১
মুক্তবাসিনী-২
লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৮
মানবতার রুদ্ধদুয়ার!
মানুষ সময়ের আগেই অনেক কিছু করে ফেলা পছন্দ করে। এটা তাদের প্রকৃতিগত স্বভাব। প্রকৃতির এই হেয়ালীপনায় কত কৃতিত্ব আর কত অপ্রীতিকর ঘটনাই যে ঘটে তার ইয়াত্তা করা কঠিন। প্রেম-ভালোবাসা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। যে মানুষ হিসেবে দুনিয়াতে পদার্পণ করেছে সে এসব গুণ নিয়েই পদার্পণ করেছে। কিন্তু এসব গুণের বহিঃপ্রকাশের একটা সময় আছে। একটা শিশু জন্মগ্রহণ করেই নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই যেমন দৌঁড়াতে পারে না তেমনিভাবে একজন নারী কিংবা পুরুষ নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই আল্লাহপ্রদত্ত এই গুণাবলীর প্রকাশ ঘটাতে পারে না। আমরা বাংলায় অকালপক্ক বলে একটা কথা বলি। অর্থাৎ যে বস্তু যখন করা বা হওয়া দরকার তখন না হয়ে তার আগেই হলে বিদ্রূপ করে একথাটা বলা হয়।
বোঝা গেল বয়সের আগে বা নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোনো বিষয়ে আগ বাড়াতে নেই। তাতে সেটা সুন্দর হয় না বরং অযোগ্য ও খারাপ হয়। সুতরাং বাবা মা অনেক কষ্ট করে যখন সন্তান লালন-পালন করেন তখন এই চিন্তাও তাদের মধ্যে থাকে যে, সন্তানকে তারা এমন ঘরে তুলে দেবেন যে ঘর তার জন্য সুখের চাদর হবে। এমন পরিবেশে মেয়ে বিয়ে দেবেন বা ছেলেকে বিয়ে করাবেন যে পরিবেশ থেকে শান্তির সুবাতাস ছুটে আসে। এমন কোন দুর্মুখ সন্তান আছে যারা মা-বাবার এই চিন্তাকে অস্বীকার করে তাদের অপমান করে? পিতৃ ও মাতৃদৃষ্টিতে দেখা ভবিষ্যত চিন্তাকে অবমূল্যায়ন করে?
হ্যাঁ, যারা বিয়ের আগেই নিজেদের সুখনীড় রচনা করতে নিজ পথে হাঁটে, পিতা-মাতার চাওয়ার অবমূল্যায়ন করে নিজেই রচনা করতে চায় ভবিষ্যত তারাই এই শ্রেণীর মানুষ। ব্যর্থতা তাদের নিত্যসঙ্গী, লাঞ্ছনা তাদের নিঃশ্বাসের মতো আবশ্যক হয়ে যায়। প্রেমের আবগাহনে বিভোর থাকা কল্পিত স্বপ্নের সাথে যখন বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না তখনই আত্মপোলব্ধি জেগে ওঠে। কিন্তু তখন তাতে লাভ কী? সমাজের আজ যে অবস্থা, তাতে অতি বিদগ্ধ আর পোড়খাওয়া ব্যক্তি ছাড়া কারো আসল চেহারা বের করে আনা সম্ভব নয়। আর বয়সন্ধিক্ষণের উত্তেজনায় তড়পাতে থাকা কিশোর-কিশোরী বা যুবক-যুবতীদের তো কথাই নেই।
তুমি কাউকে ফুলের চেহারায় দেখবে তো সাহস করে প্রথম পাতাটা উল্টাও। বিস্ফারিত হওনা যেন, সেখানে বিষের কালি থাকার সম্ভাবনা আছে! হয়ত কথার ছাঁচে তোমার চিন্তার জগত বদলে দেবে, তোমার সুখ নিশ্চিত করার গল্প বলার সময় পৃথিবীর সব কালি দিয়ে তোমার সুখকাহিনী রচনা করবে, চেরাগটা এনে দিতে বললে চাঁদটাই এনে দেয়ার কথা বলবে, ছোট্ট একটা সুখনীড়ের কথা বললে প্রাসাদ গড়ার স্বপ্ন দেখাবে, গল্পোচ্ছলে বিস্কুট খাওয়াতে বললে হয়ত পিজা খাওয়াবে। এভাবে তোমার চোখের সামনে তোমার প্রত্যাশার চেয়ে সবকিছু বেশি দেখিয়ে তোমার মন কিনে নেবে। পরে যখন তুমি তার হাতে ন্যস্ত হবে তখন ভালোবাসার এসব সওদাগররা সুদাসলে উঠিয়ে নেবে। সেখানে তুমি ভালোবাসার বদলে দেখবে মুনাফাখোরী ব্যবসায়ীর লালসার চাহনী।
তোমার যৌবনের গুরুত্ব শেষ হওয়ার আগেই তোমাকে নিক্ষেপ করতে চাইবে কোনো পরিত্যক্ত ডাস্টবিনে। তখন তুমি তাকে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে বাগে আনতে যাবে? ভুল। সেটা অতীত। আর মুক্তবাসের অনৈতিক পথে অগ্রসরমান ভালোবাসার এমন মানুষেরা অতীত স্মৃতিচারণকে ভয় পায়, লজ্জা করে। তাই সুখচিন্তার অগ্রিম চেষ্টা না করে কষ্ট হলেও জড়োসর হয়ে ঘরেই থাকো, কিছুদিনের কষ্ট তোমাকে স্থায়ী সুখ পাইয়ে দিতে সাহায্য করবে। আবেগ প্রশ্রয় দিয়ো না, বিশ্বাসের পথে চলো।
আবেগী ও অবিশ্বাসী এমন মানুষের অনেক ঘটনা আমাদের চোখের সামনে। আজ তারা দেউলিয়া, সব হারিয়ে তারা মা-বাবাকেও হারিয়েছে। কত ঘটনা বলব তোমায়? তোমার শ্রবণশক্তির ধৈর্য্যচ্যুতির ব্যাপারে যে আমার সংশয় হয়! তবু শোনো :
উম্মে হাবিবা বাপ্পি। আপনজনের শোকে কে না কাতর হয়? মা বাবা, ভাই-বোনের সাথে তো মানুষের নাড়ির সম্পর্ক। এমন কেউ যদি মারা যায় তবে কেউ কি সুস্থির থাকতে পারে? বিশেষ করে কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে যদি আপনজনের কেউ মারা যায়? মানবতার কোনো বিচারে কি তাদেরকে তখন ঠেকিয়ে রাখা যায়? কিন্তু পৃথিবীর মানবিকতার সব সংজ্ঞা অতিক্রম করে গেল উম্মে হাবিবার জীবনে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ভাইটিকে দেখতে গিয়ে হারালেন শ্বশুরবাড়ি প্রবেশের দরজার গেট পাশ। তিন বছরের একমাত্র মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এখন কেবলই উদাস নয়নে বিচিত্র এই ধরনীর দিকে তাকিয়ে কার বিরুদ্ধে যেন উষ্মা প্রকাশ করেন। হয়ত বা নিজের বিরুদ্ধেই।
নিজ কল্পনাশক্তি ব্যয় করে যে সুখনীড় রচনা করেছিলেন বিয়ের আগে, এটাই কি সেটার প্রতিচ্ছবি? বঞ্চিতা হাবিবার মনে বারবার দোলা দেয় এসব অবাঞ্ছিত প্রশ্ন। তিনি স্মৃতি হাতড়িয়ে আগে চলে যান, স্মৃতির সেই সবুজ আঙিনায় দেখতে পান স্বামী ফিরোজকে। মনে পড়ে আগের সেই কথাগুলো। সবুজের সে সময়কার কথাগুলো আজ সবচেয়ে বড় প্রহসন ও ছলনা বলে মনে হয় উম্মে হাবিবার কাছে। যে লোকটা তাকে এত ভালোবেসেছিল, বিয়ের পর ভালোবাসায় সিক্ত করতে চেয়েছিল যে, আজ সেই তাকে এভাবে বঞ্চিত করল? বঞ্চিত করতে পারল?
সে তো এই ফিরোজের ভরসাতেই ২০০৪ইং সালের ২০ মার্চ নিজের ঘরের দরজায় নিজে তালা দিয়ে পথে নেমেছিল। ফিরোজের ভালোবাসাকে মূল্য দিতে গিয়ে মা-বাবা ও গোটা পরিবারকে অসুখী করে নিজের মতে তাকে বিয়ে করেছিল। তাকে ভেবেছিল পরম আশ্রয়, যে শত ঝড়ঝাঁপটায় তাকে আগলে রাখবে, আশ্রয় দেবে মমতার কোলে। কিন্তু সেই লোকটাই কি করে পারল তাকে ঘর থেকে বের করে দিতে?
স্মৃতির সাথে যত ঘনিষ্ঠতা হয় উম্মে হাবিবার কষ্ট ততই গভীর হয়। আরে এতো সেই ফিরোজ, সংসারের সবাইকে ছেড়ে বড় আশা নিয়ে যাকে বিয়ে করার জন্য ঘর ছেড়েছিল সে; আর মাত্র তিনদিনের মাথায় এর প্রতিদান দিয়েছিল স্বামী ফিরোজ। ফিরোজ অনেক কষ্ট করে তিনদিন পর্যন্ত তার আসল চেহারা গোপন করে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ভেতরের পরিচয়টা যখন ফেঁপে উঠে ফেটে যেতে থাকে তখন নিজ মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে সে।
মানবজীবনের এ এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। এই তিনদিন আগেও যে মস্তবড় ভালোবাসার লোভ দেখালো সেই লোকটাই হঠাৎ কি হলো যে পুরো পরিবর্তন হয়ে গেল? শুরু হলো অমানুষিক নির্যাতন। উম্মে হাবিবার এসব বিশ্বাসই হতে চায় না। সে বারবার তাকায় ফিরোজের দিকে। এই কি সেই লোক, আড়ালে-আবডালে যাকে নিয়ে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনত? ভবিষ্যত কি তবে মানুষের সাথে এভাবেই ছলনা আর প্রতারণা করে?
বিবাহপূর্ব জীবনে উম্মে হাবিবা অনেক ভালোবাসা পেলেও বিয়ের পর তিনি স্বামীর কাছ থেকে কোনো ভালোবাসা পাননি। বরং পেয়েছেন বঞ্ছনা, হয়েছেন ক্ষতবিক্ষত। আজ মনে ভালোবাসার স্মৃতির বদলে সারা গায়ে কেবলই দগদগে ক্ষত। ভালোবাসার এই লোকটিই তাকে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে বেদম প্রহার করত। শুধু ২০০৭ইং সালেই উম্মে হাবিবাকে কমপক্ষে দশবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে স্বামীর আঘাতে জর্জরিত হওয়ার পর! মৃত্যুর সাথে কাইজা করে ঘরে ফিরেছেন স্বামীর সেই ধূসর ভালোবাসার স্মৃতিকে স্মরণ করে। কিন্তু আবার সেই স্মৃতি বাস্তবতার পাখায় ভর করে উম্মে হাবিবার জীবনডালে ডানা মেলেনি। তাই আবার হতে হয়েছে নির্যাতিতা।
পাষণ্ড স্বামী তথা এককালের ভালোবাসার মানুষটি উম্মে হাবিবার দাঁতগুলোর ওপরেও চালিয়েছে নির্যাতন। ভালোবাসার শক্তি প্রয়োগ করে সে স্ত্রীর দাঁতগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সীমাহীন এই নির্যাতনের মধ্যে এগিয়ে চলে উম্মে হাবিবার অবাঞ্ছিত ভালোবাসার অনাকাঙ্ক্ষিত দাম্পত্য জীবন। এগিয়ে চলে প্রজন্ম বিস্তারের প্রকৃতির খেলা। অন্তঃসত্ত্বা হন উম্মে হাবিবা। তার আশার পালকে পর গজিয়ে ওঠে যেন। এই বুঝি ভালোবাসার মানুষ স্বামীটি তাকে সন্তানের উসিলায় ভালোবাসবেন, আগের মতো আদর করবেন আর নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই দেবেন।
তার ভাবাটা যেন মরীচিকাই হয়ে থাকে। স্বামীর মন গলে না। দুনিয়া আলো করে একটা কন্যাসন্তান আগমন করলেও ফিরোজের মনে ফিরে আসে না আগের সেই ভালোবাসার উত্তাপ। তাই নিয়মিতই চলতে থাকে নির্যাতন। এমনকি তিন বছরের অবুঝ সন্তান ফারজানার সামনেই চলত অকথ্য নির্যাতন। এভাবে চলতে চলতে একসময় চলার গতি থেমে যেতে চায় উম্মে হাবিবার। এক সময় মনে হয় আগের গৃহে ফিরে যাবে, যে গৃহে বাল্যকাল কেটেছে, শৈশব আর কৈশর কেটেছে।
কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভাঙে তার। সে নিজেই তো সে পথ বন্ধ করে এসেছে! ফিরোজের সাথে যেদিন পথে নেমেছে সেদিনই তো বাড়ি থেকে বলে দেয়া হয়েছে যে, আর কোনোদিন তাকে এই বাড়িতে আশ্রয় দেয়া হবে না। তাহলে সে আজ কোথায় আশ্রয় নেবে? ভালোবাসার মর্যাদা দিতে গিয়ে ভালোবাসার মানুষের আশ্বাসে যিনি সব ছেড়ে পথে নেমেছেন সেই আশ্বাস আজ ধূসর স্মৃতি, মলিন ইতিহাস! তাই ঘরে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিতে হয় উম্মে হাবিবাকে।
এরই মধ্যে গত ৭ই সেপ্টেম্বর উম্মে হাবিবার ছোট ভাই হাফিয অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকায় মারা যায়। ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ উম্মে হাবিবার দুঃখ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনি ভাইকে একনজর দেখার জন্য বাড়িতে আসার ইচ্ছা করেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার মানুষ স্বামী তাতে প্রবল আপত্তি করে। তার সাফ কথা, কোনো কারণেই সে বাবার বাড়ি যেতে পারবে না। কিন্তু শোক আর আপন ভাইয়ের দগ্ধমুখটি শেষবারের মতো দেখার তীব্র বাসনা উম্মে হাবিবাকে বিদ্রোহী করে তোলে। তিনি এই প্রথম স্বামীর কথা অমান্য করেন। দেখতে যান ভাইয়ের লাশটি।
প্রথম যখন বাবার বাড়ি থেকে ফিরোজের সাথে পথে নেমেছিলেন সেদিনই বাবার বাড়ির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আর আজ যখন ফিরোজের বাড়ি থেকে মৃত ভাইকে দেখার জন্য বাবার বাড়ি আসলেন তখন ফিরোজের বাড়ির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হলো। এই হচ্ছে মুক্তবাসের খেলা, প্রেমের প্রকৃতি! ভাইকে দেখে স্বামীর বাড়িতে ফিরে গেলে সে বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয় হয় উম্মে হাবিবার জন্য। স্বামী ফিরোজ তাকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে উম্মে হাবিবার জন্য এই বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ! [তথ্যসূত্র : আমার দেশ ১৩/১০/২০১১ইং]
তিন বছরের একমাত্র কন্যাসন্তান ফারজানাকে নিয়ে ভাগ্যের চাকায় ঘুরতে ঘুরতে কোথায় গিয়ে ঠেকে উম্মে হাবিবার জীবন সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে সেটা তো ভবিষ্যতের কথা। উম্মে হাবিবার অতীত কিন্তু মোটেই সুখকর নয়। আর সুখকর নয় মুক্তবাস আর বেপর্দা ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন।
বোঝা গেল বয়সের আগে বা নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোনো বিষয়ে আগ বাড়াতে নেই। তাতে সেটা সুন্দর হয় না বরং অযোগ্য ও খারাপ হয়। সুতরাং বাবা মা অনেক কষ্ট করে যখন সন্তান লালন-পালন করেন তখন এই চিন্তাও তাদের মধ্যে থাকে যে, সন্তানকে তারা এমন ঘরে তুলে দেবেন যে ঘর তার জন্য সুখের চাদর হবে। এমন পরিবেশে মেয়ে বিয়ে দেবেন বা ছেলেকে বিয়ে করাবেন যে পরিবেশ থেকে শান্তির সুবাতাস ছুটে আসে। এমন কোন দুর্মুখ সন্তান আছে যারা মা-বাবার এই চিন্তাকে অস্বীকার করে তাদের অপমান করে? পিতৃ ও মাতৃদৃষ্টিতে দেখা ভবিষ্যত চিন্তাকে অবমূল্যায়ন করে?
হ্যাঁ, যারা বিয়ের আগেই নিজেদের সুখনীড় রচনা করতে নিজ পথে হাঁটে, পিতা-মাতার চাওয়ার অবমূল্যায়ন করে নিজেই রচনা করতে চায় ভবিষ্যত তারাই এই শ্রেণীর মানুষ। ব্যর্থতা তাদের নিত্যসঙ্গী, লাঞ্ছনা তাদের নিঃশ্বাসের মতো আবশ্যক হয়ে যায়। প্রেমের আবগাহনে বিভোর থাকা কল্পিত স্বপ্নের সাথে যখন বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না তখনই আত্মপোলব্ধি জেগে ওঠে। কিন্তু তখন তাতে লাভ কী? সমাজের আজ যে অবস্থা, তাতে অতি বিদগ্ধ আর পোড়খাওয়া ব্যক্তি ছাড়া কারো আসল চেহারা বের করে আনা সম্ভব নয়। আর বয়সন্ধিক্ষণের উত্তেজনায় তড়পাতে থাকা কিশোর-কিশোরী বা যুবক-যুবতীদের তো কথাই নেই।
তুমি কাউকে ফুলের চেহারায় দেখবে তো সাহস করে প্রথম পাতাটা উল্টাও। বিস্ফারিত হওনা যেন, সেখানে বিষের কালি থাকার সম্ভাবনা আছে! হয়ত কথার ছাঁচে তোমার চিন্তার জগত বদলে দেবে, তোমার সুখ নিশ্চিত করার গল্প বলার সময় পৃথিবীর সব কালি দিয়ে তোমার সুখকাহিনী রচনা করবে, চেরাগটা এনে দিতে বললে চাঁদটাই এনে দেয়ার কথা বলবে, ছোট্ট একটা সুখনীড়ের কথা বললে প্রাসাদ গড়ার স্বপ্ন দেখাবে, গল্পোচ্ছলে বিস্কুট খাওয়াতে বললে হয়ত পিজা খাওয়াবে। এভাবে তোমার চোখের সামনে তোমার প্রত্যাশার চেয়ে সবকিছু বেশি দেখিয়ে তোমার মন কিনে নেবে। পরে যখন তুমি তার হাতে ন্যস্ত হবে তখন ভালোবাসার এসব সওদাগররা সুদাসলে উঠিয়ে নেবে। সেখানে তুমি ভালোবাসার বদলে দেখবে মুনাফাখোরী ব্যবসায়ীর লালসার চাহনী।
তোমার যৌবনের গুরুত্ব শেষ হওয়ার আগেই তোমাকে নিক্ষেপ করতে চাইবে কোনো পরিত্যক্ত ডাস্টবিনে। তখন তুমি তাকে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে বাগে আনতে যাবে? ভুল। সেটা অতীত। আর মুক্তবাসের অনৈতিক পথে অগ্রসরমান ভালোবাসার এমন মানুষেরা অতীত স্মৃতিচারণকে ভয় পায়, লজ্জা করে। তাই সুখচিন্তার অগ্রিম চেষ্টা না করে কষ্ট হলেও জড়োসর হয়ে ঘরেই থাকো, কিছুদিনের কষ্ট তোমাকে স্থায়ী সুখ পাইয়ে দিতে সাহায্য করবে। আবেগ প্রশ্রয় দিয়ো না, বিশ্বাসের পথে চলো।
আবেগী ও অবিশ্বাসী এমন মানুষের অনেক ঘটনা আমাদের চোখের সামনে। আজ তারা দেউলিয়া, সব হারিয়ে তারা মা-বাবাকেও হারিয়েছে। কত ঘটনা বলব তোমায়? তোমার শ্রবণশক্তির ধৈর্য্যচ্যুতির ব্যাপারে যে আমার সংশয় হয়! তবু শোনো :
উম্মে হাবিবা বাপ্পি। আপনজনের শোকে কে না কাতর হয়? মা বাবা, ভাই-বোনের সাথে তো মানুষের নাড়ির সম্পর্ক। এমন কেউ যদি মারা যায় তবে কেউ কি সুস্থির থাকতে পারে? বিশেষ করে কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে যদি আপনজনের কেউ মারা যায়? মানবতার কোনো বিচারে কি তাদেরকে তখন ঠেকিয়ে রাখা যায়? কিন্তু পৃথিবীর মানবিকতার সব সংজ্ঞা অতিক্রম করে গেল উম্মে হাবিবার জীবনে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া ভাইটিকে দেখতে গিয়ে হারালেন শ্বশুরবাড়ি প্রবেশের দরজার গেট পাশ। তিন বছরের একমাত্র মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এখন কেবলই উদাস নয়নে বিচিত্র এই ধরনীর দিকে তাকিয়ে কার বিরুদ্ধে যেন উষ্মা প্রকাশ করেন। হয়ত বা নিজের বিরুদ্ধেই।
নিজ কল্পনাশক্তি ব্যয় করে যে সুখনীড় রচনা করেছিলেন বিয়ের আগে, এটাই কি সেটার প্রতিচ্ছবি? বঞ্চিতা হাবিবার মনে বারবার দোলা দেয় এসব অবাঞ্ছিত প্রশ্ন। তিনি স্মৃতি হাতড়িয়ে আগে চলে যান, স্মৃতির সেই সবুজ আঙিনায় দেখতে পান স্বামী ফিরোজকে। মনে পড়ে আগের সেই কথাগুলো। সবুজের সে সময়কার কথাগুলো আজ সবচেয়ে বড় প্রহসন ও ছলনা বলে মনে হয় উম্মে হাবিবার কাছে। যে লোকটা তাকে এত ভালোবেসেছিল, বিয়ের পর ভালোবাসায় সিক্ত করতে চেয়েছিল যে, আজ সেই তাকে এভাবে বঞ্চিত করল? বঞ্চিত করতে পারল?
সে তো এই ফিরোজের ভরসাতেই ২০০৪ইং সালের ২০ মার্চ নিজের ঘরের দরজায় নিজে তালা দিয়ে পথে নেমেছিল। ফিরোজের ভালোবাসাকে মূল্য দিতে গিয়ে মা-বাবা ও গোটা পরিবারকে অসুখী করে নিজের মতে তাকে বিয়ে করেছিল। তাকে ভেবেছিল পরম আশ্রয়, যে শত ঝড়ঝাঁপটায় তাকে আগলে রাখবে, আশ্রয় দেবে মমতার কোলে। কিন্তু সেই লোকটাই কি করে পারল তাকে ঘর থেকে বের করে দিতে?
স্মৃতির সাথে যত ঘনিষ্ঠতা হয় উম্মে হাবিবার কষ্ট ততই গভীর হয়। আরে এতো সেই ফিরোজ, সংসারের সবাইকে ছেড়ে বড় আশা নিয়ে যাকে বিয়ে করার জন্য ঘর ছেড়েছিল সে; আর মাত্র তিনদিনের মাথায় এর প্রতিদান দিয়েছিল স্বামী ফিরোজ। ফিরোজ অনেক কষ্ট করে তিনদিন পর্যন্ত তার আসল চেহারা গোপন করে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ভেতরের পরিচয়টা যখন ফেঁপে উঠে ফেটে যেতে থাকে তখন নিজ মূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে সে।
মানবজীবনের এ এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। এই তিনদিন আগেও যে মস্তবড় ভালোবাসার লোভ দেখালো সেই লোকটাই হঠাৎ কি হলো যে পুরো পরিবর্তন হয়ে গেল? শুরু হলো অমানুষিক নির্যাতন। উম্মে হাবিবার এসব বিশ্বাসই হতে চায় না। সে বারবার তাকায় ফিরোজের দিকে। এই কি সেই লোক, আড়ালে-আবডালে যাকে নিয়ে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনত? ভবিষ্যত কি তবে মানুষের সাথে এভাবেই ছলনা আর প্রতারণা করে?
বিবাহপূর্ব জীবনে উম্মে হাবিবা অনেক ভালোবাসা পেলেও বিয়ের পর তিনি স্বামীর কাছ থেকে কোনো ভালোবাসা পাননি। বরং পেয়েছেন বঞ্ছনা, হয়েছেন ক্ষতবিক্ষত। আজ মনে ভালোবাসার স্মৃতির বদলে সারা গায়ে কেবলই দগদগে ক্ষত। ভালোবাসার এই লোকটিই তাকে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে বেদম প্রহার করত। শুধু ২০০৭ইং সালেই উম্মে হাবিবাকে কমপক্ষে দশবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে স্বামীর আঘাতে জর্জরিত হওয়ার পর! মৃত্যুর সাথে কাইজা করে ঘরে ফিরেছেন স্বামীর সেই ধূসর ভালোবাসার স্মৃতিকে স্মরণ করে। কিন্তু আবার সেই স্মৃতি বাস্তবতার পাখায় ভর করে উম্মে হাবিবার জীবনডালে ডানা মেলেনি। তাই আবার হতে হয়েছে নির্যাতিতা।
পাষণ্ড স্বামী তথা এককালের ভালোবাসার মানুষটি উম্মে হাবিবার দাঁতগুলোর ওপরেও চালিয়েছে নির্যাতন। ভালোবাসার শক্তি প্রয়োগ করে সে স্ত্রীর দাঁতগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সীমাহীন এই নির্যাতনের মধ্যে এগিয়ে চলে উম্মে হাবিবার অবাঞ্ছিত ভালোবাসার অনাকাঙ্ক্ষিত দাম্পত্য জীবন। এগিয়ে চলে প্রজন্ম বিস্তারের প্রকৃতির খেলা। অন্তঃসত্ত্বা হন উম্মে হাবিবা। তার আশার পালকে পর গজিয়ে ওঠে যেন। এই বুঝি ভালোবাসার মানুষ স্বামীটি তাকে সন্তানের উসিলায় ভালোবাসবেন, আগের মতো আদর করবেন আর নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই দেবেন।
তার ভাবাটা যেন মরীচিকাই হয়ে থাকে। স্বামীর মন গলে না। দুনিয়া আলো করে একটা কন্যাসন্তান আগমন করলেও ফিরোজের মনে ফিরে আসে না আগের সেই ভালোবাসার উত্তাপ। তাই নিয়মিতই চলতে থাকে নির্যাতন। এমনকি তিন বছরের অবুঝ সন্তান ফারজানার সামনেই চলত অকথ্য নির্যাতন। এভাবে চলতে চলতে একসময় চলার গতি থেমে যেতে চায় উম্মে হাবিবার। এক সময় মনে হয় আগের গৃহে ফিরে যাবে, যে গৃহে বাল্যকাল কেটেছে, শৈশব আর কৈশর কেটেছে।
কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভাঙে তার। সে নিজেই তো সে পথ বন্ধ করে এসেছে! ফিরোজের সাথে যেদিন পথে নেমেছে সেদিনই তো বাড়ি থেকে বলে দেয়া হয়েছে যে, আর কোনোদিন তাকে এই বাড়িতে আশ্রয় দেয়া হবে না। তাহলে সে আজ কোথায় আশ্রয় নেবে? ভালোবাসার মর্যাদা দিতে গিয়ে ভালোবাসার মানুষের আশ্বাসে যিনি সব ছেড়ে পথে নেমেছেন সেই আশ্বাস আজ ধূসর স্মৃতি, মলিন ইতিহাস! তাই ঘরে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিতে হয় উম্মে হাবিবাকে।
এরই মধ্যে গত ৭ই সেপ্টেম্বর উম্মে হাবিবার ছোট ভাই হাফিয অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকায় মারা যায়। ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ উম্মে হাবিবার দুঃখ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তিনি ভাইকে একনজর দেখার জন্য বাড়িতে আসার ইচ্ছা করেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার মানুষ স্বামী তাতে প্রবল আপত্তি করে। তার সাফ কথা, কোনো কারণেই সে বাবার বাড়ি যেতে পারবে না। কিন্তু শোক আর আপন ভাইয়ের দগ্ধমুখটি শেষবারের মতো দেখার তীব্র বাসনা উম্মে হাবিবাকে বিদ্রোহী করে তোলে। তিনি এই প্রথম স্বামীর কথা অমান্য করেন। দেখতে যান ভাইয়ের লাশটি।
প্রথম যখন বাবার বাড়ি থেকে ফিরোজের সাথে পথে নেমেছিলেন সেদিনই বাবার বাড়ির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আর আজ যখন ফিরোজের বাড়ি থেকে মৃত ভাইকে দেখার জন্য বাবার বাড়ি আসলেন তখন ফিরোজের বাড়ির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হলো। এই হচ্ছে মুক্তবাসের খেলা, প্রেমের প্রকৃতি! ভাইকে দেখে স্বামীর বাড়িতে ফিরে গেলে সে বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ করে দেয় হয় উম্মে হাবিবার জন্য। স্বামী ফিরোজ তাকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে উম্মে হাবিবার জন্য এই বাড়ির দরজা চিরতরে বন্ধ! [তথ্যসূত্র : আমার দেশ ১৩/১০/২০১১ইং]
তিন বছরের একমাত্র কন্যাসন্তান ফারজানাকে নিয়ে ভাগ্যের চাকায় ঘুরতে ঘুরতে কোথায় গিয়ে ঠেকে উম্মে হাবিবার জীবন সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে সেটা তো ভবিষ্যতের কথা। উম্মে হাবিবার অতীত কিন্তু মোটেই সুখকর নয়। আর সুখকর নয় মুক্তবাস আর বেপর্দা ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন।