hadith book logo

কাদের রোযা কবুল হয়

লেখকঃ শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর উম্মতের রোযা

 রমাযানের রোযা ফরয হওয়ার আগে নবী সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম মুসলমানদেরকে প্রতি মাসে তিনদিন রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং আশুরার দিনে রোযা রাখতে উৎসাহিত করতেন ।

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ وَيَحُثُّنَا عَلَيْهِ وَيَتَعَاهَدُنَا عِنْدَهُ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ لَمْ يَأْمُرْنَا وَلَمْ يَنْهَنَا وَلَمْ يَتَعَاهَدْنَا عِنْدَهُ

জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) বলেন, রাসূল সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়াসালস্নাম আমাদেরকে আশুরার দিন রোযা রাখার নির্দে.শ দিতেন এবং এ ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন। আমরা রোযা রাখছি কি না এরও খোঁজ-খবর নিতেন। পরে যখন রমাযানের রোযা ফরজ হয়ে গেল তখন এ ব্যাপারে কোন আদেশ করতেন না, নিষেধও করতেন না এবং কোন খোঁজ-খবরও নিতেন না। (সহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৯৪৬)

 দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে সর্বপ্রথম রমাযান মাসে রোযা রাখার বিধান নাযিল হয়। তবে এতে লোকদেরকে এতটুকু সুযোগ দেয়া হয়েছিল যে, যারা রোযা রাখতে চায় না, তারা প্রতি রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাওয়ালেও চলবে। আলস্নাহর বাণী :

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ - أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَّرِيضًا أَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِيْنَ يُطِيْقُونَه فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِيْنٍ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَنْ تَصُوْمُوا خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ

‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা (এর মাধ্যমে আলস্নাহকে) ভয় করতে পার। (রোযা ফরজ করা হয়েছে) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য, তবে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে, তবে সমপরিমাণ দিনের রোযা (সুস্থ হয়ে অথবা সফর থেকে ফিরে এসে) কাযা আদায় করে নেবে; আর যারা সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও রোযা রাখতে চায় না তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদিয়া দেয়ার সুযোগ থাকবে আর তা হচ্ছে একজন গরীব ব্যক্তিকে (পেট ভরে) খাবার দেয়া। অবশ্য যদি কোন ব্যক্তি (এর চেয়ে বেশি দিয়ে) ভাল কাজ করতে চায়, তাহলে এ কাজ তার জন্য একামত্ম কল্যাণকর হবে। তবে (এ সময়) রোযা রাখা তোমাদের জন্য খুবই ভাল; যদি তোমরা (রোযার উপকারিতা সম্পর্কে) জানতে পার।’’ (সূরা বাকারা- ১৮৩,১৮৪)

 উপরোক্ত বিধান নাযিল হওয়ার একবছর পর সুস্থদের ব্যাপারে যে ছাড় দেয়া হয়েছিল তা রহিত করে পুরো মাস রোযা রাখা বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয় এবং রোগী ও মুসাফিরদের ব্যাপারে কাযার বিধান বহাল রাখা হয়। তবে যারা রোযা রাখতে অক্ষম তারা ফিদিয়া দিতে পারবে।

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيْ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدٰى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَنْ كَانَ مَرِيْضًا أَوْ عَلٰى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ يُرِيْدُ اللهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيْدُ بِكُمُ الْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ

রমাযান মাস (এমন একটি মাস) যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে, আর এই কোরআন হচ্ছে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং (হক ও বাতিলের) পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে, তবে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফরে থাকে তবে সে পরবর্তী দিনগুলোতে গুণে গুণে সেই পরিমাণ কাযা করে নেবে। (এ সুযোগ দিয়ে) আলস্নাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কখনোই তোমাদের (জীবন) কঠিন করতে চান না। আলস্নাহর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা যেন গুণে গুণে (রোযার) সংখ্যাগুলো পূর্ণ করতে পার, আর আলস্নাহ তোমাদেরকে (জীবন যাপনের) যে পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন সেজন্য তাঁর মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে পার এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পার। (সূরা বাকারা- ১৮৫)

 রমাযান মাসে রোযা রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার পর এর বিসত্মারিত বিধি-বিধান সম্পর্কে মুসলমানদেরকে ধারণা দেয়া হয় এবং রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর জেগে উঠে সহবাস করা ও খাওয়া-দাওয়া করাকে হালাল করে দেয়া হয়, আগে এসব হালাল ছিল না। ইবনে কাসীরের বর্ণনায় এসেছে :

কায়েস ইবনে সুরমাহ আনসারী রোযা রেখে সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ী ফিরে স্ত্রীকে বললেন, খাওয়ার কিছু আছে কি? স্ত্রী বললেন, না। এরপর স্ত্রী খাবারের খোঁজে বের হলেন। ফিরে এসে দেখেন স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছেন। ফলে তিনি পরের দিন না খেয়ে রোযা রাখলেন। এক পর্যায়ে তিনি ক্ষুধার জ্বালায় বেঁহুশ হয়ে পড়েন। নবীর কাছে এ খবর দেয়া হল।

অপরদিকে উমর (রাঃ) রোযার রাতে ঘুমানোর পর জেগে উঠে স্ত্রীর সাথে সহবাস করে বসেন। পরে তিনি নিজেকে দোষী মনে করে আক্ষেপের সাথে নবীর কাছে গিয়ে নিজের ঘটনা বললেন। এসব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আলস্নাহ তা‘আলা সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াত নাযিল করে সুবহে সাদিক পর্যমত্ম সহবাস করা ও খাওয়া-দাওয়াকে বৈধ করে দিলেন।

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ الصِّيَامِ الرَّفَثُ إِلٰى نِسَائِكُمْ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ عَلِمَ اللهُ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَخْتَانُونَ أَنْفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنْكُمْ فَالْآنَ بَاشِرُوْهُنَّ وَابْتَغُوْا مَا كَتَبَ اللهُ لَكُمْ وَكُلُوْا وَاشْرَبُوْا حَتّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الْأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ وَلَا تُبَاشِرُوْهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُوْنَ فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُوْدُ اللهِ فَلَا تَقْرَبُوْهَا كَذلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ آيَاتِه لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُوْنَ

‘‘রোযার মাসে রাতের বেলায় তোমাদের স্ত্রীদের সাথে মিলন করা তোমাদের জন্য হালাল করে দেয়া হয়েছে, তোমাদের স্ত্রীরা যেমনি তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ, ঠিক তোমরাও তাদের জন্য পোশাক সমতুল্য। আলস্নাহ এটা জানেন যে, তোমরা নিজেদের উপর খিয়ানত করে বসবে, তাই তিনি তোমাদের উপর দয়া করলেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এখন চাইলে তোমরা তাদের সাথে সহবাস করতে পার এবং (এ ব্যাপারে) আলস্নাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য যা (বিধি-বিধান কিংবা সমত্মান) লিখে রেখেছেন তা সন্ধান কর। আর তোমরা পানাহার অব্যাহত রাখতে পার যতক্ষণ পর্যমত্ম রাতের অন্ধকার রেখার ভিতর থেকে ভোরের শুভ্র আলোকরেখা পরিষ্কার না হয়। অতঃপর তোমরা রাত আসা পর্যমত্ম রোযা পূর্ণ কর। তবে মসজিদে যখন তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় থাকবে তখন নারী সম্ভোগ থেকে বিরত থকবে। এ হচ্ছে আলস্নাহর নির্ধারিত সীমারেখা। অতএব তোমরা কখনো এর কাছেও যেয়ো না, এভাবেই আলস্নাহ তা‘আলা তার যাবতীয় নিদর্শন মানুষের জন্য বলে দিয়েছেন, যেন তারা (এর আলোকে) আলস্নাহকে ভয় করতে পারে।’’

(সূরা বাকারা- ১৮৭)