hadith book logo

তাওহীদের কিশতী

লেখকঃ ডঃ মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান আল উরাইফী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

কিভাবে শির্কের সূচনা হয়?

আপনি যদি চিন্তা করে দেখেন পৃথিবীতে কিভাবে শির্কের সূচনা হয় তবে দেখবেন এর একমাত্র কারণ হল নেক লোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি। তাদের যা মর্যাদা তার চাইতে বেশী তাদেরকে সম্মান করা। এজন্য যে কোন মানুষের কথা বিনা দলীলে অন্ধের মত মেনে নেয়া এবং বিশ্বাস করা শির্কের চোরাগলীর দরজা উম্মুক্ত করে।

নূহ (আ:) এর সমপ্রদায় তাওহীদ পন্থী ছিল। তারা এককভাবে আল্লাহ্‌র ইবাদত করত। তার সাথে কাউকে শরীক করত না। সে সময় পৃথিবীর বুকে কোন শির্ক ছিল না। তাদের মধ্যে পাঁচ জন নেক লোক ছিল। ওয়াদ, সুয়াহ, ইয়াগুছ, ইয়াউক্ব ও নসর ছিল তাদের নাম। তারা ইবাদত বন্দেগী করতেন এবং লোকদের দ্বীন শিক্ষা দিতেন। যখন তারা মৃত্যু বরণ করলেন, কওমের লোকেরা খুবই চিন্তিত হল। বলল, যারা আমাদেরকে ইবাদতের কথা স্মরণ করাতো, আল্লাহ্‌র আনুগত্য করার নির্দেশ দিত তারা তো চলে গেলেন..।

শয়তান এসে তাদেরকে কুমন্ত্রনা দিল। বলল, তোমরা যদি তাদের ছবি তৈরী করতে মূর্তীর আকৃতিতে- আর তা মসজিদের কাছে রেখে দিতে, তবে তাদেরকে দেখলেই তোমরা তোমাদের ইবাদতে প্রাণ ফিরে পাবে এবং তৎপরতার সাথে ইবাদত বন্দেগী করতে পারবে। তারা তার কথা শুনল। তাদের প্রতিকী মূর্তী (ভাস্কর) তৈরী করা হল। উদ্দেশ্য তাদেরকে দেখে ইবাদত ও নেক কাজে স্পৃহা ও উদ্দীপনা লাভ করা।

বাস্তাবিকই তারা এ সমস্ত মূর্তীকে দেখে ইবাদত-বন্দেগীতে উৎসাহ অনুপ্রেরণা লাভ করত। অনেক বছর পার হয়ে গেল। এ প্রজম্ম বিদায় নিল। নতুন প্রজম্ম তাদের সন্তানগণ বড় হল। তারা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে তাদের বাপ-দাদারা এ সমস্ত মূর্তী সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলেন। তাদেরকে সম্মান করেন। কেননা তারা নেক লোকদের কথা তাদেরকে স্মরণ করায়।

তাদের পর আর এক প্রজম্ম দুনিয়ায় এল। ইবলিস তাদের কাছে এসে বলল, তোমাদের আগে যারা ছিল (তোমাদের বাপ-দাদারা) এগুলোর ইবাদত করত! দুর্ভিক্ষ বা অনাবৃষ্টি বা বিপদ-আপদে তারা এগুলোর আশ্রয় কামনা করত। সুতরাং তোমরাও এগুলোর ইবাদত কর।

তারা তাদের ইবাদত শুরু করল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্‌ তাওআলা তাদের মাঝে হযরত নূহ (আ:)কে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে ঐ সমস্ত মূর্তীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে আল্লাহ্‌র ইবাদত করার জন্য মানুষকে আহ্বান জানালেন। সাড়ে নয়হশ বছর তিনি দাওওয়াত দিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক লোক দাওওয়াত কবূল করল। তারা বলল,

لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا

দুআতোমরা তোমাদের মাওবূদদেরকে ছেড়ো না, তোমরা ছাড়িও না ওয়াদ, সুয়াহ, ইয়াগুছ, ইয়াউক্ব ও নসরকে । (সূরা নূহ: ২৩) ফলে আল্লাহ্‌ তাদের উপর রাগম্বিত হলেন। বন্যায় ডুবিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিলেন..। দুনিয়া থেকে শির্ক মিটে গেল। এ হল নূহ (আ:)এর সমপ্রদায়ের লোকদের ঘটনা।

ইবরাহীম (আ:)এর কওমের মধ্যে কিভাবে শির্কের সূচনা হল? তারা গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা করত। তারা বিশ্বাস করত এগুলো জগত নিয়ন্ত্রন করে, বিপদাপদ দূরীভূত করে, দুওআ কবূল করে, প্রয়োজন পূরণ করে। তারা বিশ্বাস করত এ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র আল্লাহ্‌ ও সৃষ্টি জগতের মাঝে মধ্যস্থতাকারী এবং তাদেরকে দেয়া হয়েছে পৃথিবী পরিচালনার দায়-দায়িত্ব। এ বিশ্বাসের ফলশ্রুতিতে তারা অনুমানের ভিত্তিতে গ্রহ-নক্ষত্র, ফেরেস্তা প্রভৃতির মূর্তী তৈরী করে সেগুলোর ইবাদত করত।

ইবরাহীম (আ:)এর পিতা মূর্তী তৈরী করে ছেলেদের দিয়ে বাজারে বিক্রি করত। সে ইবরাহীমকেও মূর্তী বিক্রয় করার জন্য বাজারে যেতে চাপ দিত। তিনি বাজারে যেতেন আর বিক্রয় করার সময় হাঁক ছাড়তেন, কে খরিদ করবে এমন বস্তু যা উপকার-অপকারের কোন ক্ষমতা রাখে না...। অন্য ভায়েরা মূর্তী বিক্রয় করে বাড়ি ফিরত। আর তিনি মূর্তী নিয়ে ফেরত আসতেন। এরপর তিনি পিতাকে এবং কওমের লোকদেরকে আহ্বান জানালেন এ সমস্ত মূর্তীকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু কেউ কোন সাড়া দিল না। ফলে তিনি মূর্তীগুলো ভেঙ্গে ফেললেন। কওমের লোকেরা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপ করল। কিন্তু আল্লাহ্‌ তাওআলা আগুনকে আদেশ দিলেন,

يَانَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ

দুআহে আগুন! তুমি ইবরাহীমের জন্য ঠান্ডা এবং শান্তি হয়ে যাও । (সূরা আম্বিয়া- ৬৯)