hadith book logo

কুরআনের আলোকে মূসা আলাইহিস সালামের ব্যক্তিত্ব ও দা‘ওয়াহ কার্যক্রম

লেখকঃ মো: আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

(ক) ব্যক্তিগত প্রস্তুতি গ্রহণ

ইসলামী দা‘ওয়াহ মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া এক মহান দায়িত্ব। যুগে যুগে সকল নবী রাসূল এ দা‘ওয়াত নিয়েই এসেছিলেন। মানবের সৃষ্টিগত দিকটি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সৃষ্টিগতভাবেই একটি শিশু সত্য মিথ্যা, ভাল-মন্দ ইত্যাদি মৌলিক কিছু মুল্যবোধ নিয়েই বেড়ে উঠে। এরই নাম ‘ফিতরাত’। অতএব, সত্য গ্রহণের যোগ্যতা তাদের মাঝেও নিহিত আছে। মহান আল্লাহ বলেন ‘‘এটা আল্লাহর দেয়া ফিতরাত (স্বভাব প্রকৃতি) যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই।” [আল-কুরআন, সূরা আর রুম-৩০।]

সুতরাং এ ফিতরাতের বিকাশ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার সামর্থ্য সংকীর্ণ। ফলে সে নিজে নিজে বিকশিত হতে পারছে না। তাই আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় করুণায় মানুষকে পথ দেখালেন তার সেই সুপ্ত শক্তি বিকাশের জন্য, যেন সে কোন দিন আপত্তি তুলতে না পারে, এ জন্যই তিনি যুগে যুগে আম্বিয়া ও রাসূলগণকে দা‘ওয়াতের মিশন নিয়ে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘‘সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছি, যাতে প্রেরণের পর আল্লাহর কাছে আপত্তি করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে যে, আমরা সত্য জানতাম না, তাই তোমার আদর্শ মানতে পারিনি।” [আল-কুরআন, সূরা আন-নিসা-: ১৬৫।]

এ মানব জাতিকে সত্যপথে আহ্বান জানানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলা তার প্রিয় মনোনীত বান্দাদের জন্মলগ্ন থেকেই কতিপয় নৈতিক ও মানবিক গুণাবলী সম্বলিত করে প্রেরণ করেন। সে হিসেবে মূসা আলাইহিস সালাম বাল্যকাল হতেই সত্য ও শান্ত ছিলেন। ফের‘আউনের গৃহে অবস্থান কালে তার অন্যায় অবিচারকে তিনি অসত্য ও অপরাধ হিসেবেই মনে করতেন। খুব ছেলে বেলায়ই আল্লাহ তা‘আলা তার মাকে এ বলে সান্তনা দিয়েছিলেন যে, ‘‘তাকে তিনি রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত করবেন।’’ সুতরাং শৈশব হতেই তার মাঝে পয়গম্বরসূলভ আচরণ পরিলক্ষিত হয়।

তদুপরি ব্যক্তিগত প্রস্তুতির জন্য আল্লাহ রাববুল আলামীন তাকে নিজ দেশ মিসর হতে ‘হিজরত’ [হিজরত অর্থ দেশ ত্যাগ করা, কোন কিছু ছেড়ে দেয়া, বিরত থাকা পরিত্রাণ ইত্যাদি। পরিভাষায়, কাফের অধ্যুষিত দেশ হতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশের দিকে চলে যাওয়াকে বুঝায়। (ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮০৩; সায়া‘দী আবু যাইব , আল কামুসূলে ফিকহী, (পাকিস্তান: ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলুম আল-ইসলামীয়া, তা. বি.). পৃ. ৩৬৫] করিয়ে ‘মাদইয়ান’ শহরে নিয়ে যান এবং সেখানকার এক নেককার ব্যক্তির সংস্পর্শে পাঠান। সূদীর্ঘ দশবছর যাবত তার গৃহে অবস্থান করায় তিনি জ্ঞানগত ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণে সক্ষম হন। তিনি (মূসা) এর সময়ে একদিকে যেমন পারস্পরিক আচার-আচারণ, লেন-দেন, উঠা-বসা, চাল-চলন, ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়েছিলেন, তেমনি সেখানে বকরী চরানোর কারণে নেতৃত্বের গুণাবলী, ধৈর্য, কষ্ট-সহিঞ্চুতা, আনুগত্য, পরিশ্রমপ্রিয়তা, বিনয় ও নম্রতা, প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এ মর্মে হাদীসে এসেছে, ‘‘আল্লাহ সকল নবীকে বকরীর রাখাল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। [ইমাম বুখারী, প্রাগুক্ত, কিতাবুল ইজারাত, হাদীস নং-২১০২।] অতএব বকরী চরানো পয়গম্বরদের সুন্নাত। এতে নেতৃত্বের গুনাবলী অর্জিত হয়। কেননা, ছাগল সাধারণতঃ পাল থেকে আলাদা হয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করে। ফলে রাখালের মনে বার বার ক্রোধের উদ্রেক হয়। ক্রোধের বশবতী হয়ে রাখাল যদি পলাতক ছাগল হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, তবে ছাগল হাতছাড়া হয়ে কোন বাঘের খোরাকে পরিণত হবে। পক্ষান্তরে, ইচ্ছামত পরিচালনা করার জন্য যদি সে ছাগলকে মারপিট করে, ক্ষীনকায় জন্তু হওয়ার কারণে হাত পা ভেঙ্গে যাওয়া বিচিত্র নয়। এ জন্যেই রাখালকে অত্যাধিক ধৈর্য্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয়। রাসূলগণের সাথে সাধারণ মানব সমাজের ব্যবহার ও তদ্রুপ হয়ে থাকে। এতে রাসূলগণ তাদের তরফ হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেও পারেন না এবং তাদেরকে কঠোরতার মাধ্যমেও পথে আনতে পারেন না। ফলে ধৈর্য্য ও সহনশীলতার পথই তাদেরকে অবলম্বন করতে হয়।