১
মুক্তবাসিনী-২
লেখকঃ আবু বকর সিরাজী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২৪
ধর্ষিত সভ্যতা এবং লাঞ্ছিত মানবতা
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের হীনমন্যতা সারাবিশ্বে জঘন্যতার প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। সারাবিশ্বে যখন ধর্মীয় উৎসব বা আয়োজনগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমানো হয়, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা তখন নির্লজ্জভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগিয়ে চরম মুনাফাখোরীতে লিপ্ত হয়। রমযান সারাবিশ্বের মুসলিমের কাছে পরম পবিত্রতা ও সংযমের পয়গাম নিয়ে আগমন করে। কিন্তু বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের কাছে তা আগমন করে চরম মুনাফাখোরীর বার্তা নিয়ে। এ এক লজ্জাকর ইতিহাস, জঘন্য মনোবৃত্তি। থাক সে সব কথা।
এবার এমনি এক মুনাফাখোরী সাধারণ ব্যবসায়ীর কথা বলি। লোকটি মোবাইল ফোন ও মোবাইল রিচার্জের ব্যবসা করেন। প্রায় তিন ডজন বাটন টিপে একবার লোড দিয়ে কখনও কখনও মাত্র ২৭ পয়সা কামাই করতে হয় লোডব্যবসায়ীদের। তাই একটু বড় পয়সা বা দুয়েক টাকার প্রশ্ন এলে তাদের কারও কারও ভেতরটা লোভে চক চক করে ওঠে। ফলে মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দিয়ে কখনও কখনও চরম জঘন্য ইতিহাস রচনা করেন তারা।
টুম্পা (ছদ্মনাম) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বেশ দর্শনদারী। মনে হয় বংশীয়। প্রথমে ঢাকায় পা রাখার পর দলে টেনে নেয়ার জন্য যেমন রাজনৈতিক দলগুলো নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তেমনিভাবে প্রথমে ঢাকায় পা রাখা গ্রাম্য সরল মেয়েগুলোকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ওঁৎ পেতে থাকে একশ্রেণীর চতুর যুবক। তাদের সেই চাতুর্যে ধরা পড়ে যে সব ছাত্রী, তারা বাকি জীবন ব্যর্থতার বন্দী খাঁচায় ছটফট করতে থাকে। ঢাকায় আসার স্বপ্ন, রাজধানীর ছায়ায় বড় কিছু হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে যায় কোন্ অজানা দিগন্তে। আর যারা স্বপ্নকে বাঁচানোর জন্য কঠোর হয়, চতুর কামুকদের পাতা ফাঁদে পা না দেয়ার দুঃসাহস দেখায় তাদেরকেও প্রতিনিয়ত ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়।
কুজনের চোখ রাঙানী, ভেংচি কাটার মধ্যে কাটতে থাকে তাদের নিঃসঙ্গ জীবন। তবে সাময়িক কষ্ট হলেও তারাই এক সময় সফল হয়। কর্মজীবনে তারা সফলতার উজ্জ্বল তারকা হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু মোহের কাছে যারা হার মানে, ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয় তারা সাময়িক আনন্দের কাছে সারা জীবনকে বিকিয়ে দিয়ে আসে।
এমনি এক মেয়ে টুম্পা (ছদ্মনাম)। মা-বাবা বড় আশা নিয়ে আদরের কন্যা টুম্পাকে ঢাকা ভার্সিটিতে পাঠিয়েছিলেন। টুম্পা উঠলেন এক মহিলা হোস্টেলে। প্রথম দিনেই একাধিক লোভের চোখ তাকে কুণ্ঠিত করল। কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না। ঢাকায় আসার উদ্দেশ্য তাকে সংযত রাখল এসব লোভাতুর চাহনীর অগ্নিতে দগ্ধ হওয়া থেকে। এগিয়ে চলল তার লেখাপড়ার সংগ্রাম। কিন্তু তাকে বাগে পেতে মরিয়া হয়ে যারা ছুটছিল তারা নিরাশ হওয়ার পাত্র নয়। তারা তার পিছু ছাড়ছিল না। যে কোনো মূল্যে তাকে বশ করা ছিল প্রতারক লোকদের প্রধান লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত তারা প্রতারণার আশ্রয় নিল। মেয়েটির মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা হিমশিম খেলেও নতুন ও অভিনব পন্থা অবলম্বন করল তারা। খেয়াল করল কোন্ দোকান থেকে মেয়েটি টাকা রিচার্জ করে। কলেজ-ভার্সিটি ও এধরনের জনবহুল এলাকায় মোবাইল ব্যবসায়ীর অনেকেই সামান্য কিছু পয়সার লোভে অতি হীনপন্থা অবলম্বন করে থাকে। এলাকার বখাটেদের সাথে তাদের চুক্তি করা থাকে। দশ/বিশ টাকার বদলায় তারা বখাটেদের হাতে রিচার্জ করতে আসা সুন্দরী মেয়েদের নাম্বার ধরিয়ে দেয়।
টুম্পা পড়লেন এমন এক হীনমন্য প্রতারক ব্যবসায়ীর হাতে। যে দোকানে টাকা রিচার্জ করতে আসলেন তিনি সেই দোকানের সাথে বখাটেদের আগ থেকেই চুক্তি করা ছিল। ফলে মাত্র দশটাকায় সে টুম্পার নাম্বার দিয়ে দিল। হাতে সোনার হরিণ পেল বখাটে ছেলেটি। দীর্ঘদিনের সাধনা পূরণ হওয়ার আনন্দে আজ সে খুশিতে আটখানা।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল মোবাইলের রিংটোনে। চমকে গেলেন টুম্পা। এই সময় তো তার নাম্বারে ফোন আসার কথা নয়! তাও আবার অপরিচিত নাম্বার! বহু সংকোচে কলটা রিসিভ করলেন। অপর প্রান্তের লোকটির বিনয়ী সুর, আমি ...আপনি কি...
উটকো ঝামেলা বলে একবার লাইনটা কেটে দেয়ার উদ্যোগ করলেন টুম্পা। কিন্তু কী এক সংকোচ তাকে জড়িয়ে ধরল। তিনি লাইনটা কাটতে গিয়েও কাটলেন না। বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। লজ্জা ও সংকোচ কাজ করলেও কেমন যেন ভালোই লাগে বলে মনে হলো তার। লোকটা কে, টুম্পার কাছে কী চায় সে- ইত্যাদি প্রশ্ন ও কৌতূহল তাকে তাড়িয়ে নিল কৌতূহলের বিরানভূমিতে। কৌতূহলের মধ্য দিয়েই পরের দিনটা কেটে গেল। তিনি অনুভব করলেন তার ভেতরটা যেন এই লোকের কাছ থেকে আবার কল পাওয়ার আশা করছে। রাতে শুতে গিয়ে গতকালের স্মৃতিটা বারবার রোমন্থন করতে লাগলেন। স্মৃতিটাও তার কাছে বেশ রোমাঞ্চকর মনে হলো। তাই আজ আবার কলটা বেজে ওঠার আগ্রহ তাকে অধীর করে তুলল। তিনি সেই অপরিচিত লোকটির করা একটি রিংটোন শোনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করতে থাকলেন।
এক অনিশ্চিত প্রত্যাশার সম্ভাব্য শিহরণে তার সময়গুলো মৃদ মেজাজে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। প্রতীক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয় আর তার শিহরণগুলো অপ্রাপ্তির আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। এমনি এক দোলাচলে এগুতে থাকে তার এই কঠিন মুহূর্তগুলো। সময়ের আঙিনায় এক সময় যেমন সূর্য উদিত হয়, তেমনিভাবে টুম্পার আকাঙ্ক্ষার সীমানাতেও একবার প্রত্যাশার নবোদয় হয়। চাওয়ার তীব্রতার মধ্যেই হঠাৎ তার মোবাইলটা বেজে ওঠে। তিনি শিহরণে কাঁপতে থাকেন। অপরপক্ষের লোকটিও যেন তার হাতের কাঁপন অনুভব করে। লোকটি বুঝতে পারে টুম্পার মানসিকতা। সেভাবে কথার টোপ ফেলে সে। ফলে বড়শীতে যে শিকার আসতে সময় লাগতো অনেক, সে শিকার খুব কম সময়ের মধ্যেই তার বড়শীতে আটকা পড়ে। কথার জালে খুব তীব্রগতিতেই জড়াতে থাকেন টুম্পা।
উভয়ের কথা বলা এখন আর শিহরণ বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তা অধিকারে পরিণত হয়। লোকটি কল দিতে দেরি করলে বা প্রত্যাশিত সময়ে কল না পেলে বড় করে অভিমান করেন টুম্পা। সে অভিমান ভাঙাতে বেশ গলদঘর্ম হতে হয় সেই লোকটাকে।
এভাবে আরো বেশকিছুদিন কেটে যায়। আবেগ-অনুভূতির পাখা একের পর গজাতে থাকে টুম্পার। এক সময়ে ভুলেই যান ঢাকা আসার উদ্দেশ্যের কথা। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বের কথা। সেই ভুল তাকে কাঁদায়, তার মা-বাবাকে কাঁদায় এবং একটি স্বপ্নকে চূর্ণিত করে।
ঢাকার ছেলেমেয়েদের প্রেম প্রেম খেলার অন্যতম রসদ ও সঙ্গী হলো দুইজন মিলে একসাথে চাইনিজ, ফুসকা, আইসক্রিম খাওয়া আর নানা গহীন জায়গায় আড্ডা দেয়া। চাইনিজ খাওয়া বা আড্ডা দেয়ার এমনি এক প্রলোভনের অফার দিয়ে একদিন টুম্পাকে ফোন করলো সেই লোকটি। ফোনের দাওয়াতে শিহরিত হয়েও থেমে গেলেন টুম্পা। এত রাতে একা বের হওয়া সমীচীন মনে হচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় মানুষের অনুরোধে তার এই ভাবাভাবি পরাস্ত হলো। তিনি তার ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হলেন।
আসলে মানুষের আন্তরাত্মা নামের কিছু একটা আছে। না হলে মানুষ যে বিপদে পড়ে আকারে ইঙ্গিতে সে তা প্রকাশ করে কীভাবে? টুম্পার অন্তরাত্মাও বারবার তাকে নিবৃত করছিল না যাবার। কিন্তু তিনি তার অন্তরাত্মার কথায় কান দিতে গিয়েও দিলেন না। ফলে এক চরম অশুভ পরিণতির জালে পা ফেঁসে গেল তার। লোকটি তাকে এক অজানা ঠিকানায় নিয়ে যেতে লাগল। টুম্পা মৃদ প্রতিবাদ করেও তেমন কিছু করতে পারলেন না।
এক পর্যায়ে লোকটি তার মুখোশ উন্মোচন করল। টুম্পাকে সে লাঞ্ছিতা করার উদ্যোগ নিতেই সে বিস্ময়ে, বেদনায়, ক্ষোভে একেবারে পাথর হয়ে গেল। চূড়ান্ত সর্বনাশ হতে দেখে সে তার কথিত প্রিয় মানুষের পায়ে পড়ে বলল, আমার প্রেমের কসম! বিয়ের আগে এসব নয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো। আমি তো তোমারই থাকব! কিন্তু লোকটি বাজখাই গলায় বলল, প্রেমের কসম! কীসের প্রেম? কার সাথে প্রেম? তুমি আমার দশ টাকার প্রেম! দশ টাকায় আমি তোমাকে বাগে পেয়েছি, তাই আজ...
বড্ড রিক্তহস্তে হোস্টেলে ফিরলেন টুম্পা। বারবার মনের জানালা দিয়ে উঁকি দিতে থাকল গ্রামে ফেলে আসা সরল মা-বাবার কথা। মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন বোনা মানুষগুলো এখন কী করছেন? হয়ত ঘুমের কোলে আশ্রয় নিয়ে নির্বিঘ্নে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। কিন্তু হায়! এই যে বাবা এই মা! তোমাদের টুম্পা আজ শেষ হয়ে গেছে। যাকে নিয়ে তোমরা স্বপ্নের পাখা মেলতে, দেখে যাও আজ সে বড়ই অসহায়। বড় রিক্ত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত। সমাজ সভ্যতার নিষ্ঠুরতা তাকে আজ তোমাদের থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেবে, মা!
সমাজের অনেক মানুষ এখন মেয়েকে নিয়েই স্বপ্ন বোনেন। কন্যার কৃতিত্বে মুখ উজ্জ্বল হবে, দুখ মুছবে, অভাব দূর হবে ইত্যকর আশায় তারা প্রশান্তির নিশ্বাস নেন। টুম্পা সেসব বাবা-মাদেরই একজন মেয়ে। যখন ঢাকায় পা রেখেছিলেন তখন কোটি মানুষের শহর তার কাছে বড্ড অপরিচিত ঠেকেছিল। একজন দুর্বল নারী হয়ে কীভাবে এই নির্দয় শহরে নিজেকে মানিয়ে নিবেন এসব ভাবনাও তাকে তাড়া করেছিল। কিন্তু সেই অসহায় দরিদ্র বাবা-মার দুখ ঘোচানোর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তাকে সেদিন শক্ত করেছিল। তিনি নিঃসঙ্গ মুসাফিরের ন্যায় নিজ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছিলেন। কিন্তু অচেনা একটা মরুঝড় আজ তার জীবনটাকেই এলোমেলো করে দিল!
বিধ্বস্ত এই সতীত্ব নিয়ে তিনি কীভাবে সমাজের কাছে মুখ দেখাবেন, মা-বাবার সামনে কোন মুখে উপস্থিত হবেন এসব তিক্ত জিজ্ঞাসা তাকে উদ্ভ্রান্ত করে তুলল। নিজেকে খুব করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন। কেবল মা বাবার দুঃখমোচন ও তাদের আশা পূরণের জন্য হলেও তাকে শূন্য হাতে নতুন করে শুরু করতে হবে বলে নিজেকে প্রবোধ দিলেন। কিন্তু পাথরসম বাস্তবতা ছাপিয়ে কেবলই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মানুষের গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র।
সদ্যরচিত ও সংঘটিত এই চিত্র তার সুস্থ মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করে দিল। তিনি আজ ভুলে গেলেন নিজেকে, ভুলে যেতে কসরত করলেন জন্মদাতা মা-বাবার স্মৃতি, গ্রামে রেখে আসা হাজারও আত্মীয়-স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীর কথা। নির্জনে, একাকিত্বে অশ্রুপাত করে দূর করতে চাইলেন গ্লানি। কিন্তু অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটা থেকে ঝরে পড়ল কেবলই অভিমান, অনুযোগ, দুঃখ আর বেদনা। নির্ভার হতে পারলেন না কিছুতেই। হালকা করতে পারলেন না মনের ব্যথা। তাই বাধ্য হয়ে অনাগত ভবিষ্যতের কোলে আশ্রয় নিয়ে চিরদিনের জন্য ভুলে যেতে চাইলেন কেবলই ফেলে আসা এই ঘৃণ্য অতীত।
পাঠক! পরের দিন জনকোলাহলে মুখরিত মানবতাশূন্য এই বিশাল শহরের একটি হোস্টেলের নির্জনকক্ষে দুঃখী, অসহায়, বঞ্চিত, অপমানিত ও ভাগ্যবিড়ম্বিত এক সরল যুবতীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গিয়েছিল। জানেন কার লাশ ছিল সেটি? [তথ্যসূত্র : যায়যায়দিন]
এবার এমনি এক মুনাফাখোরী সাধারণ ব্যবসায়ীর কথা বলি। লোকটি মোবাইল ফোন ও মোবাইল রিচার্জের ব্যবসা করেন। প্রায় তিন ডজন বাটন টিপে একবার লোড দিয়ে কখনও কখনও মাত্র ২৭ পয়সা কামাই করতে হয় লোডব্যবসায়ীদের। তাই একটু বড় পয়সা বা দুয়েক টাকার প্রশ্ন এলে তাদের কারও কারও ভেতরটা লোভে চক চক করে ওঠে। ফলে মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দিয়ে কখনও কখনও চরম জঘন্য ইতিহাস রচনা করেন তারা।
টুম্পা (ছদ্মনাম) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বেশ দর্শনদারী। মনে হয় বংশীয়। প্রথমে ঢাকায় পা রাখার পর দলে টেনে নেয়ার জন্য যেমন রাজনৈতিক দলগুলো নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তেমনিভাবে প্রথমে ঢাকায় পা রাখা গ্রাম্য সরল মেয়েগুলোকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ওঁৎ পেতে থাকে একশ্রেণীর চতুর যুবক। তাদের সেই চাতুর্যে ধরা পড়ে যে সব ছাত্রী, তারা বাকি জীবন ব্যর্থতার বন্দী খাঁচায় ছটফট করতে থাকে। ঢাকায় আসার স্বপ্ন, রাজধানীর ছায়ায় বড় কিছু হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে যায় কোন্ অজানা দিগন্তে। আর যারা স্বপ্নকে বাঁচানোর জন্য কঠোর হয়, চতুর কামুকদের পাতা ফাঁদে পা না দেয়ার দুঃসাহস দেখায় তাদেরকেও প্রতিনিয়ত ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়।
কুজনের চোখ রাঙানী, ভেংচি কাটার মধ্যে কাটতে থাকে তাদের নিঃসঙ্গ জীবন। তবে সাময়িক কষ্ট হলেও তারাই এক সময় সফল হয়। কর্মজীবনে তারা সফলতার উজ্জ্বল তারকা হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু মোহের কাছে যারা হার মানে, ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয় তারা সাময়িক আনন্দের কাছে সারা জীবনকে বিকিয়ে দিয়ে আসে।
এমনি এক মেয়ে টুম্পা (ছদ্মনাম)। মা-বাবা বড় আশা নিয়ে আদরের কন্যা টুম্পাকে ঢাকা ভার্সিটিতে পাঠিয়েছিলেন। টুম্পা উঠলেন এক মহিলা হোস্টেলে। প্রথম দিনেই একাধিক লোভের চোখ তাকে কুণ্ঠিত করল। কিন্তু তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না। ঢাকায় আসার উদ্দেশ্য তাকে সংযত রাখল এসব লোভাতুর চাহনীর অগ্নিতে দগ্ধ হওয়া থেকে। এগিয়ে চলল তার লেখাপড়ার সংগ্রাম। কিন্তু তাকে বাগে পেতে মরিয়া হয়ে যারা ছুটছিল তারা নিরাশ হওয়ার পাত্র নয়। তারা তার পিছু ছাড়ছিল না। যে কোনো মূল্যে তাকে বশ করা ছিল প্রতারক লোকদের প্রধান লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত তারা প্রতারণার আশ্রয় নিল। মেয়েটির মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা হিমশিম খেলেও নতুন ও অভিনব পন্থা অবলম্বন করল তারা। খেয়াল করল কোন্ দোকান থেকে মেয়েটি টাকা রিচার্জ করে। কলেজ-ভার্সিটি ও এধরনের জনবহুল এলাকায় মোবাইল ব্যবসায়ীর অনেকেই সামান্য কিছু পয়সার লোভে অতি হীনপন্থা অবলম্বন করে থাকে। এলাকার বখাটেদের সাথে তাদের চুক্তি করা থাকে। দশ/বিশ টাকার বদলায় তারা বখাটেদের হাতে রিচার্জ করতে আসা সুন্দরী মেয়েদের নাম্বার ধরিয়ে দেয়।
টুম্পা পড়লেন এমন এক হীনমন্য প্রতারক ব্যবসায়ীর হাতে। যে দোকানে টাকা রিচার্জ করতে আসলেন তিনি সেই দোকানের সাথে বখাটেদের আগ থেকেই চুক্তি করা ছিল। ফলে মাত্র দশটাকায় সে টুম্পার নাম্বার দিয়ে দিল। হাতে সোনার হরিণ পেল বখাটে ছেলেটি। দীর্ঘদিনের সাধনা পূরণ হওয়ার আনন্দে আজ সে খুশিতে আটখানা।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল মোবাইলের রিংটোনে। চমকে গেলেন টুম্পা। এই সময় তো তার নাম্বারে ফোন আসার কথা নয়! তাও আবার অপরিচিত নাম্বার! বহু সংকোচে কলটা রিসিভ করলেন। অপর প্রান্তের লোকটির বিনয়ী সুর, আমি ...আপনি কি...
উটকো ঝামেলা বলে একবার লাইনটা কেটে দেয়ার উদ্যোগ করলেন টুম্পা। কিন্তু কী এক সংকোচ তাকে জড়িয়ে ধরল। তিনি লাইনটা কাটতে গিয়েও কাটলেন না। বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। লজ্জা ও সংকোচ কাজ করলেও কেমন যেন ভালোই লাগে বলে মনে হলো তার। লোকটা কে, টুম্পার কাছে কী চায় সে- ইত্যাদি প্রশ্ন ও কৌতূহল তাকে তাড়িয়ে নিল কৌতূহলের বিরানভূমিতে। কৌতূহলের মধ্য দিয়েই পরের দিনটা কেটে গেল। তিনি অনুভব করলেন তার ভেতরটা যেন এই লোকের কাছ থেকে আবার কল পাওয়ার আশা করছে। রাতে শুতে গিয়ে গতকালের স্মৃতিটা বারবার রোমন্থন করতে লাগলেন। স্মৃতিটাও তার কাছে বেশ রোমাঞ্চকর মনে হলো। তাই আজ আবার কলটা বেজে ওঠার আগ্রহ তাকে অধীর করে তুলল। তিনি সেই অপরিচিত লোকটির করা একটি রিংটোন শোনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করতে থাকলেন।
এক অনিশ্চিত প্রত্যাশার সম্ভাব্য শিহরণে তার সময়গুলো মৃদ মেজাজে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। প্রতীক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয় আর তার শিহরণগুলো অপ্রাপ্তির আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। এমনি এক দোলাচলে এগুতে থাকে তার এই কঠিন মুহূর্তগুলো। সময়ের আঙিনায় এক সময় যেমন সূর্য উদিত হয়, তেমনিভাবে টুম্পার আকাঙ্ক্ষার সীমানাতেও একবার প্রত্যাশার নবোদয় হয়। চাওয়ার তীব্রতার মধ্যেই হঠাৎ তার মোবাইলটা বেজে ওঠে। তিনি শিহরণে কাঁপতে থাকেন। অপরপক্ষের লোকটিও যেন তার হাতের কাঁপন অনুভব করে। লোকটি বুঝতে পারে টুম্পার মানসিকতা। সেভাবে কথার টোপ ফেলে সে। ফলে বড়শীতে যে শিকার আসতে সময় লাগতো অনেক, সে শিকার খুব কম সময়ের মধ্যেই তার বড়শীতে আটকা পড়ে। কথার জালে খুব তীব্রগতিতেই জড়াতে থাকেন টুম্পা।
উভয়ের কথা বলা এখন আর শিহরণ বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তা অধিকারে পরিণত হয়। লোকটি কল দিতে দেরি করলে বা প্রত্যাশিত সময়ে কল না পেলে বড় করে অভিমান করেন টুম্পা। সে অভিমান ভাঙাতে বেশ গলদঘর্ম হতে হয় সেই লোকটাকে।
এভাবে আরো বেশকিছুদিন কেটে যায়। আবেগ-অনুভূতির পাখা একের পর গজাতে থাকে টুম্পার। এক সময়ে ভুলেই যান ঢাকা আসার উদ্দেশ্যের কথা। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বের কথা। সেই ভুল তাকে কাঁদায়, তার মা-বাবাকে কাঁদায় এবং একটি স্বপ্নকে চূর্ণিত করে।
ঢাকার ছেলেমেয়েদের প্রেম প্রেম খেলার অন্যতম রসদ ও সঙ্গী হলো দুইজন মিলে একসাথে চাইনিজ, ফুসকা, আইসক্রিম খাওয়া আর নানা গহীন জায়গায় আড্ডা দেয়া। চাইনিজ খাওয়া বা আড্ডা দেয়ার এমনি এক প্রলোভনের অফার দিয়ে একদিন টুম্পাকে ফোন করলো সেই লোকটি। ফোনের দাওয়াতে শিহরিত হয়েও থেমে গেলেন টুম্পা। এত রাতে একা বের হওয়া সমীচীন মনে হচ্ছিল না। কিন্তু প্রিয় মানুষের অনুরোধে তার এই ভাবাভাবি পরাস্ত হলো। তিনি তার ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হলেন।
আসলে মানুষের আন্তরাত্মা নামের কিছু একটা আছে। না হলে মানুষ যে বিপদে পড়ে আকারে ইঙ্গিতে সে তা প্রকাশ করে কীভাবে? টুম্পার অন্তরাত্মাও বারবার তাকে নিবৃত করছিল না যাবার। কিন্তু তিনি তার অন্তরাত্মার কথায় কান দিতে গিয়েও দিলেন না। ফলে এক চরম অশুভ পরিণতির জালে পা ফেঁসে গেল তার। লোকটি তাকে এক অজানা ঠিকানায় নিয়ে যেতে লাগল। টুম্পা মৃদ প্রতিবাদ করেও তেমন কিছু করতে পারলেন না।
এক পর্যায়ে লোকটি তার মুখোশ উন্মোচন করল। টুম্পাকে সে লাঞ্ছিতা করার উদ্যোগ নিতেই সে বিস্ময়ে, বেদনায়, ক্ষোভে একেবারে পাথর হয়ে গেল। চূড়ান্ত সর্বনাশ হতে দেখে সে তার কথিত প্রিয় মানুষের পায়ে পড়ে বলল, আমার প্রেমের কসম! বিয়ের আগে এসব নয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো। আমি তো তোমারই থাকব! কিন্তু লোকটি বাজখাই গলায় বলল, প্রেমের কসম! কীসের প্রেম? কার সাথে প্রেম? তুমি আমার দশ টাকার প্রেম! দশ টাকায় আমি তোমাকে বাগে পেয়েছি, তাই আজ...
বড্ড রিক্তহস্তে হোস্টেলে ফিরলেন টুম্পা। বারবার মনের জানালা দিয়ে উঁকি দিতে থাকল গ্রামে ফেলে আসা সরল মা-বাবার কথা। মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন বোনা মানুষগুলো এখন কী করছেন? হয়ত ঘুমের কোলে আশ্রয় নিয়ে নির্বিঘ্নে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। কিন্তু হায়! এই যে বাবা এই মা! তোমাদের টুম্পা আজ শেষ হয়ে গেছে। যাকে নিয়ে তোমরা স্বপ্নের পাখা মেলতে, দেখে যাও আজ সে বড়ই অসহায়। বড় রিক্ত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত। সমাজ সভ্যতার নিষ্ঠুরতা তাকে আজ তোমাদের থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেবে, মা!
সমাজের অনেক মানুষ এখন মেয়েকে নিয়েই স্বপ্ন বোনেন। কন্যার কৃতিত্বে মুখ উজ্জ্বল হবে, দুখ মুছবে, অভাব দূর হবে ইত্যকর আশায় তারা প্রশান্তির নিশ্বাস নেন। টুম্পা সেসব বাবা-মাদেরই একজন মেয়ে। যখন ঢাকায় পা রেখেছিলেন তখন কোটি মানুষের শহর তার কাছে বড্ড অপরিচিত ঠেকেছিল। একজন দুর্বল নারী হয়ে কীভাবে এই নির্দয় শহরে নিজেকে মানিয়ে নিবেন এসব ভাবনাও তাকে তাড়া করেছিল। কিন্তু সেই অসহায় দরিদ্র বাবা-মার দুখ ঘোচানোর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তাকে সেদিন শক্ত করেছিল। তিনি নিঃসঙ্গ মুসাফিরের ন্যায় নিজ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছিলেন। কিন্তু অচেনা একটা মরুঝড় আজ তার জীবনটাকেই এলোমেলো করে দিল!
বিধ্বস্ত এই সতীত্ব নিয়ে তিনি কীভাবে সমাজের কাছে মুখ দেখাবেন, মা-বাবার সামনে কোন মুখে উপস্থিত হবেন এসব তিক্ত জিজ্ঞাসা তাকে উদ্ভ্রান্ত করে তুলল। নিজেকে খুব করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন। কেবল মা বাবার দুঃখমোচন ও তাদের আশা পূরণের জন্য হলেও তাকে শূন্য হাতে নতুন করে শুরু করতে হবে বলে নিজেকে প্রবোধ দিলেন। কিন্তু পাথরসম বাস্তবতা ছাপিয়ে কেবলই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মানুষের গাদ্দারি ও বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র।
সদ্যরচিত ও সংঘটিত এই চিত্র তার সুস্থ মস্তিষ্ককে নিষ্ক্রিয় করে দিল। তিনি আজ ভুলে গেলেন নিজেকে, ভুলে যেতে কসরত করলেন জন্মদাতা মা-বাবার স্মৃতি, গ্রামে রেখে আসা হাজারও আত্মীয়-স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীর কথা। নির্জনে, একাকিত্বে অশ্রুপাত করে দূর করতে চাইলেন গ্লানি। কিন্তু অশ্রুর প্রতিটি ফোঁটা থেকে ঝরে পড়ল কেবলই অভিমান, অনুযোগ, দুঃখ আর বেদনা। নির্ভার হতে পারলেন না কিছুতেই। হালকা করতে পারলেন না মনের ব্যথা। তাই বাধ্য হয়ে অনাগত ভবিষ্যতের কোলে আশ্রয় নিয়ে চিরদিনের জন্য ভুলে যেতে চাইলেন কেবলই ফেলে আসা এই ঘৃণ্য অতীত।
পাঠক! পরের দিন জনকোলাহলে মুখরিত মানবতাশূন্য এই বিশাল শহরের একটি হোস্টেলের নির্জনকক্ষে দুঃখী, অসহায়, বঞ্চিত, অপমানিত ও ভাগ্যবিড়ম্বিত এক সরল যুবতীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গিয়েছিল। জানেন কার লাশ ছিল সেটি? [তথ্যসূত্র : যায়যায়দিন]