১
মুক্তবাসিনী-২
লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১৮
স্কুলে যৌন নিপীড়ন বাড়ছে
জানি এমন শিরোনাম পছন্দ হবে না অনেকের। শুনতেও শ্রতিকটু সে কথাও অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু তারপরেও যে বিশ্বাস করতে হয়, শুনতে হয়!
স্কুল হলো পবিত্র স্থান। এখানে এসে মানুষ নৈতিকার শিক্ষা পাবে, চরিত্রমাধুর্য হাসিল করবে এবং অনৈতিকার বিরুদ্ধে লড়ার দুরন্ত সাহস অর্জন করবে, এই বহুমুখী উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যের বিপরীত সেই পবিত্র স্থানই যদি যৌনসর্বস্ব হয় তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে? ১০ই অগাস্ট ২০১১ইং সালে বাংলাদেশ প্রতিদিন নামের দৈনিক পত্রিকাটি এই শিরোনামেই কথাটা লিখেছে, আমি তা নকল করলাম মাত্র।
‘সুমন আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। জানি আমাকে তুমি মনে রাখবা না। তাই মনে রাখার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।’
মারজিয়া জান্নাত সুমা। জাহানারা ইমাম হলের ৩২৩ হলের ছাত্রী। শিক্ষিকা হতে চেয়েছিলেন। অনার্সে প্রথম ক্লাশে প্রথম হয়েছিলেন। একবছর ধরে বোটান বিভাগের প্রভাষক মনিরুজ্জামান শিকদার সুমনের সাথে প্রেম। মাস্টার্সের পর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে সুমন তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন সুমা। বাড়ি জামালপুরের উত্তরকাচারিপাড়ায়। পিতা আব্দুস সামাদ। তিনি ভাইবোনের মধ্যে প্রথম। মেধাবী ছাত্রী। অনার্সে জিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। প্রথম থেকেই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় পরিবারের চাপে খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু ওই খালাতো ভাইয়ের সাথে অন্য একটি মেয়ের সম্পর্ক থাকায় বিয়ে ভেঙে যায় এবং মাত্র ৫-৬ মাস পরই ডিভোর্স হয়ে যায়।
বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর তিনি আবার পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখানে ভর্তি হওয়ার পর পরিচয় হয় শিক্ষক মনিরুজ্জামান শিকদার সুমনের সাথে। শিক্ষক তাকে শিক্ষক হওয়ার প্রলোভন দেখান। এতে আগ্রহ আরো বেড়ে যায় সুমার। তার আগ্রহকে পুঁজি করে সুমন তাকে প্রেমের জালে আবদ্ধ করতে সক্ষম হন। প্রেমের অস্বচ্ছধারা এগিয়ে চলে আপন গতিতে। নিয়ে যায় নালা-নর্দমায়। এই সম্পর্কের টান এত প্রবলভাবে সুমাকে আচ্ছন্ন করে যে, এক গ্রীষ্মকালীন পুরো ছুটি তিনি তার সাথে কাটান, স্বামী-স্ত্রীর রূপ ধারণ করে!
সুমার সহপাঠীরা জানিয়েছে, তারা রাতে একত্রিত হতেন। সুমা যে ডিভোর্সী তা সুমনকে জানানো হয়েছিল। তাতে আপত্তি করেননি সুমন। কিন্তু স্বার্থ ফুরিয়ে যাবার পর, সুমার কাছ থেকে পাওনা আদায় করে নেয়ার পর এই অজুহাতেই তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। প্রত্যাখ্যাত নারীর শেষ সম্বল বুঝি জীবননাশ! তাই সুমা এই পথই অবলম্বন করেন। নিজ হলের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে জীবনের পাওনা পরিশোধ করেন। যাবার আগে লিখে যান দুটি চিরকুট। দলীয় ও প্রভাবশালী লোক হওয়ায় সুমনের চেষ্টায় সেই চিরকুট দুটি গায়েব করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরপারের বাসিন্দার বিদেহী আত্মার সেই বাসনার কাছে হেরে যায় সুমনের অপচেষ্টা। উদ্ধার করা হয়ে চিরকুট দুটি। এতে সুমা লিখেছেন- ‘সুমন ভাই, জানি মনে রাখবেন না। তাই সারাজীবন অনুতপ্ত হবেন এমন কাজ করে গেলাম।’
আরেকটিতে লিখেছেন- ‘সুমন আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। জানি আমাকে তুমি মনে রাখবা না। তাই মনে রাখার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।’
আর মা-বাবাকে উদ্দেশ্যে করে লিখেছেন- আব্বা, আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। আমি তোমাদের যোগ্য সন্তান হতে পারলাম না। জানি আমাকে ক্ষমা করবে না। তবু ক্ষমা চাচ্ছি।’
সুমনকে জাগাতে গিয়ে, তার স্মৃতির পাতায় অমর হয়ে থাকার বাসনায় সুমা জীবন দিয়ে গেলেন। কিন্তু সুমনরা কি মনে রাখবে একটি বঞ্চিতা, লাঞ্ছিতা নারীর কথা? স্বার্থ যেখানে মুখ্য, স্মরণিকা সেখানে গৌণ। তাই বৃথাই গেল সুমার জীবনদান! [তথ্যসূত্র : আমারদেশ ১১/০৮/১১ইং]
বিচারকের বিবেকে বন্দি বিচার
ঘটনাটা শুনেছিলাম এক বক্তার মুখে। নাম মনে নেই। আর ঘটনাটাও আমি এ পর্যন্ত কোনো কিতাবে পাইনি। তবে ঘটনার মর্ম যে সত্য এতে সন্দেহ নেই। সেটা মুসলিম রেঁনেসা আর মুসলিম স্বর্ণালী যুগের কথা। তখন এধরনের ঈমানদীপ্ত ঘটনা বিরল ছিল না। বরং তা ছিল স্বাভাবিকতার চাদরে মোড়ানো সাধারণ সত্য ঘটনা। তখন মুসলিম শাসক আর বিচারকদের ঈমান, সততা ও নৈতিকতা এত প্রখর ছিল যে, ইতিহাসের কোনো পাতায় এধরনের ঘটনা উল্লেখ না থাকলেও ঘটনার মর্মার্থের সত্যতা সম্পর্কে কেউ আপত্তি করবে না। এক বিখ্যাত ফকীহর সময়কার ঘটনা। সে সময়ের মুসলিম খলীফা একদিন স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ কী কথা প্রসঙ্গে স্ত্রী বলে ফেললেন, আরে তুমি তো জাহান্নামী!
অন্তরঙ্গ মুহূর্তে এমন কথা কার ভালো লাগে? তাই খলীফা রাগান্বিত হয়ে বললেন, আমি যদি জাহান্নামী হই তবে তোমার মতো জান্নাতী স্ত্রী আমার দরকার নেই! তুমি তালাক। কথাটা বলেই খলীফার চৈতন্য ফিরে এলো। এবার স্ত্রী রক্ষার পালা। সে সময়ের অনেক মুফতী, ফকীহর দ্বারস্থ হলেন। কিন্তু কেউ সমাধান দিতে পারলেন না। কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী- এই ফয়সালা দিতে গিয়ে কে বিপদে পড়তে চায়! সে ফয়সালা যে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া আর কারো হাতে নেই! অতএব এর ভিত্তিতে ফাতাওয়া দেয়া সম্ভব নয়। খলীফার এমন নাযুকতম মুহূর্তে এগিয়ে এলেন যুগের সেই বিখ্যাত ফকীহ। তিনি একদিন খলীফাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, বলুন তো আপনি এমন কোনো নেক কাজ করেছেন কিনা যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ তা‘আলার রেজামন্দি? খলীফা অনেকক্ষণ ভেবে বললেন, তেমন নেক কাজের কথা মনে পড়ে না। তবে জীবনে বড় একটা গুনাহ ছেড়ে দিয়েছিলাম সেরেফ আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে। ফকীহ বললেন, ঘটনাটা খুলে বলুন।
‘আমার একজন ফুফাতো বোন ছিল। খলীফা বলা শুরু করলেন- আমরা ছোটকালে এক সাথেই বড় হয়েছি। রূপে ছিল সে অপ্রতিদ্বন্দ্বি, সেরা এবং অনন্য। তাকালে সৌন্দর্যের আগুনে চোখ ঝলসে যায় যেন! কিন্তু যখন বয়স বাড়ল এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হলাম তখন আমাদেরকে আলাদা করে দেয়া হলো এবং আমরা পর্দা করতে শুরু করলাম। সে ছিল আমার জন্য দিওয়ানা। কিন্তু পর্দা ভেদ করে কখনও সে আমার সাথে সাক্ষাত করতে পারত না। ফলে তার অন্তরের দহন আরো বেড়ে গিয়েছিল। বহুদিন ধরে সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবং একদিন সে সুযোগটা পেয়েও গেল। একাকী পেয়ে সে আমাকে অভিযোগ আর অনুযোগের বানে জর্জরিত করে বলল, জানো না তোমায় আমি কত ভালোবাসি? এরপর সে তার ভালোবাসার নগদ ফল তুলে নিতে চাইল। আমিও তার আহ্বানে সাড়া দেয়ার উপক্রম করলাম। ঠিক সে সময়ে জানি না কোথা থেকে এলো আওয়াজটা। কে যেন আমাকে বলছে, হায়! একদিন তুমি বিচারক ও শাসক হয়ে যে অপরাধের বিচার করবে, দোররা লাগাবে আর মৃত্যুদণ্ড দেবে, সেই তুমিই আজ সেই পাপে লিপ্ত হতে চলেছ?
খলীফা বলেন, এর পর আমি আর আগে বাড়িনি। আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে সাথে সাথে আমি তাওবা করেছি। ফকীহ বললেন, আপনার স্ত্রী তালাক হয়নি। অন্য সাধারণের জন্য তো এক জান্নাত। আপনার জন্য দুই জান্নাত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
﴿ وَلِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِۦ جَنَّتَانِ ٤٦ ﴾ [ الرحمن : ٤٦ ]
‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে তার জন্য দুটি জান্নাত।’ {সূরা আর-রহমান, আয়াত : ৪৬}
অতএব আপনি দুই জান্নাতের অধিকারী। তাই স্ত্রী তালাক হয়নি। একজন মুসলিম শাসক ও বিচারকে জীবনে এধরনের ঘটনা আসলে এভাবেই তা ব্যাখ্যায়িত হবে, চর্চা হবে নৈতিকার, বিজয় হবে সততার এটাই স্বাভাবিক কাম্য ব্যাপার। কিন্তু কেন যেন তা আর হয় না। ফিরে আসে না সেই সোনালী ইতিহাস। বরং রচিত হয় ঘৃণিত ইতিহাস। সত্তা তো এক, কিন্তু ইতিহাস আর ইতিহাসের জনকেরা ভিন্ন!
বরিশালের সাবেক জেলা ও দায়রা জজ আমিন উল্লাহ (ছদ্মনাম)। ছেলে শহিদ উল্লাহ। বাকেরগঞ্জের নিয়ামতি এলাকার সাবেক মেম্বার মন্নুজান চৌধুরী তার বোনকে ওই বিচারকের ঘরে গৃহপরিচারিকার কাজ জুটিয়ে দেন। সে সময় কিন্তু ঘুণাক্ষরেও মুন্নাজান তার বোনের সতীত্ব আর সম্ভ্রমের ব্যাপারে চিন্তা করেন নি। কেন করবেন? একজন বিচারকের ঘরে কোনো নারীকে অনিরাপদ ভাবা যায়? নাকি তা ইনসাফে পড়ে? কিন্তু মুন্নাজানের সেই সরল বিশ্বাস গরল হয়েছে। তিনি যে সেই শাসক আর বিচারকের যুগের বাসিন্দা না, সে কথাই ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। বিচারক চাকরির প্রলোভন দিয়ে মেয়েটিকে নিয়মিত লাঞ্ছিতা করতে থাকেন। পিতার কর্মে পুত্র! তাই পুত্র বাদ যাবেন কেন? বিচারক বাবার দেখাদেখি ছেলেও মেয়েটিকে নিয়মিত ধর্ষণ করতে থাকে! এই না হলে আধুনিক সভ্যতা, প্রগতির দমকা হাওয়া!
পিতাপুত্রের উন্মাদনার ভার সইতে পারেন না গৃহপরিচারিকা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি পেটে ধারণ করেন অবৈধ ফসল। কার? পিতার না পুত্রের তা তিনি নিজেও জানেন না! তবে টনক নড়ে বিচারকের। পাপের অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছাটাকে অংকুরেই ধ্বংস করার জন্য ২০০৯ইং সালের ৭ই জুলাই মেরি স্টোপসে গর্ভপাত করানো হয়। সে যাত্রায় বেঁচে যান বিচারক পিতাও পুত্র। মেয়েটি অনাহুত অতিথিকে বিদায় করে দিয়ে স্বস্তি পাওয়ার নূন্যতম ফুরসতই পান না। আবার তিনি বিচারকের আদিম উন্মদনার শিকার হন। আবার ধর্ষণ করা হয় তাকে।
একটি পরিবারের ভারসাম্য রক্ষায় পরিবারের সকলকে সচেতন থাকতে হয়। নারীরা তো এসব ক্ষেত্রে অতন্দ্রপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করে থাকে! কোনো নারী তো স্বামীকে অন্য নারীর দিকে ‘হঠাৎ দৃষ্টিতেও’ তাকালে একে তিল থেকে তাল বানায়। স্বামীকে পুরোদস্তুর শাসন করে। বিষয়টি কখনও কখনও বাড়াবাড়ির মাত্রায় গেলেও এর উপকারী দিকও আছে বটে। এতে স্বামী বাছাধনেরা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকেন। কিন্তু কোনো সংসারের নারী যদি এতটুকু দায়িত্বও পালন না করে একেবারে উদাসীন থাকেন, স্বামীর অনাচার দেখেও কোনো প্রতিকার বা প্রতিবাদ না করেন তাহলে সেই সংসারের পতন আর পচন ঠেকাতে যাবে কে? বিচারকের আলয়টা যে প...লয়ে পরিণত হয়েছে তা দেখেও কোনো প্রতিবাদ করেন নি তার স্ত্রী। দেখেও না দেখার ভান করেছেন। স্বামী-সন্তানকে এক পাপের নৌকায় ডুবতে দেখেও তাদেরকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন নি। এমন উদাসী গৃহকর্ত্রী সংসারের বর নয়, শাপ।
এভাবে চলতে চলতে এক সময় ছন্দপতন ঘটে। বিচারক বদলী হয়ে চট্রগ্রামে চলে যান। তখন মেয়েটিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেয়েটি তখন সতীত্বের বিনিময় দাবি করেন। যে চাকরির কথা বলে তার সর্বস্ব লুট করে নেয়া হয়েছে সেই চাকরির খবর জানতে চান। বিচারক মানুষ তো! মানুষকে ভেজে খাওয়া তাদের পেশা। তাই ভাজতে বেগ পেতে হয় না ধর্ষিতা মেয়েটিকে। চাকরি দিতে হলে পরীক্ষা দিতে হবে এবং তা নিজ বাড়ি থেকে দিতে হবে বলে তাকে বিদায় করে দেন এবং বলেন, আমার বাসায় থেকে পরীক্ষা দিলে বদনাম হবে এবং চাকরি না পাওয়ারও আশঙ্কা থাকবে।
কিন্তু এ ছিল তার কেবলই মৌখিক সান্ত্বনা। কাজের কাজ কিছুই না। মেয়েটির সম্ভ্রমের কোনো মূল্য না দিয়েই তিনি চট্রগ্রামে চলে যান। কথাটা জানতে পেরে ধর্ষিতা আদালতের ক্যাশরক্ষক সরকার দীন মুহাম্মাদের শরণাপন্ন হন। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে এক শ্রেণীর মানুষকে উদ্ধার তৎপরতার নামে ভিন্ন চেহারায় দেখা যায়। আহত-নিহত যাত্রীদের উদ্ধার ও সেবার নামে তাদের পকেট হাতড়ায়, সবকিছু লুট করে নেয়। তাই এই শ্রেণীর মানুষ মনেপ্রাণে এমন দুর্ঘটনারই আশা নিয়ে বসে থাকে। ধর্ষিতা মেয়েটি যে দীন মুহাম্মাদের কাছে বিচার দায়ের করেন সেই দীন মুহাম্মাদ এই শ্রেণীর মানুষদেরই একজন। তিনি সুযোগ হাতছাড়া করেন না। ‘ঝামেলা’ মিটিয়ে দেয়ার নাম করে তিনি বিচারকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন। বিচারক বেচারাও ঝামেলা বাঁধার ভয়ে তাকে চাহিদা মোতাবেক টাকা পরিশোধ করেন।
এবার মেয়েটির কাছ থেকে অগ্রিম ‘বিনিময়’ পাওয়ার পালা। কিন্তু একজন হতদরিদ্র আর অসহায় নারীর বিনিময় দেয়ার সাধ্যই বা কতটুকু? একমাত্র সম্বল যে তার দেহ আর সতীত্ব! কিন্তু তাতে সমস্যা নেই সম্ভ্রমখেকো বণিকদের। তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘পণ্যই’ যে এটি! তাই এই পণ্যের ওপরেই চুক্তি সংঘটিত হয়। বিচার পাইয়ে দেয়ার কথা বলে সেও মেয়েটিকে ধর্ষণ করে! জানি না কতদিন চলত এই ধারা। তবে দীনের স্ত্রী এক্ষেত্রে বিচারকের স্ত্রীর চেয়ে আলাদা ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি ব্যাপারটি জানতে পেরে মেয়েটিকে ঘর থেকে বের করে দেন। অসহায় নারী আরও অসহায় হয়ে পড়ে। দুর্ভোগ কমে না তার। শনৈঃ শনৈঃ বাড়তে থাকে দুর্ভোগ। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তারাও মেয়েটিকে ধর্ষণ করে! এভাবে এক পাপ ডেকে আনে হাজার পাপ। এক মুক্তবাস সৃষ্টি করে হাজার অপরাধ। [তথ্যসূত্র : দৈনিক আমার দেশ ১০-০৮-১১ইং]
এই যদি হয় ইনসাফ, তবে জুলুম কাকে বলে? যদি এই হয় বিচার তবে প্রহসন কাকে বলে? যদি এই হয় বিবেকের আদালত তবে শয়তানের আদালতের খবর কী? মানবতা, মনুষ্যত্ব যদি বিচারকদের দ্বারা এভাবে পদদলিত হয় তবে বিচারপ্রার্থী কার দরজায় করাঘাত করবে?
মুক্তবাস! এ এক নিষ্ঠুর, নিরস পুতুল খেলা বোন! সন্ধ্যায় যখন খেলা শেষে ঘরে ফিরবে তখন দেখবে ফলাফল শূন্য। আর গায়ে লাগানো কিছু ধূলোবালি ছাড়া তোমার আর কিছু পাওনা নেই। এই মরিচিকা ইতিহাসের কত কাতর পথিকের যে জীবননাশ করেছে তার ইয়াত্তা নেই। তুমিও কি তবে সেই হারিয়ে যাওয়া মরিচিকার খোরাকদের একজন হতে চাও? ফিরে এসো বোন! ইফফত আর সতীত্বের রাজপথে তোমাকে সুস্বাগত!
স্কুল হলো পবিত্র স্থান। এখানে এসে মানুষ নৈতিকার শিক্ষা পাবে, চরিত্রমাধুর্য হাসিল করবে এবং অনৈতিকার বিরুদ্ধে লড়ার দুরন্ত সাহস অর্জন করবে, এই বহুমুখী উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু উদ্দেশ্যের বিপরীত সেই পবিত্র স্থানই যদি যৌনসর্বস্ব হয় তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে? ১০ই অগাস্ট ২০১১ইং সালে বাংলাদেশ প্রতিদিন নামের দৈনিক পত্রিকাটি এই শিরোনামেই কথাটা লিখেছে, আমি তা নকল করলাম মাত্র।
‘সুমন আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। জানি আমাকে তুমি মনে রাখবা না। তাই মনে রাখার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।’
মারজিয়া জান্নাত সুমা। জাহানারা ইমাম হলের ৩২৩ হলের ছাত্রী। শিক্ষিকা হতে চেয়েছিলেন। অনার্সে প্রথম ক্লাশে প্রথম হয়েছিলেন। একবছর ধরে বোটান বিভাগের প্রভাষক মনিরুজ্জামান শিকদার সুমনের সাথে প্রেম। মাস্টার্সের পর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে সুমন তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন সুমা। বাড়ি জামালপুরের উত্তরকাচারিপাড়ায়। পিতা আব্দুস সামাদ। তিনি ভাইবোনের মধ্যে প্রথম। মেধাবী ছাত্রী। অনার্সে জিপিএ ৩.৫৬ পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। প্রথম থেকেই শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় পরিবারের চাপে খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু ওই খালাতো ভাইয়ের সাথে অন্য একটি মেয়ের সম্পর্ক থাকায় বিয়ে ভেঙে যায় এবং মাত্র ৫-৬ মাস পরই ডিভোর্স হয়ে যায়।
বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর তিনি আবার পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখানে ভর্তি হওয়ার পর পরিচয় হয় শিক্ষক মনিরুজ্জামান শিকদার সুমনের সাথে। শিক্ষক তাকে শিক্ষক হওয়ার প্রলোভন দেখান। এতে আগ্রহ আরো বেড়ে যায় সুমার। তার আগ্রহকে পুঁজি করে সুমন তাকে প্রেমের জালে আবদ্ধ করতে সক্ষম হন। প্রেমের অস্বচ্ছধারা এগিয়ে চলে আপন গতিতে। নিয়ে যায় নালা-নর্দমায়। এই সম্পর্কের টান এত প্রবলভাবে সুমাকে আচ্ছন্ন করে যে, এক গ্রীষ্মকালীন পুরো ছুটি তিনি তার সাথে কাটান, স্বামী-স্ত্রীর রূপ ধারণ করে!
সুমার সহপাঠীরা জানিয়েছে, তারা রাতে একত্রিত হতেন। সুমা যে ডিভোর্সী তা সুমনকে জানানো হয়েছিল। তাতে আপত্তি করেননি সুমন। কিন্তু স্বার্থ ফুরিয়ে যাবার পর, সুমার কাছ থেকে পাওনা আদায় করে নেয়ার পর এই অজুহাতেই তিনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। প্রত্যাখ্যাত নারীর শেষ সম্বল বুঝি জীবননাশ! তাই সুমা এই পথই অবলম্বন করেন। নিজ হলের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে জীবনের পাওনা পরিশোধ করেন। যাবার আগে লিখে যান দুটি চিরকুট। দলীয় ও প্রভাবশালী লোক হওয়ায় সুমনের চেষ্টায় সেই চিরকুট দুটি গায়েব করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরপারের বাসিন্দার বিদেহী আত্মার সেই বাসনার কাছে হেরে যায় সুমনের অপচেষ্টা। উদ্ধার করা হয়ে চিরকুট দুটি। এতে সুমা লিখেছেন- ‘সুমন ভাই, জানি মনে রাখবেন না। তাই সারাজীবন অনুতপ্ত হবেন এমন কাজ করে গেলাম।’
আরেকটিতে লিখেছেন- ‘সুমন আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। জানি আমাকে তুমি মনে রাখবা না। তাই মনে রাখার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।’
আর মা-বাবাকে উদ্দেশ্যে করে লিখেছেন- আব্বা, আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। আমি তোমাদের যোগ্য সন্তান হতে পারলাম না। জানি আমাকে ক্ষমা করবে না। তবু ক্ষমা চাচ্ছি।’
সুমনকে জাগাতে গিয়ে, তার স্মৃতির পাতায় অমর হয়ে থাকার বাসনায় সুমা জীবন দিয়ে গেলেন। কিন্তু সুমনরা কি মনে রাখবে একটি বঞ্চিতা, লাঞ্ছিতা নারীর কথা? স্বার্থ যেখানে মুখ্য, স্মরণিকা সেখানে গৌণ। তাই বৃথাই গেল সুমার জীবনদান! [তথ্যসূত্র : আমারদেশ ১১/০৮/১১ইং]
বিচারকের বিবেকে বন্দি বিচার
ঘটনাটা শুনেছিলাম এক বক্তার মুখে। নাম মনে নেই। আর ঘটনাটাও আমি এ পর্যন্ত কোনো কিতাবে পাইনি। তবে ঘটনার মর্ম যে সত্য এতে সন্দেহ নেই। সেটা মুসলিম রেঁনেসা আর মুসলিম স্বর্ণালী যুগের কথা। তখন এধরনের ঈমানদীপ্ত ঘটনা বিরল ছিল না। বরং তা ছিল স্বাভাবিকতার চাদরে মোড়ানো সাধারণ সত্য ঘটনা। তখন মুসলিম শাসক আর বিচারকদের ঈমান, সততা ও নৈতিকতা এত প্রখর ছিল যে, ইতিহাসের কোনো পাতায় এধরনের ঘটনা উল্লেখ না থাকলেও ঘটনার মর্মার্থের সত্যতা সম্পর্কে কেউ আপত্তি করবে না। এক বিখ্যাত ফকীহর সময়কার ঘটনা। সে সময়ের মুসলিম খলীফা একদিন স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ কী কথা প্রসঙ্গে স্ত্রী বলে ফেললেন, আরে তুমি তো জাহান্নামী!
অন্তরঙ্গ মুহূর্তে এমন কথা কার ভালো লাগে? তাই খলীফা রাগান্বিত হয়ে বললেন, আমি যদি জাহান্নামী হই তবে তোমার মতো জান্নাতী স্ত্রী আমার দরকার নেই! তুমি তালাক। কথাটা বলেই খলীফার চৈতন্য ফিরে এলো। এবার স্ত্রী রক্ষার পালা। সে সময়ের অনেক মুফতী, ফকীহর দ্বারস্থ হলেন। কিন্তু কেউ সমাধান দিতে পারলেন না। কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী- এই ফয়সালা দিতে গিয়ে কে বিপদে পড়তে চায়! সে ফয়সালা যে আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া আর কারো হাতে নেই! অতএব এর ভিত্তিতে ফাতাওয়া দেয়া সম্ভব নয়। খলীফার এমন নাযুকতম মুহূর্তে এগিয়ে এলেন যুগের সেই বিখ্যাত ফকীহ। তিনি একদিন খলীফাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, বলুন তো আপনি এমন কোনো নেক কাজ করেছেন কিনা যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ তা‘আলার রেজামন্দি? খলীফা অনেকক্ষণ ভেবে বললেন, তেমন নেক কাজের কথা মনে পড়ে না। তবে জীবনে বড় একটা গুনাহ ছেড়ে দিয়েছিলাম সেরেফ আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে। ফকীহ বললেন, ঘটনাটা খুলে বলুন।
‘আমার একজন ফুফাতো বোন ছিল। খলীফা বলা শুরু করলেন- আমরা ছোটকালে এক সাথেই বড় হয়েছি। রূপে ছিল সে অপ্রতিদ্বন্দ্বি, সেরা এবং অনন্য। তাকালে সৌন্দর্যের আগুনে চোখ ঝলসে যায় যেন! কিন্তু যখন বয়স বাড়ল এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হলাম তখন আমাদেরকে আলাদা করে দেয়া হলো এবং আমরা পর্দা করতে শুরু করলাম। সে ছিল আমার জন্য দিওয়ানা। কিন্তু পর্দা ভেদ করে কখনও সে আমার সাথে সাক্ষাত করতে পারত না। ফলে তার অন্তরের দহন আরো বেড়ে গিয়েছিল। বহুদিন ধরে সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবং একদিন সে সুযোগটা পেয়েও গেল। একাকী পেয়ে সে আমাকে অভিযোগ আর অনুযোগের বানে জর্জরিত করে বলল, জানো না তোমায় আমি কত ভালোবাসি? এরপর সে তার ভালোবাসার নগদ ফল তুলে নিতে চাইল। আমিও তার আহ্বানে সাড়া দেয়ার উপক্রম করলাম। ঠিক সে সময়ে জানি না কোথা থেকে এলো আওয়াজটা। কে যেন আমাকে বলছে, হায়! একদিন তুমি বিচারক ও শাসক হয়ে যে অপরাধের বিচার করবে, দোররা লাগাবে আর মৃত্যুদণ্ড দেবে, সেই তুমিই আজ সেই পাপে লিপ্ত হতে চলেছ?
খলীফা বলেন, এর পর আমি আর আগে বাড়িনি। আল্লাহ তা‘আলার ভয়ে সাথে সাথে আমি তাওবা করেছি। ফকীহ বললেন, আপনার স্ত্রী তালাক হয়নি। অন্য সাধারণের জন্য তো এক জান্নাত। আপনার জন্য দুই জান্নাত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন,
﴿ وَلِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِۦ جَنَّتَانِ ٤٦ ﴾ [ الرحمن : ٤٦ ]
‘যে ব্যক্তি তার প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে তার জন্য দুটি জান্নাত।’ {সূরা আর-রহমান, আয়াত : ৪৬}
অতএব আপনি দুই জান্নাতের অধিকারী। তাই স্ত্রী তালাক হয়নি। একজন মুসলিম শাসক ও বিচারকে জীবনে এধরনের ঘটনা আসলে এভাবেই তা ব্যাখ্যায়িত হবে, চর্চা হবে নৈতিকার, বিজয় হবে সততার এটাই স্বাভাবিক কাম্য ব্যাপার। কিন্তু কেন যেন তা আর হয় না। ফিরে আসে না সেই সোনালী ইতিহাস। বরং রচিত হয় ঘৃণিত ইতিহাস। সত্তা তো এক, কিন্তু ইতিহাস আর ইতিহাসের জনকেরা ভিন্ন!
বরিশালের সাবেক জেলা ও দায়রা জজ আমিন উল্লাহ (ছদ্মনাম)। ছেলে শহিদ উল্লাহ। বাকেরগঞ্জের নিয়ামতি এলাকার সাবেক মেম্বার মন্নুজান চৌধুরী তার বোনকে ওই বিচারকের ঘরে গৃহপরিচারিকার কাজ জুটিয়ে দেন। সে সময় কিন্তু ঘুণাক্ষরেও মুন্নাজান তার বোনের সতীত্ব আর সম্ভ্রমের ব্যাপারে চিন্তা করেন নি। কেন করবেন? একজন বিচারকের ঘরে কোনো নারীকে অনিরাপদ ভাবা যায়? নাকি তা ইনসাফে পড়ে? কিন্তু মুন্নাজানের সেই সরল বিশ্বাস গরল হয়েছে। তিনি যে সেই শাসক আর বিচারকের যুগের বাসিন্দা না, সে কথাই ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। বিচারক চাকরির প্রলোভন দিয়ে মেয়েটিকে নিয়মিত লাঞ্ছিতা করতে থাকেন। পিতার কর্মে পুত্র! তাই পুত্র বাদ যাবেন কেন? বিচারক বাবার দেখাদেখি ছেলেও মেয়েটিকে নিয়মিত ধর্ষণ করতে থাকে! এই না হলে আধুনিক সভ্যতা, প্রগতির দমকা হাওয়া!
পিতাপুত্রের উন্মাদনার ভার সইতে পারেন না গৃহপরিচারিকা। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি পেটে ধারণ করেন অবৈধ ফসল। কার? পিতার না পুত্রের তা তিনি নিজেও জানেন না! তবে টনক নড়ে বিচারকের। পাপের অনাকাঙ্ক্ষিত আগাছাটাকে অংকুরেই ধ্বংস করার জন্য ২০০৯ইং সালের ৭ই জুলাই মেরি স্টোপসে গর্ভপাত করানো হয়। সে যাত্রায় বেঁচে যান বিচারক পিতাও পুত্র। মেয়েটি অনাহুত অতিথিকে বিদায় করে দিয়ে স্বস্তি পাওয়ার নূন্যতম ফুরসতই পান না। আবার তিনি বিচারকের আদিম উন্মদনার শিকার হন। আবার ধর্ষণ করা হয় তাকে।
একটি পরিবারের ভারসাম্য রক্ষায় পরিবারের সকলকে সচেতন থাকতে হয়। নারীরা তো এসব ক্ষেত্রে অতন্দ্রপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করে থাকে! কোনো নারী তো স্বামীকে অন্য নারীর দিকে ‘হঠাৎ দৃষ্টিতেও’ তাকালে একে তিল থেকে তাল বানায়। স্বামীকে পুরোদস্তুর শাসন করে। বিষয়টি কখনও কখনও বাড়াবাড়ির মাত্রায় গেলেও এর উপকারী দিকও আছে বটে। এতে স্বামী বাছাধনেরা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকেন। কিন্তু কোনো সংসারের নারী যদি এতটুকু দায়িত্বও পালন না করে একেবারে উদাসীন থাকেন, স্বামীর অনাচার দেখেও কোনো প্রতিকার বা প্রতিবাদ না করেন তাহলে সেই সংসারের পতন আর পচন ঠেকাতে যাবে কে? বিচারকের আলয়টা যে প...লয়ে পরিণত হয়েছে তা দেখেও কোনো প্রতিবাদ করেন নি তার স্ত্রী। দেখেও না দেখার ভান করেছেন। স্বামী-সন্তানকে এক পাপের নৌকায় ডুবতে দেখেও তাদেরকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন নি। এমন উদাসী গৃহকর্ত্রী সংসারের বর নয়, শাপ।
এভাবে চলতে চলতে এক সময় ছন্দপতন ঘটে। বিচারক বদলী হয়ে চট্রগ্রামে চলে যান। তখন মেয়েটিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মেয়েটি তখন সতীত্বের বিনিময় দাবি করেন। যে চাকরির কথা বলে তার সর্বস্ব লুট করে নেয়া হয়েছে সেই চাকরির খবর জানতে চান। বিচারক মানুষ তো! মানুষকে ভেজে খাওয়া তাদের পেশা। তাই ভাজতে বেগ পেতে হয় না ধর্ষিতা মেয়েটিকে। চাকরি দিতে হলে পরীক্ষা দিতে হবে এবং তা নিজ বাড়ি থেকে দিতে হবে বলে তাকে বিদায় করে দেন এবং বলেন, আমার বাসায় থেকে পরীক্ষা দিলে বদনাম হবে এবং চাকরি না পাওয়ারও আশঙ্কা থাকবে।
কিন্তু এ ছিল তার কেবলই মৌখিক সান্ত্বনা। কাজের কাজ কিছুই না। মেয়েটির সম্ভ্রমের কোনো মূল্য না দিয়েই তিনি চট্রগ্রামে চলে যান। কথাটা জানতে পেরে ধর্ষিতা আদালতের ক্যাশরক্ষক সরকার দীন মুহাম্মাদের শরণাপন্ন হন। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে এক শ্রেণীর মানুষকে উদ্ধার তৎপরতার নামে ভিন্ন চেহারায় দেখা যায়। আহত-নিহত যাত্রীদের উদ্ধার ও সেবার নামে তাদের পকেট হাতড়ায়, সবকিছু লুট করে নেয়। তাই এই শ্রেণীর মানুষ মনেপ্রাণে এমন দুর্ঘটনারই আশা নিয়ে বসে থাকে। ধর্ষিতা মেয়েটি যে দীন মুহাম্মাদের কাছে বিচার দায়ের করেন সেই দীন মুহাম্মাদ এই শ্রেণীর মানুষদেরই একজন। তিনি সুযোগ হাতছাড়া করেন না। ‘ঝামেলা’ মিটিয়ে দেয়ার নাম করে তিনি বিচারকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন। বিচারক বেচারাও ঝামেলা বাঁধার ভয়ে তাকে চাহিদা মোতাবেক টাকা পরিশোধ করেন।
এবার মেয়েটির কাছ থেকে অগ্রিম ‘বিনিময়’ পাওয়ার পালা। কিন্তু একজন হতদরিদ্র আর অসহায় নারীর বিনিময় দেয়ার সাধ্যই বা কতটুকু? একমাত্র সম্বল যে তার দেহ আর সতীত্ব! কিন্তু তাতে সমস্যা নেই সম্ভ্রমখেকো বণিকদের। তাদের কাঙ্ক্ষিত ‘পণ্যই’ যে এটি! তাই এই পণ্যের ওপরেই চুক্তি সংঘটিত হয়। বিচার পাইয়ে দেয়ার কথা বলে সেও মেয়েটিকে ধর্ষণ করে! জানি না কতদিন চলত এই ধারা। তবে দীনের স্ত্রী এক্ষেত্রে বিচারকের স্ত্রীর চেয়ে আলাদা ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি ব্যাপারটি জানতে পেরে মেয়েটিকে ঘর থেকে বের করে দেন। অসহায় নারী আরও অসহায় হয়ে পড়ে। দুর্ভোগ কমে না তার। শনৈঃ শনৈঃ বাড়তে থাকে দুর্ভোগ। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তারাও মেয়েটিকে ধর্ষণ করে! এভাবে এক পাপ ডেকে আনে হাজার পাপ। এক মুক্তবাস সৃষ্টি করে হাজার অপরাধ। [তথ্যসূত্র : দৈনিক আমার দেশ ১০-০৮-১১ইং]
এই যদি হয় ইনসাফ, তবে জুলুম কাকে বলে? যদি এই হয় বিচার তবে প্রহসন কাকে বলে? যদি এই হয় বিবেকের আদালত তবে শয়তানের আদালতের খবর কী? মানবতা, মনুষ্যত্ব যদি বিচারকদের দ্বারা এভাবে পদদলিত হয় তবে বিচারপ্রার্থী কার দরজায় করাঘাত করবে?
মুক্তবাস! এ এক নিষ্ঠুর, নিরস পুতুল খেলা বোন! সন্ধ্যায় যখন খেলা শেষে ঘরে ফিরবে তখন দেখবে ফলাফল শূন্য। আর গায়ে লাগানো কিছু ধূলোবালি ছাড়া তোমার আর কিছু পাওনা নেই। এই মরিচিকা ইতিহাসের কত কাতর পথিকের যে জীবননাশ করেছে তার ইয়াত্তা নেই। তুমিও কি তবে সেই হারিয়ে যাওয়া মরিচিকার খোরাকদের একজন হতে চাও? ফিরে এসো বোন! ইফফত আর সতীত্বের রাজপথে তোমাকে সুস্বাগত!