মনে পড়ে গেল গ্রীসের বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী হাকিম জালিনুস (খ্রীস্টপূর্ব ২০১-১৩১ অব্দ) এর কথা। হাকিম জালিনুস চিকিৎসাশাস্ত্রে চোখ বিষয়ে তার লেখা গ্রন্থের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন,
بَخِلْتُ عَلَى النَّاسِ بِذِكْرِ حِكْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى فِي تَخْلِيقِ الْعَصَبَيْنِ الْمُجَوَّفَيْنِ مُلْتَقِيَيْنِ عَلَى مَوْضِعٍ وَاحِدٍ، فَرَأَيْتُ فِي النَّوْمِ كَأَنَّ مَلَكًا نَزَلَ مِنَ السَّمَاءِ وَقَالَ يَا جَالِينُوسُ، إِنَّ إِلَهَكَ يَقُولُ : لِمَ بَخِلْتَ عَلَى عِبَادِي بِذِكْرِ حِكْمَتِي؟ قَالَ : فَانْتَبَهْتُ فَصَنَّفْتُ فِيهِ كِتَابًا
আমি যখন অল্প কটি কথায় চোখের বিবরণ শেষ করলাম, তখন দেখতে পেলাম যেন আসমান থেকে একজন ফেরেস্তা অবতীর্ণ হয়ে বলছেন, হে জালিনুস! তোমার প্রভু বলেছেন, ‘আমার হেকমত উল্লেখের ব্যাপারে আমার বান্দার সাথে কৃপণতা করছ কেন?’ তিনি বলেন, আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম এবং চোখের উপকারিতা ও অবদান সম্পর্কে দীর্ঘ একটি কিতাব সংকলন করলাম। [তাফসীরে রাযী : ১/২৫]
বস্তুত চোখ এমনই মহামূল্যবান সম্পদ। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা জুমানার এই মহামূল্যবান সম্পদকে নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নিয়েছিল। স্বামীর অভিযোগ, স্ত্রী জুমানা কানাডায় যখন ডিগ্রি নিতে গিয়েছিলেন তখনই ইরানী এক যুবকের (নাভেদ) সাথে তার পরিচয় হয়। তার বক্তব্যানুযায়ী তারা নাকি সেখানে স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন যাপনও করেন। সে সময় তিনি স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে জুমানা তাকে পাত্তা দিতেন না। কথা বলতে গেলে দুয়েক মিনিট কথা বলে তড়িঘড়ি করে মোবাইল রেখে দিতেন। এমনকি ছোট্ট মেয়েটির সাথেও কথা বলার সুযোগ দেয়া হতো না।
এমনি এক অসুস্থ, অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে কেটে যায় ডিগ্রি আনার সময়গুলো। দেশে ফিরে আসার পরও এই ধারা বহাল থাকে। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ কায়িকভাবে এখন দূরে থাকে। মনের দিক থেকে তো আর নয়! তাই ইরানী যুবকের সাথে এখনও চলে ইন্টারনেট চ্যাটিং, মোবাইল ম্যাসেজিং ইত্যাদি। তার স্বামী অসুস্থতা, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণে ছিলেন মানসিক রোগী। কিন্তু পৃথিবীতে বোধ হয় একটা ক্ষেত্রে এসে সব রোগের কার্যকারিতা থেমে যায়। সকলেই তখন স্বপ্রতিভ হয়ে ওঠেন। তাই এই লোকটি আর দশটি ক্ষেত্রে মানসিক রোগী হলেও স্ত্রীর এই আচরণের কারণে ঠিকই ক্রোধে, ক্ষোভে ঝলসে ওঠেন। ঘটনার দিন ইরানী যুবকের মোবাইল থেকে জুমানার নাম্বারে একটি ম্যাসেজ আসলে তার স্বামী তা মুছে ফেলেন। পরে এ নিয়েই শুরু হয় বিবাদ এবং বিবাদ থেকে এই অস্বাভাবিক পরিণতি।
জুমানা একজন পরিণত বয়স্কা ভার্সিটির অধ্যাপিকা। তার মতো ব্যক্তি যদি ডেটিং আর ম্যাসেজিংয়ের ফাঁদে পড়ে এভাবে নিজেকে ধ্বংসের হাতে সঁপে দেন তবে আমরা কার ওপর ভরসা করব, কাদের ব্যাপারে আশাবাদী হবো? তরুণ-তরুণীদের উত্তপ্ত খুনে কি সঞ্চালিত করা সম্ভব হবে নৈতিকার জোয়ার?
জুমানা হারিয়েছেন তার মহামূল্যবান দুটি চোখ। আর স্বামী হাসান সাঈদ আজ প্রয়াত ইতিহাস। ঢাকা মেডিকেলে অবহেলা আর অযত্নে তিনি মারা গেছেন। এমনিতেই ছিলেন মানসিক বিকারগ্রস্ত। স্ত্রী নির্যাতনের পর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর বোধ-অনুভূতিটুকু সমূলে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আর এই নিঃস্ব, অসহায় অবস্থাতেই তিনি পরপারে পাড়ি জমান। অথচ কত মধুর ছিল তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক! সপ্তায় প্রায় তিন-চার দিন তারা হোটেলে গিয়ে খাবার খেতেন। স্ত্রীকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন হাসান আবূ সাঈদ। কিন্তু স্ত্রীর এই আচরণ তাকে চরমভাবে নিষ্ঠুর করে তুলেছিল।
হাসানের পরিবারের অভিযোগ, কানাডা থেকে দেশে ফেরার দিন জিয়া বিমানবন্দরে অবতরণ করে জুমানা প্রথমে মা-বাবার সাথে সাক্ষাত করেন এবং কিছুক্ষণ পরই ইরানী যুবক নাভেদের কাছে ফোন দেন। কিন্তু নাভেদ ফোন না ধরায় ‘নাভেদটা ফোন ধরছে না কেন- বলে বিরক্তি প্রকাশ করেন তিনি। স্বামীর সামনেই ঘটছিল এসব। কষ্টে তার বুকের হাড্ডিগুলো জমে যাওয়ার অবস্থা। স্থির নয়নে তাকিয়ে শুধু দেখে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রায় বিশ মিনিট পর একান্তই দায়ে ঠেকে জুমানা তাকে জিজ্ঞেস করেন- ওহ তুমি?...
স্ত্রীর এই অবহেলা, অনৈতিক সম্পর্ক, ভালোবাসায় বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি তাকে সীমাহীন ক্রুদ্ধ ও নির্মম করে তুলেছিল। তাই সেদিন বিমানবন্দরে নেমে মাতৃভূমির সবুজ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হতে পারলেও পরের বার যেদিন ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসলেন সেদিন মাতৃভূমির সৌন্দর্য দেখা হলো না। এমনকি একমাত্র মেয়েটির চেহারা দেখারও সৌভাগ্য হলে না। তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করে বললেন, মা! আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না!
হায়! হিজাব থেকে জিন্স এভাবেই একটি সংসারকে তছনছ করে দিলো। জুমানার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিলো আর সাঈদের নিলো প্রাণ!
যেদিন বিদেশের উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে হাজির হয়েছিলেন সেদিন স্বামীর কাছে পুনঃপুন দু‘আ নিয়েছিলেন, বারবার দাম্পত্য ভাব বিনিময় করেছিলেন। কিন্তু যেদিন দেশে ফিরলেন সেদিন বিশ মিনিট পর কোনো মতে সৌজন্যের খাতিরে বললেন, ওহ্ তুমি? তা বলো কেমন আছো?
আধুনিকতা আমাদেরকে নিরঙ্কুশভাবে সবকিছু উগরে দিয়েছে। দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও দিতে থাকবে। বিজ্ঞানের অবদান কোথায় গিয়ে শেষ হবে সে কথা বলা মুশকিল। তবে হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, মানুষ বিজ্ঞান, উন্নতি আর উৎকর্ষের হাত ধরে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হবে, যখন তারা নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে কথা বলতে পারবে। হাদীসের বাণী-
«وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تُكَلِّمَ السِّبَاعُ الإِنْسَ، وَحَتَّى تُكَلِّمَ الرَّجُلَ عَذَبَةُ سَوْطِهِ وَشِرَاكُ نَعْلِهِ وَتُخْبِرَهُ فَخِذُهُ بِمَا أَحْدَثَ أَهْلُهُ مِنْ بَعْدِهِ»
‘ওই সত্তার শপথ! যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না বনের হিংস্র বাঘ কথা বলবে, কোড়া (চাবুক) কথা বলবে, জুতার ফিতা কথা বলবে এবং স্ত্রী স্বামীর অনুপস্থিতিতে যে পাপ করেছে উরু তার সংবাদ দেবে’। [জামে তিরমিযী : ২১৮১, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]
আলোচ্য হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী মানুষ চতুষ্পদ জন্তুসহ জড় পদার্থের ভাষা পর্যন্ত বুঝতে সক্ষম হবে। তো এই বিজ্ঞান আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়েছে। দেয়া শেষ হয়নি এখনও। ডেটিং, চ্যাটিং আর ম্যাসেজিং হলো এই বিজ্ঞানেরই অন্যতম অবদান! বিশ্বের এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষের সাথে নিমিষেই যোগাযোগ করতে পারছে। ফেসবুকের মাধ্যমে, মোবাইলের মাধ্যমে। মোবাইলে কথা বলতে গেলে আমাদের দেশে সর্বনিম্ন মূল্য হলেও অন্তত ২৯ পয়সা মিনিটে কথা বলতে হয়। কিন্তু ইন্টারনেটের কল্যাণে এরচেয়ে অনেক কম মূল্যে- বলা যায় প্রায় বিনামূল্যে লক্ষ মাইল দূরে বসে দুইজন লোক পরস্পরে কথা বলছে। শুধু কথাই বলছে না, বরং কম্পিউটার ক্যামেরার কল্যাণে পরস্পরকে দেখে দেখে কথা বলছে!
আজকের যুগে দুইজন যুবক-যুবতী চ্যাট করবে আর পরস্পরে পরস্পরকে দেখবে না- তার কল্পনাকেও বিজ্ঞানের অবমাননা বলে জ্ঞান করা হয়। উৎকর্ষের ধাপ একে একে পেরিয়ে পাগলা ঘোড়ার গতিতে এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞান। টু-জি প্রযুক্তি ছাড়িয়ে এখন বাংলাদেশেও থ্রিজি (থার্ড জেনারেশন বা তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি) সুবিধা সম্বলিত মোবাইল সেবা প্রবেশের জন্য মুখ ব্যাদান করে অপেক্ষা করছে। এই প্রযুক্তির আগমনের মধ্য দিয়ে তখন সাধারণ যুবক-যুবতীরাও মোবাইলেই ইন্টারনেটের সেই বাঞ্ছিত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ লাভ করবে। তখন তরুণ-তরুণী আর যুবক-যুবতীদের নৈতিকতার যে পচন ধরবে তা কোন্ ভাগাড়ে নিয়ে ফেলতে হবে আবিষ্কারকদেরকে সে কথাটাও আগাম ভেবে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। কিন্তু তখন কি আমরা পারব বিজ্ঞানের সেই ভার সইতে? এখনই যে বিজ্ঞানের ‘ভারে’ আমরা কেবলই ন্যুব্জ হয়ে পড়ছি! এই ঋণের দাবানলে আমাদের ঘর পুড়ছে, জীবন ধ্বংস হচ্ছে এবং হাজারও অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদেরকে ভয়ানক পরিণতির অশুভ ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত বিখ্যাত সব মানুষের জীবনপাতার সজীবতাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।
২০১১ইং সালের জুনের ৫ তারিখের কথা অনেকেরই মনে থাকবে হয়ত। সেদিনের সেই ঘটনাটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, আচরণের নিষ্ঠুরতা ও বিশ্বাসের অবমূল্যায়নের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি বিখ্যাত বিশবিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ ও খ্যাতনামা শিক্ষিকা যদি ভিন্ন সম্পর্কের অভিযোগে স্বামী কর্তৃক চরম নির্যাতনের শিকার হন- চাই সেই অভিযোগ যতই প্রশ্নবিদ্ধ হোক না কেন- তবে সেই সমাজের নৈতিকতা নিয়ে আর বড়াই করা যায় না এবং সেই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গৌরব করারও কিছু থাকে না। আসলে দেশের গৌরব এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষিকার ব্যাপারে কিছু লেখা আমাদের মানায়ও না, উচিতও না। তবু কলমের কাছে কখনও কখনও ঠেকে যাই। সত্য প্রকাশের সৌজন্যে, মানুষের বিবেকের দরজায় করাঘাত করার জন্য এসব লিখতে হয়। তাই সাহসে, সংকোচে লিখি এসব।
জুমানা বেগম (ছদ্মনাম) ভার্সিটির আন্তঃযোগাযোগ বিভাগের একজন শিক্ষিকা। কিছুদিন আগে কানাডা থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। সেই ডিগ্রিটাই সম্ভবত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সত্য মিথ্যা যাই হোক তার স্বামীর মনে সন্দেহ ঢুকেছিল। সেই সন্দেহ এবং পূর্বপর নানা ঘটনাই তাকে স্ত্রীর প্রতি ক্ষুদ্ধ, ক্রুদ্ধ ও হিংস্র করে তুলেছিল। তিনি তার প্রতিভাধর স্ত্রীর প্রতি খড়গহস্ত হয়েছিলেন। ঘটনার দিন তিনি স্ত্রীর ওপর সর্বশক্তি নিয়োগ করে উন্মত্ত দানবতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অপ্রত্যাশিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে যান স্ত্রী জুমানা। প্রতিহত বা প্রতিরোধ করার আগেই তিনি চরম সর্বনাশের শিকার হন। স্বামী তাকে বিছানায় ফেলে চোখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে চোখের মনি বের করে ফেলে। মুহূর্তের ঘটনা। স্ত্রী জুমানা কয়েক মিনিটের মধ্যেই মূল্যবান অঙ্গ চোখের জ্যোতি হারিয়ে অন্ধ হয়ে যান।
মানুষের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান নেয়ামত হচ্ছে তার চোখ। মনে পড়ে গেল গ্রীসের বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী হাকিম জালিনুস (খ্রীস্টপূর্ব ২০১-১৩১ অব্দ) এর কথা। হাকিম জালিনুস চিকিৎসাশাস্ত্রে চোখ বিষয়ে তার লেখা গ্রন্থের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন,
بَخِلْتُ عَلَى النَّاسِ بِذِكْرِ حِكْمَةِ اللَّهِ تَعَالَى فِي تَخْلِيقِ الْعَصَبَيْنِ الْمُجَوَّفَيْنِ مُلْتَقِيَيْنِ عَلَى مَوْضِعٍ وَاحِدٍ، فَرَأَيْتُ فِي النَّوْمِ كَأَنَّ مَلَكًا نَزَلَ مِنَ السَّمَاءِ وَقَالَ يَا جَالِينُوسُ، إِنَّ إِلَهَكَ يَقُولُ : لِمَ بَخِلْتَ عَلَى عِبَادِي بِذِكْرِ حِكْمَتِي؟ قَالَ : فَانْتَبَهْتُ فَصَنَّفْتُ فِيهِ كِتَابًا
আমি যখন অল্প কটি কথায় চোখের বিবরণ শেষ করলাম, তখন দেখতে পেলাম যেন আসমান থেকে একজন ফেরেস্তা অবতীর্ণ হয়ে বলছেন, হে জালিনুস! তোমার প্রভু বলেছেন, ‘আমার হেকমত উল্লেখের ব্যাপারে আমার বান্দার সাথে কৃপণতা করছ কেন?’ তিনি বলেন, আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম এবং চোখের উপকারিতা ও অবদান সম্পর্কে দীর্ঘ একটি কিতাব সংকলন করলাম। [তাফসীরে রাযী : ১/২৫]
বস্তুত চোখ এমনই মহামূল্যবান সম্পদ। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা জুমানার এই মহামূল্যবান সম্পদকে নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নিয়েছিল। স্বামীর অভিযোগ, স্ত্রী জুমানা কানাডায় যখন ডিগ্রি নিতে গিয়েছিলেন তখনই ইরানী এক যুবকের (নাভেদ) সাথে তার পরিচয় হয়। তার বক্তব্যানুযায়ী তারা নাকি সেখানে স্বামী-স্ত্রীর মতো জীবন যাপনও করেন। সে সময় তিনি স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে জুমানা তাকে পাত্তা দিতেন না। কথা বলতে গেলে দুয়েক মিনিট কথা বলে তড়িঘড়ি করে মোবাইল রেখে দিতেন। এমনকি ছোট্ট মেয়েটির সাথেও কথা বলার সুযোগ দেয়া হতো না।
এমনি এক অসুস্থ, অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে কেটে যায় ডিগ্রি আনার সময়গুলো। দেশে ফিরে আসার পরও এই ধারা বহাল থাকে। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ কায়িকভাবে এখন দূরে থাকে। মনের দিক থেকে তো আর নয়! তাই ইরানী যুবকের সাথে এখনও চলে ইন্টারনেট চ্যাটিং, মোবাইল ম্যাসেজিং ইত্যাদি। তার স্বামী অসুস্থতা, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণে ছিলেন মানসিক রোগী। কিন্তু পৃথিবীতে বোধ হয় একটা ক্ষেত্রে এসে সব রোগের কার্যকারিতা থেমে যায়। সকলেই তখন স্বপ্রতিভ হয়ে ওঠেন। তাই এই লোকটি আর দশটি ক্ষেত্রে মানসিক রোগী হলেও স্ত্রীর এই আচরণের কারণে ঠিকই ক্রোধে, ক্ষোভে ঝলসে ওঠেন। ঘটনার দিন ইরানী যুবকের মোবাইল থেকে জুমানার নাম্বারে একটি ম্যাসেজ আসলে তার স্বামী তা মুছে ফেলেন। পরে এ নিয়েই শুরু হয় বিবাদ এবং বিবাদ থেকে এই অস্বাভাবিক পরিণতি।
জুমানা একজন পরিণত বয়স্কা ভার্সিটির অধ্যাপিকা। তার মতো ব্যক্তি যদি ডেটিং আর ম্যাসেজিংয়ের ফাঁদে পড়ে এভাবে নিজেকে ধ্বংসের হাতে সঁপে দেন তবে আমরা কার ওপর ভরসা করব, কাদের ব্যাপারে আশাবাদী হবো? তরুণ-তরুণীদের উত্তপ্ত খুনে কি সঞ্চালিত করা সম্ভব হবে নৈতিকার জোয়ার?
জুমানা হারিয়েছেন তার মহামূল্যবান দুটি চোখ। আর স্বামী হাসান সাঈদ আজ প্রয়াত ইতিহাস। ঢাকা মেডিকেলে অবহেলা আর অযত্নে তিনি মারা গেছেন। এমনিতেই ছিলেন মানসিক বিকারগ্রস্ত। স্ত্রী নির্যাতনের পর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর বোধ-অনুভূতিটুকু সমূলে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আর এই নিঃস্ব, অসহায় অবস্থাতেই তিনি পরপারে পাড়ি জমান। অথচ কত মধুর ছিল তাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক! সপ্তায় প্রায় তিন-চার দিন তারা হোটেলে গিয়ে খাবার খেতেন। স্ত্রীকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন হাসান আবূ সাঈদ। কিন্তু স্ত্রীর এই আচরণ তাকে চরমভাবে নিষ্ঠুর করে তুলেছিল।
হাসানের পরিবারের অভিযোগ, কানাডা থেকে দেশে ফেরার দিন জিয়া বিমানবন্দরে অবতরণ করে জুমানা প্রথমে মা-বাবার সাথে সাক্ষাত করেন এবং কিছুক্ষণ পরই ইরানী যুবক নাভেদের কাছে ফোন দেন। কিন্তু নাভেদ ফোন না ধরায় ‘নাভেদটা ফোন ধরছে না কেন- বলে বিরক্তি প্রকাশ করেন তিনি। স্বামীর সামনেই ঘটছিল এসব। কষ্টে তার বুকের হাড্ডিগুলো জমে যাওয়ার অবস্থা। স্থির নয়নে তাকিয়ে শুধু দেখে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রায় বিশ মিনিট পর একান্তই দায়ে ঠেকে জুমানা তাকে জিজ্ঞেস করেন- ওহ তুমি?...
স্ত্রীর এই অবহেলা, অনৈতিক সম্পর্ক, ভালোবাসায় বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি তাকে সীমাহীন ক্রুদ্ধ ও নির্মম করে তুলেছিল। তাই সেদিন বিমানবন্দরে নেমে মাতৃভূমির সবুজ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হতে পারলেও পরের বার যেদিন ভারত থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসলেন সেদিন মাতৃভূমির সৌন্দর্য দেখা হলো না। এমনকি একমাত্র মেয়েটির চেহারা দেখারও সৌভাগ্য হলে না। তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ করে বললেন, মা! আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না!
হায়! হিজাব থেকে জিন্স এভাবেই একটি সংসারকে তছনছ করে দিলো। জুমানার দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিলো আর সাঈদের নিলো প্রাণ!