hadith book logo

কাদের রোযা কবুল হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৩

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোযার উপকারিতা

ইসলামের আদেশ-নিষেধ পালন করলে সওয়াব হয় এ কথা সবারই জানা; কিন্তু কেবল সওয়াবই নয়, ইসলামের প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পালনের মধ্যে ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিহিত রয়েছে কল্যাণ ও উপকারিতা। এ বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের যুগে যুক্তি, তর্ক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে যে, ইসলামের প্রতিটি বিধান নিঃসন্দেহে কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক। রোযা তেমনি একটি অত্যমত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ ইসলামী বিধান। পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে রোযা গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি মেশিন প্রসত্মুতকারী জানেন যে, উক্ত মেশিন ঠিক রাখার জন্য ও ভাল সার্ভিস দেয়ার জন্য কোন্ সময় কী ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে মানব দেহের নির্মাতা স্বয়ং আলস্নাহ তা‘আলাই ভাল জানেন শরীরকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখার জন্য এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কী ব্যবস্থা নিতে হবে। উক্ত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তিনি বছরে একমাস রোযা রাখা ফরয করেছেন। বিভিন্ন প্রকার রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে রোযার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। নিম্নে এ সংক্রামত্ম কিছু আলোচনা তুলে ধরছি।

 উচ্চ রক্তচাপ :

রোযা শরীরের রক্ত প্রবাহকে পরিশোধন করে থাকে এবং সমগ্র প্রবাহ প্রণালীকে নবরূপ দান করে থাকে। রোযা উচ্চ রক্তচাপজনিত ব্যাধি এবং অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধি কমাতে সাহায্য করে।

 ডায়াবেটিস :

গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, রোযা রাখাতে ডায়াবেটিস রোগীদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে, তাদের সুগার নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। হৃদরোগীদের অস্থিরতা ও শ্বাস স্ফীতি হ্রাস পেয়েছে।

 পাকস্থলীর রোগ ও আলসার :

রোযার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় পাকস্থলীর রোগীরা। রোযা পেপটিক আলসার এবং তজ্জনিত পাকস্থলীর দাহ্যতা ও এর প্রদাহ তাড়াতাড়ি উপশম করে। পাকস্থলী একটি বৃহদাকার পেশী বিশেষ। শরীরের অন্যান্য পেশীর মত এরও বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। এক মাস রোযা রাখার ফলে পাকস্থলী ও অন্ত্র বিশ্রাম নেয়ার সময় পায় তখনই তা ক্ষতস্থান বা আলসার নিরাময়ে লেগে যায় এবং পূর্বাবস্থা পুনরম্নদ্ধারে নিয়োজিত হয়।

যারা মনে করেন যে, রোযা রাখলে পেটের শুল বেদনা বৃদ্ধি পায়, তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। সতের জন রোযাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি বা কম, রোযা রাখার ফলে তাদের উভয় দোষই সেরে গেছে।

 ধূমপান ত্যাগ :

উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসে ক্যান্সার ও হৃদরোগ থেকে বাঁচার জন্য ধূমপান ত্যাগ করা একামত্ম অপরিহার্য। রোযা ধুমপান থেকে বিরত থাকার একটি সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।

 কিডনী ও মূত্রথলি :

একমাস রোযা রাখার ফলে লিভার, কিডনী, ও মূত্রথলী প্রভৃতি অঙ্গসমূহ বিশ্রাম পায়। এতে অঙ্গগুলো বেশ উপকারিতা লাভ করে। কিডনী ও মূত্রথলীর নানা উপসর্গ রোযার ফলে নিরাময় হবার সম্ভাবনা আছে।

 ওজন কমানো :

যারা বেশি মোটা এবং যাদের শরীরে মেদ থাকে রোযা রাখলে তাদের শরীরের চর্বি শরীরে ব্যবহৃত হয়ে শরীরে শক্তি যোগায় এবং দেহকে অস্বাভাবিক মোটা হতে বাধা দেয়। এতে শরীর ভাল থাকে এবং হার্ট এ্যাটাকের সম্ভাবনা হ্রাস পায় এবং শরীরের ওজন স্বাভাবিক হয়ে আসে।

 প্রজনন অঙ্গ :

জৈবিক চাহিদাকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষেত্রে রোযার প্রতিক্রিয়া অত্যধিক। একবার জনৈক অতি দরিদ্র সাহাবী রাসূল সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম-এর নিকট বিবাহ মঞ্জুরির আবেদন করেছিলেন। নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম এ অবস্থায় তাঁকে বিবাহের অনুমতি না দিয়ে রোযা রাখবার ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন। ইসলামের বিধান হল দারিদ্রের কারণে বিবাহ করতে না পারলে রোযা রেখে মনকে পবিত্র রাখা।

 মসিত্মষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র :

রোযা মসিত্মষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে সর্বাধিক উজ্জীবিত করে। রোযা মসিত্মষ্কে রক্ত প্রবাহ সবল করে। স্নায়ুবিক দুর্বলতা এবং মসিত্মষ্কের অবসাদ দূর করে। যার ফলে মসিত্মষ্ক অধিক শক্তি অর্জন করতে পারে। এতে ধ্যান-ধারণা পরিষ্কার হয়। সুদীর্ঘ অনুশীলন এবং গভীর ধ্যান করা সম্ভব হয়। জ্ঞানীগণ যথার্থই বলেছেন, ‘‘ক্ষুধার্ত উদর জ্ঞানের উৎস’’।

Dr. Alex Heig বলেছেন, ‘‘রোযা হতে মানুষের মানসিক শক্তি এবং বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়, স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তি শক্তি বর্ধিত হয়, প্রীতি, ভালবাসা, সহানুভূতি, এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। খাদ্যে অরম্নচি দূর হয়।’’

 মানসিক শক্তি ও শামিত্ম :

শারীরিক কতগুলো ব্যাধির উৎস হচ্ছে মানসিক অশামিত্ম। এ রোগগুলোকে বলা হয় সাইকোসোমাটিক ব্যাধি। মানুষ যদি রোযা রাখে তবে এসব ব্যাধির উপসর্গ কম হবার সম্ভবনা থাকে। কেননা রোযার মাধ্যমে মানুষের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

 মুখ ও দাঁত :

রমাযান মাসে খাদ্য গ্রহণের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় বিধায় মুখ ও দাঁতের যত্নেরও কিছুটা পরিবর্তন লক্ষণীয়। সাহারীর পর, নামাযের পূর্বে এবং রাত্রে ঘুমাবার আগে ভাল করে মেসওয়াক বা ব্রাশ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। নিম গাছের ডাল দিয়ে মেসওয়াক করা উত্তম। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হল নিম গাছের ডালের রস রোগের উত্তম কার্যকর প্রতিরোধক। মেসওয়াক করার সময় হাতের আঙ্গুল দিয়ে মাড়ি ম্যাসেজ করলে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এতে মাড়ি সুস্থ থাকে। সাহারীর পর দু’দাঁতের মধ্যখানে যেসব খাদ্যের কণা আটকে থাকে তা খিলাল দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

 ঘুম :

ঘুম মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জৈব প্রক্রিয়া। সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য এর প্রয়োজন অপরিসীম। নিদ্রা মানুষের দুশ্চিমত্মাগুলোকে কমিয়ে এনে মানসিক প্রশামিত্ম দান করে। সেজন্য কোরআনে কয়েক জায়গায় ঘুমকে শামিত্ম ও আরামের উপায় বলা হয়েছে। যেমন : সূরা নাবার ৯ ও ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে: ‘‘তোমাদের জন্য নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম এবং রাতকে করেছি আবরণ’’।

তবে মাত্রাতিরিক্ত ঘুম ভাল নয়। একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন ৫-৬ ঘন্টা ঘুমাতে পারে। যারা বেশি ঘুমায় তাদের চেয়ে যারা কম ঘুমায় তারা অধিক পরিশ্রমী এবং কর্তব্যনিষ্ঠ। তারাই জীবনে সফলকাম হয়। রমাযান মাসে কম ঘুমানোর ট্রেনিংটা জীবনে সাফল্য বয়ে আনতে সাহায্য করে।