১
মুক্তবাসিনী-২
লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
ভিনগ্রহের পরকীয়া
ঘটনাটা প্রথমে বিশ্বাস হতে চায় নি। এখনও কেমন খটকা খটকা লাগে। কিন্তু কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা মন থেকে খটকা দূর করে দিয়েছে। ব্যাখ্যা পাঠ করে মনে হয়েছে এমন ঘটনাও ঘটতে পারে। তাছাড়া ঘটনাটি সচিত্র উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ইচ্ছা করলেও সহজে তা অবিশ্বাস করার উপায় নেই। আগে ঘটনার পেছনের ঘটনা উল্লেখ করে নিই :
সুর আর গানের ঝংকারে বিমুগ্ধ হয় মানুষ। সুরের মূর্ছনায় হিতাহীত জ্ঞান হারিয়ে অপ্রীতিকর কিছুও করে বসে তারা। অশ্লীল গান আর সুরের ঝংকারে নষ্ট হতে পারে ঈমান-আকীদা। অনেক সময় সুরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয় নানান আপত্তিকর ঘটনা। অবশ্য এগুলো নিতান্তই মানব সমাজের ঘটনা। কিন্তু যদি ভিন্ন জগতের বাসিন্দারা সুরের মূর্ছনায় অস্বাভাবিক কিছু করে বসে তাহলে সেটা কেমন হয়? সেরূপ একটা ঘটনা পড়েছিলাম বহুদিন আগে একটি আরবী কিতাবে।
জনৈক ব্যক্তি এক হিজাযী বন্ধুর বাড়িতে মেহমান হয়ে দেখতে পেলেন, ঘরের বাইরে একটা গোলামকে বেঁধে রাখা হয়েছে। গোলাম মেহমানকে দেখে আশান্বিত হলো। কারণ, আরবরা মেহমানকে খুব সম্মান করে। তাই সে মেহমানকে বলল, জনাব! আপনি আমাকে বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করুন। মেহমান বললেন, আগে বলবে তো কী হয়েছে তোমার? গোলাম বলল, হুজুর! অনিচ্ছাকৃত একটি অপরাধের সাজা দিতে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছে। এরপর সে পুরো কাহিনী বর্ণনা করে শোনালো।
আমি একবার সফর থেকে ফিরছিলাম- বলা শুরু করল সে- মুনিবের বাড়ির কাছাকাছি এসে তর সইছিল না। তাই দ্রুত উট হাঁকালাম। উট হাঁকানোর ক্ষেত্রে আমার একটা কৌশল আছে। সেই কৌশল আমি সেদিনও প্রয়োগ করলাম। সুরেলাকণ্ঠে গযল গাওয়া শুরু করলাম আর আমার সওয়ারকে দ্রুত হাঁকাতে শুরু করলাম। কণ্ঠের মাধুর্য্যে পেছনের উটগুলো ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করল। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হলাম। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দম নেয়ার আগেই উটগুলো একের পর এক পড়ে মারা যেতে শুরু করল। অবলা প্রাণীগুলো সুরের মূর্ছনায় দম নেয়ার সময় না পেলেও যখন পেলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভেতর শুকিয়ে কলজে ফেটে তখন মরার সময়। তাই প্রায় সবগুলো উটই মারা পড়ল। মুনিব এত বড় ক্ষতি মেনে নিতে পারলেন না। মানার কথাও না। তাই তিনি আমাকে বন্দী করে এভাবে ফেলে রাখলেন। মেহেরবানী করে আপনি আমাকে উদ্ধার করুন।
মেহমান তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, আমি আমার সাধ্যানুযায়ী তোমাকে সাহায্য ও উদ্ধার করার চেষ্টা করব। কথা মতো তিনি খেতে বসে হঠাৎ হাত গুটিয়ে নিলেন। আরব মেজবানের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কিছু হয় না। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ব্যাপার কী? মেহমান বললেন, আপনি যদি একটা কথা রাখেন তাহলে আপনার বাড়ির খাবার গ্রহণ করব, অন্যথায় নয়। মেজবান তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, কী সেই কথা?
-আপনার গোলামটাকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিতে হবে!
-কিন্তু আপনি কি জানেন সে আমার কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে? তার কণ্ঠে এমন যাদু আছে যা বোবা পশুদেরকেও তন্ময় করে। আসুন দেখবেন তার কারিশমা।
এই বলে মেজবান তাকে গোলামের কাছে নিয়ে গেলেন এবং বন্দীত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বললেন, তুমি তোমার সুরে গযল গাইতে শুরু করো তো!
মুনিবের আদেশ মোতাবেক ছাড়া পাওয়া গোলাম গযল গাওয়া শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে এক সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হলো। গাছপালাও যেন সুরের ঝংকারে দুলে ওঠা শুরু করল। আশেপাশের উটগুলো লাফাতে শুরু করল। কোনোটা দড়ি ছিঁড়ে গোলামের কাছে দৌঁড়ে এলো। মেহমান বিস্মিত হলেন। সুরের মূর্ছনায় পশুপাখিও যে বিমোহিত হয় তার বাস্তব প্রমাণ নিয়ে তিনি সেদিন ঘরে ফিরলেন।
বহুদিন পর এমন আরেকটি ঘটনার সন্ধান মিলল। ঘটনাটি হিজাযের নয়, আমাদের দেশের; রংপুর চিড়িয়াখানায়। মানুষের ধারণা, আল্লাহ তা‘আলা আঠার হাজার মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাদের এই ধারণা আদৌ সত্য নয়। আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি ও মাখলুকের সংখ্যা মোটেই এত কম নয়। বিজ্ঞানিরাই তো এ পর্যন্ত অনুন্ধান করে তের লাখ পঞ্চাশ হাজার প্রাণীর অস্তিত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে কীট-পতঙ্গই আছে প্রায় ছয় লাখ।
দয়াময় মাবুদের সৃষ্টি এসব প্রাণীর মধ্যে যে কত রকমের বৈচিত্র্য আছে তার কিছুটা অনুমান করা যায় আল্লামা দুমাইরী রহ. সংকলিত হায়াতুল হায়ওয়ান গ্রন্থটি পাঠ করে। এসব প্রাণী ও কীটপতঙ্গের কতগুলো আছে বিস্ময়কর গানপাগল। সুর আর গানের মূর্ছনায় তারা বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। যেমন অতিপরিচিত একটা কীট হচ্ছে ঘুগরা। পৃথিবীতে বহুপ্রজাতির ঘুগরা আছে। কেবল আমেরিকাতেই আছে ২২০ প্রজাতির ঘুগরা। পুরুষ ঘুগরার কাজ হচ্ছে গানের মাধ্যমে বান্ধবী খুঁজে বেড়ানো। তারা গানে গানে বান্ধবীকে কাছে আসার আমন্ত্রণ জানায়। আর মেয়ে ঘুগরারাও পুরুষ ঘুগরার গানে মাতাল হয়ে তার কাছে ধরা দেয় এবং তার সাথে মিলিত হয়।
ঘুগরা ছাড়াও আরো বহুপ্রাণী আছে যারা গান করে বিপরীত লিঙ্গকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। একটি ঘটনা অবতারণার জন্য এতগুলো কথা বললাম। এবার মূল কথায় ফিরে আসি। বছর দশেক আগে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে রংপুর চিড়িয়াখানায় আনা হয় জোড়া ময়ূর-ময়ূরীকে। রাখা হয় এক খাঁচায়। প্রাণী তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন শখ করে ময়ূরের নাম রাখেন শাকিল খান। আর স্ত্রী ময়ূরের নাম রাখেন ময়ূরী।
আবাসস্থল পরিববর্তন হলেও ভালোই দিন কাটছিল তাদের। ময়ূরীকে ছাড়া এক মুহূর্তও একা থাকত না শাকিল খান। কিন্তু বছর চারেক আগে পাশের খাঁচায় আনা হয় এক কিশোর পাখিকে। অতিথির আগমন সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। ডিমোসিলক্রেন নামের এই পাখিটি দেখতে সুদর্শন। ময়ূরীর খাঁচার পাশে বড় হতে থাকে সে। সুদর্শন এই ডিমোসিলক্রেন যুবক বয়সী হওয়ার সাথে সাথে আনোয়ার হোসেন এটার নাম রাখেন শাকিব খান। মিষ্টি সুরে গান করে শাকিব খান। তাই এই সুর ফাটল সৃষ্টি করে ময়ূরী ও শাকিল খানের সম্পর্কে।
তার গানে মুগ্ধ হয় ময়ূরী। বিমোহিত হয়। কিন্তু ‘স্বামী’র সামনে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না সে। তাই স্বামী ঘুমিয়ে পড়লেই মনের টানে শাকিব খানের খাঁচার পাশে গিয়ে হাজির হয় সে। আস্তে আস্তে ময়ূরীর প্রতি দুর্বল হতে শুরু করে শাকিব খানও। সুযোগ পেলেই শিল্পিত আকারে পরকীয়ার চর্চা করে। খাঁচার ফাঁক গলে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিয়ে ময়ূরীকে ‘আদর’ করে। ময়ূরীও কম যায় না। সেও তার ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেয়। ফলে শাকিল থেকে দূরে সরে যেতে থাকে ময়ূরী। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ময়ূরীর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় শাকিল খান। কিন্তু ময়ূরী তখন পরকীয়ার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া এক ভ্রান্ত নাবিক। সে কোনো মতেই নিজেকে শাকিলে আবদ্ধ রাখতে পারে না। ফলে অভিমানে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেয় সে। স্বামীর সামনেই দেখিয়ে দেখিয়ে সারাক্ষণ শাকিবের খাঁচার কাছে পড়ে থাকে। বোবা প্রাণীর পরকীয়ায় মানুষেরই বা কী করার আছে? তাই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ময়ূরীকে শাকিবের খাঁচায় রাখা শুরু করে।
পরস্পরকে কাছে পেয়ে নতুন জীবন ফিরে পায় শাকিব-ময়ূরী। স্বাভাবিক খাবার খাওয়া শুরু করে তারা। অপরদিকে নিজের চোখের সামনে স্ত্রীর পরকীয়া এবং পরকীয়া স্বামীর সাথে আমোদে বসবাস দেখে দুঃখের সাগরে ভাসতে শুরু করে শাকিল। শোকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয় সে। চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর আবুল কাশেম জানান, মানুষের মতো ভালোবাসা প্রাণীজগতের মধ্যেও রয়েছে। তারাও সঙ্গীনী হারানো ব্যথা অনুভব করে। সেটা শাকিলের আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি ভিন্ন উপায়ে খানা খাওয়ানো হচ্ছে। [তথ্যসূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ১জুন ২০১১ইং]
কী অদ্ভুত ব্যাপার! শেষ পর্যন্ত প্রাণীজগতেও...
প্রাণীজগতে বেশকিছু প্রাণীর সতীত্ব ও স্বামী-স্ত্রী ভক্তির সুনাম আছে। এগুলোর অন্যতম হলো ময়ূর-ময়ূরী, ঘুঘু, কবুতর ইত্যাদি। আল্লামা ইবন কুতাইবা (রহ.) ‘উয়ূনুল আখবার’-গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আমি কবুতরীকে দেখেছি, সে নিজ স্বামী (জোড়া) ছাড়া অন্যকে সংগত হওয়ার সুযোগ দেয় না। আর স্বামী কবুতরও নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও সাথে মিলিত হয় না। ময়ূরের মধ্যেও ঠিক এই স্বভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এ কী! আজ যে হিসেবপাতি ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে! ময়ূরী কেন শাকিল খানের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে? এটা কীসের আলামত? এই ঘটনা তো আমাদের মানবসভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করছে না? শেষ পর্যন্ত চিড়িয়াখানার চিড়িয়াগুলো আমাদের মানবসমাজের মুখোশ উন্মোচন করে দেবে নাকি! আসুন এবার এসব প্রশ্নের উত্তর ও রহস্যের জট খুলতে কুরআনের ব্যাখ্যায় যাই। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
﴿ ظَهَرَ ٱلۡفَسَادُ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِي ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعۡضَ ٱلَّذِي عَمِلُواْ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٤١ ﴾ [ الروم : ٤١ ]
‘মানুষের হাতের উপার্জনে জল ও স্থলভাগে ফিৎনা ছড়িয়ে পড়েছে।’ {সূরা আর-রূম, আয়াত : ৪১}
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, পৃথিবীর জল ও স্থলভাগ এক সময় শান্ত, নিরাপদ ও জুলুমমুক্ত ছিল। কেউ কারও প্রতি আগ্রাসী ছিল না। বনের বাঘ ছাগলের ওপর, সিংহ হরিণের ওপর আক্রমণ করত না। সাপ ব্যাঙ ধরে খেত না। রাঘব বোয়াল পুঁটি মাছ ধরে খেত না। কুমির খেত না কচ্ছপকে। কিন্তু এক সময় মানুষের পাপের ভারে বিপর্যস্ত হয় পরিবেশ। ভেঙে পড়ে ইনসাফ ব্যবস্থা। মানুষের হাতের কামাইয়ের কারণে জল ও স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়ে জুলুম-আগ্রাসন। যেদিন কাবিল নিরাপরাধ হাবিলকে হত্যা করে সেদিন থেকে স্থলভাগের পশুদের মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটে। তারা চিন্তা করে তবে এটাই বুঝি জগতের নিয়ম? শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বলের ওপর আক্রমণ করা? ব্যস, শুরু হলো হাঙ্গামা। শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বলকে আক্রমণ করার নির্মম প্রতিযোগিতা।
জুলুমও আগ্রাসন ততক্ষণ পর্যন্ত স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখনও জলভাগে এর প্রভাব পড়ে নি। কিন্তু এগিয়ে এলো আরেক জুলুমবাজ। জালান্দার ইবন কিরকির। কুরআনে মুসা (আ.) ও খিযির (আ.)-এর ঘটনায় নৌকা নষ্ট করে দেয়ার যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মূল উৎস ছিলেন এই বাদশা মশাই! তিনিই জোর করে গরীব-দুঃখীদের নিখুঁত ও ভালো জাহাজ এবং নৌকাগুলো ছিনিয়ে নিতেন। অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে দুর্বলের সম্পদ গ্রাস ও তার ওপর আক্রমণ করার দৃশ্য দেখে সেদিন থেকে জলভাগের প্রাণীরাও জুলুমবাজ হতে শুরু করেছিল। মানুষের দেখাদেখি জলভাগেও সবল কর্তৃক দুর্বলের ওপর আক্রমণের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, সেদিন থেকে বোয়াল পুঁটিকে ধরে। কুমির ধরে কচ্ছপকে। ফলে এভাবেই মানুষের দেখাদেখি স্থল ও জলভাগে জুলুম ও অন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। অবলা প্রাণীরা এক্ষেত্রে নির্বিচারে মানুষের ‘অন্ধ অনুসরণ’ করতে থাকে!
বর্তমান সময়ে প্রেম ও পরকীয়া মানুষের মধ্যে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে প্রাণীরাও যেন এই দুষিত আবওহাওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না। তারাও মানুষের অনুসরণ করার কসরত করছে! ময়ূরী-শাকিলের প্রেম-উপাখ্যান কি তবে মানুষেরই পাপের ফসল? আমরা কি এই নিষ্পাপ পাখিদের মধ্যে নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে শুরু করেছি? কথাটা বোধ হয় সত্যি, মিথ্যে নয় এক রত্তি!
সুর আর গানের ঝংকারে বিমুগ্ধ হয় মানুষ। সুরের মূর্ছনায় হিতাহীত জ্ঞান হারিয়ে অপ্রীতিকর কিছুও করে বসে তারা। অশ্লীল গান আর সুরের ঝংকারে নষ্ট হতে পারে ঈমান-আকীদা। অনেক সময় সুরকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয় নানান আপত্তিকর ঘটনা। অবশ্য এগুলো নিতান্তই মানব সমাজের ঘটনা। কিন্তু যদি ভিন্ন জগতের বাসিন্দারা সুরের মূর্ছনায় অস্বাভাবিক কিছু করে বসে তাহলে সেটা কেমন হয়? সেরূপ একটা ঘটনা পড়েছিলাম বহুদিন আগে একটি আরবী কিতাবে।
জনৈক ব্যক্তি এক হিজাযী বন্ধুর বাড়িতে মেহমান হয়ে দেখতে পেলেন, ঘরের বাইরে একটা গোলামকে বেঁধে রাখা হয়েছে। গোলাম মেহমানকে দেখে আশান্বিত হলো। কারণ, আরবরা মেহমানকে খুব সম্মান করে। তাই সে মেহমানকে বলল, জনাব! আপনি আমাকে বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করুন। মেহমান বললেন, আগে বলবে তো কী হয়েছে তোমার? গোলাম বলল, হুজুর! অনিচ্ছাকৃত একটি অপরাধের সাজা দিতে আমাকে বন্দী রাখা হয়েছে। এরপর সে পুরো কাহিনী বর্ণনা করে শোনালো।
আমি একবার সফর থেকে ফিরছিলাম- বলা শুরু করল সে- মুনিবের বাড়ির কাছাকাছি এসে তর সইছিল না। তাই দ্রুত উট হাঁকালাম। উট হাঁকানোর ক্ষেত্রে আমার একটা কৌশল আছে। সেই কৌশল আমি সেদিনও প্রয়োগ করলাম। সুরেলাকণ্ঠে গযল গাওয়া শুরু করলাম আর আমার সওয়ারকে দ্রুত হাঁকাতে শুরু করলাম। কণ্ঠের মাধুর্য্যে পেছনের উটগুলো ঝড়ের বেগে ছুটতে শুরু করল। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হলাম। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে দম নেয়ার আগেই উটগুলো একের পর এক পড়ে মারা যেতে শুরু করল। অবলা প্রাণীগুলো সুরের মূর্ছনায় দম নেয়ার সময় না পেলেও যখন পেলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভেতর শুকিয়ে কলজে ফেটে তখন মরার সময়। তাই প্রায় সবগুলো উটই মারা পড়ল। মুনিব এত বড় ক্ষতি মেনে নিতে পারলেন না। মানার কথাও না। তাই তিনি আমাকে বন্দী করে এভাবে ফেলে রাখলেন। মেহেরবানী করে আপনি আমাকে উদ্ধার করুন।
মেহমান তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, আমি আমার সাধ্যানুযায়ী তোমাকে সাহায্য ও উদ্ধার করার চেষ্টা করব। কথা মতো তিনি খেতে বসে হঠাৎ হাত গুটিয়ে নিলেন। আরব মেজবানের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কিছু হয় না। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ব্যাপার কী? মেহমান বললেন, আপনি যদি একটা কথা রাখেন তাহলে আপনার বাড়ির খাবার গ্রহণ করব, অন্যথায় নয়। মেজবান তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, কী সেই কথা?
-আপনার গোলামটাকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিতে হবে!
-কিন্তু আপনি কি জানেন সে আমার কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে? তার কণ্ঠে এমন যাদু আছে যা বোবা পশুদেরকেও তন্ময় করে। আসুন দেখবেন তার কারিশমা।
এই বলে মেজবান তাকে গোলামের কাছে নিয়ে গেলেন এবং বন্দীত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে বললেন, তুমি তোমার সুরে গযল গাইতে শুরু করো তো!
মুনিবের আদেশ মোতাবেক ছাড়া পাওয়া গোলাম গযল গাওয়া শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে এক সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হলো। গাছপালাও যেন সুরের ঝংকারে দুলে ওঠা শুরু করল। আশেপাশের উটগুলো লাফাতে শুরু করল। কোনোটা দড়ি ছিঁড়ে গোলামের কাছে দৌঁড়ে এলো। মেহমান বিস্মিত হলেন। সুরের মূর্ছনায় পশুপাখিও যে বিমোহিত হয় তার বাস্তব প্রমাণ নিয়ে তিনি সেদিন ঘরে ফিরলেন।
বহুদিন পর এমন আরেকটি ঘটনার সন্ধান মিলল। ঘটনাটি হিজাযের নয়, আমাদের দেশের; রংপুর চিড়িয়াখানায়। মানুষের ধারণা, আল্লাহ তা‘আলা আঠার হাজার মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তাদের এই ধারণা আদৌ সত্য নয়। আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টি ও মাখলুকের সংখ্যা মোটেই এত কম নয়। বিজ্ঞানিরাই তো এ পর্যন্ত অনুন্ধান করে তের লাখ পঞ্চাশ হাজার প্রাণীর অস্তিত্ব পেয়েছেন। এর মধ্যে কীট-পতঙ্গই আছে প্রায় ছয় লাখ।
দয়াময় মাবুদের সৃষ্টি এসব প্রাণীর মধ্যে যে কত রকমের বৈচিত্র্য আছে তার কিছুটা অনুমান করা যায় আল্লামা দুমাইরী রহ. সংকলিত হায়াতুল হায়ওয়ান গ্রন্থটি পাঠ করে। এসব প্রাণী ও কীটপতঙ্গের কতগুলো আছে বিস্ময়কর গানপাগল। সুর আর গানের মূর্ছনায় তারা বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। যেমন অতিপরিচিত একটা কীট হচ্ছে ঘুগরা। পৃথিবীতে বহুপ্রজাতির ঘুগরা আছে। কেবল আমেরিকাতেই আছে ২২০ প্রজাতির ঘুগরা। পুরুষ ঘুগরার কাজ হচ্ছে গানের মাধ্যমে বান্ধবী খুঁজে বেড়ানো। তারা গানে গানে বান্ধবীকে কাছে আসার আমন্ত্রণ জানায়। আর মেয়ে ঘুগরারাও পুরুষ ঘুগরার গানে মাতাল হয়ে তার কাছে ধরা দেয় এবং তার সাথে মিলিত হয়।
ঘুগরা ছাড়াও আরো বহুপ্রাণী আছে যারা গান করে বিপরীত লিঙ্গকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। একটি ঘটনা অবতারণার জন্য এতগুলো কথা বললাম। এবার মূল কথায় ফিরে আসি। বছর দশেক আগে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে রংপুর চিড়িয়াখানায় আনা হয় জোড়া ময়ূর-ময়ূরীকে। রাখা হয় এক খাঁচায়। প্রাণী তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন শখ করে ময়ূরের নাম রাখেন শাকিল খান। আর স্ত্রী ময়ূরের নাম রাখেন ময়ূরী।
আবাসস্থল পরিববর্তন হলেও ভালোই দিন কাটছিল তাদের। ময়ূরীকে ছাড়া এক মুহূর্তও একা থাকত না শাকিল খান। কিন্তু বছর চারেক আগে পাশের খাঁচায় আনা হয় এক কিশোর পাখিকে। অতিথির আগমন সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে। ডিমোসিলক্রেন নামের এই পাখিটি দেখতে সুদর্শন। ময়ূরীর খাঁচার পাশে বড় হতে থাকে সে। সুদর্শন এই ডিমোসিলক্রেন যুবক বয়সী হওয়ার সাথে সাথে আনোয়ার হোসেন এটার নাম রাখেন শাকিব খান। মিষ্টি সুরে গান করে শাকিব খান। তাই এই সুর ফাটল সৃষ্টি করে ময়ূরী ও শাকিল খানের সম্পর্কে।
তার গানে মুগ্ধ হয় ময়ূরী। বিমোহিত হয়। কিন্তু ‘স্বামী’র সামনে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না সে। তাই স্বামী ঘুমিয়ে পড়লেই মনের টানে শাকিব খানের খাঁচার পাশে গিয়ে হাজির হয় সে। আস্তে আস্তে ময়ূরীর প্রতি দুর্বল হতে শুরু করে শাকিব খানও। সুযোগ পেলেই শিল্পিত আকারে পরকীয়ার চর্চা করে। খাঁচার ফাঁক গলে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিয়ে ময়ূরীকে ‘আদর’ করে। ময়ূরীও কম যায় না। সেও তার ভালোবাসার ডাকে সাড়া দেয়। ফলে শাকিল থেকে দূরে সরে যেতে থাকে ময়ূরী। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ময়ূরীর সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয় শাকিল খান। কিন্তু ময়ূরী তখন পরকীয়ার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া এক ভ্রান্ত নাবিক। সে কোনো মতেই নিজেকে শাকিলে আবদ্ধ রাখতে পারে না। ফলে অভিমানে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেয় সে। স্বামীর সামনেই দেখিয়ে দেখিয়ে সারাক্ষণ শাকিবের খাঁচার কাছে পড়ে থাকে। বোবা প্রাণীর পরকীয়ায় মানুষেরই বা কী করার আছে? তাই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ময়ূরীকে শাকিবের খাঁচায় রাখা শুরু করে।
পরস্পরকে কাছে পেয়ে নতুন জীবন ফিরে পায় শাকিব-ময়ূরী। স্বাভাবিক খাবার খাওয়া শুরু করে তারা। অপরদিকে নিজের চোখের সামনে স্ত্রীর পরকীয়া এবং পরকীয়া স্বামীর সাথে আমোদে বসবাস দেখে দুঃখের সাগরে ভাসতে শুরু করে শাকিল। শোকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয় সে। চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর আবুল কাশেম জানান, মানুষের মতো ভালোবাসা প্রাণীজগতের মধ্যেও রয়েছে। তারাও সঙ্গীনী হারানো ব্যথা অনুভব করে। সেটা শাকিলের আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি ভিন্ন উপায়ে খানা খাওয়ানো হচ্ছে। [তথ্যসূত্র : দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ১জুন ২০১১ইং]
কী অদ্ভুত ব্যাপার! শেষ পর্যন্ত প্রাণীজগতেও...
প্রাণীজগতে বেশকিছু প্রাণীর সতীত্ব ও স্বামী-স্ত্রী ভক্তির সুনাম আছে। এগুলোর অন্যতম হলো ময়ূর-ময়ূরী, ঘুঘু, কবুতর ইত্যাদি। আল্লামা ইবন কুতাইবা (রহ.) ‘উয়ূনুল আখবার’-গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আমি কবুতরীকে দেখেছি, সে নিজ স্বামী (জোড়া) ছাড়া অন্যকে সংগত হওয়ার সুযোগ দেয় না। আর স্বামী কবুতরও নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্য কারও সাথে মিলিত হয় না। ময়ূরের মধ্যেও ঠিক এই স্বভাব পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এ কী! আজ যে হিসেবপাতি ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে! ময়ূরী কেন শাকিল খানের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে? এটা কীসের আলামত? এই ঘটনা তো আমাদের মানবসভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করছে না? শেষ পর্যন্ত চিড়িয়াখানার চিড়িয়াগুলো আমাদের মানবসমাজের মুখোশ উন্মোচন করে দেবে নাকি! আসুন এবার এসব প্রশ্নের উত্তর ও রহস্যের জট খুলতে কুরআনের ব্যাখ্যায় যাই। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
﴿ ظَهَرَ ٱلۡفَسَادُ فِي ٱلۡبَرِّ وَٱلۡبَحۡرِ بِمَا كَسَبَتۡ أَيۡدِي ٱلنَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعۡضَ ٱلَّذِي عَمِلُواْ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٤١ ﴾ [ الروم : ٤١ ]
‘মানুষের হাতের উপার্জনে জল ও স্থলভাগে ফিৎনা ছড়িয়ে পড়েছে।’ {সূরা আর-রূম, আয়াত : ৪১}
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, পৃথিবীর জল ও স্থলভাগ এক সময় শান্ত, নিরাপদ ও জুলুমমুক্ত ছিল। কেউ কারও প্রতি আগ্রাসী ছিল না। বনের বাঘ ছাগলের ওপর, সিংহ হরিণের ওপর আক্রমণ করত না। সাপ ব্যাঙ ধরে খেত না। রাঘব বোয়াল পুঁটি মাছ ধরে খেত না। কুমির খেত না কচ্ছপকে। কিন্তু এক সময় মানুষের পাপের ভারে বিপর্যস্ত হয় পরিবেশ। ভেঙে পড়ে ইনসাফ ব্যবস্থা। মানুষের হাতের কামাইয়ের কারণে জল ও স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়ে জুলুম-আগ্রাসন। যেদিন কাবিল নিরাপরাধ হাবিলকে হত্যা করে সেদিন থেকে স্থলভাগের পশুদের মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটে। তারা চিন্তা করে তবে এটাই বুঝি জগতের নিয়ম? শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বলের ওপর আক্রমণ করা? ব্যস, শুরু হলো হাঙ্গামা। শক্তিশালী কর্তৃক দুর্বলকে আক্রমণ করার নির্মম প্রতিযোগিতা।
জুলুমও আগ্রাসন ততক্ষণ পর্যন্ত স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখনও জলভাগে এর প্রভাব পড়ে নি। কিন্তু এগিয়ে এলো আরেক জুলুমবাজ। জালান্দার ইবন কিরকির। কুরআনে মুসা (আ.) ও খিযির (আ.)-এর ঘটনায় নৌকা নষ্ট করে দেয়ার যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মূল উৎস ছিলেন এই বাদশা মশাই! তিনিই জোর করে গরীব-দুঃখীদের নিখুঁত ও ভালো জাহাজ এবং নৌকাগুলো ছিনিয়ে নিতেন। অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে দুর্বলের সম্পদ গ্রাস ও তার ওপর আক্রমণ করার দৃশ্য দেখে সেদিন থেকে জলভাগের প্রাণীরাও জুলুমবাজ হতে শুরু করেছিল। মানুষের দেখাদেখি জলভাগেও সবল কর্তৃক দুর্বলের ওপর আক্রমণের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, সেদিন থেকে বোয়াল পুঁটিকে ধরে। কুমির ধরে কচ্ছপকে। ফলে এভাবেই মানুষের দেখাদেখি স্থল ও জলভাগে জুলুম ও অন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। অবলা প্রাণীরা এক্ষেত্রে নির্বিচারে মানুষের ‘অন্ধ অনুসরণ’ করতে থাকে!
বর্তমান সময়ে প্রেম ও পরকীয়া মানুষের মধ্যে যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে প্রাণীরাও যেন এই দুষিত আবওহাওয়া থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না। তারাও মানুষের অনুসরণ করার কসরত করছে! ময়ূরী-শাকিলের প্রেম-উপাখ্যান কি তবে মানুষেরই পাপের ফসল? আমরা কি এই নিষ্পাপ পাখিদের মধ্যে নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে শুরু করেছি? কথাটা বোধ হয় সত্যি, মিথ্যে নয় এক রত্তি!